menu

সারাদেশে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার

সংবাদ :
  • বাকী বিল্লাহ ও সাইফ বাবলু
  • ঢাকা , রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০

ভাস্কর্য অপসারণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিষয়টি সমাধানে আসার ইঙ্গিত নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক দেশেই ভাস্কর্য আছে। তাতে ইসলামের কোন ক্ষতি হচ্ছে না। কুষ্টিয়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় সারাদেশে জাতির জনকের ভাস্কর্য, মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরালসহ সব ধরনের ভাস্কর্যের রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এবং উপজেলা শহরের যেসব এলাকায় যত ধরনের ভাস্কর্য আছে তা রক্ষণাবেক্ষণে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা ইউনিটের নজরদারি গতকাল রাত থেকে জোরদার করা শুরু হয়েছে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান গতকাল জামালপুরে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে হেফাজতে ইসলামের নেতাদের বিরোধিতায় সৃষ্ট পরিস্থিতির অবসান হবে এক সপ্তাহের মধ্যে। সাম্প্রদায়িকতার চিহ্ন রেখে বাংলাদেশ কোন কাজ করে না। অসাম্প্রদায়িকতার বাংলাদেশের জন্য যা করার দরকার, সে বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ভাস্কর্য নিয়ে চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ইতোমধ্যে সমস্যা অনেক সমাধান হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে বলে বিশ্বাস করে ধর্ম মন্ত্রণালয়।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ভাস্কর্য ইস্যুতে দেশে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থায় অনড় থাকা দেশের জন্য কোনভাবেই মঙ্গলজনক নয়। এ পরিস্থিতি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। জাতির জনককে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, ভাস্কর্য ইস্যুতে চলমান পরিস্থিতির মধ্যে কুষ্টিয়ায় জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনার পর থেকে সারাদেশে ভাস্কর্য রক্ষণাবেক্ষণে নিরপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে উগ্র মৌলবাদী গ্রুপ বা জঙ্গি সংগঠনগুলো যেন অপতৎপরতা না চালাতে পারে এ জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সদস্যরা এসব ইস্যুতে তৎপর রয়েছে।

ভাস্কর্য ইস্যুতে চলমান পরিস্থিতি এবং কুষ্টিয়ায় জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাবেক নির্বাচন কমিশন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাখাওয়াত হোসেন টেলিফোনে সংবাদকে বলেন, কুষ্টিয়ায় জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুর অত্যন্ত ন্যক্কার জনক ঘটনা। এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। তবে ভাস্কর্য ইস্যুতে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের বসা উচিৎ। ধর্মীয় তর্ক-বিতর্কে না জড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান হতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশেষ করে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলেন এমন দেশেও জাতির জনকের ভাস্কর্য থাকে। তবে অনেক দেশে দেখেছি, ভাস্কর্য একটি সুরক্ষিত জায়গায় স্থাপন করা হয়। মিউজিয়ামে বিশেষ যতেœ জাতির জনকের ভাস্কর্য রাখা হয় নতুন প্রজন্মের জ্ঞান সমৃদ্ধ করার জন্য। তিনি বলেন, ভাস্কর্য নিয়ে আমরা দুটি পক্ষ দেখতে পাচ্ছি। এখানে দুপক্ষ যদি ভাস্কর্য রাখা না রাখা নিয়ে নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকেন তাহলে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে না। ধর্মের জন্য ভালো হবে না। আমরা মুসলিম প্রধান দেশ। এখন ভাস্কর্য ইস্যুতে যাদের অতখানি বুঝার সক্ষমতা নেই, তাদের কে বুঝাবে। আমাদের দেশে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে জঙ্গিবাদের দিকে না যায়। ভাস্কর্য ইস্যুতে জঙ্গিবাদ যেন মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে এ জন্য দুই পক্ষের আলোচনায় বসা দরকার।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা দেখছি ভাস্কর্য নিয়ে অনেকেই রাজনীতি করছেন। আনাচে-কানাছে জাতির জনকের ভাস্কর্য নির্মাণ করে তার প্রতিও অবমাননা হচ্ছে। যত্রতত্র জাতির জনকের ভাস্কর্য নির্মাণ না করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে জাতির জনকের ভাস্কর্য নির্মাণ ও তা রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বে থাকতে হবে। কাজটি সরকারকেই করতে হবে।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘যারা অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে আমরা তাদের নজরদারি করছি। এজন্য রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানাই। কেউ যেন স্বার্থান্বেষী কোন গোষ্ঠীর উস্কানির ফাঁদে পা না দেন। কেউ উস্কানির ফাঁদে পা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার চেষ্টা করলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

সম্প্রতি রাজধানীর শনির আখড়া এলাকায় সড়কে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একটি প্রতিকৃতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর জের ধরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ সব ধরনের প্রতিকৃতি স্থাপনের বিরোধিতা করে তা প্রতিহতের ডাক দেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। এরপর থেকেই আলেমদের একাংশ একযোগে ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে মাঠে নামে। মাওলানা মামুনুলের বিরোধিতা করে ইসলামী অন্য সংগঠন এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। আলেমদের মধ্যে ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে দুই পক্ষ দুদিকে অবস্থান নেন। এমন পরিস্থিতে মাওলানা মামুনুলের অনুসারীরা কয়েক দফা রাজধানীতে ভাস্কর্যবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল করে। পুলিশ বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের ওপর চড়াও হয় আন্দোলনকারীরা। পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে মাওলানা মামুনুলের কয়েক অনুসারীকেও আটক করে পুলিশ। চট্টগ্রামে এক মাহফিলে যুবলীগ ছাত্রলীগ মাওলানা মামুনুলকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহিতার মামলা করে গ্রেফতারের দাবি জানান দেশের সুশিল সমাজ।

গতকাল কুষ্টিয়ায় ভাঙচুর করা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য। এর দুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের মধুসূদন দত্তের ভাস্কর্যের একটি কান ভেঙে দেয় দুষ্কৃতকারীরা। হেফাজতে ইসলামের সমাবেশেও ভাস্কর্য ধ্বংস করার হুমকি ছিল। ভাস্কর্য ইস্যুতে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে মাঠে নেমেছে ধর্মান্ধ মৌলবাদী একটি গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী কৌশলে সাধারণ মানুষের মনে ভাস্কর্য নিয়ে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে মৌলবাদী গোষ্ঠীটি মনগড়া কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে চলছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর। একদিকে ধর্মীয় বিষয়, আরেক দিকে জাতির জনক বন্ধবন্ধুর প্রতিকৃতি। এ কারণে অনেক সাবধানে বিষয়টি ‘হ্যান্ডেল’ করা হচ্ছে। তবে কেউ ভাস্কর্য বিনষ্ট করার মতো কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও কৌশলে বিষয়টি মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কঠোর আইন প্রয়োগের চাইতে রাজনৈতিকভাবে তা সমাধানের চেষ্টা চলছে। সারাদেশে আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠন ও প্রগতিশীল ব্যক্তি এবং সংগঠনগুলোকে কাজে লাগানোর নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া ভাস্কর্য ইস্যুতে পেছন থেকে যারা কলকাঠি নাড়ছেন তাদের শনাক্ত করে কৌশলে দমন করার জন্য বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্যদাতাদের তালিকা করছেন তারা। একই সঙ্গে যারা নেপথ্য মদদ দিচ্ছেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ার কারণে খুবই কৌশলে সবকিছু করা হচ্ছে। একটি পক্ষ ভাস্কর্য ইস্যুকে সামনে রেখে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে। এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি তাদের শনাক্তের জন্য গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছেন।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, চলমান ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে আমাদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আমরা তিনটি উপায়ে কাজ করছি। সাদা পোশাকে আমাদের সদস্যরা অপতৎপরতাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে। এছাড়া সারাদেশে র‌্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা পেট্রোলিং করছে। কেউ আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমাদের সাইবার ক্রাইম বিভাগের সদস্যরা অনলাইনে অপতৎপরতাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে। অনলাইনে যারা উস্কানিমূলক পোস্ট দিচ্ছে তাদের কঠোর নজরদারি করার পাশাপাশি শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

বিভাগীয় শহরেও নিরাপত্তা জোরদার

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন জানান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতায় যতগুলো জেলা আছে সব জেলায় স্থাপিত ভাস্কর্য, ম্যুরালের রক্ষণাবেক্ষণে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। যেকোন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী ম্যুরালসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর উপসানালয়গুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

খুলনা রেঞ্জের এক কর্মকতা বলেন, কুষ্টিয়ার ঘটনার পর খুলনা শহরসহ বিভাগের সব জেলায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যেকোন ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। গতকাল রাতে খুলনা বিভাগের পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কুষ্টিয়ায় রওনা হয়েছে। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন আর অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। খুলনা ছাড়াও ঢাকা, রংপুর, রাজশাহীসহ সব বিভাগীয় শহরে বাড়তি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া শাখার ডিসি ওয়ালিদ হোসেন বলেন, সার্বিক নিরাপত্তায় সকল ধরনের নিরাপত্তা টহল বাড়ানো হয়েছে। চলছে নজরদারিও। গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর সব স্থাপনার বাড়তি নিরাপত্তায় পুলিশ কাজ করছেন।

গতকাল সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতির পিতার ম্যুরালে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।