menu

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নামাতে বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে

সংবাদ :
  • সংসদ বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

  • ঘুষ দেয়া-নেয়া দুটোই অপরাধ
  • দুর্নীতি নিজেও করব না কাউকে করতেও দেব না

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদককে শক্তিশালী করা, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিশেষ পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। দেশ থেকে দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার দূর করতে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে দলমত নির্বিশেষে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, সাধারণ ছোটখাটো চোর ধরতে পারবে কিন্তু বড় অর্থশালী-বিত্তশালী হলে তাদের হাত দেয়া যাবে না, ধরা যাবে না- এটি তো হয় না। আমার চোখে অপরাধী অপরাধীই। তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি কোন অপরাধের সঙ্গে আমাদের দলেরও কেউ যদি সম্পৃক্ত থাকেন, তাহলে তাদের ছাড় দিচ্ছি না, ছাড় দেব না। আর অন্য কেউ যদি করে, তাহলে তারা তো ছাড় পাবেই না। শাসনটা ঘর থেকেই করতে হবে। আমিও তা-ই করছি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা সংস্থার কেউ এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং এটা অব্যাহত থাকবে। কারণ এটা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য নির্ধারিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও উত্তর পর্বে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে বিকেলে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়।

জাতীয় পার্টির বেগম রওশন আরা মান্নানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব সময় নিজেকে বাংলাদেশের জনগণের সেবক মনে করি। প্রধানমন্ত্রিত্বটা হলো একটা সুযোগ মানুষের জন্য কাজ করার। আমি সার্বক্ষণিক চেষ্টা করি ওই সুযোগটুকু কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের কতটা উন্নয়ন করা যায়। দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি কতটা করা যায়। অন্যায়-অবিচারের হাত থেকে দেশের মানুষকে কীভাবে রক্ষা করা যায়? তিনি বলেন, শুধু আমাদের দেশেই নয়, সব দেশেই দেখা যায়- একটা দেশ যখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অগ্রযাত্রা শুরু করে, তখন কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের টাউট-বাটপাড় বা বিভিন্ন ধরনের লোক সৃষ্টি হয়। কিন্তু তাদের দমন করা এটা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সম্ভব নয়। এটা সামাজিকভাবেও করতে হবে। জঙ্গি-সন্ত্রাস-মাদক ও দুর্নীতি দমনে জনসচেনতা সৃষ্টির বিষয়টি ইতোমধ্যে গুরুত্ব দিয়েছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী গোয়েন্দা সংস্থা সবাইকে কাজে লাগাচ্ছি। এর পাশাাপাশি আমাদের সমাজের বিভিন্ন মানুষ যেমন- শিক্ষক, অভিভাবক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সবাইকে নিয়ে বিশিষ্টজন জনপ্রতিনিধি আছে, তাদেরকে বলব- প্রতিটি এলাকায় একটা কমিটি করা যাতে এ ধরনের কোন অন্যায়কে কেউ যেন প্রশ্রয় না দেয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার দূর করতে হবে। শুধু বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল তা নয়, সামাজিকভাবে সচেতন করতে হবে। দুর্নীতি আমরা করব না, কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না। ঘুষ যে গ্রহণ করবে, ঘুষ যে দেবে- তারা উভয়ই অপরাধী। দু’জনকেই ধরা হবে। শুধু ঘুষ নিলে তাকে ধরা হবে, তা নয়। যে দেবে তাকেও ধরা হবে। কারণ ঘুষ দেয়াটাও অপরাধ।

সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, কেউ বলতে পারবেন না সবাই একশ’ ভাগ সৎ হবে। ঈদের আগে যখন দেশের বাইরে ছিলাম, তখন কিছু বড় জায়গায় হাত দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো। এটা আমার কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। মনে হয়, এমন অনেক বড় জায়গায় আছে যাতে হাত দিলেই হাতটা পুড়ে যাচ্ছে। যারা ধরতে যায়, তারাই অপরাধী হয়ে যায়। কিছু পত্রিকা লেখালেখি শুরু করে। তবে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। কে কী বলল, এতে কান দেয়ার দরকার নেই।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষটা ছিল পরিকল্পিত। এই ঘটনার যিনি মূল হোতা ছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকে খাদ্যমন্ত্রী করেছিলেন। তার পুত্র বিএনপির এখনও বড় নেতা। বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বেগম রওশন আরা মান্নানের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার টানা তৃতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের জনগণের কল্যাণ ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা, জনসচেনতামূলক কার্যক্রম জোরদার এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি পরিধি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিশেষ পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার দুর্নীতির বিষবৃক্ষ সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে দেশের প্রকৃত আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণে একটি সুশাসনভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করতে বদ্ধপরিকর।

সংসদ নেতা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন ও সশাসিত সংস্থা। কমিশন নিরপেক্ষভাবে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করে। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন একফোর্সমেন্ট টিমের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন দফতরে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করছে। ফলে বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/দফতরে দুর্নীতির মাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী দুদককে শক্তিশালী করতে গৃহীত নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, এ বাস্তবতায় দুর্নীতি দমনে আলাদা কোন সংস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন আছে মর্মে প্রতীয়মান হয় না। এছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিস থেকে কমিশনের চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় জনবল প্রেষণে দুর্নীতি দমন কমিশনে পদায়ন করা হচ্ছে। ফলে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যকর অবদান রাখতে পারছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সংস্থা। বিভিন্ন এলিট ফোর্স থেকে লোকবল নিয়ে দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে নতুন সংস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নেই।

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকারের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকরা যাতে ধানসহ সব ফসলের নায্যমূল্য পায় এবং মধ্য স্বত্বভোগীরা যাতে কৃষকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, এ লক্ষ্যে আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। তিনি জানান, কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পান, এ লক্ষ্যে সরকার চলতি মৌসুমে দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে ক্রয় করছে। বাজারদর বৃদ্ধির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ৩৫ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল ও ৩৬ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল থেকে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।