menu

ইসকন সমর্থক হওয়ায়

না’গঞ্জে তিন হিন্দু পরিবার এক বছর ধরে একঘরে

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ
  • ঢাকা , শুক্রবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৮

ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের বন্দরের লাঙলবন্দ এলাকার তিনটি হিন্দু পরিবারকে প্রায় এক বছর ধরে একঘরে করে রেখেছে এলাকার মাতব্বররা। একই কারণে এ পরিবারের এক ছেলেকে মাদক মামলায়ও ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় বিষয়টি তদন্ত করে অমানবিক এ ঘটনার সত্যতা পেলেও এ তিনটি পরিবার সহযোগিতা পায়নি স্থানীয় প্রশাসনের।

লাঙলবন্দ এলাকার ধীরেন চন্দ্র দাস, বাবুল চন্দ্র দাস জানান, তাদের ও আত্মীয়দের তিনটি পরিবার হিন্দু ধর্মেরই ইসকন সমর্থক। শুধু এ কারণে গত ২০১৭ সালের ১০ জুলাই থেকে এ তিনটি পরিবারকে একঘরে করে রেখেছে লাঙলবন্দ ঋষিপাড়া পাঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মনিরাম দাস, পূজা উদযাপন পরিষদের বন্দর থানার সাংগঠনিক সম্পাদক রিপন দাস, রামধন দাস ও রঞ্জিত দাস। একঘরে করার পরে তাদের কোন অনুষ্ঠাতে যেতে, তাদের বাসায় কাউকে আসতে, তাদের দোকান থেকে কিছু কিনতে, পূজায় অংশ নিতে এমনকি পানি আনতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। ধীরেন চন্দ্র দাসকে বের করে দেয়া হয়েছে পঞ্চায়েত কমিটি থেকে।

ধীরেন চন্দ্র দাসের স্ত্রী সাগরী দাস জানান, কয়েক মাস আগে তাদের বাড়ির টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে যায়। তারা তাদের জা’ এর বাসা থেকে পানি আনতে যায়। কিন্তু মনিরাম দাস ও রিপন দাস তাদের আত্মীয়কে হুমকি দেয় পানি দিলে তাদের আত্মীয়ের পরিবারকেও একঘরে করা হবে। এই ভয়ে তারা তাদের পানি দিতে অস্বীকার করে দেয়। তাদের কারও বাসায় দাওয়াত খেতে যেতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। আরেক আত্মীয়ের বাসায় গীতাপাঠ উপলক্ষে তাদের দাওয়াত দেয়া হয়। তারা ওই বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলে পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মনিরাম দাস খবর পান। তিনি সাগরী দাসদের ওই আত্মীয়কে হুমকি দেন, সাগরি দাসের পরিবার দাওয়াত খেতে আসলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। ফলে ওই আত্মীয় এসে তাদের দাওয়াত প্রত্যাহারের কথা বলে পঞ্চায়েতের নেতার হুমকির কথা জানিয়ে যান।

এসব বিষয়ে তারা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জানালেও কোন বিচার পাননি। উল্টো ধীরেন দাসের ছেলেকে মাদক মামলায় ফাঁসানো হয় বলে জানান তারা। ধীরেন দাসের ছেলে দুলাল দাস জানান, জুতা মেরামতের পৈত্রিক পেশার পাশাপাশি তারা তাদের বাড়ির পাশে একটি মুদি দোকান চালান। তাদের একঘরে করার অন্যতম হোতা পূজা উদযাপন পরিষদের বন্দর থানার সাংগঠনিক সম্পাদক রিপন দাস পুলিশের ইনফরমার হিসেবে কাজ করে। গত ২২ মে রিপন দাস তাদের দোকানে আসে। একঘরে করার পর থেকে তারা আমাদের দোকানে আসে না এবং অন্যদেরও আমাদের দোকানে আসতে বাধা দেয়। এ সময় তার বাবা দোকানে ছিল। সে চোখে কম দেখে। রিপন পানি কেনার এক ফাঁকে মশার কয়েলের বাক্সের ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে দেয়। পরে সন্ধ্যায় সে পুলিশ নিয়ে আসে। তখন আমি দোকানে ছিলাম। পুলিশ বলে তোমাদের দোকান সার্চ করব। পুলিশ আর কোথাও সার্চ না করে মশার কয়েলের বাক্স সার্চ করে সেখান থেকে কয়েকটি ইয়াবা বের করে। প্রতিবেশী শম্পা দাসসহ আরও কয়েকজন জানান, ভিন্নমত হলেও তাদের একঘরে করে রাখা ঠিক হয়নি। একঘরে করে রাখার নির্দেশটি প্রত্যাহারের অনুরোধ করলেও ঋষিপাড়া পঞ্চায়েতের লোকজন তা মানছেন না বলে তারা জানান।

