menu

ঢাকা লিট ফেস্ট শুরু

সংবাদ :
  • যোবায়ের মুরাদ
  • ঢাকা , শুক্রবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৮
image

গতকাল বাংলা একাডেমিতে ঢাকা লিট ফেস্ট-এর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী

শাস্ত্রীয় সংগীতের মূর্ছনায় কত্থক নৃত্যের তালে শুরু হলো ঢাকা লিট ফেস্ট-১৮’র অষ্টম আসর। গতকাল বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে ঢাকা লিট ফেস্টের অনাড়ম্বর সূচনা ঘোষণা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায সিদ্দীক এবং আহসান আকবর। সঙ্গে যোগ দেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা নন্দিতা দাস ও পুলিৎজার জয়ী লেখক অ্যাডাম জনসন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, স্পিকার, লেখক এবং বিদেশি অতিথিদের শুভেচ্ছা জানাই। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে একটি সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানালে তিনি অগ্রাহ্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিকদের এই মিলনমেলায় আমি কীভাবে যাই।’ এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করলে তিনি একটি শর্ত দেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে কবি জসীমউদদীন, চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন ও প্রফেসর আবদুল মতিন চৌধুরীকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু ক্রিয়েটিভিটি এবং জ্ঞানের ওপর বিশ্বাস করেন। ঠিক এমনটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তিনি সব সময় সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ঢাকা লিট ফেস্টের অংশ হতে পেরে গর্বিত। আমি ঢাকা লিট ফেস্টের সাফল্য কামনা করি। অভিনেত্রী নন্দিতা দাস বলেন, আমার অনুরোধ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ এবং ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালককে, আপনারা ভারতে আসুন এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলুন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম কারাগারে আছেন। তার জন্য আমাদের সবার একসঙ্গে আওয়াজ তোলা উচিত বলে আমি মনে করি।

এর পরপরই বর্তমান সময়ের গ-ি বিবেচনায় দুশ’ বছরের পুরনো এই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভবিষ্যত খুঁজতে আলাপে বসেন অ্যাডাম জনসন, ডেভিড বিয়েলো, জেমস মিক, কোর্টনি হোডেল ও নিশিদ হাজারির মতো প-িতেরা। পোস্ট-আমেরিকা ফিউচার শিরোনামে ঢাকা লিট ফেস্টের উদ্বোধনী এই সেশনটি সঞ্চালনা করেন কাজী আনিস আহমেদ। কেবল মাত্র রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই নয়, যারা আলোচনা করেন দেশটির সংস্কৃতি, সাহিত্য, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার খুঁটিনাটি নিয়ে।

দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর বাংলা একাডেমির কসমিক টেন্টে আয়োজিত ‘প্রকাশনা শিল্প ও বইয়ের বিপণন’ শীর্ষক আলোচনায় যোগ দেন প্রকাশক খান মাহাবুব, মিলন কান্তি নাথ, সৈয়দ জাকির হোসেন, মারুখ মহিউদ্দীন এবং পশ্চিমবঙ্গের ‘দে প্রকাশনা’র প্রকাশক অপু দে। সঞ্চালনায় ছিলেন ফিরোজ আহমেদ।

বই প্রকাশনা শিল্প এগিয়ে নিতে কার কী দায়িত্ব? সরকারের, প্রকাশকের, লেখকের এবং পাঠকদের দায়িত্ব নিয়ে কথা উঠেছে। কথা উঠেছে প্রকাশনা শিল্প ও বইয়ের বিপণনের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও। পাশাপাশি ‘প্রকাশনা শিল্প ও বইয়ের বিপণন’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তাদের কণ্ঠে ফুটে ওঠে শঙ্কাও। তারা এই শিল্পের সংকটের নানা দিক তুলে ধরেন।

ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিনের দুপুরে কবি শামসুর রাহমান সেমিনার হলে আয়োজিত হয় আলোচনা সভা ‘যে গল্পের পাঠক নেই’। ছোট গল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন সাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের, আহমাদ মুস্তফা কামাল, হামীম কামরুল হক ও রাশিদা সুলতানা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছোটগল্পকার পারভেজ হোসাইন।

