menu

গাজীপুর : প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যা

দীর্ঘদিনের মতবিরোধে পরিকল্পিতভাবে খুন করে সেলিম

সংবাদ :
  • সাইফ বাবলু
  • ঢাকা , শনিবার, ২৩ মে ২০২০

গাজিপুর সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী দেলোয়ারকে হত্যায় পুরো ছক ছিল সহকারী প্রকৌশলী আনিসুর রহমান সেলিমের। গাজিপুর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ারকে কীভাবে কব্জায় আনা হবে, কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হবে তা আগে থেকেই ঠিক করেন একই বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী সেলিম। তার ছক দেখে রীতিমতো হতবাক হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনিও। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বড় কোন রাঘোব বোয়ালদের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার সেলিমকে রিমান্ড হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পাওয়ায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, ব্যক্তিগত ও পেশাগত দ্বন্দ্বে সেলিমের নেতৃত্বে প্রকৌশলী দেলোয়ারকে হত্যা করা হলেও এর নেপথ্যে অন্য কারও লাভের গুড় থাকতে পারে।

গত ১১ মে উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকায় বেওয়ারিশ হিসেবে গজিপুর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ারের লাশ উদ্ধার হয়। পরে পরিচয় পাওয়ার পর নিহতের স্ত্রী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে রাজধানীর তুরাগ থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত তদারকি করেন উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামান সরদার। ১০ দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দেলোয়ারের সহকর্মী প্রকৌশলী আনিসুর রহমান সেলিম ও তার দুইসহযোগীকে গ্রেফতার করে। ইতোমধ্যে সেলিমের সহযোগী হিসেবে হত্যায় অংশ নেয়া গাড়িচালক হাবিব এবং শাহিন দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। অন্যদিকে সহকারী প্রকৌশলী সেলিমকে ৫ দিনের রিমান্ড হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের উত্তরা জোনের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামান সরদার জানান, গত ১১ মে বিকেল অনুমান ৪টায় তুরাগ থানা এলাকার দিয়াবাড়ি ১৭ নম্বর সেক্টরের বি-ব্লকের খালি প্লট এলাকার রাস্তার পাশে প্রকৌশলী দেলোয়ারের লাশ অজ্ঞাতনামা হিসেবে পাওয়া যায়। প্রকৌশলী দেলোয়ারের লাশ উদ্ধারের সময় গলায় রশির দাগ এবং মাথায় আঘাতের চিহ্ন থাকা এটি একটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা পুলিশ অনেকটা নিশ্চিত হয়। প্রাথমিকভাবে পরিচয় না পাওয়ায় র‌্যাব সদর দফতরের সহযোগিতায় ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করে প্রকৌশলী দেলোয়ারের পরিচয় পাওয়া যায়। পরে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে তুরাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজন হিসেবে একই জোনের সহকারী ইঞ্জিনিয়ার মো. সেলিম ওরফে আনিস, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আরসিএল-এর ইঞ্জি. রাশেদুল ইসলাম ও ইঞ্জি. আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আবু সুফিয়ান জানায় যে, নিহত ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেন ঘটনার দিন সকাল বেলা তাকে ফোন করে এবং গাড়ি না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে (সুফিয়ান) জানায়, ১০ মে রাতে ইঞ্জিনিয়ার সেলিম তাকে ফোন করে বলে গাড়ির যেহেতু এসির সমস্যা আছে তাদের গাড়ি নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন হলে আপনি নিজে অথবা ইঞ্জি. সেলিম তাকে জানাবেন।

এসব তথ্য তদন্ত করে জানা গেছে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আর সিএলেল গাড়িতে করে প্রতিদিন গাজিপুর সিটি করপোরেশনের নিজ অফিসে যেতেন প্রকৌশলী দেলোয়ার। আবু সুফিয়ান ও রাশেদুল নিজেদের ব্যবসায়ীক স্বার্থে দেলোয়ারকে এ সুবিধা দিতেন। ঘটনার আগের দিন রাতে সেলিম সুফিয়ানকে ফোন করে বলেন, কাল স্যারকে আমি গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যাবো। আপনাদের গাড়িতে যেতে সমস্যা হয় আপনাদের গাড়ি স্যারের বাসায় পাঠানোর প্রয়োজন নেই।

হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া কিলার শাহিন পেশাদার অটোরিকশা চালক। পাশাপাশি সে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত। শাহিনের সঙ্গে সহকারী প্রকৌশলী সেমিলের দীর্ঘ ৪, ৫ বছরের পরিচয় রয়েছে। মিরপুরের দেওয়াপাড়া এলাকায় সেলিমের একটি জমি রয়েছে। ওই জমি দেখাশুনা করে শাহিন। সেখানে একটি গ্যারেজ রয়েছে। সেই সুবাদে শাহিনের সঙ্গে গাড়িচালক হাবিবের পরিচয়। হাবিব লাশবহনকারী এম্বুলেন্স চালক। মূলত দেলোয়ারকে হত্যায় পরিকল্পনা মোতাবেক শাহিনকে কাজে লাগায় সহকারী প্রকৌশলী দেলোয়ার। শাহিনের পূর্ব পরিচিত হাবিবকে দিয়ে হাসান নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া করে আনে। চালক হিসেবে গাড়িটি হাসানই চালায়। সেই গাড়ি নিয়ে প্রকৌশলী দেলোয়ারকে কর্মস্থলে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে উঠিয়ে নেয়।