প্রতিবেশী নরেশ দাস জানান, পঞ্চায়েতের নেতাদের আমরা বলেছি একঘরে করার নির্দেশনা তুলে নেয়ার জন্য। কিন্তু তারা নিজেদের প্রভাব বোঝানোর জন্য নির্দেশনা প্রত্যাহার করছে না। তিনি বলেন, হিন্দু ধর্মে গোসাই (কৃষ্ণ) বিভিন্ন মতের রয়েছে। কৃষ্ণ চৈতন্য মত অনুযায়ী এক রকম, রামকৃষ্ণের মত অনুযায়ী এক রকম, কাঁলাচান মত, ইসকন মত অনুযায়ী একেকরকম। যারা যেভাবে পছন্দ সেভাবে সে সেটা মানে। এখানে জোরের কিছু নেই। কিন্তু আমাদের পঞ্চায়েতের সভাপতি মনিরাম দাস, পূজা উদযাপন পরিষদের বন্দর থানার সাংগঠনিক সম্পাদক রিপন দাস বলছে তাদের মতই শ্রেষ্ঠ। অন্যমত মানা যাবে না। এ কারণে তারা জোর করছে ইসকন মত ত্যাগ করার জন্য। এ কারণেই তাদের একঘরে করে রেখেছে। এটা চরম অন্যায় হচ্ছে। এখন মুসলমানরা এসে যদি মনিরামকে বলে তাদের ধর্ম মানতে আর না হলে একঘরে করে দেয় তাহলে তার কেমন লাগবে ? এটা খুবই অন্যায় কাজ হচ্ছে। এ বিষয়টি সমাধান হওয়া প্রয়োজন। তবে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এসএম মোক্তার হোসেন জানান, আমি ঘটনাটি তদন্ত করি। তদন্তে একঘরে করে রাখার বিষয়টির সত্যতা পাই। বিষয়টি আমার রিপোর্টে উল্লেখ করে ইউএনও’র কাছে দিয়েছি।

গত ৪ নভেম্বর ভুক্তভোগিরা ও এলাকাবাসী যখন অমানবিক পরিস্থিতি বর্ণনা করছেন সেদিনই বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিন্টু বেপারী বললেন, বিষয়টি সুরাহা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে শান্তি বিরাজ করছে। একঘরে হওয়া পরিবারের সদস্য মিঠুন দাস বলেন, আমরা এই ইউএনও’র কাছে সাহায্যের জন্য বেশ কয়েকবার গেছি। তিনি দেই দেই করে সমস্যার কোনো সমাধান করেননি। বরং মনিরামদের পক্ষে কাজ করেছেন। একইভাবে আমাদের উপর বারবার হামলা, লাঞ্ছিত করার ঘটনায় আমরা বন্দর থানার ওসি’র কাছে গেলেও তিনিও কোনো মামলা নেননি। শুধু জিডি নিয়েছেন।

বন্দর ইউএনও অফিসের একটি সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের রিপোর্টটি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানোর কথা থাকলেও ইউএনও তা করেননি। এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে ইউএনও বিষয়টি এড়িয়ে যান। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন ঢাকা বিভাগ (দক্ষিন) এর সমন্বয়কারি এডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম জানান, এটি শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘন না এটি আইনেরও চরম লঙ্ঘন। আমি জেলা পুলিশের প্রতি আহ্বান জানাবো এ ঘটনা যারা ঘটিয়েছে পুলিশ যেন দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়।

ইউএনও’র বক্তব্য নিয়ে আসার পরদিন সকালে এক ইস্কন ভক্তের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে পাঞ্চায়েতের সভাপতি কয়েকজন ইসকন ভক্তের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। অন্যদিকে একই দিন এক ঘরে করে রাখার বিষয়ে জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ঋষিবাড়ির ইসকন ভক্তরা আরেকটি মামলা করেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি আমার নজরে আসার সাথে সাথে আমি এটিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। কামতাল ফাড়ির ইনচার্জকে ঘটনাটি তদন্ত করতে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্তের পর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

খুব দ্রুত এ পরিস্থিতির অবসান ঘটবে এমন প্রত্যাশা এলাকাবাসির।