menu

শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

ভিকারুননিসার অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষক বরখাস্ত

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮
image

শিক্ষার্থীর আত্মহত্যায় গতকালও উত্তাল ছিল ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ -সংবাদ

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আরা এবং শ্রেণী শিক্ষিকা হাসনা হেনাকে বরখাস্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের প্রেক্ষিতে গতকাল সন্ধ্যায় গভর্নিং বডির জরুরি সভায় তিন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাদের এমপিও (বেতনভাতা) বন্ধেরও নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে এ ৩ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ৯ জানুয়ারি দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল মামলার এজহার গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরী।

গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে তিন শিক্ষককে বরখাস্তের নির্দেশ দেন। তিনি পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত রাখারও নির্দেশ দিয়েছেন।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের প্রেক্ষিতে আমরা জরুরি সভা ডেকে অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করেছি। এ সভায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানও উপস্থিত ছিলেন। তবে গভর্নিং বডির সদস্য সচিব ও অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস আজ স্কুলে আসেননি। বরখাস্তের নোটিশ স্কুলে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।’

তিনি জানান, ‘শনিবার থেকে যথারীতি পরীক্ষা নেয়া হবে।’

অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, শাখা প্রধান এবং এক শ্রেণী শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে র?্যাব ও পুলিশের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গতকাল বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় র?্যাবের মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারকে চিঠি দিয়ে এই অনুরোধ জানায়।

এদিকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা ৬ দফা দাবি জানিয়েছে। বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিন গতকাল শিক্ষার্থীরা প্রিন্সিপালসহ বাকি অভিযুক্ত শিক্ষকদের পদত্যাগের লিখিত আদেশ দেয়াসহ ৬ দফা দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানান।

শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- অভিযুক্ত শিক্ষকদের আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া, স্কুলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করা, কথায় কথায় টিসি দেয়ার ভয় না দেখানো, মানসিক সুস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে কাউন্সিলিং করা এবং ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির সব সদস্যকে অপসারণ করা। শিক্ষার্থীরা জানান, দাবি মেনে নেয়া হলে সড়ক ছেড়ে তারা বিদ্যালয়ে ফিরে যাবেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব আনোয়ারুল হক স্বাক্ষরিত পৃথক চিঠি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং পুলিশ ও র‌্যাব প্রধানকে পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, অরিত্রির আত্মহত্যার বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত তিনজন শিক্ষককে বরখাস্তসহ তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালককে পৃথক চিঠিতে তিন শিক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আরেকটি চিঠি ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও র‌্যাব মহাপরিচালক?কে পাঠানো হয়েছে। এতে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন

শিক্ষামন্ত্রী জানান, ভিকারুননিসার শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীকে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’র অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে মন্ত্রণালয়ের গঠিত তিন সদস্যের কমিটি। ভিকারুননিসা স্কুলের দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের অনিয়ম উঠে আসছে। অভিভাবকরাও নানা অনিয়মের কথা বলেছেন। ওই ঘটনায় তিনজনের নাম উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আক্তার ও শ্রেণী শিক্ষিকা হাসনা হেনাকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তাদের বরখাস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।

তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার শিফট ইনচার্জ জিনাত আরা ও শ্রেণী শিক্ষক হাসনা হেনাকে প্রতিবেদনে অভিযুক্ত করেছেন। তারা অরিত্রির পিতামাতাকে ভয়ভীতি দেখায় এবং তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে এবং অরিত্রিকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। পিতামাতার প্রতি অপমান ও অসম্মানের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি বলেই অরিত্রিকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে বলে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়। যার দায় কোনোভাবেই তারা এড়াতে পারেন না। তাদের বিরুদ্ধে অরিত্রির আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী হিসেবে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে বলে তারা সুপারিশ করেছে।’

মামলা ডিবিতে হস্তান্তর

অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় কারো কোনো প্ররোচনা ছিল কিনা তা তদন্ত করবে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গতকাল দুপুরে পল্টন থানার পুলিশ মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিবিতে হস্তান্তর করে ।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, ‘এ ঘটনায় এখনও কেউ আটক কিংবা গ্রেফতার হয়নি। তবে যে কোন সময় তাদেরকে গ্রেফতার করা হতে পারে।’

অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্কুলের গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধিদের একজন মুশতারী সুলতানা অধ্যক্ষের কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান।

