menu

ফিরে দেখা একাত্তর

তেলিখালী যুদ্ধের কাহিনী ডিফেন্স কলেজে পড়ানো হয়

বিমল পাল

  • ঢাকা , রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০
image

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মাকে মামার বাড়ির কথা বলে গিয়েছিলাম যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। মেট্রিক পাস করে ময়মনসিংহ মিন্টু কলেজে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলাম। যুদ্ধের দামামা তখন বেজে উঠেছিল। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১-এ ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ ফেরিঘাটে পাকসেনাদের জঙ্গি বিমান বোমা হামলা চালায়। আতঙ্ক তৈরি করে ২১ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। এর আগে আমাদের পরিবার পরিজনসহ প্রায় ২৫ জনের একটি দল জীবন বাঁচাতে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে যাই ফুলবাড়িয়ার থানার কুশমাইল গ্রামের হিন্দুপাড়ায়।

সেখান থেকেই যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। দিনটি ছিল ৯ মে রোববার। মাকে বললাম মামার বাড়ি চলে যাব। মা সহজেই রাজি হলেন, এই ভেবে যে, মামা বাড়িতে মামাদের কাছে আমাদের নিশ্চিত নিরাপদ আশ্রয়। আমার মা মামাদের আদরের ছোট বোন। মামারা রাজি হলে মাসহ সবাইকে নিয়ে চলে যাবেন দামপাড়া গ্রামে মামার বাড়িতে এই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু তখন মামারাই ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আমাকেইতো ভালোভাবে নিতে চাচ্ছেন না। আবার মাসহ তাদের কিভাবে নিয়ে আসব? কি করব, কি করব ভাবতে থাকি। অবশেষে মনে মনে ঠিক করলাম যুদ্ধেই চলে যাব। যুদ্ধ করে পাকসেনাদের আমি একাই মেরে ফেলব। দরকার শুধু একটা রাইফেল আর গুলি। কোথায় গেলে পাওয়া যায়? শেষে বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে পরলাম এবং অবশেষে ভারতে পৌঁছে গেলাম ক্যাম্পে। ইয়ুথ ক্যাম্প ইনচার্জ আবদুল মজিদ তাঁরা মিয়া সাহেবের কাছে ট্রেনিং নিতে ভর্তি হলাম।

জুন মাসের ৭/৮ তারিখ হবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন তুমি ছাত্রলীগ করো। আমি গর্ব করে বললাম, না- আমি ছাত্র ইউনিয়ন করি। তাতে অসুবিধা হলো না।

জুন মাসের ১১ তারিখ তুরা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হলো একদল তরুণের সঙ্গে খোলা ট্রাকে করে। গরু ছাগলের মতো ঠাসাঠাসি দাঁড়িয়ে, কখনও বসে। ১২ জুন এসে উপস্থিত হলাম ক্যাম্পে। প্রায় ১ মাস গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হলো। প্রশিক্ষণ শেষে ১৪ জুলাই আমাদের পোস্টিং দেয়া হয় ঢালু সাব সেক্টরে। কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন আলী হোসেন (হালুয়াঘাট), প্লাটুন কমান্ডার মোজাফফর হোসেন (ফুলবাড়িয়া), সেকশন কমান্ডার ফারুক আহমেদ ( নাটক ঘর লেন, ময়মনসিংহ)। প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ ১৭ জুলাই হালুয়াঘাটের নাগলা ব্রিজ ধ্বংস করার মধ্যদিয়ে। এরপর বারমারি অ্যাটাক, নুন্নি সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ।

আমাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল ৩ নভেম্বর হালুয়াঘাটের তেলিখালী যুদ্ধ। এটিই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। ৩ নভেম্বর হালুয়াঘাটের তেলিখালী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কোম্পানি কমান্ডার আবুল হাশেমের সঙ্গে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট যুক্ত ছিল। ঘাঁটিটি ছিল হালুয়াঘাট সীমান্তে পাকসেনাদেও সবচেয়ে শক্তিশালী ক্যাম্প । ১ প্লাটুন ৩৩ পাঞ্জাব, ১ প্লাটুন ৭১ উইং রেঞ্জারের সঙ্গে সমান সংখ্যক রাজাকার। এই আক্রমণের নায়ক ল্যান্স নায়েক মো. মেসবাহ উদ্দিন। কোম্পানি কমান্ডার আবুল হাশেম ক্যাম্পের সামনে গারো প্রধান ডুবাজুরী গ্রাম থেকে ব্যারিলাইট পিস্তল দিয়ে ফায়ার ওপেন করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হলো। তুমুল যুদ্ধ হলো সকাল ৮টা পর্যন্ত। চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এই যুদ্ধ শেষে পুরো তেলিখালী ক্যাম্প দখলে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের। যুদ্ধে ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ২১ জন ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সদস্য শহীদ হন। এর বিপরীতে একজন পাকিস্তানি আত্মসমর্পণ করেন আর বাকি ১২৪ জন পাকসেনা ও ৮৫ জন রাজাকার প্রাণ হারায় এবং বাকি রাজাকাররা পালিয়ে যায়।

এ তেলিখালী যুদ্ধের কাহিনী ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে ব্যাটেল স্টাডিতে পড়ানো হয়। তেলিখালী রণাঙ্গনে ৩৯ বিজিবি-এর আয়োজনে ক্লাস বসে প্রতি বছর। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আমি উপস্থিত থাকি।