menu

পশুর হাটে ক্রেতা কম

লোকসানে বিক্রি হতাশ বেপারিরা

‘এবার ৫০ শতাংশ কোরবানি কম হবে’

সংবাদ :
  • ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ
  • ঢাকা , শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২০
image

গতকাল সদরঘাটে বাড়িমুখো মানুষের ভিড়। স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না লঞ্চযাত্রীরা, কড়া নজরদারিও নেই -সংবাদ

রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটের ক্রেতা কম থাকায় গরু বিক্রয় কম গেছে। গত ৫ দিন অপেক্ষা করে একটি গরু বিক্রয় করতে পারেননি কমলাপুর পশু হাটের ফারুক বেপারি। তিনি বলেন, ফরিদপুর থেকে ২০টি গরু নিয়ে এসেছেন। ঈদের আর মাত্র দুইদিন বাকি কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি গরু বিক্রয় করতে পারেননি। তার কাছে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকার দরের গরু আছে। কিন্তু ক্রেতারা দাম বলে ৫০ থেকে দেড় লাখ টাকা। তাই লোকসানে গরু বিক্রয় না করায় এখনও একটি গরু বিক্রয় করতে পারেনি। গতবার ১৫টি গরু নিয়ে এই হাটে এসেছিলেন তিনি। এই সময় তার সব গরু বিক্রয় হয়ে যায়। কিন্তু এবার একটি গরু বিক্রয় না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। একই অবস্থা রাজধানীর অন্যান্য হাটের বেপারিদের। করোনাভাইরাস, বন্যা ও অর্থ সংকটের কারণে অনেকই এবার কোরবানি না দেয়ার কারণে তেমন গরু বিক্রয় হচ্ছে না বলে বলে জানান ইজারাদার।

তবে খামারিদের ক্ষতি পোষাতে আশ্বাস দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শম রেজাউল করিম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রান্তিক খামারিদের আমরা আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার কথা ভাবছি। তাদের স্বল্প সুদে লোন দেয়ার কথা ভাবছি, প্রাণীর খাবারে জন্য ভর্তুকির কথাও ভাবনায় রয়েছে আমাদের। এ বছর ১ কোটি ১৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ পশু কোরবানির জন্য মজুদ ছিল বলে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সূত্র জানায়। এরমধ্যে হৃষ্টপুষ্ট গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৩৮ হাজার এবং ছাগল-ভেড়ার ৭৩ লাখ ৫৫ হাজার ও অন্যান্য চার হাজার ৫০০টি।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাটে ঘুরে দেখা গেছে, হাট ভরা গরু থাকলেও ক্রেতা নেই বললেই চলে। দুই-একজন ক্রেতা আসলেও তারা ঘুরে দেখেন কোথায় কম দামের গরু পাওয়া যায়। এবার বড় গরু থেকে ছোট গরু চাহিদা বেশি দেখা গেছে। অনেকেই ৫০ থেকে ৬০-৭০ হাজার টাকার ছোট গরু খুঁজতে দেখা গেছে। তবে ঈদের আরও দুইদিন বাকি থাকায় দাম ছাড়ছেন বেপারিরা। আজ শেষদিন বেশি পশু বিক্রয় হতে পারে বলে জানান অনেকেই। করোনার কারণে অনেকেই আগেভাগে গরু কিনছে না বলে ক্রেতারা জানান।

রাজধানীর কমলাপুর হাট থেকে ৫০ হাজার টাকায় একটি গরু ক্রয় করেছেন ওয়ারী বাসিন্দা সাইদুর রহমান। তিনি সংবাদকে বলেন, গতবার দেড়লাখ টাকার গরু কোরবানি দিয়েছিলাম। কিন্তু এবার পরিবারে সবাই বলে কম টাকায় গরু কিনতে। তাই একটি ছোট গরু কিনে নিলাম। তবে গরু বিক্রয় কম হওয়ায় গতবারের চেয়ে এবার একটু দাম কম।

