menu

সিপিডির প্রতিবেদন

প্রতিবছর বেকার হচ্ছে ৮ লাখ কর্মক্ষম মানুষ

কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি বড় চ্যালেঞ্জ, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের তাগিদ

সংবাদ :
  • অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , সোমবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯
image

চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না হওয়ায় প্রতিবছর নতুন করে বেকার হচ্ছে ৮ লাখ কর্মক্ষম মানুষ। গত ১০ বছরে আর্থ-সামাজিক খাতে অনেক উন্নয়ন হলেও কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বর্তমান সরকারের জন্য রয়েছে আরও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ। এগুলো হচ্ছে, যুব কর্মসংস্থান, বৈষম্য বৃদ্ধি রোধ করা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবার নিশ্চয়তা ও মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়ে আনা, দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ‘কাঙ্ক্ষিত সামাজিক উন্নয়নের জন্য অন্তর্ভুক্তি মূলক প্রবৃদ্ধি : ইস্যুজ অ্যান্ড প্রাইরেটিস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন এবং সংলাপে আলোচকরা এসব বিষয় তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়।

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। আলোচক ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ডা. রশিদ ই মাহবুব। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিডিপির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। সংলাপ পরিচালনা করেন সংস্থাটির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। সংলাপে ‘স্টেট অব দ্যা বাংলাদেশ ইকনোমিক অ্যান্ড ন্যাশনাল ইলেকশন-২০১৮ প্রাইরেটস ফর ইলেক্টরাল ডিবেটস’ একটি বইয়ের মোড়কও উšে§াচন করা হয়েছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে বিশ্বব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, প্রতিবছর ২১ লাখ কর্মক্ষম মানুষ কর্মের বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রতিবছর কর্ম সংস্থান তৈরি হচ্ছে প্রায় ১৩ লাখ। এক্ষেত্রে প্রতিবছর ৮ লাখ কর্মক্ষম মানুষ বেকার থাকছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০১১ সালে ৬ শতাংশ থাকলেও পরবর্তীতে তা বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ধারবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশ। সেই সঙ্গে ২০১৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। সেটি কমিয়ে এখন ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অর্থনীতিতে দুটি অন্যতম ভাবনার বিষয় হচ্ছে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও সে তুলনায় কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অন্যটি হচ্ছে প্রবৃদ্ধির সুফল সর্বত্রই সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। যা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তা সহায়ক নয়। আরও বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ধনী ৫ শতাংশের তুলনায় সর্বনিম্ন ৫ শতাংশের আয় বৈষম্য ব্যাপক বেড়েছে। প্রবৃদ্ধির সুবিধা সমানভাবে বিতরণ না হওয়ায় বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। এ বিষয়ে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন।

এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে বলা হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোর উন্নয়ন হলেও তার মানসম্মত ব্যবহার হচ্ছে না। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু কমানোসহ বিভিন্ন খাতে স্বাস্থ্য খাতে অনেক ক্ষেত্রে সুমান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু তারপরও মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবার অভাব রয়েছে। এক্ষত্রে সম্পদের সীমাবদ্ধতা, পেশাদারিত্বের অভাব এবং নিম্নমানের ব্যবস্থাপনা ও নীতগত উদ্যোগকেই দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মানুষের ব্যক্তি পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বেড়েছে অনেক। কিন্তু সরকারিভাবে গত ১০ বছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তি প্রতি ব্যয় বেড়েছে ২০৫ টাকা। মানুষের পকেট থেকেই বেরিয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যক্তির পকেট থেকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে একজন মানুষের পেছনে মোট যে ব্যয় হয় তার ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ যায় ব্যক্তির পকেট থেকে। অন্যান্য দেশর মধ্যে ভারতে ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ, নেপালে ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভুটানে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় হয়।

শিক্ষার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে অর্জন রয়েছে অনেক। যেমন প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি, বয়স্ক শিক্ষার হার বাড়নো, উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি, বিনামূল্যে বই দেয়া, ছাত্র ও শিক্ষকের গড় অনুপাত কমিয়ে আন, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে সাফল্য রয়েছে। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষার ব্যাপক অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারিভাবে শিক্ষায় প্রকৃত খরচও খুব বেশি বাড়েনি। এক্ষেত্রে গত ১০ বছরে শিক্ষার্থী প্রতি ব্যয় বেড়েছে ৪৪৫ টাকা। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে জিডিপির ৪ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া কারিগরি ও ভকেশনাল শিক্ষায় গুরুত্ব, মানসম্মত প্রি-প্রাইমারি শিক্ষা, শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে তৈরি করা এবং শিক্ষায় সুশাসন নিশ্চিত করতে বিকেন্দ্রীকরণ করার কথা বলা হয়েছে। কোচিং বন্ধের বিষয়টিও উঠে আসে আলোচনায়।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর মধ্যে দ্বৈততা পরিহার করা, কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা এবং তদারকি জোরদার করা তাগিদ দেয়া হয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এম এ মান্নান বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কমসূচির ৯০ শতাংশের বেশি সঠিক সুবিধাভোগীরাই পাচ্ছেন। স্বাস্থ্য খাতে অনেক উন্নতি হয়েছে। হাজার হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সেবা দিচ্ছে। তারপরও কিছু ব্যর্থতা রয়েছে। কিন্তু তারপরও মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, মানুষের আয় বাড়ছে। মানুষ এখন সরকারি হাসপাতালে যেতে চায় না। বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে তাদের চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয় বেড়েছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। আমরা চাই বৈষম্য দূর হোক। দেশের জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করুক। তিনি আরও বলেন, দরিদ্র হচ্ছে আমাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা। দরিদ্র ও ক্ষুধা সবসময় মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ক্ষুধার নেকড়ে বাঘ সবসময় আমাদের তাড়া করছে। তাই তারাহুরো করতে গিয়ে সমস্যা বাড়ানো যাবে না।

ড. রেহমান সোবহান বলেন, মান সম্মত শিক্ষা এখন অনেক বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশে দারিদ্র্য নিরসন হলেও জিডিপির সুফল সমানভাবে সব অংশে পৌঁছাচ্ছে না। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।

মুহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, স্থানীয় সরকারগুলোকে নিয়ে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে শিক্ষা খাতে মানসম্মত শিক্ষা দেয়া হয় না। কিন্তু শিক্ষা খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি না করলে এত প্রবৃদ্ধি হয় কিভাবে। তবে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে কখনও আপস করা হবে না।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, সুশাসন যেকোন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তার, ডিসি ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের হেদায়েত করার জন্য শিক্ষা দিতে হবে। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পুরনো ১৭টি জেলাকে স্টেট হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বেশ কিছু ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া প্রয়োজন।

আলোচনায় অংশ নেন, প্রফেসর ড. রওনক জাহান, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমান, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা চৌধুরী মুফাদ আহমেদ।