menu

ইউরোপের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা বন্ধ হলে

তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধাক্কা খাবে

সিপিডির প্রতিবেদন

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , বুধবার, ১৬ মে ২০১৮

ইউরোপের মার্কেটে ডিউটি ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ হওয়ার পর বড় ধরনের ধাক্কা খাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। এ ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে এখন থেকেই পরিকল্পনা নিতে সতর্ক করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, আমরা চিন্তিত নই, আরও ১০ বছর সময় রয়েছে; এর মধ্যে বাংলাদেশ অনেক দূর পৌঁছে যাবে।

গতকাল খাজানার গার্ডেনিয়া ব্যানকুয়েট হলে সিপিডির আয়োজিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন এবং এলডিসিতে উত্তরণের পরিপেক্ষিতে উদীয়মান শ্রমের মানোন্নয়ন শীর্ষক এক সংলাপে এমন মতামত উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। সংলাপে সিপিডির বিশেষ ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এছাড়াও সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিজিএমইএ-এর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান, আইএলও-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি গগন রাজভান্ডারী, শ্রমিক প্রতিনিধি ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম এবং বিল্সের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বক্তব্যদেন।

মূল প্রবন্ধে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০২৭ সালের পর ডিউটি ও কোটামুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে বাংলাদেশ বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। তবে সুযোগ রয়েছে এসডিজি বাস্তবায়ন করে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো এসডিজি প্লাসের সুবিধা নিতে। এসডিজি প্লাসের সুযোগ পেতে হলে শ্রমের মান, শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা, কর্মের পরিবেশসহ বেশ কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। সরকার অনেকগুলো কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। শুধু মানলে হবে না বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে হলে নন ফরমাল শ্রমিক আউটসোর্সিংসহ অনেক বিষয় নীতিমালায় আনতে হবে।

সংলাপে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শ্রম আইনের অধিনে ইপিজেডের বিদ্যমান শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর যুক্ত হবে। এজন্য বাংলাদেশ শ্রম আইন ও ইপিজেড শ্রম আইন সংশোধনের কাজ চলছে। শ্রমিকের অধিকার এবং জীবন মান উন্নয়নে যা যা করা প্রয়োজন সব কিছুই করছে সরকার। রানা প্লাজা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক শ্রম মান এবং আইএলও’র কনভেনশনের মেনে কারখানার কর্ম পরিবেশের নিরাপত্তা, শ্রমিকের অধিকারের বিষয়গুলোকে পুনঃগঠন করেছে। শ্রমিকের নিরাপত্তায় ইতোমধ্যে ১৪৪২টি কারখানায় সেফটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেখানে ২০১৫ সালে এ কমিটির সংখ্যা ছিল ১১৮টি। এ কমিটিগুলো তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভুমিকা রাখতে পারছে। তিনি এলডিসি উত্তোরন এবং এসডিজি বাস্তবায়নে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কারখানায় সামাজিক সংলাপের ওপর জোর দেন। আগামী বছরগুলোতে শোভন কর্মপরিবেশ তৈরি এবং এসডিজি বাস্তবায়নে শ্রমিক সংগঠন, বেসরাকরি খাত, নাগরিক সমাজ, আএলওসহ, আন্তর্জাতিক সংস্থা উন্নয়ন অংশীদার, ব্যান্ড বায়ার এবং আন্তর্জাতিক সামাজিক সংগঠন সরকারকে সহযোগিতা করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকার সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারখানায় ৩০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারবে। ২০২৭ সালের পরবর্তী সময়ে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার আবেদন করতে হলে বাংলাদেশকে আইএলও’র ২৭টি কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করতে হবে। বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা পেতে অসুবিধা হবে না। কেননা বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বয়সের নিম্নসীমা সংক্রান্ত আইএলও এর কনভেনশন ১৩৮ ছাড়া জিএসপি প্লাস এর সবগুলো কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ আইএলও এর ৩৫টি কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করেছে যার মধ্যে ৭টি কোর কনভেনশন রয়েছে।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার কর্মপরিকল্পনা গ্রহন করেছে। দেশে বর্তমানে ৮ হাজার ৬৪টি রেজিস্ট্রার্ড ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে যার মধ্যে শুধু গার্মেন্টসেই রয়েছে ৬৫৯টি ইউনিয়ন ২০১২ সালে যেখানে ছিল ১৩২টি। ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন স্বাচ্ছ ও জবাবদিহি করার জন্য অনলাইন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে সব প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম এবং ২০২৫ সালের মধ্যে সকল প্রকার শিশু শ্রম নিরসনে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ৫ দিন আগে উত্তরবঙ্গ থেকে একটি ফোন আসে। আমাকে বলা হয় একজন পরিদর্শক মামলার হুমকি দিয়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে চলে গেছেন। আমি সেই পরিদর্শককে বদলি করে দেই। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, আসল ঘটনা হচ্ছে স্টোরে ৮০ কেজি ওজনের বস্তা পাওয়া গেছে। কিন্তু পুরুষের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ কেজি ও নারীদের জন্য ৩০ কেজি ওজনের বস্তা হওয়ার কথা। কিন্তু কারখানাটি তা মেনে চলেনি। ওই কারখানার মালিক যদি নিয়ম মানতেন তাহলে কিন্তু ঘুষের প্রশ্ন আসতো না। আগে আপনাদের সৎ হতে হবে। ডে কেয়ার সেন্টার করার কথা করেন না। আপনারা অনিয়ম করেন বলে ওরা মামলার ভয় দেখায়। ওরা মনে করে মামলা দিয়ে লাভ কী? মামলা দিলে মন্ত্রীকে ফোন করবেন। তার চেয়ে ১০ হাজার টাকা পেলে মন্দ কী!

বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমরা মোটেই চিন্তিত নই। আমরা অ্যাকর্ড’র ৯০ শতাংশ শর্ত পূরণ করেছি। অন্যান্য শর্ত পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমার মনে হয় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূর পৌঁছে যাবে। তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিবর্তন করতে পারবো। কিন্তু পোশাক খাতে ৪৪ লাখ শ্রমিক রয়েছে, তাদের কথা ভাবতে হবে। তারা তো দ্রুত অন্য কাজ শিখতে পারবে না। বিজিএমইএ সভাপতি আরো বলেন, রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর গার্মেন্ট শিল্পে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেসবের কোনো প্রচার নেই। বিদেশে শুধু নেগেটিভ প্রচারণা চলছে। আমাদের অর্জনগুলো প্রচার করতে হবে। আর তা উঠতে হবে ঘর থেকেই।

সংলাপে অংশ নেন আইএলও প্রতিনিধি গগন রাজভান্ডারী। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে জানিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন তিনি।