menu

লড়াকু বাঙালির বিজয়গাথা ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১

সাদেকুর রহমান

  • ঢাকা , রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০
image

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ছিল সোমবার। এ দিনটি ছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালির জন্য খুবই সুখের দিন। কোমল হৃদয়ের বাঙালিরা সময়ের প্রয়োজনে পাথর-কঠিনও হতে পারে, তা জানিয়ে দিয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে। ঢাকা বিমানবন্দর (তখন ছিল তেজগাঁওয়ে) অকেজো হওয়ায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পাইলটরা তৃতীয় দেশের সাহায্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করে।

এদিন বেলা ১১টার সময় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ মারফত ঘোষণা করা হলো, ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারতের পার্লামেন্টে বিশেষ অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রস্তাব উত্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য শেষ না হতেই ভারতের সংসদ সদস্যরা হর্ষধ্বনি আর ‘জয় বাংলাদেশ’ ধ্বনিতে ফেটে পড়ে। এর সূত্র ধরে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত কবি আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক গ্রন্থে এদিনের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে এভাবে- ‘নিয়াজীর নির্দেশে পাকবাহিনী বেসামাল হয়ে পড়ে। এগোনো অসম্ভব, পিছু হটা আরও অসম্ভব। ময়নামতি, জামালপুর, হিলি, চট্টগ্রামে ওরা যেভাবে ছিল সেভাবেই রয়ে গেল কিন্তু সিলেট এবং যশোরের ঘাঁটি ছেড়ে পালাল। মিত্রবাহিনী একই চেষ্টা করছে যাতে পাকবাহিনী কোথাও জড়ো হতে না পারে। এরই মধ্যে (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তুমুল করতালির মধ্যে সংসদে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করলেন। এর ফলে বাংলাদেশের জনগণ বিপুলভাবে মিত্রবাহিনীর সাহায্যে এগিয়ে এলেন। একজন অধ্যাপক টিনের বহর মাথায় নিয়ে গেছেন তিন মাইল, মহিলারা পর্যন্ত ব্রিজ তৈরিতে সাহায্য করেছেন।’

পাকিস্তান সরকারের আমলা, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের সচিব ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এইচ টি ইমাম তার ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’ গ্রন্থে সেদিন ভারত সরকারের তৎপরতার কথা স্মরণ করেন এভাবে- ‘৬ ডিসেম্বর সকালে আমরা কয়েকজন সচিব ও কর্মকর্তা ভারতীয় উচ্চ পর্যায়ের সফরকারী দলের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হই। ভারতীয় দলে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। বৈঠক চলার সময়েই লক্ষ্য করলাম চারদিকে একটা চাঞ্চল্য। পাশের ঘরে রেডিও শোনা যাচ্ছে। গভীর আগ্রহের সঙ্গে ভারতীয় কয়েকজন কর্মকর্তা রেডিও শুনছেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে ভাষণ দিচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিসেস গান্ধীর দৃঢ় এবং সুস্পষ্ট কণ্ঠ ভেসে এলো। ভারত সরকার বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতীয় পার্লামেন্টে তুমুল হর্ষধ্বনি আর করতালি দিয়ে সবাই সংবাদটিকে স্বাগত জানালেন। বিকেল ৪টায় অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের অফিস কক্ষে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হলো কয়েক ঘণ্টার ব্যবস্থায়। এতে বিশেষ কয়েকটি বিষয় সংশ্লিষ্ট ছিল বিধায় সচিবরা নিজেদের মধ্যে কার্যপত্র প্রস্তুতের দায়িত্ব বণ্টন করে নিয়েছিলেন।’

তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান ও আজাদ-এর খবর অনুযায়ী, এদিন ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সরকারকে ‘বৈধ সরকার’ বলেও ঘোষণা দেন। মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দেয়া এক চিঠিতে ইন্দিরা গান্ধী তার এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তার আগেই ভুটানের রাজা মি. জিগমে ওয়ানচুক বাংলাদেশের বাস্তব অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে বৈধ বলে স্বীকার করে নেন। যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় উপনির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে। এ নির্বাচন ৭ ডিসেম্বর থেকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) প্রধান নূরুল আমিন সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিক এবং সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভারত ‘অস্তিত্বহীন বাংলাদেশ’ নিয়ে পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে মেতেছে। ভারতীয় হামলা প্রতিহত করতে সেনাবাহিনীর সাফল্য কামনা করে ৭ ডিসেম্বর বিশেষ মুনাজাত করার জন্য গভর্নর ডা. মালিক দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে এদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম মিত্র ভারতের জওয়ানদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘ভারতের সৈন্যবাহিনীর জওয়ানরা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশের মাটি থেকে হানাদার শত্রুদের নির্মূল করার জন্য আজ যুদ্ধ করে চলেছে।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর একটি তথ্যবহুল ও বিস্তারিত নিবন্ধ প্রকাশ করে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গণমাধ্যম ‘নিউজউইক’। ওই নিবন্ধে বলা হয়, ‘এই সংঘাত ঠেকাতে বৃহৎ শক্তিগুলো কোন তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ নিচ্ছে না। চারশ’ কোটি ডলার খরচ করে ওয়াশিংটন ইয়াহিয়াকে রক্ষার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তা যথেষ্ট ফলপ্রসূ হচ্ছে না।’

এদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধকৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ঢাকায় বলেন, ‘আমাদের বাহিনী বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তান ধরে রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। শত্রুকে পছন্দমত জায়গায় এনে আক্রমণ করাই আমাদের লক্ষ্য। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি এলাকা দখল করেছে এ দাবি শুধু ভিত্তিহীনই নয়, হাস্যকরও বটে। বরং শত্রুকে ঢুকতে দেয়া আমাদের যুদ্ধকৌশলেরই একটা অংশ।’

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত তথ্যপূঞ্জি অনুযায়ী, এদিন রাতে লে. জেনারেল নিয়াজী ঝিনাইদহ অবস্থান থেকে সরে এসে তার বাহিনীকে ঢাকা রক্ষার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ঢাকার পথে পেছনে এসে মেঘনার তীরে সৈন্য সমাবেশ করার নির্দেশ দেন তিনি। কিন্তু তা আর তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কারণ ততক্ষণে ঢাকা-যশোর সড়ক মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মধুমতি অতিক্রম করে মিত্রবাহিনীর একটি দল খুলনার দিকে এবং আরেকটি দল কুষ্টিয়ার দিকে অভিযান অব্যাহত রাখে। মুক্তিবাহিনী বৃহত্তর কুমিল্লার লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম ও আখাউড়া এবং দিনাজপুরের হিলিতে দৃঢ় অবস্থান নেয়। মিত্রবাহিনীর বিমানের বোমাবর্ষণে ঢাকা বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়।

নিজেদের পরাজয় ঠেকাতে হানাদার বাহিনী যুদ্ধের মাঠে এবং পাকিস্তান সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে সর্বশক্তি দিয়ে লড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু রণপ্রান্তরের মতো কূটনৈতিক ময়দানেও একের পর এক তাদের পরাজয় হচ্ছিল। ক্রমেই যেন পরাজয়ের গ্লানি তাদের চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলছিল। এদিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ‘পাক-ভারত যুদ্ধ’ বিরতি সংক্রান্ত মার্কিন প্রস্তাবের ওপর তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় দফা ভেটো দেয়। নিরাপত্তা পরিষদের ১১ জন সদস্য মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। পোল্যান্ড সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে ভোট দেয়। এবারও ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভোট দানে বিরত থাকে।

এদিকে, মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে প্রথম কোন জেলা শহর হিসেবে যশোর হানাদারমুক্ত হয়। ৮ ডিসেম্বর যশোর শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় মুক্তিবাহিনী। ১১ ডিসেম্বর স্থানীয় টাউন হল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় জনসভা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, যশোরের এমপিএ অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।

সংস্থাপন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘যশোর গেজেটিয়ার’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘৬ তারিখ সন্ধ্যা হতে না হতেই পাকবাহিনীর সবাই যশোর ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। ৭ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ আট নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর মঞ্জুর ও মিত্র বাহিনীর নবম ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল দলবীর সিং যশোরে প্রবেশ করেন। তখনও তারা জানতেন না যে, যশোর ক্যান্টনমেন্ট শূন্য। তারা বিস্মিত হন কোন প্রতিরোধ না দেখে।’

এদিন বিকেলে শত্রুমুক্ত হয় তৎকালীন কুড়িগ্রাম মহকুমা। এছাড়াও একাত্তরের এই দিনে ফেনী, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও লালমনিরহাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি ও কঠোর প্রতিরোধে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। হানাদারদের হটিয়ে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হয় এসব এলাকায়।