মুশতারী বলেন, ‘অরিত্রির সহপাঠীরা যারা আন্দোলন করছে, তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আমরা অরিত্রির ঘটনায় গভীরভাবে শোকাহত। ছাত্রীরাও গভীরভাবে শোকাহত। তাদের বান্ধবী মারা গেছে, তারা পড়াশোনা করতে পারছে না। এ কারণে পরীক্ষা বাতিল করেছি।’

অধ্যক্ষ কোথায় জানতে চাইলে বলেন, ‘তিনি অসুস্থ। আমরা গভর্নিং বডির সদস্যরা মিলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোচিং ও বাজে ব্যবহারের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে মুশতারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে ৭০০ জনের মতো শিক্ষক আছেন। ২ থেকে ৫ শতাংশ শিক্ষক কোচিং করায়। সবাই এক রকম নয়। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা শিক্ষার্থী অভিভাবকদের লিখিতভাবে দিতে বলেছি।’

শিক্ষার্থীদের গভর্নিং বডির পদত্যাগের দাবি বিষয়ে মুশতারী সুলতানা বলেন, ‘এটি তো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়। তারা পরিবর্তন করে দিলে আমাদের কিছু করার নেই।’

মুশতারী সুলতানা প্রেস ব্রিফিং করার আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিন ফটকের বাইরে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের গিয়ে ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ করার বিষয়টি জানিয়ে আসেন। গতকালও সকাল থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেইলি রোডের শাখার প্রধান ফটকে বিক্ষোভ শুরু করে কয়েকশ শিক্ষার্থী। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অনেক অভিভাবক। এর আগে মঙ্গলবার রাতে মেয়েকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে অধ্যক্ষ-শিক্ষকসহ এই তিনজনকে আসামি করে পল্টন থানায় মামলা করেন অরিত্রির বাবা দিলীপ অধিকারী।

দিলীপ অধিকারীর অভিযোগ, রোববার পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষক অরিত্রির কাছে মোবাইল ফোন পান। মোবাইলে নকল করেছে, এমন অভিযোগে অরিত্রিকে সোমবার তার মা-বাবাকে নিয়ে স্কুলে যেতে বলা হয়। তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সোমবার স্কুলে গেলে ভাইস প্রিন্সিপাল তাদের অপমান করে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। মেয়ের টিসি (স্কুল থেকে দেয়া ছাড়পত্র) নিয়ে যেতে বলেন। পরে প্রিন্সিপালের কক্ষে গেলে তিনিও একই রকম আচরণ করেন। এ সময় অরিত্রি দ্রুত প্রিন্সিপালের কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। পরে বাসায় গিয়ে তিনি দেখেন, অরিত্রি তার কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়নায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় ঝুলছে।

দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত

বিক্ষোভ চালিয়ে যাবে শিক্ষার্থীরা

অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অধ্যক্ষের বরখাস্তসহ ছয়টি দাবি মেনে নেয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা। অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর দুপুর পৌনে দুইটার দিকে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা আসে।

শিক্ষার্থীদের পক্ষে আনুশকা রায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা শুনেছি, আমাদের কিছু দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। আমরা আমাদের অধ্যক্ষ বা মুখপাত্রের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চাই। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আমাদের অবস্থান চলতে থাকব।’

গত সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শান্তিনগর ২৩/২৪ নম্বর বাসায় গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে স্কুলছাত্রী অরিত্রি। তার বাবা দিলীপ অধিকারী জানান, স্কুলে ফোন নেয়া নিষেধ থাকলে গত রোববার অরিত্রি মোবাইল নিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্রে যায়। এনড্রয়েড মোবাইল দেখে নকল করার অপরাধে মোবাইল ফোন নিয়ে তাকে পরীক্ষার হল থেকে বের করে দেন দায়িত্বর শিক্ষক। এরপর অরিত্রির বাবা-মাকে স্কুলে ডেকে বলা হয় প্রিন্সিপাল নাজনীন ফেরদৌস জানান, পরীক্ষার সময় মোবাইলে নকল করায় অরিত্রিকে টিসি দেয়া হয়েছে। এ সময় অরিত্রির মা-বাবা টিসি না দেয়ার জন্য অনুরোধ করলে তাদেরকে চরমভাবে অপমান করা হয়। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে বাসায় গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে অরিত্রি।