menu

পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভ অব্যাহত

ছাত্রলীগের কমিটি পুনর্গঠনে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

সংঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রলীগ তদন্ত কমিটি গঠন

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, ঢাবি
  • ঢাকা , বুধবার, ১৫ মে ২০১৯

দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ না পাওয়ায় বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। গতকাল তারা ছাত্রলীগের সদ্যঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি ভেঙে দিতে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তারা বলছেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই কমিটি ভেঙে দেয়া না হলে তারা বিক্ষোভ ও অনশন করবেন এবং যে কয়েকজন কমিটিতে স্থান পেয়েছেন, তারা গণপদত্যাগ করবেন। এদিকে, সোমবার কমিটি ঘোষণার পর পদবঞ্চিতরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করলে তাদের মারধর করা হয়। পরে ওই ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। তবে সেই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করছেন পদবঞ্চিত বিক্ষোভকারীরা।

গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ‘যোগ্য পদ’ না পাওয়া বা কমিটিতে স্থান না পাওয়া নেতাকর্মীরা এই আল্টিমেটাম দেন। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলার আসামি, নিষ্ক্রিয়, বিবাহিত, অছাত্র ও চাকরিজীবীদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ দেয়া হয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের দাবিতে দুইদিনের আল্টিমেটাম দেন তারা। এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় সংঘর্ষের ঘটনায় আহত পদবঞ্চিতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গেলে পদবঞ্চিতদের তোপের মুখে পড়েন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এ সময় তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে পদবঞ্চিতরা। অনেক চেষ্টা করেও তারা ভেতরে ঢুকতে পারেননি।

সংবাদ সম্মেলনে সম্মেলনে ছাত্রলীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক সাইফউদ্দিন বাবু প্রতিবাদ উত্থাপন করেন। আজ দুপুর একটায় সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যে তারা মানববন্ধন করবেন বলেও জানান।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘ দিন ধরে যারা ছাত্রলীগে সক্রিয় এবং সংগঠনের জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করছেন, তাদের নতুন কমিটিতে মূল্যায়ন করা হয়নি। অযোগ্য ও নিষ্ক্রিয়দের বড় বড় পদ দেয়া হলেও ত্যাগী ও নিবেদিতদের অনেকেই কমিটিতে স্থান পাননি। যারা স্থান পেয়েছেন, তাদেরও উপসম্পাদক ও সদস্যের মতো পদ দিয়ে অবমূল্যায়িত করা হয়েছে। তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পদ দেয়া হয়নি। আবার যারা নিষ্ক্রিয়, সাবেক চাকরিজীবী, বিবাহিত, অছাত্র, গঠনতন্ত্রের অধিক বয়স্ক, বিভিন্ন মামলার আসামি, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে যারা ছাত্রলীগ থেকে আজীবন বহিষ্কার হয়েছিল তাদেরই ছাত্রলীগে পদায়ন করা হয়েছে।

সাইফউদ্দিন বাবু বলেন, বিবাহিতদের বিষয়ে আমরা এর আগেও জানিয়েছি, কিন্তু ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমরা তাই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানান।

এ সময় দাবি না মানলে অনশন ও গণপদত্যাগের ঘোষণা দেন নতুন কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপ-সম্পাদক শামসুন নাহার হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নিপু ইসলাম তন্বী। তিনি বলেন, কমিটিতে যারা স্থান পেয়েছে তারা শোভন-রাব্বানীর সঙ্গে ৮-১০ মাস রাজনীতি করেছে, তাদের পেছনে পেছনে ঘুরেছে। তাদের মেকানিজমে যারা তাদেরই কমিটিতে স্থান দেয়া হয়েছে। আগের দুই কমিটির ত্যাগী কাউকে রাখা হয়নি। তিনি বলেন, হলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের বাদ দিয়ে কমিটি করা হয়েছে। হল কমিটির যাদের পদ দেয়া হয়েছে তাও একটি প্রহসন। এটাই প্রমাণ করে রাজাকারের ছেলেসহ বিতর্কিতদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে কমিটি দিয়েছে শোভন-রাব্বানী।

জসিদ উদদীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহেদ খান বলেন, ডাকসু নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছিলেন, ডাকসুতে যাদের স্থান দেয়া সম্ভব হয়নি সেসব ত্যাগী নেতাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু সেটা করা হয়নি। তারা দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। তাই আমরা আর আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা শুনব না। আমাদের ছাত্রলীগের আদর্শিক নেতা শেখ হাসিনা। আমরা সরাসরি তার কথা শুনব।

ছাত্রলীগের গত কমিটির সদস্য তানভীর হাসান সৈকত বলেন, যারা পহেলা বৈশাখের কনসার্টে আগুন দিয়েছে তাদের কেন পদ দেয়া হয়েছে তা জানতে চাই।

রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বিএম লিপি আক্তার বলেন, যারা গতকাল (সোমবার) আমাদের মারধর করেছে, তাদেরই তদন্ত কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে। আমরা এই কমিটি মানি না। শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কোন নেতার সিদ্ধান্ত আমরা মানব না। তিনি বলেন, আমি রোকেয়া হলের সভাপতি ও ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদের দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় আমাকে ছাত্রলীগের উপ সম্পাদক পদ দেয়া হয়েছে। আমি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদককে জিজ্ঞেস করেছি যে, কিসের ভিত্তিতে আপনি আমাকে ছাত্রলীগের উপ সম্পাদক পদ দিয়েছেন। তিনি উত্তর দিয়েছেন, ডাকসুর গুরুত্বপূর্ণ পদে আছি বলে আমাকে এই পদ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাপারটা এমন আপনি এবার এমপি নির্বাচন করেছেন, এবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন করেন। আমার প্রশ্ন হলো- তিনি (গোলাম রাব্বানী) ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে থেকেও কেন ডাকসু নির্বাচন করলেন!

এর আগে, কমিটিতে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ঢাবি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন পদবঞ্চিতরা। সেখান থেকে তারা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৩০১ বিশিষ্ট নতুন কমিটির সবাইকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার পাশাপাশি গতকালের হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। কমিটি ভেঙে দিয়ে যোগ্যদের মূল্যায়িত করে নতুন কমিটি গঠনের জন্য প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।

নবগঠিত কমিটির সদস্যদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন : সোমবার হামলার ঘটনায় তদন্ত করতে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে রয়েছেন- ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, আইন বিষয়ক সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন শাহাদাৎ ও তথ্য গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক পল্লব কুমার বর্মণ। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার ইফতার-পরবর্তী সময়ে মধুর ক্যান্টিনে যে অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত ঘটনা হয়েছে, আমরা ছাত্রলীগ পরিবার তার তীব্র নিন্দা জানাই। সেই সঙ্গে ওই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির লক্ষ্যে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। তদন্ত কমিটিকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরেজমিন অনুসন্ধান করে তথ্য-উপাত্তসহ প্রতিবেদন দফতর সেলে জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ও সিনিয়র সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, আমরা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছি। তথ্য সংগ্রহ করছি। নির্দিষ্ট সময়েই প্রতিবেদন দেয়া হবে।

প্রশ্নফাঁসে অভিযুক্ত ইডেনের নেত্রী সহ-সম্পাদক : দুই বছর আগে ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে তার, বিয়েও করেছেন। তবু ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পেয়েছেন সহ-সম্পাদকের পদ। সদ্যঘোষিত ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহ-সম্পাদকের পদ পাওয়া এই নেত্রীর নাম আঞ্জুমান আরা অনু। তিনি ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। অনুর বিরুদ্ধে নিয়োগ পরীক্ষা ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ৫-এর ