menu

পদ্মায় তীব্র স্রোতে ফেরি চলাচলে বিপর্যয়

দৌলতদিয়ায় ভেঙেছে ৪টি ঘাট

সংবাদ :
  • মাহমুদ আকাশ
  • ঢাকা , বুধবার, ০৯ অক্টোবর ২০১৯

পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। দৌলতদিয়ায় ৬টি ঘাটের মধ্যে ৪টি ভেঙে গেছে। মাওয়ার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে বিকল্প চ্যানেল দিয়ে ছোট ফেরি চলাচল করলেও নাব্য সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে বড় ফেরি চলাচল। অন্যদিকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটে তীব্র স্রোত ও নদীভাঙনের কারণে বড় ফেরি চলাচল করলেও বন্ধ রয়েছে ছোট ফেরি চলাচল। ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মাওয়া ও আরিচা ফেরিঘাটের দু’পাড়ে তৈরি হয়েছে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় থাকা যাত্রী ও চালক-শ্রমিকদের চরম দুর্ভোগে পোহাতে হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানায়।

জানা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলায় যানবাহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌরুট শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট। নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নৌরুট দুটিতে তীব্র স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ী নৌরুটের লৌহজংয়ে পলি পড়ে চ্যানেলে নাব্য সংকট তৈরি হয়েছে। তীব্র স্রোতে ড্রেজার ভাসিয়ে নেয়ার কারণে নদী খনন কাজও ব্যাহত হচ্ছে। তাই গত সোমবার রাত ৯টার পর শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। গতকাল ভোর থেকে ছোট ফেরি চলাচল শুরু হলেও নাব্য সংকটে বড় ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে তীব্র স্রোতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ৬টি ঘাটের মধ্যে ৪টি ভেঙে গেছে। ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে বালির বস্তা ফেলে নদীর পাড় রক্ষা কাজ করছে। কিন্তু নদীতে স্রোতের কারণে বালির বস্তা ভেসে যাচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা করে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে বড় ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব-উল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ভারতের বিভিন্ন স্থানে বন্যা ও ফারাক্কা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেয়ায় পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তীব্র স্রোতে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ বিকল্প চ্যানেল দিয়ে ফেরি চলাচল করছে। কিন্তু চ্যানেলে মুখে নাব্য সংকটের কারণে বড় ফেরি চলাচল করতে পারছে না। নাব্য সংকট দূর করতে ডেজিং হচ্ছে। কিন্তু তীব্র স্রোতে ডেজার ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। তবু বিআইডব্লিউটিএ নিজস্ব ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করা হচ্ছে। অন্যদিকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। তীব্র স্রোত ও নদীভাঙনের কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর ৬ ঘাটের মধ্যে ৪টি ভেঙে গেছে। বালির বস্তা ফেলে বিকল্প ব্যবস্থায় ঘাট তৈরি কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু স্রোতর কারণে বালির বস্তা ভেসে যাচ্ছে। আশা করছি, দু’একদিনের মধ্যে পদ্মায় পানি চাপ কমলে দ্রুত ঘাট তৈরির কাজ শেষ করা যাবে।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া ঘাট শাখার ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম জিল্লুর রহমান বলেন, পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতর কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় ফেরি চলাচলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ৪টি ঘাট ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে। ১৬টি ফেরির মধ্যে মাত্র ৫টি বড় ফেরি চলাচল করছে। ফলে দু’পাড়ে তীব্র যানবাহনের জট তৈরি হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, বর্ষায় শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি রুটের মূল পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত লৌহজং টার্নিং পয়েন্টে জুলাই-সেপ্টেম্বরে প্রবল স্রোতে ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়। নাব্য সংকট ও প্রবল স্রোতের কারণে এ সময় ফেরি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এ সময় নাব্য সংকট নিরসনে নদী খননের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। তীব্র স্রোতে ড্রেজার ভাসিয়ে নিয়ে যায়। উজান থেকে আসা পলি দ্বারা নৌচ্যানেলটি ভরাট হয়ে যায় এবং ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই এই সমস্যা সমাধানে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে বিআইডব্লিউটিএ নিজস্ব ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে। চ্যানেলটি নাব্য রক্ষায় ১২টি ড্রেজার দিয়ে সব নদী খনন করতে হচ্ছে। স্রোতের তীব্রতার কারণে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথের পুরনো চ্যানেলের মাটি ও বিকল্প চ্যানেলের দু’পাড়ের চর ভেঙে বিকল্প চ্যানেলের মুখসহ লৌহজং টার্নিং পয়েন্ট থেকে মাগুরখন্দ এলাকায় পলি জমে নাব্য হারাচ্ছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন ৯-১০ ফুট গভীরতায় পানি রয়েছে। লৌহজং টার্নিং পয়েন্ট, বিকল্প চ্যানেলের মুখ ও মাগুরখন্দ এলাকায় তুলনামূলক বেশি পলি মাটি জমে। তবে নদী খননের কারণে বর্তমানে পুরনো চ্যানেল ও বিকল্প চ্যানেলে প্রয়োজনীয় নাব্য থাকায় ফেরি চলাচলে কোন সমস্যা হচ্ছে না। তবে নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় ড্রেজিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