তদন্তে নিহত প্রকৌশলী দেলোয়ারের বাসার আশপাশ, রাস্তা যাতায়াতের রুটসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হয়। ভিকটিমের বাসা থেকে অনুমান ৪০০ মিটার দূরের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি হাইয়েস মাইক্রোবাস থেকে সাদা পিপিই পরিহিত একজন ও প্যান্ট- শার্ট পরিহিত একজন ব্যক্তি নেমে প্রথমে এক রিকশা চালককে থামায়, পরবর্তীতে আর এক রিকশাচালককে থামিয়ে তার কাছ থেকে ফোন নিয়ে পিপিই পরা লোকটি, কালো লোকটিকে দিয়ে ফোনে একজনের সঙ্গে কথা বলায়, কিছুক্ষণ পর ওই রিক্সাচালকের ফোনে আরেকটি কল আসলে তারা ফোন রিসিভ করে কথা বলে দ্রুত মাইক্রোবাসে উঠে নিহত ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ারে বাসার দিকে চলে যায়।

মূলত পিপিই পড়া লোকটি ছিল সহকারী প্রকৌশলী দেলোয়ার। প্রমাণ গায়েব করতে তারা নিজেদের মোবাইলে কথা বলেনি। রিকশাচালকের মোবাইল দিয়ে প্রকৌশলী দেলোয়ারকে ফোন করে তার জন্য গাড়ি পাঠানোর কথা বলেছে। সিসি ফুটেজ অনুযায়ী রিকশাচালক রফিকুক ইসলামকে শনাক্ত করে তাকে আটক করা হয়। পরে সে সহকারী প্রকৌশলী সেলিমকে শনাক্ত করে।

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ইঞ্জিনিয়ার মো. সেলিম জিজ্ঞাসাবাদ করে। সে সময় সেলিম পুলিশকে জানায়, ঘটনার দিন সকাল থেকে সে অসুস্থ থাকায় অফিসে না গিয়ে বাসাতেই অবস্থান করছিল। ওই সময় সেলিম সে তার বাসার সঠিক ঠিকানা প্রদান না করে অন্য একটি বাসার ঠিকানা দেয়। যে বাসায় সেলিম তার স্ত্রীকে আগ থেকেই অবস্থান করতে বলে। ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের সন্দেহ হয়। পরে সেলিমের মূল বাসা খুঁজে পায় পুলিশ। বাসার সিসি ক্যামেরা সংগ্রহ করে পুলিশ দেখতে পায় ঘটনার দিন সেলিম তার বাসা থেকে পিপিই পড়ে বের হয়। এছাড়া ঘটনার আগের দিন ইঞ্জিনিয়ার সুফিয়ানকে ফোন করে ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ারের জন্য গাড়ি না পাঠানোর ঘটনায় পুলিশের সন্দেহের দিক সেলিমের দিকে যায়। এরপর সেলিমকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে মূল রহস্য বের হয়ে আসে এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত আরও ২ জনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। সহকারী ইঞ্জি. সেলিম মাইক্রোবাস নিয়ে দেলোয়ার হোসেনের বাসার সামনে নিয়ে গেলে দেলোয়ার তাকে জিজ্ঞাসা করেন গাড়িটি কার। জবাবে সেলিম বলে গাড়িটি তার নিজের বলে দাবি করে। দেলোয়ার হোসেন সেলিমের বাম পাশে বসে এবং ভাড়া করা কিলার শাহিন, ভিকটিম দেলোয়ার হোসেনের ঠিক পিছনের সিটে বসে। রূপনগর বেড়িবাঁধে ওঠার পরে সেলিমের ইশারায় শাহীন আকস্মিকভাবে ভিকটিমের গলায় রশি পেঁচিয়ে টান দেয়? এবং সেলিম নিজে ভিকটিমকে চেপে ধরে। হত্যার পর দিয়াবাড়ি ১৭ নম্বর সেক্টরে খালি প্লটে রাস্তর পাশে লাশ ফেলে দেয়। এ সময় দেলোয়ারের ফোনটি দিয়াবাড়ি লেকে ফেলে দেয়।

ইঞ্জিনিয়ার সেলিম হত্যাকাণ্ডে কোন প্রকার প্রমাণ না রাখার জন্য পিপিই পরিধান করে, ঘটনার আগের দিন সে শাহীনের স্ত্রীর নাম, ঠিকানা ব্যবহার করে শাহিনের মাধ্যমে নতুন একটি সিম উত্তোলন করে। ওই সিম দিয়েই সে ড্রাইভার ভাড়া করে এবং শাহিনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। সে তার স্ত্রীকে তারই আরেকটি নির্মানাধীন বাড়িতে অবস্থান করতে বলে। ঘটনার আগের দিন সে এবং শাহীন পল্লবীর একটি দোকান থেকে ১০০ টাকা দিয়ে একটি রশি ক্রয় করে। নিহত প্রকৌশলী দেলোয়ার ও প্রকৌশলী সেলিম একই অফিসে সহকর্মী ছিলেন। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তাদের মধ্যে বনিবনা হতো না। প্রকৌশলী দেলোয়ার বহুবার সহকারী প্রকৌশলী সেলিমের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিবেদন দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। এসব নিয়ে দেলোয়ারের উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন সহকারী প্রকৌশলী দেলোয়ার।