menu

ভরা মৌসুমে

বীজ সংকট ও অগ্নিমূল্যে দিশেহারা পিয়াজ চাষিরা

সংবাদ :
  • হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
  • ঢাকা , রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০
image

পাবনায় জমিতে কৃষকের পিয়াজের বীজ বপন -সংবাদ

গত দুই বছর পিয়াজের টানা অগ্নিমূল্যে যখন দেশের সাধারণ মানুষ সংসার খরচে পিয়াজের জোগান দিতে হিমশিম খেয়েছে তখন পিয়াজ ব্যবসায়ী আর পিয়াজ চাষিরা লাভের টাকা গুনেছে। তবে পিয়াজের বীজ সংকট ও অগ্রিমমূল্যে পিয়াজ চাষে লাভবান সেসব কৃষকের এখন কপালে ভঁাঁজ পড়েছে।

পিয়াজ রোপণের ভরা মৌসুমে এবার মানসম্মত পিয়াজ বীজের সংকট আর আকাশচুম্বী দাম দিয়ে বীজ কিনে বপন করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ কৃষক। এদিকে বীজের অগ্নিমূল্যের পাশাপাশি শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ বছর পিয়াজ আবাদের খরচ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে কৃষকরা। ফলে সহসাই পিয়াজের দাম কমার আশা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

পিয়াজ বীজের সংকটের সময়ে এ বছর সরকারিভাবে বিএডিসি থেকে কৃষকদের কাছে ন্যায্যমূল্যে বীজ বিক্রি না করায় সংকট আরও ঘনিভূত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষকরা। পর্যাপ্ত বীজের যোগান না থাকায় বিএডিসি এ বছর কৃষকদের বীজ সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে পিয়াজ বীজের বাজার দখল করেছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।

সংকট নিরসনে কৃষি বিভাগ এ বছর দেশের বেশ কিছু জেলায় কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে কিছু পিয়াজ বীজ বিতরণ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অনেক কম হওয়ায় পিয়াজ বীজের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। বীজ সংকট থাকলেও দেশে এ বছর প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে পিয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। কৃষি সম্প্রসারণ আধিদফতরের (খামার বাড়ি) নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার মো. রাশেদ ইফতেখার বলেন, এবছর দেশে বীজ পিয়াজ আবাদ হবে প্রায় ১ লাখ ৮৫ লাখ হেক্টর জমিতে আর কন্দ পিয়াজ (মূলকাটা) পিয়াজ আবাদের টার্গেট নির্ধারণ করেছে ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে। কন্দ পিয়াজ আবাদ কার্যক্রম শেষ হয়ে গেলেও বীজ পিয়াজ আবাদের কার্যক্রম শুরু করার সময় ভয়াবহ সংকটে পড়েছে দেশের পিয়াজ চাষিরা।

আবাদের টার্গেট পূর্ণ হলে চলতি মৌসুমে আবাদকৃত জমি থেকে ২৯.৫ লাখ মেট্রিক টন পিয়াজ উৎপাদন করা যাবে বলে রাশেদ জানায়। এ জন্য প্রয়োজন মানসম্মত পেয়াজ বীজ। লক্ষ্যমাত্রার জমিতে পিয়াজ আবাদ করতে এ বছর ১১৪২ মেট্রিক টন পিয়াজ বীজের প্রয়োজন হবে বলে সে জানায়।

সরেজমিনে পিয়াজ বীজের বাজার পরিদর্শন করে এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর যে পিয়াজের বীজের দাম ছিল ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি এ বছর সে পিয়াজ বীজের দাম হয়েছে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা, পিয়াজ বীজের অস্বাভাবিক বাজার বৃদ্ধিও পাশাপাশি বাজারে গুণগত বীজের সংকট দেখা দেয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ কৃষকরা।

পাবনার সুজানগর উপজেলার মাঠপাড়া গ্রামের পিয়াজ চাষি কাওসার মোল্লা বলেন, গত বছর ৬ বিঘা জমিতে তিনি পিয়াজ চাষ করে দাম ভালো পাওয়ায় এ বছর সে ১০ বিঘা জমিতে পিয়াজ আবাদের উদ্যোগ নেন। এ জন্য তার ১০ কেজি বীজ প্রয়োজন, গত সপ্তাহে তিনি রাজশাহী থেকে ৪ কেজি তাহেরপুরি পিয়াজের বীজ কিনেছেন ৭ হাজার টাকা কেজি দরে। আমি ৪ কেজি বীজের চারা দিয়েছি যা দিয়ে অর্ধেক জমিও আবাদ করা যাবে না। দাম বেশি হলেও বাজারে বীজের পর্যাপ্ততা না থাকায় আমি প্রয়োজনীয় বীজ কিনতে পারিনি বলে কাওসার জানান। এ সপ্তাহে তিনি আরও বীজ কেনার জন্য আবারও রাজশাহীতে যাবেন বলে জানান।

চলতি ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে বীজতলা শেষ করতে না পারলে পিয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাবে না বলে তিনি জানান।

প্রতি বছর বিএডিসি থেকে কিছু বীজ কিনতে পারলেও এ বছর বিএডিসি কৃষকদের জন্য কোন বীজের ব্যবস্থা করতে পারেনি ফলে পিয়াজ বীজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে কৃষকরা।

বিএডিসি বীজ বিপণন ম্যানেজার আবু রায়হান তারেক বলেন, প্রতি বছর কৃষকদের কাছে কিছু বীজ ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা হয় এতে করে চাহিদা পূরণ না হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে এ বছর বিএডিসি কোন বীজ সংরক্ষণ করতে না পারায় কৃষকদের কাছে সরকার নির্ধারিত সাড়ে ৩ হাজার টাকা কেজি দরে পিয়াজ বীজ বিক্রি করতে পারেনি, ফলে বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।

গত বছর বিএডিসি ৫ মেট্রিক টন পিয়াজ বীজের যোগান দিতে পারলেও এ বছর বিএডিসির কাছে মাত্র ৩/৪ মেট্রিক টন পিয়াজ বীজ ছিল- যার পুরটাই কৃষি বিভাগ নিয়ে নিয়েছে। কৃষি বিভাগ তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার জন্য এ বছর বিএডিসির সব বীজ নিয়ে নেয়ায় কৃষকদের কাছে বিএডিসি কোন বীজ সরবরাহ করতে পারছে না বলে জানায় তারেক।

এদিকে পিয়াজ বীজের বাজার বৃদ্ধির পাশাপাশি এ বছর শ্রমিকের খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ায় পিয়াজ চাষের খরচ অনেক বেড়েছে বলে জানায় কৃষকরা।

সাঁথিয়া উপজেলার ঘুঘুদহ গ্রামের কৃষক আবদুল মজিদ বলেন, গত বছর এক বিঘা জমিতে পিয়াজ আবাদ করতে খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা তবে এ বছর পিয়াজ বীজের বাজার বাড়তি হওয়ায় এবং শ্রমিকের খরচ বেশি পড়ায় এ বছর এক বিঘা জমিতে পিয়াজ আবাদ করতে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ পড়বে ফলে পিয়াজের দাম কমার এখনই আশা নেই।

এদিকে পিয়াজ আবাদের শুরুতে পিয়াজ বীজের সংকট আর বেশি বাজার মূল্য ভাবিয়ে তুলেছে কৃষি বিভাগকে। মানসম্মত বীজ না থাকায় এ বছর পিয়াজের আবাদ ও উৎপাদনের টার্গেট পূরণ করা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে খোদ কৃষি বিভাগের। সংকট মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ পিয়াজ চাষিদের মধ্যে পিয়াজ বীজ বিনামূল্যে প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আসাদুল্লা ‘সংবাদ’কে বলেন, এ বছর দেশের ২১টি জেলায় প্রায় ৫০ হাজার কৃষকের মাঝে পিয়াজ বীজ প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতি কৃষককে ২৫০ গ্রাম পিয়াজ বীজ প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হয়েছে বলে মহাপরিচালক জানান।

পিয়াজের বাজার মূল্য ভালো থাকায় অধিকাংশ কৃষক পিয়াজ বাজারজাত করে ফেলায় কৃষকদের ঘরে পর্যাপ্ত পিয়াজ বীজ রাখা সম্ভব হয়নি। কৃষকদের ঘরে পর্যাপ্ত বীজ না থাকায় বীজ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে পিয়াজ বীজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠেছে বলে তিনি জানান।

বাজারে যে বীজ পাওয়া যাচ্ছে তার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মহাপরিচালক জানান। পিয়াজ বীজ সংকটের এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আগামিতে দেশে পিয়াজ বীজের সক্ষমতা অর্জন করা হবে বলে জানান তিনি।