menu

রূপনগর সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

দগ্ধ আহতরা কাতরাচ্ছে হাসপাতালে

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , শনিবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৯

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ও ক্যাজুয়ালটি কমপ্লেক্সের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের ২৩ নম্বর বেড। একটু পর পর ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠছেন বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদ। তাকে দেয়া হচ্ছে ব্যথানাশক ইনজেকশন। গত ৩০ অক্টোবর বিকেলে মনিপুর স্কুলের রূপনগর শাখার বিপরীত দিকে ১১ নম্বর সড়কে শিয়ালবাড়ি বস্তির পাশে তারই গ্যাস বেলুনের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে সাত শিশুর মৃত্যু হয়, আহত হয় অন্তত ২০ জন। সেদিন থেকেই হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন আহত সাঈদ। বিস্ফোরণের ঘটনায় রূপনগর থানায় যে মামলা হয়েছে, তার একমাত্র আসামি এই বেলুন বিক্রেতা, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন বা গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহারবিধি নিয়ে যার কোন ধারণাই নেই।

ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবল মনোয়ার হোসেন বলেন, তার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো, তবে এক হাতে সমস্যা আছে। আপাতত তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এই বিপদে আবু সাঈদের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রতিবেশী আবু জাহিদ। তিনি বলেন, গতকাল অপারেশন হবে সাঈদের। ডাক্তার বলেছে, বাঁ হাতের আঙুল কেটে বাদ দিতে হবে। চিকিৎসা নিয়ে খানিকটা আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, এখানে টাকা ছাড়া কোন কাজ হয় না। ব্যান্ডেজ করাতেও পাঁচশ’ টাকা নেয়।

এদিকে একই ওয়ার্ডের ১২ নম্বর বেডে শুয়ে ব্যথায় কাঁদছেন রিকশাচালক জুয়েল সরদার (২৯)। সেদিন বাচ্চার জন্য বেলুন কিনতে গিয়ে বিস্ফোরণে তার বাঁ হাত ভেঙে যায়। গত মঙ্গলবার ওই হাতে অস্ত্রোপচার করেছেন চিকিৎসকরা। সেদিনের ঘটনার বর্ননা দিয়ে জুয়েল বলেন, আমি বাচ্চার জন্য বেলুন কিনতে গেলাম, তারপর বেলুনওয়ালা বলল তার কাছে গ্যাস নাই। বলেই সে তার সিলিন্ডারে ছাইয়ের মতো কী জানি একটা দিল। আমিও দাঁড়ায়ে দেখতে লাগলাম, তারপর হঠাৎ বিস্ফোরণ হল। এই কষ্টের মধ্যেও সান্ত¡না খুঁজে তিনি বলেন, ভাগ্যিস আমার বাচ্চাগুলা আমার সঙ্গে ছিল না। নিজের কষ্ট সহ্য করতে পারতেছি, কিন্তু ওদের কিছু হইলে বাঁচতাম না। ছেলের চিকিৎসার বিষয়ে জুয়েলের মা জুলেখা বলেন, এতদিন যা হয়েছে হোক কিন্তু এখন আমাদের বড়ই টাকার প্রয়োজন। প্রথমে একজন এসে চিকিৎসার জন্য ৫ হাজার টাকা দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে আর কেউ কোন সাহায্য দেয়নি। ছেলে দিন আনে দিন খায়, তার রিকশা চালানো বন্ধ। টাকা না থাকলে ওষুধ কিনতে পারব না। আমাদের সাহায্য দরকার, দয়া করে সাহায্য করুন।

ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি বিল্ডিংয়ের পাশেই বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৫ বছর বয়সী জান্নাত বেগম। পেশায় গৃহকর্মী এই নারী সেদিন বিস্ফোরণে হারিয়েছেন তার ডান হাত। তার স্বামী রিকশাচালক মো. নজরুল বলেন, সেদিন বিকালে জান্নাত বাজার করতে যাচ্ছিলেন। পাশেই ঘটনাটি ঘটে। বিস্ফোরণে ওই জায়গাতেই তার ডান হাত শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। এখানে চিকিৎসা চলছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে ইমার্জেন্সি থেকে এইখানে (বার্ন ইউনিট) ট্রান্সফার করেছে। অপারেশন লাগবে কি না ডাক্তার কিছু বলে নাই। তবে রোজ এসে দেখে যায়। ওষুধ আর ইনজেকশন দিচ্ছে প্রতিদিন।

ওই বিস্ফোরণে এক চোখ হারানো ছয় বছরেরর মো. মোস্তাকিনের চিকিৎসা চলছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। রূপনগরের ৯ নম্বর রোড মডেল স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে পড়ত সে। মোস্তাকিনের বাবা মফিজুরের রহমান কাজ করেন একটি প্লাস্টিক কারখানায়। তিনি জানান, তার ছেলের ডান চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ডান পা ভেঙে গিয়েছে, পুড়ে গেছে শরীরের অনেকটা অংশ। শনিবার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা। রূপনগরের মাদ্রাসা ছাত্র ৮ বছর বয়সী জনি সেই বিস্ফোরণে দুই চোখই হারিয়েছে। তার চিকিৎসা চলছে শ্যামলীর চক্ষু হাসপাতালে। তার বাবা রিকশা গ্যারেজের শ্রমিক মো. সুলতান জানান, জনির মুখের অনেকটা অংশ পুড়েও গেছে। তিন দিন সে অচেতন ছিল।

মন্ত্রণালয়ের চার সুপারিশ

রূপনগর বিস্ফোরণের পর এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সরকারের কাছে চার দফা সুপারিশ করেছে বিস্ফোরক পরিদফতর। পরিদফতরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. সামসুল আলম বলেন, ওই ঘটনা তদন্ত করে বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। হাইড্রোজেন ভর্তি বেলুন নিষিদ্ধেও সুপারিশ করেছি আমরা। তিনি জানান, বেলুনের জন্য কস্টিক সোডা ও এলুমিনিয়াম পাউডার নিয়ে হাইড্র্রোজন গ্যাসের রিঅ্যাক্টর বানায় এক শ্রেণীর হকার। এ ধরনের একটি সিলিন্ডারই রূপনগরে বিস্ফোরিত হয়েছে। পরিদফতরের পক্ষ থেকে সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- শিশু কিশোরদের জন্য হাইড্রোজেন বেলুন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অভিভাবকদের সতর্ক করতে হবে। হাইড্রোজেন বেলুন বিক্রেতাদের পেলেই থানায় সোপর্দ করতে হবে। হাইড্রোজেন বেলুন নিষিদ্ধ করা যায় কিনা- সেটাও দেখার সুপারিশ করেছে পরিদফতর।