menu

বিএনপি এখন নেতৃত্ব সংকটে

সংবাদ :
  • ফয়েজ আহমেদ তুষার
  • ঢাকা , শুক্রবার, ১২ অক্টোবর ২০১৮

প্রায় এক যুগ ক্ষমতার বাইরে থেকে সাংগঠনিক দুর্বলতায় কোণঠাসা হয়ে পড়া বিএনপিতে এখন নেতৃত্ব সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় আদালত কর্তৃক ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে। তার ছেলে বিএনপির ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ তারেক রহমান হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত। আইন অনুযায়ী উভয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য (যদি উচ্চ আদালত ওই রায় বাতিল বা স্থগিত না করে)। বিএনপির অর্থ ও শক্তির জোগানদাতা জামায়াতও এখন কোণঠাসা। যুদ্ধাপরাধ মামলায় শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি, ইসির নিবন্ধন হারিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্যতা এবং সম্প্রতি বৃহত্তর ঐক্য গঠনে বিএনপির নতুন মিত্রদের অনাস্থা জামায়াতকে রাজনীতি থেকে কিছুটা হলেও দূরে ঠেলে দিয়েছে। এসব পরিপ্রেক্ষিতে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল বিএনপি এবার কার নেতৃত্বে জাতীয় নির্বাচনে যাবে এ নিয়ে দলের ভিতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

‘সংসদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যাতা ও অযোগ্যতার বিষয়ে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে- কোন ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দোষীসাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদ-ে দ-িত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হয়ে থাকে; তবে তিনি সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারবেন না।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দোষীসাব্যস্ত করে আদালত ৫ বছরের কারাদ- দিয়েছেন। বিএনপি নেত্রী এখন কারাবন্দী। রায়ের এক সপ্তাহ আগে গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা সংশোধন করে বিএনপি। সেখানে বলা ছিল, দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি বিএনপির কোন পর্যায়ের কমিটির সদস্য কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ‘অযোগ্য’ বিবেচিত হবেন।

এদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তিন মামলায় সাজা দিয়েছেন আদালত। এসব মামলায় যথাক্রমে ৭ বছর, ১০ বছর এবং যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন আদালত। গত বুধবার ২১ আগস্ট মামলায় যাবজ্জীবন, মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় ৭ বছর ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছর কারাদ- দিয়েছেন আদালত। তারেক রহমান ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের অনুমতি নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। এর আগে এসব মামলায় জামিন বাতিল করে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন আদালত। তিনি দেশে না আসায় পলাতক হিসেবে রায় ঘোষণা করেন আদালত।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার রায়ের পর একই দিন তড়িঘড়ি করে তার পুত্র তারেক রহমানকে দলের দায়িত্ব দেয়া হয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদ দিয়ে, যিনি একই মামলায় দশ বছর দ-িত এবং ২০০৮ সাল থেকে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আশ্রিত (পলাতক)। বিএনপিতে একাধিক যোগ্য নেতা থাকার পরও জ্যেষ্ঠদের কাউকে দলের দায়িত্ব দেয়ার আস্থা পাননি খালেদা। এতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট স্পষ্ট হয়। এরপর মার্চে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সরিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়কের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে এসব রদবদল তৃণমূলে নানা প্রশ্ন জন্ম দেয়। দলের নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে বিএনপি কিংবা ২০ দলীয় জোট কোন পর্যায় থেকে আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি না পেয়ে হতাশ হয় তৃণমূল।

জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে ধরনা দিয়ে বিএনপি নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতার পরিচয় দিচ্ছে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিএনপি নেত্রীর সাজার পর, আগামীতে রাজনীতির মাঠে কে নেতৃত্ব দেবেন, তা নিয়েও দলটি সংকটে পড়েছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সূত্রমতে, বেগম খালেদা জিয়ার কারাদ-ের পর দলটি কার্যত দু’ভাগে বিভক্ত। নেতাদের একে অপরের প্রতি আস্থা নেই। দলের একটি অংশ খালেদা জিয়াকে নিয়ে নির্বাচনে যেতে চাইলেও, অন্য অংশের চাওয়া তাকে বাদ দিয়েই নির্বাচন। তাই আন্দোলনের লক্ষ্যে রাজপথ দখলের কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না দলটি। শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেও দলের ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে বিভেদ স্পষ্ট।

দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে আন্দোলনের নামে রাজপথে সহিংসতা করে, আগুন সন্ত্রাস করে সাধারণ মানুষ হত্যা করে, জানমালের ক্ষতি করে জনসমর্থন হারায় বিএনপি। এরপর আর মাঠের আন্দোলনে সক্রিয় হতে পারেনি দলটি। সহিংস আন্দোলনের সময়ও বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। দলটির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, জামায়াতের নির্দেশেই সহিংসতা হয়েছে। সূত্রমতে, জামায়াত বিএনপিতে এমন এক শক্তি যা তারেক রহমানকেও নিয়ন্ত্রণ করে।

নির্বাচনের আর তিন মাস বাকি। শেষ সময়ে এসে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি কী? তা এখনও তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে স্পষ্ট নয়। নির্বাচনের আগে নেত্রীকে মুক্ত করা সম্ভব হবে কি-না। না হলে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানকে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি-না। শত-সহস্র মামলায় জর্জরিত দলের লাখো নেতাকর্মীর মধ্যে জ্যেষ্ঠ শতাধিক নেতা শীঘ্রই নির্বাচনের অযোগ্য হবেন কি-না। এমন নানা আশঙ্কা বিএনপির তৃণমূলে।