গরু বিক্রয় কম হওয়ায় অনেকেই লোকসান দিয়ে বিক্রয় করছে বলে বেপারিরা জানান। রাজধানী পোস্তগোলা শ্মশানঘাট বালুর মাঠ পশুর হাটে ২০টি গরু নিয়ে গত সপ্তাহে এসেছে চুয়াডাঙ্গার বেপারি আল আমিন। তিনি সংবাদকে বলেন, মাত্র দুটি গরু বিক্রয় করেছি। নিজের প্রতিষ্ঠান ফেটারি এগ্রো ফার্মে গরু নিয়ে হাটে এসেছি। কিন্তু বেচাবিক্রি কম হওয়ায় তেমন দাম পাচ্ছি না। নিজে লালন-পালন করা গরুগুলো নিয়ে আবার গ্রামে ফিরতে চায় না। তাই অল্প কিছু লাভ হলে গরু ছেড়ে দিব। এখনও ১৮ গরু আছে। দুই থেকে বিশ লাখ টাকা দরের গরু আছে তার কাছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী তেমন দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজধানীর উত্তরার বৃন্দাবন হাটে গত বুধবার সোয়া ৩ লাখ টাকায় একটি গরু বিক্রি করে বেপারি আবদুর রহিম। তিনি বলেন, ‘২৫ হাজার টাকা লস খাইলাম।’ ৮-৯ মণ ওজনের এই হরিয়ানা গরুটি কিনেছেন উত্তরা-৭ সেক্টরের বাসিন্দা আনিসুর রহমান। রহিম দাম হেঁকেছিলেন ৫ লাখ টাকা। কিন্তু আনিসুর আড়াই লাখ টাকা বলেন। দরাদরির পর সোয়া ৩ লাখ টাকায় দফারফা হয়। আনিসুর রহমান চলে যাওয়ার পরে বেপারি রহিম বলেন, ‘আমার গরুটা কিনা ছিল সাড়ে ৩ লাখ টাকায়।’ তাহলে লোকসানে বিক্রি করলেন কেন- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কী করমু? গরু তো আর ফিরায়া নিতে পারমু না। এইবার সব গরুই প্রায় লস দিয়া বেচন লাগব।’

বৃন্দাবন হাটে ফরিদপুর থেকে আসা বেপারি মো. হাশেম বলেন, আমি একটা দেশি গরুর দাম চাইলাম ৮০ হাজার টাকা, দাম কইল ৪০ হাজার টাকা। গৃহস্থের ঘর থেকে গরুটা কিনতেও তো ৬০ হাজার টাকা লাগব। শেষ পর্যন্ত লসেই বেচা লাগব। কী আর করমু।’

কুষ্টিয়ার প্রাগপুর গ্রাম থেকে আসা বেপারি সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত শুক্রবার ৫টি দেশি গরু নিয়ে হাটে এলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত একটিও বিক্রি করতে পারেননি। আমি দাম বলি, ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। যারা কিনতে আসে তারা দাম কয় ৫০ হাজার, ৬০ হাজার টাকা। এত কম দামে গরু ছাড়া যায়? যদি এমন অবস্থা হয়, একটা গরুও বিক্রি করতে পারছি না, ফিরায়া নিয়া যাব। কিন্তু এত কমে না।’

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে আসা বেপারি কদম আলী ১২টি ষাঁড় নিয়ে এসেছিলেন বৃন্দাবন হাটে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত তিনি চারটি বিক্রি করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, যেসব ষাঁড় তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে চেয়েছিলেন, সেগুলো বিক্রি করতে হয়েছে ৭০ হাজার টাকায়।

দেশি আবাল, দেশি শাহীওয়াল ক্রস, এরে- তিন ধরনের ৬০টি গরু নিয়ে পোস্তগোলা শ্মশান ঘাটের কোরবানির হাটে এসেছিলেন কুষ্টিয়ার বেপারি মাসুদ রানা। তিনি বলেন, ‘বহুজন এসে দাম জিজ্ঞাসা করে চলে গেছে। কিন্তু কেউ কিনতে চায় না। একটা গরুও বিক্রি করতে পারিনি। কী করব আর! গরু মনে হয় ফিরায়ে নিয়ে যাব।’ কুষ্টিয়ার বেপারি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘১০-১২টা গরু আনছিলাম। কিন্তু বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩টা। লাখের গরু ছাড়তে হইছে ৭০-৮০ টাকায়।’

উত্তরার বৃন্দাবন হাটের সায়িমা ডেইরি ফার্মের মালিক শামসুদ্দীন টগর বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে গরুর ব্যবসা করছি। কিন্তু এমন খারাপ অবস্থা আর কখনও আসেনি। ৪-৫ দিন হাটে আসছি, একটা গরুও বিক্রি করতে পারছি না। এবার ব্যবসা পুরোটাই লস বলা চলে। করোনাভাইরাস ধসিয়ে দিল এবারের ব্যবসা।’

অথৈ অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফিশারিজের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘২৮টি গরু নিয়ে হাটে এসেছিলাম। বুধবার পর্যন্ত বিক্রি করলাম ২টা মাত্র। এভাবে চলতে থাকলে তো ব্যবসাই হবে না। যে দাম বলছি, ক্রেতারা তার ধারেকাছেও থাকছেন না। হাটের খরচটাও উঠে আসছে না।’

ভাটারার সাইদনগর হাটে ২০টি ষাঁড় নিয়ে এসেছেন পাবনার আতাইকুলার আর এসআর অ্যাগ্রো ফার্মের খামারি জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, আমাদের একেকটা ষাঁড়ের দাম পড়বে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে আমাদের পোষাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত গরু কিছু বিক্রি করতে পারব, আর কিছু পারব না।’