নদীতে স্রোতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় গত সোমবার রাত ৯টা থেকে এই রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও চালকরা। কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া রুটে ৪টি রো-রোসহ মোট ১৮টি ফেরি রয়েছে। কিন্তু নাব্য সংকট ও তীব্র স্রোতের কারণে মাঝে মধ্যেই চলাচল ব্যাহতের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বন্ধও থাকছে ফেরি চলাচল। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানান।

যশোর থেকে আসা ট্রাকচালক আসলাম মিয়া বলেন, সোমবার রাত থেকে ফেরি বন্ধ। আটকে আছি ঘাটে। নির্ধারিত সময়ে ঢাকা যেতে পারছি না। এদিকে ঘাটে খাবারের দামও বেশি। সব মিলিয়ে বেশ কষ্টকর হয়ে উঠছে এই রুটে চলাচল।

আরেক ট্রাকচালক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, সোমবার বিকেলে এসেও পার হতে পারিনি। আর এখন ফেরি বন্ধ। কখন চালু হবে, তাও জানেন না কেউ।

পচনশীল পণ্যবাহী এক ট্রাক শ্রমিক জানান, ঘাটে আটকে থেকে ট্রাকে থাকা সবজি নষ্ট হওয়ার পথে। একই সঙ্গে ঘাটে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকায় আমাদের খরচও বাড়ছে।

দৌলতদিয়ায় নদীপারের অপেক্ষায় শত শত যাত্রীবাহী বাস

প্রতিনিধি, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) জানান, তীব্র স্রোতে টানা এক সপ্তাহ ধরে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জনদুর্ভোগ কমাতে এ নৌরুট দিয়ে শুধু যাত্রীবাহী যানবাহন পারাপারের কথা থাকলেও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে পণ্যবাহী ট্রাক ফেরিতে ওঠার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে দৌলতদিয়ায় মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।

বিআইডব্লিউটিসি ও ঘাট সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহ নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় ফেরি চলাচল চরম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া একই কারণে ৪ দিন ধরে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে লঞ্চ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নৌরুটের মোট ১৬টি ফেরি মধ্যে বেশিরভাগ ফেরিই স্রোতের বিপরীতে চলাচল করতে পাছে না। কখনও ৩টি আবার কখনও ৭-৮টি ফেরি চলাচল করছে। এক্ষেত্রেও স্রোতের তীব্রতায় ফেরিগুলোকে প্রতি ট্রিপে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। আবার কখনও যানবাহন পারাপার বন্ধ করে দিয়ে শুধু যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। এ অবস্থায় সোমবার থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রাক না পার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। তারপরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ সিরিয়ালে আটকে আছে যাত্রীবাহী শত শত বাস।

সরেজমিন গতকাল দুপুর ১টার দিকে দেখা গেছে, দৌলতদিয়া ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে মহাসড়কের বাংলাদেশ হ্যাচারিজ পর্যন্ত অন্তত সাড়ে ৩ কিলোমিটারজুড়ে যাত্রীবাহী বাসের দীর্ঘ সারি। এর মধ্যে অসংখ্য নৈশ কোচ সোমবার রাতে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় সিরিয়ালে আটক পড়ে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ফেরির নাগাল পায়নি।