menu

কুমিল্লায় ৫০ কিলোমিটার যানজট : হুমকিতে অর্থনীতি

  • ঢাকা , বুধবার, ১৬ মে ২০১৮

  • যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে, ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ৬-৭ ঘণ্টা
  • চালকদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেছে পুলিশ

‘মহাসড়কে এত ভয়াবহ যানজট আমার জীবনেও দেখিনি। যে ভাড়া নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছি, সেই খরচ এখন পথেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটি ভাড়া মারতে যদি ৪ দিন লাগে তাইলে বৌ-পুলামাইয়ারে (স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে) কি খাওয়ামু, আর নিজেই বা কেমনে চলমু। না পারছি ঠিকমতো খাইতে আবার না পারছি ঠিকমতো ঘুমাইতে। কি করমু কিছুই বুঝতে পারছি না। যারা পণ্য ভাড়া করেছেন, তাদের কাছে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত চাইলেও তো পামু না। আর মালিক একটু পর পর ফোন দিয়ে খোঁজ নেয় কখন চট্টগ্রাম ফিরব। অথচ এখন পর্যন্ত ঢাকায়ই পৌঁছতে পারি নাই।’ গতকাল দুপুরে কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরিপুর এলাকায় এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন হতাশা এবং নির্ঘুম চোখে থাকা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রাক চালক জামাল হোসেন। শুধুই তিনিই নন, এভাবেই দিন কাটছে এ মহাসড়কে চলাচলকারী অন্যান্য যানবাহন চালকদেরও। গত দুদিন ধরে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। আর এতে হুমকির মুখে পড়েছে অর্থনীতি। পাশাপাশি চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। মাত্র ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ৬-৭ ঘণ্টা। আর এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ছিনতাইকারী ও হিজড়া গোষ্ঠীরা। সন্ধ্যার পর ছিনতাইকারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ছিনতাইয়ে আর দিনে-দুপুরে চালকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে হিজড়ারা। তবে যানজট নিরসনে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আটকে পড়া এসব ট্রাক চালকদের মাঝে শুকনো খাবার, জুস ও পানি বিতরণ করেছে জেলা পুলিশ। গত দুদিন ধরে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী পণ্যবাহী যানজটের চাপে অনেকটা নাকাল হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। গতকালও মহাসড়কের চান্দিনার মাধাইয়া থেকে টোলপ্লাজা পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আর এতে মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যাপক চেষ্টা করেও দুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, আসন্ন রমজান মাস ও ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইনখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির চাপ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যানে করে বিভিন্ন পণ্য ঢাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে ফেনীতে সৃষ্ট যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করলে এসব পণ্যবাহী গাড়িগুলো আটকা পড়ে। ওই এলাকায় যানজট পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় এবার সব গাড়ির চাপ বেড়েছে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে। ঢাকায় যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটিতে এখন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার ভোররাত থেকে ঢাকায় যেতে সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কুমিল্লা থেকে ঢাকায় পৌঁছতে আগে মাত্র ২ ঘণ্টা সময় লাগত। আর এখন সেখানে ব্যয় হচ্ছে ৬-৭ ঘণ্টা। আর এ সুযোগে যানজটপূর্ণ এলাকায় দলে দলে গিয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে চাঁদাবাজি করছে হিজড়া গোষ্ঠীর লোকজন। সবার কাছ থেকে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ১শ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। এদিকে সন্ধ্যার পর ছিনতাইকারীরা যানজটের কবলে আটকে থাকা চালক ও যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে চট্টগ্রামের কুমিরা পর্যন্ত