খিলক্ষেতের মাস্তুল হাটে বেপারি মেহেরপুরের শমসের আলী বলেন, মোটামুটি ২০ বছর ধরে ঢাকার হাটে আসি গরু নিয়ে। এমন খারাপ অবস্থা আর দেখি নাই। গরু আনা, হাটের পজিশন সব মিলায়ে খরচ হয়েছে ১২-১৩ লাখ টাকা। হাট থেকে ৫-৬ লাখ টাকাও যদি পাই, তাও বলতে পারতাম। কিন্তু এখনও তো গরুই বিক্রি করতে পারলাম না।’ উত্তর শাহজাহানপুর হাটের বেপারি পিজির ম-ল বলেন, ‘ম্যালা লসে গরু বিক্রি করতে হইতেছে। মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নাই।’

এদিকে হাটে গরু বিক্রয় কম হওয়া ক্ষতির মুখে আছে বলে ইজারাদারা জানান। হাটে গরু বিক্রি না হওয়ায় এবার কোরবানির হাটের ইজারাদাররাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। কারণ গরু বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের একাংশ থেকে তাদের আয় আসে। রাজধানীর উত্তরখানের মৈনারটেক হাটের ইজারাদার পারভেজ মিয়া বলেন, এবার সাড়ে ৪ লাখ টাকা ইজারামূল্যসহ নানা ভ্যাট-ট্যাক্সসহ তাকে ১৫-১৬ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে কোরবানির হাটে। আমার হাটটা তেমন বড় নয়। মোটে ৫০০-৬০০ গরু আসছে। বুধবার পর্যন্ত বিক্রি হইছে মাত্র ১৬টি গরু। এবার তো মনে হইতেছে, গজব নামছে। গত হাটে ৫ লাখ টাকা হ্যান্ডক্যাশ লস হইছিল। এবার তো মনে হইতাছে, আরও লস হইবে।’ কাওলার শিয়ালডাঙ্গা হাটের ইজারাদার রুবেল শওকত বলেন, ‘আমারে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেয়া লাগছে কোরবানির হাটের ইজারার জন্য। এখন গরু বিক্রি না হলে সেই টাকা কেমনে উঠাব? সব মিলায়ে তো মনে হইতাছে, এক কোটি টাকার গরুও বিক্রি হবে না এবারের হাটে। এ ক্ষতি কত বিশাল বোঝানো যাইব না।’

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, অন্যান্য বছর এ সময়ে বাসা বাড়িতে কোরবানির পশু চলে এলেও এবার তা দৃশ্যমান নয়। করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের হাতে টাকা পয়সাও খুব নাই। আগে যারা ২-৩ জন মিলে কোরবানি দিতেন, তাদের অনেকেই কোরবানি দিতে পারবেন না। আমার মনে হয়, গত বছরের তুলনায় আমার এলাকা মহাখালী-বনানীতে ৫০ পারসেন্টের কম কোরবানি হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাহবুবুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এবার ৩০ শতাংশ কোরবানি কম হবে আমার এলাকায়, এমনটাই ধারণা করছি। আর্থসামাজিক অবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কথা চিন্তা করে অনেকেই কোরবানি দিচ্ছেন না।’ ডিএসসিসির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুলতান মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘অবস্থা খুব হতাশাজনক। কোরবানির হাটে গেলাম, সেখানে ক্রেতা দেখলাম না। মধ্যবিত্ত যারা তারা অর্থ সম্পদের কথা বিবেচনা করে, এবার কোরবানি দিচ্ছেন না অনেকে। আমার বাড়ির আশপাশেও কোরবানির প্রস্তুতি তেমন দেখছি না।’

জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবার ডিএসসিসিতে একটি স্থায়ীসহ মোট ১২টি পশুহাট বসানো হয়েছে। এছাড়া অনলাইনে একটি ডিজিটাল হাটের ব্যবস্থা রয়েছে। সারুরিয়া বাজার স্থায়ী হাট ছাড়া ১১টি অস্থায়ী পশুর হাটের রয়েছে। এগুলো হলো- কমলাপুর লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব সংলগ্ন গোপীবাগ বালুর মাঠও কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গা, আফতাবনগর ব্লক-ই, এফ, জি এর সেকশন ১ ও ২ নম্বর এলাকা, হাজারীবাগ লেদার টেকনোলজি কলেজ সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘের মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গা, মেরাদিয়া বাজার সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, দনিয়া কলেজ মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, ধূপখোলা মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, সাদেক হোসেন খোকা মাঠের পাশে ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন উন্মুক্ত জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গা এবং রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা। এছাড়া ডিএনসিসি এবার গাবতলী স্থায়ী হাটসহ ছয়টি স্থানে পশুহাট বসানো হয়। এগুলো হলো পূর্বাচল ব্রিজ সংলগ্ন মস্তুল ডুমনি, কাউলা, উত্তরার বৃন্দাবন, বসিলা, উত্তরখান ও ভাটারা।