menu

পাপুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল

কারামুক্তির পরও ৫ বছর যোগ্য বিবেচিত হবেন না

  • ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২১
image

মানব ও অর্থ পাচারের মামালায় কুয়েতের ফৌজদারি আদালতে চার বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল করে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল এ সংক্রান্ত একটি গেজেট প্রকাশ করেছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। পাপুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বর্তমানে স্বতন্ত্র কোটায় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন সংসদ সদস্য বিদেশের মাটিতে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। কুয়েতের রেসিডেন্ট পারমিটধারী ব্যবসায়ী পাপুলকে গত ৬ জুন মানব পাচার, ভিসা জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে কুয়েত সিটির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। সেদেশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা তার বিরুদ্ধে মানব পাচার ও প্রায় ৫৩ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার (প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা) পাচারের বিষয়ে তথ্য প্রমাণ পাওয়ার পর এবং জামিনের আবেদন নাকচ হওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করে কুয়েতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর পাপলুর মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের ফৌজদারি আদালতের রায়ে পাপুলকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার বা ৫৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে পাপুলের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ বাতিলের বিষয়ে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়, ‘কুয়েতের ফৌজদারি আদালতে ঘোষিত রায়ে নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে চার বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন লক্ষ্মীপুর-২ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম। এ কারণে বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য নন তিনি। সে কারণে সংবিধানের ৬৭(১(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রায় ঘোষণার তারিখ (গত ২৮ জানুয়ারি) থেকে তার আসন শূন্য হয়েছে। এর আগে কুয়েতের আদালতে সংসদ সদস্য পাপুলের সাজা হওয়ার বিষয়টি চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায় কুয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোন আইনপ্রণেতা নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবে না এবং মুক্তি পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না। ওই অনুচ্ছেদেই বলা আছে, কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিলে কিংবা কোন বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে আর এমপি হিসেবে থাকতে পারবে না।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পাপুলের সংসদ সদস্য পদ শূন্য ঘোষণা করে গেজেট জারির পর গণমাধ্যমকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী তা নির্বাচন কমিশনে (ইসি) পাঠিয়েছে সংসদ সচিবালয়। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিষয়টি নিয়ে স্পিকার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় কুয়েত থেকে পাঠানো পাপুলের মামলার রায়ের কপি পর্যালোচনা করা হয়। আরবি ও ইংরেজিতে লেখা ৬১ পৃষ্ঠার রায়ের কপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের স্পিকারের দপ্তরে ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

লক্ষ্মীপুর-২ আসনে উপনির্বাচন শীঘ্রই

ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, গেজেটের কপি কমিশনে পৌঁছেছে। সাংবিধানিকভাবে লক্ষ্মীপুর-২ আসন শূন্য ঘোষণার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সেখানে নির্বাচনের ব্যবস্থা নেবে ইসি। এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি পাপুলকে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করে তার সংসদীয় আসন কেন শূন্য ঘোষণা করা হবে না, তা নিয়ে জারি করা রুলের শুনানির জন্য গতকাল দিন ধার্য করেন হাইকোর্ট।

পাপুলের এমপি হওয়ার নেপথ্যে

কুয়েতে মানব পাচার ও ভিসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল টাকার মালিক রায়পুরের পাপুল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও লক্ষ্মীপুর সদরের ৯টি ইউনিয়ন) আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাপ করে ব্যর্থ হয় পরে স্বতন্ত্র (আপেল প্রতীক) সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

আওয়ামী লীগ এ আসনটি জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছেড়ে দেয়। জাপার (লাঙ্গল) সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নোমান রহস্যজনক কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাপুল বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীদের নির্বাচনে নীরব করে দেন।

নির্বাচনের আগে হঠাৎ জাতীয় পার্টির নোমান সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি বদলে যায়। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পাপুলকে সমর্থন দেন এবং তিনি এমপি হয়ে যান। রাজনীতিতে নতুন মুখ পাপুলের আড়াই লাখ ভোটের বিপরীতে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির আবুল খায়ের ভূঁইয়া পান ২৮ হাজার ভোটের সামান্য বেশি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের কোন এক সময় পাপুল তার গ্রামের বাড়ির সামনে নিজের মায়ের নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান করার উদ্যোগ নেন। তার আগে পাপুলকে তিনি চিনতেন না। এরপর থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগসহ সব সহযোগী সংগঠনের দলীয় অনুষ্ঠানগুলোতে প্রচুর অর্থ দেন তিনি। কুয়েত আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দেয়া পাপুল ২০১৭ সালে দেশে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য পদের ফরম পূরণ করেন।

এলাকায় রাজনীতি শুরুর দুই বছরের মাথায় পাপুল ‘টাকা ছড়িয়ে’ স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে ভোট করে বাংলাদেশের আইনপ্রণেতা বনে যান। এমপি হওয়ার পর ২০১৯ সালে রায়পুর পৌর আওয়ামী লীগের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ১ নম্বর সদস্য পদ পান। নিজের পাশাপাশি স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ও মেয়েকে যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় সদস্য করেন। এর আগে বা পরে আওয়ামী লীগের আর কোন পদে পাপুল ছিলেন না।

স্ত্রী সেলিনাকেও এমপি বানান

সংসদে দলীয় এমপির অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০টি আসন ভাগাভাগির পর পাপুলসহ স্বতন্ত্র চার এমপির ভাগেও একটি আসন জোটে। সেই সংরক্ষিত আসনে পাপুল এমপি বানিয়ে আনেন তার স্ত্রী কুমিল্লা উত্তর আওয়ামী লীগের নেত্রী সেলিনা ইসলামকে। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, স্ত্রীকে সংসদ সদস্য বানাতেও বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করেন পাপুল।

সাধারণ শ্রমিক বা পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কুয়েত গিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়া পাপুল সেখানকার মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম অংশীদার (মলিক) হন। প্রবাসী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেও তার বড় অঙ্কের শেয়ার রয়েছে বলে জানা গেছে। গত বছর জুনে কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেখানে পাপুল ও তার কোম্পানির ব্যাংক হিসাব জব্দ করে কুয়েত কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশেও তার বিষয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ।

কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের পৃথক দুই মামলায় সাংসদ পাপুলসহ ৬ জনের ৬৭০টি ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেন ঢাকার আদালত। মানব পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পাপুলসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর মামলা করে সিআইডি। আসামিদের মধ্যে তার মেয়ে, ভাই ও শ্যালিকাও রয়েছেন। এর আগে ১১ নভেম্বর মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে শহিদ ও তার স্ত্রী সেলিনার বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।