menu

শিবচরে

ছাড়পত্র পাওয়া ৬ জনের ফের করোনা উপসর্গ

সাধারণ মানুষ বিধি মানছে না হোম কোয়ারেন্টিনের

সংবাদ :
  • শিব শংকর রবিদাস, শিবচর (মাদারীপুর)
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০

লকডাউন ঘোষিত মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার এক নারীসহ ৬ জনকে আইসোলেশন থেকে ফেরার এক সপ্তাহের মধ্যেই আবারও আইসোলেশনে নেয়া ও প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ উৎকন্ঠা বেড়েছে। সিভিল সার্জনের অভিযোগ আইসোলেশন থেকে মুক্ত হওয়ার পর ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিনের বিধি না মানায় এ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। উল্টো একজন মসজিদে নামাজ আদায় ও মিলাদ দিয়ে এলাকা ও মানুষকে করেছেন ঝুঁকিপূর্ণ। সারা উপজেলা লকডাউন হলেও ওই এলাকাগুলো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে লাল ফ্ল্যাগ টানিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এদের সংস্পর্শে আসা ৫০ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রেখেছে প্রশাসন। ১০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। দুপুর ২টা থেকেই ওষুধের দোকান ছাড়া সব দোকান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সব প্রবেশদ্বার বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জরুরি রুগী ছাড়া সব যানবাহন বন্ধ রয়েছে।

সরেজমিন আক্রান্ত এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, শিবচর উপজেলায় করোনা উপসর্গ দেখা দেয়ায় এক নারীসহ তিনজনকে সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাঠানো হয় ৫ এপ্রিল। এর আগে গত ২৭ মার্চ এই তিনজনকে আইসোলেশন ওয়ার্ড থেকে ছাড়পত্র দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা তিনজনের মধ্যে দু’জন স্বামী-স্ত্রী। এক ইতালি প্রবাসীর শ্বশুর-শাশুড়ি। তারা উপজেলার পাচ্চর ইউনিয়নের হাজীপুরের বাসিন্দা। অপর একজন একই উপজেলার বহেরাতলা ইউনিয়নের ৩২ বছর বয়সী ইতালি প্রবাসী। আইসোলেশন থেকে মুক্ত হওয়ার পর বাড়িতে ফিরলে প্রবাসীর শ্বশুর হোম কোয়ারেন্টিন বিধি না মেনে উল্টো এলাকার মসজিদে নামাজ পড়ে ও মিলাদ মাহফিলে অংশ নেয়। যেখানে অর্ধশতাধিক মুসল্লিও অংশ নেয়। এই ৩ জনসহ ১৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ৩ এপ্রিল আইইডিসিআর এ পাঠালে ৫ এপ্রিল এই ৩ জনের মধ্যে পুনরায় সংক্রমণ পাওয়া যায়। এছাড়াও ছাড়পত্র পাওয়া ওই ইতালি প্রবাসীর শ্বশুর-শাশুড়ি ছাড়া তার স্ত্রী ও ২ সন্তানের অবস্থার অবনতি ঘটায় এই ৩ জনকেও আইসোলেশনে নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়। তাদের ২ সন্তান শিশু হওয়ায় বাড়িতেই তাদের চিকিৎসা চলছে। এর আগে এই পরিবারটির ৮ সদস্য আইসোলেশনে ছিল। প্রবাসীর বাবা করোনায় মৃত্যুবরণ করে। বর্তমানে এদের সংস্পর্শে আসা ৫০ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রেখেছে প্রশাসন। এই ৬ জনের বাড়ি লাল ফ্ল্যাগ দিয়ে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়ে হোম কোয়ারেন্টিন না মানায় নিজেরা আক্রান্ত হয় ও অন্যদের সংস্পর্শে নিয়ে ঝুঁকিতে ফেলে। ফলে সোমবার জরুরি বৈঠক করে কোয়ারেন্টিন থেকে পুরো উপজেলা লকডাউন করে প্রশাসন। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়া হয়েছে। ওষুধের দোকান ছাড়া সব দোকান বন্ধ দুপুর ২টায়। পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিবচরজুড়ে টহল দিচ্ছে। এর আগে গত ১৯ মার্চ থেকে শিবচর উপজেলার ৪টি এলাকা কনটেইনমেন্ট ঘোষণা করলেও কার্যত উপজেলাজুড়ে অচল রয়েছে। এরই সূত্র ধরে সারা জেলা জোরালো কোয়ারেন্টিন ঘোষণা করে প্রশাসন। যদিও স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর উদ্যোগে ঘরে ঘরে খাবার সহায়তা কর্মসূচির আওতায় এ উপজেলায় ২৫ হাজার মানুষকে চালসহ খাবার সরবরাহ করা হয়েছে।