সারা বিশ্বে চলছে বিরামহীন যুদ্ধ। যুদ্ধ এখন বাস্তবতা। তাই নিয়ে ‘ক্র্যাশিং রিয়েলিটিস’ শিরোনামে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মঞ্চে কথা বলছিলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মোহাম্মদ হানিফ সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ সাহিত্য ম্যাগাজিন গ্রান্টার নির্বাহী সম্পাদক রস পর্টার। মাত্র ২৪ ঘণ্টার জন্য ঢাকায় ছিলেন তিনি। কথা বললেন তার নতুন বই ‘রেড বার্ডস’ নিয়ে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরও দুটি বই ‘মুজিব ভাই’ ও ‘শেখ মুজিব ট্রায়ামফ অ্যান্ড ট্রাজেডি’ নিয়ে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী দিন। ‘দিনগুলি: স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক এ সেশনেই ড. আনিসুজ্জামান ওই উদ্ধৃতি দেন। ‘বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়’, ‘মুজিব ভাই’ এবং ‘ শেখ মুজিব ট্রায়ামফ অ্যান্ড ট্রাজেডি’ বই তিনটির লেখক যথাক্রমে মফিজ চৌধুরী, এবিএম মুসা এবং এসএ করিম।

লিট ফেস্টের প্রথমদিন দুপুরে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ‘সময়ের গান, অসময়ের কবিতা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে অংশগ্রহণ করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন শামীম রেজা।

এদিকে নিওরো বিজ্ঞানী গর্গ চ্যাটার্জির সঞ্চালনায় আয়োজিত হয় ‘মিথ্যা বলার অধিকার নিয়ে কথা’। রাইট টু লাই শীর্ষক এই আয়োজনে আরও ছিলেন জাকির কিবরিয়া, সৈয়দ মফিজ কামাল অনিক, ডেভিড বিওয়েল। তারা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও ব্যক্তি আচরণ নিয়ে কথা বলেন। প্রযুক্তির অপব্যবহার মানুষকে মিথ্যুক করে তুলছে। মানুষ কথা বলার সময় ও সুযোগ হারিয়ে ফেলছে। সব মিলিয়ে প্রতারণা বাড়ছে।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে অনুবাদে সৃজনশীলতার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কারণ, অনুবাদে ভিন্ন ভাষার মূল অক্ষুণœ রেখেও রূপান্তর সম্ভব। এমন অভিমতের পাশাপাশি ভিন্ন বক্তব্যও উঠে আসে ‘অনুবাদ : মূলানুগ নাকি রূপান্তর’ শীর্ষক আলোচনায়। ভাস্কর নভেরা এক্সিবিশন হল মিলনায়তনে অনুবাদক আলীম আজিজ, আলম খোরশেদ এবং মোজাফফর হোসেনের আলাপচারিতায়। এতে সূত্রধরের ভূমিকায় ছিলেন প্রথিতযশা অনুবাদক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী।

এরপর শুরু হয় সাদাত হোসেন মান্টোর জীবনী নিয়ে নন্দিতা দাসের চলচ্চিত্র ‘মান্টো’। চলচ্চিত্র প্রদর্শন শেষে নন্দিতা বলেন এই ছবি তৈরির গল্প। এ সময় বটতলার মঞ্চে জয়িতা খান রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন। একই সময় ভাস্কর নভেরা মঞ্চে শিশুদের লেখার কর্মশালা করান শিশুতোষ লেখিকা মিতালি পার্কিন্স। এর আগে লনের মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধের কবিতা আবৃত্তি হয়। বিকালের শেষভাগে বাংলা একাডেমির লনে কবিতা পাঠ করেন দেশের শীর্ষ কবিরা। কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজীর সঞ্চালনায় এই আবৃত্তিতে অংশ নেন আলফ্রেড খোকন, রাজু আলাউদ্দিন প্রমুখ।

বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে থাকছেন ভারতীয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। বাংলা ভাষার লেখকদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা অতুলনীয়। ঢাকা লিট ফেস্টের শেষ দিনে তিনি যোগ দেবেন এই আয়োজনে, কথা বলবেন বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমীদের সঙ্গে। দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা লিট ফেস্টে এসেছেন অস্কার জয়ী অভিনেত্রী টিলডা সুইন্টন। এবারও আসছেন তিনি নিজের লেখালেখি নিয়ে কথা বলতে। তারকাদের তালিকায় এবার যুক্ত হচ্ছেন বলিউড কাঁপানো অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা।