menu

আইন ও বিধিমালা সংশোধন হলেও

সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ঘুষ দুর্নীতি কমছে না

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
image

জমির দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রতারণা ও জালিয়াতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, স্থানীয় রাজনৈতিক ও নানাবিধ প্রভাব বিস্তার, সময়ক্ষেপণসহ নানা কৌশলে ফাঁদে ফেলে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। শুধু সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলির ক্ষেত্রে এলাকাভেদে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং ঢাকা বা তার আশপাশের এলাকায় বদলির জন্য ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেন হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। টিআইবি বলছে, বিগত বছরগুলোতে ভূমি নিবন্ধন সেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা সংশোধন ও হালনাগাদ করা এবং নিবন্ধন ফি ও যাবতীয় শুল্ক পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধের মতো বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও আইনি, পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সীমাবদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা ও সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এ খাতে এখনো সুশাসনের ঘাটতি বিদ্যমান।

গতকাল টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে টিআইবি। পাশাপাশি ভূমি নিবন্ধন সেবার যুগোপযোগী মান উন্নয়নে ১৫ দফা সুপারিশ করে সংস্থাটি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার আবু সাঈদ মো. জুয়েল মিয়ার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রণয়ন ও উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নিহার রঞ্জন রায়।

গবেষণায় দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে টাকা ছাড়া কোন কাজ করানো অত্যন্ত দুরূহ। দলিল লেখার ‘ফি’ সম্পর্কে সেবাগ্রহীতাদের ধারণা না থাকায় নিবন্ধনের ধরনভেদে দলিলের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে লেখকদের প্রতি লাখে ১-৩ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়। এছাড়া নির্ধারিত নিবন্ধন ফি’র বাইরে প্রতিটি দলিল নিবন্ধনের জন্য দলিল লেখক সমিতির নামেও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় করা হয়। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, দলিল নিবন্ধনের জন্য সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ১ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের ‘অফিস খরচ’ অজুহাতেও দলিল লেখকরা নিয়ম-বহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় করে থাকে। দলিলের নকল কপি উত্তোলনের জন্যও সরকারি নির্ধারিত ফি অপেক্ষা ১ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেনের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে একটি যোগসাজশ রয়েছে। এমনকি কিছু সেবাগ্রহীতাও এই যোগসাজশের অংশ হয়। আবার দলিল লেখকদের তাদের সমিতিতেও দলিলপ্রতি ৫০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত প্রদান করতে হয়। অন্যদিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের এই যোগসাজশের দুর্নীতির শিকার হয় এবং তাদেরকে জিম্মি করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রারসহ অন্য কর্মচারীদের পদোন্নতি ও বদলির জন্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে তদবির ও নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আছে। সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলির ক্ষেত্রে এলাকাভেদে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং ঢাকা বা তার আশপাশের এলাকায় বদলির জন্য ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। আবার সাব-রেজিস্ট্রার থেকে জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়ম-বহির্ভূত অর্থের লেনদেন, প্রভাব বিস্তার বা তদবিরের অভিযোগ রয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নকলনবিশ পদে তালিকাভুক্তি, কাজে যোগদান এবং নকলনবিশ থেকে স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত ২০ হাজার থেকে ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। একইভাবে নকলনবিশ থেকে মোহরার পদে যোগদানের জন্য জেলা রেজিস্ট্রার অফিস ও নিবন্ধন অধিদফতরে ২ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, মোহরার থেকে অফিস সহকারী পদে পদোন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা দিতে হয়। অফিস সহকারী থেকে প্রধান সহকারী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। দলিল লেখকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও এক লক্ষ থেকে তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া লাইসেন্স পাওয়ার পর দলিল লেখক সমিতিতে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য একজন দলিল লেখককে আরও ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা দিতে হয়। আবার প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়ন করার সময় অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় আইনি ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপ্রতুল বাজেট, জনবল, লজিস্টিকস, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি নানা ঘাটতির কারণে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হচ্ছে। নানা আইনি দুর্বলতায় জাল দলিল তৈরি, বিধি-৪২ অনুসারে নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা কোন দলিল প্রতারণামূলক বা সরকারি নীতির পরিপন্থী হলেও সব নিয়ম মেনে উপস্থাপিত হওয়া সাপেক্ষে সন্তুষ্ট হলে সম্ভাব্য ফলাফল না দেখে নিবন্ধনে বাধ্য হওয়ায় অন্য পক্ষের ক্ষতির আশঙ্কা, নকলনবিশ নিয়োগ বা তালিকাভুক্তিকরণ সংক্রান্ত কোন নির্দেশনা না থাকা কিংবা সাব রেজিস্ট্রার অফিসগুলোর জরাজীর্ণ দশায় নানা নথি নষ্ট হওয়ার শঙ্কা বিদ্যমান, যাতে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া বাজেট ঘাটতির কারণে কিছু ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দাফতরিক ব্যয় মেটানোর জন্য দলিল লেখক সমিতির ওপর অনিয়মতান্ত্রিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয় যা দুর্নীতির ঝুঁকি সৃষ্টি করে। সারাদেশের সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে বিভিন্ন পদে জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। গবেষণার আওতাভুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোর অনেকগুলোতেই সাব-রেজিস্ট্রারের পদ ফাঁকা রয়েছে এবং ৪১টি সাব-রেজিস্ট্রিার অফিসের মধ্যে ২২টিতে পূর্ণকালীন সাব-রেজিস্ট্রারের নেই। এছাড়া অস্থায়ী কর্মী হিসেবে পিওন, উমেদার এবং নকলনবিশরা কাজ করে। জনবল কম থাকায় অনেক সময় নকলনবিশদের দিয়ে অফিসের কাজ (ইনডেক্সিং, সার্চিং ইত্যাদি) করানোয় তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি বা দলিলে অভিগম্যতা পায়, যা দুর্নীতি বা অনৈতিক অর্থ লেনদেনের ঝুঁকি তৈরি করে।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আইন ও বিধিতে দৃষ্টিগোচর স্থানে বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞপ্তি যেমন- ফিসের তালিকা, দলিল দাখিলের সময়সূচি, সমাপ্তকৃত দলিলের দৈনিক বিজ্ঞপ্তি, নাগরিক সনদ, তল্লাশি ও নকলের আবেদন গ্রহণের সময়সূচি, রেজিস্ট্রার কর্তৃক অনুমোদিত দূরত্ব তালিকা ইত্যাদি জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ অফিসে এর সবগুলো প্রদর্শিত নেই। অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তার নাম ও যোগাযোগের মাধ্যমও প্রদর্শিত নেই। নিবন্ধন অধিদফতরের নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকলেও তা হালনাগাদ নয়। এছাড়া জেলা রেজিস্ট্রার, সাবরেজিস্ট্রারসহ অন্যান্য কর্মচারী, নকলনবিশ ও দলিল লেখকদের কার্যক্রম ও আচরণ যথাযথভাবে তদারকি না হওয়ায় তাদের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইন অনুযায়ী কোন দলিল লেখক নির্ধারিত হারের অধিক ‘ফি’ দাবি করলে তার সনদ বাতিলযোগ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে দলিল লেখকরা সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলেও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে যথেষ্ট ঘাটতি বিদ্যমান।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভূমি সম্পদ অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার চর্চার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নিবন্ধন। এটি একদিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবাখাত অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য রাজস্বের উৎস। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এবং এখাতে সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সার্বিকভাবে আমরা দেখতে পাই যে, দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অবৈধ লেনদেন এবং সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। এখাতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করছে এবং জবাবদিহিতার যে কাঠামো আছে তা কাজ করছে না। বরঞ্চ অংশীদারিত্ব ও যোগসাজশের মাধ্যমে দুর্নীতি হচ্ছে এবং সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতি বিরাজমান, যার জন্য একধরণের প্রতিষ্ঠিত রূপরেখা তৈরি করা আছে।

দলিল নিবন্ধন ও দুর্নীতি সমার্থক হয়ে গেছে মন্তব্য করে ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, আমরা চাই এ খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হোক, জনগণ দুর্নীতি থেকে মুক্ত হোক। তা করা গেলে এখাত থেকে রাজস্ব আদায়ও অনেক বৃদ্ধি পাবে। আমরা মনে করি, কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে খাতটিকে দুর্নীতিমুক্ত করার মতো সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব, আর তা করতেই হবে। কোন অপরাধ যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটতে দেয়া হয় তার বিস্তৃতি ও গভীরতা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক, যার ফলাফল হলো দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। এই সেবা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দ্বিতীয় অন্যতম উপায় হিসেবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডিজিটাইজেশন নিশ্চিত করার সুপারিশ করছে টিআইবি। অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, দলিল নিবন্ধন সেবার ক্ষেত্রে যেই পরিমাণ চাহিদা আছে, সে তুলনায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি আছে। তদারকির অভাব আছে, যারা তদারকি করছেন তারাও সঠিকভাবে তদারকি করছেন না ইত্যাদি নানা কারণে সেবা দেয়ার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দরকার তার ঘাটতি আছে। আমরা সুপারিশ করেছি যে, দলিল নিবন্ধন সেবার ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিতে অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সার্বিকভাবে ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে এসব চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের জন্য সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এ গবেষণার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যসমূহ হলো- ভূমি দলিল নিবন্ধন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা; ভূমি দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির ধরন, কারণ ও প্রভাব নিরূপণ করা; ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবা কার্যক্রমে বিদ্যমান সুশাসনের চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের জন্য সুপারিশ প্রস্তাব করা। গবেষণার সময় ভূমি দলিল নিবন্ধনে আইনি সক্ষমতা, অবকাঠামো ও লজিস্টিকস, আর্থিক বরাদ্দ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, তথ্যের উন্মুক্ততা, স্বপ্রণোদিত তথ্যপ্রকাশ ব্যবস্থা, তদারকি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বিধান, নিরীক্ষা, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, শুদ্ধাচার চর্চা এবং দুর্নীতির ধরন, কারণ ও প্রভাব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

টিআইবির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য ১৫ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দলিল নিবন্ধন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইনি ও পদ্ধতিগত সংস্কার এবং আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে; যথাযথ চাহিদা নিরূপণ সাপেক্ষে দেশের সকল সাবরেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, অবকাঠামো, লজিস্টিকস ও জনবল নিশ্চিত করতে হবে; ভূমি নিবন্ধন সেবা সহজীকরণ, জনবান্ধব এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে এই সেবা সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাইজেশন করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে ই-নিবন্ধন ব্যবস্থা দ্রুত চালু করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সকল প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, হালনাগাদ রেকর্ড অব রাইটস বা খতিয়ানের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে যা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সমন্বিত থাকবে এবং প্রতিটি নাগরিকের ভূমির বিদ্যমান খতিয়ানের তথ্য প্রদর্শন করবে। এই তথ্যভান্ডারে সাবরেজিস্ট্রারদের তাৎক্ষণিক অভিগম্যতা থাকবে; প্রতি বছর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হালনাগাদ আয় ও সম্পত্তির বিবরণ বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করতে হবে; কর্মকর্তা-কর্মচারী, নকলনবিশ, দলিল লেখক এবং ভূমি দলিল নিবন্ধনের সাথে সংশ্লিষ্টদের যে কোন অনিয়ম-দুর্নীতি ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপারে দ্রুততার সাথে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃসমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, জুলাই ২০১৮ থেকে আগস্ট ২০১৯ সময়কালের মধ্যে এ গবেষণার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রতিবেদন প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এটি মূলত একটি গুণগত গবেষণা; তবে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পরিমাণগত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের এলাকা ও প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য প্রথম পর্যায়ে, দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটি থেকে দুইটি করে মোট ১৬টি জেলা রেজিস্ট্রার অফিস নির্বাচন করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে, ১৬টি জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের আওতাধীন সাবরেজিস্ট্রার অফিসগুলোর মধ্য থেকে কমপক্ষে দুইটি এবং কোথাও কোথাও তিনটি করে মোট ৪১টি সাবরেজিস্ট্রার অফিস নির্বাচন করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের কাছ থেকেও গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।