অন্তত ৮০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে। এতে মহাসড়কের দাউদকান্দি অংশে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ অনেক কম ছিল। তবে গত সোমবার ভোর থেকে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। এছাড়াও দাউদকান্দি টোল প্লাজা এলাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেলে ঢাকামুখী পণ্যবাহী যানবাহনে ওজন নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার নামে চাঁদাবাজির কারণে ঢাকামুখী সড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ১০ মিনিটের রাস্তা যেতে সময় লাগছে ৬-৭ ঘণ্টারও বেশি। রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, ছোট শিশু, ভারী ব্যাগ ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নিয়ে পায়ে হেঁটে ১০ কিলোমিটার পথ হেটে যেতে দেখা গেছে যাত্রীদের। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়ে যাত্রী ও চালকরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আটকে পড়া এসব চালকদের মাঝে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার শুকনো খাবার, জুস ও পানি বিতরণ করেন কুমিল্লার দাউদকান্দি সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মহিদুল ইসলামসহ পুলিশের অন্যান্য সদস্যরা। যানজটে আটকে থাকা ঢাকাগামী ট্রাক চালক মকবুল মিয়া জানান, মাল নিয়া আসার সময়ও ফেনীতেও যানজট পাইছি। সেখান থেকে মুক্ত হলেও কুমিল্লায় এসে আবার আটকা পড়ছি। কখন যে ঢাকায় পৌঁছব তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। কথা হয় ঢাকাগামী আরেক ট্রাক চালক হোসেন মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, সরকার এ মহাসড়ক ফোরলেন করলেও আমরা সে সুবিধা পাচ্ছি না। অনেক প্রাইভেটকারকে দেখছি তারা ঠিকই উল্টা পথে গিয়ে আগে যাওয়ার চেষ্টা করে যানজট আরও বাড়াইতাছে। পুলিশ তাদেরকে দেইখাও না দেখার ভান করছে।কুমিল্লা থেকে ঢাকাগামী এশিয়া লাইনের যাত্রী মুন চৌধুরী জানান, বিশেষ একটি কাজে ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে সকাল ৭টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে দুপুর ২টার দিকে ঢাকায় পৌছেছি। কাজ তো হলই না। বরং বাসে আসতে গিয়ে গরমে দুর্ভোগ পোহাতে হল। একইভাবে দুর্ভোগের কথা জানালেন তিশা পরিবহনের আরেক যাত্রী তারেক হাসান। তিনি বলেন, ঢাকার একটি হাসপাতালে রোগী দেখতে সকাল ১০টায় রওয়ানা দিয়েছি। দুপুর ১টা পর্যন্ত দাউদকান্দি পার হতে পারিনি। নিরুপায় হয়ে গাড়ি থেকে নেমে আবার কুমিল্লায় ফিরে চলে এসেছি। জানতে চাইলে কুমিল্লা-ঢাকা রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী পরিবহন সার্ভিস এশিয়া এয়ারকনের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই যানজটের কারণে একটি গাড়ি ঢাকায় পৌছতে ৬-৭ ঘন্টা সময় লাগছে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে ঠিক তেমনি পরিবহন মালিকও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

হাইওয়ে পুলিশের দাউদকান্দি থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, রমজানকে কেন্দ্র করে পন্যবাহী অতিরিক্ত যানবাহন বেড়ে যাওয়া এবং ফেনীতে আটকে থাকা ট্রাকগুলো একই সাথে চলে আসায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মহাসড়কের যানজট নিরসনের লক্ষ্যে সার্বক্ষনিক কাজ করে যাচ্ছি। সহসাই মহাসড়ক যানজট স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছি। এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন বিপিএম বলেন, কুমিল্লা থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে কাঁচপুর, মেঘনা ও দাউদকান্দিসহ ৩টি সেতু রয়েছে। এ সেতুগুলোতে গাড়ি ধীরগতিতে চলে। সামনের দিকে যদি গাড়ি না যায় তাহলে এনফোর্সমেন্ট দিয়ে তো যানজট নিরসন সম্ভব নয়। ঢাকায় গাড়ি প্রবেশে ধীরগতির কারণেই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে যানজট বেড়েছে এবং রমজানকে সামনে রেখে মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের চাপে এ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। যানজট নিরসনে জেলা ও হাইওয়ে পুলিশ নিরলসভাবে সার্বক্ষনিক কাজ করছে।