হাজীপুর এলাকার মারুফ হোসেন বলেন, প্রবাসীর শ্বশুর ছাড়পত্র পেয়ে বাড়িতে আসলে সবাই স্বাভাবিকভাবে তাদের মেনে নেয়। সে মসজিদে নামাজ পড়ে। মিলাদ দেয়। পরে আবার টেস্টে তার পজিটিভ আসে। এখন সম্পূর্ণ এলাকায় লকডাউন করে আমাদের বের হতে নিষেধ করা হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নূরুল আমিন বলেন, আমরা শুনেছিলাম আমাদের উপজেলার যে আটজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল। এখন আবার জানলাম তারা নাকি আবারও আক্রান্ত হয়েছে। এটা শোনার পর আমাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

আরেক স্থানীয় শিউলী বেগম বলেন, দিন দিন করোনা রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে শুনছি। আমাদের এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের সংসদ সদস্যর লোকজন আমাদের বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে। এই খাবার সহায়তা না পেলে আমাদের অনেক সমস্যা হতো।

শিবচর পৌরসভার মেয়র মো. আওলাদ হোসেন খান, শিবচরে প্রথম কনটেইনমেন্ট পরে লকডাউন করায় জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। এই সময় হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা প্রবাসী, আক্রান্ত পরিবার ও স্বল্প আয়ের প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের মাঝে খাবার সহায়তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত ইতালি প্রবাসী মুঠোফোনে বলেন, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ও বন্ধুকে মাদারীপুর হাসপাতালে নিয়ে রেখেছে। এর আগেও ওরা ১৫ দিন ছিল। আমার স্ত্রীকেও সাবধানে থাকতে বলেছে। আমার বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

মাদারীপুর সিভিল সার্জন মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন করে বর্তমানে তিনজন আইসোলেশনে রয়েছে। এরমধ্যে প্রবাসীর শ্বশুর স্থানীয় মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশগ্রহণ করেছে। আমরা তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করেছি। আসলে যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় তারা সুস্থ হওয়ার পরও একটা নির্দিষ্ট সময় পরে আবারও তাদের স্যাম্পল টেস্ট করতে হয়। চীনেও কিন্তু যে ব্যক্তিরা প্রথম দফায় সুস্থ হয়েছিল পরবর্তীতে তারাও আবার দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হয়েছিল। বাস্তবতা হলো এই লোকজনগুলো প্রথম দফায় সুস্থ হয়ে হোম কোয়ারেন্টিন না মেনে অবাধে চলাফেরা করে। তাই নতুন সমস্যা সৃষ্টি করছে।

মাদারীপুর পুলিশ সুপার মাহবুব হাসান বলেন, আমাদের কঠোর নির্দেশনা কেউ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে পারবে না। আপনাদের কাছে অনুরোধ আমাদের নির্দেশনা মেনে চলুন। নিজেকে ও নিজের পরিবারকে নিরাপদ রাখুন।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ইতালি প্রবাসীর শ্বশুর-শাশুড়িসহ ৩ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে আছে। প্রবাসীর স্ত্রী ও দুই সন্তানের পরিস্থিতিও অবনতি হওয়ায় তাদের বাড়িতেই চিকিৎসা চলছে। যারা এর আগেও আক্রান্ত হয়েছিল। তাদেরকে আমরা আইসোলেশনে রেখেছি। লকডাউন শক্তভাবে মানতে বাধ্য করা হবে।

চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী মুঠোফোনে বলেন, লকডাউন পরিস্থিতিতে সবাইকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো মেনে চলার অনুরোধ করছি। সবাইকে সাবধানতার সঙ্গে ঘরে থাকতে হবে। খাবার সহায়তা চলতে থাকবে।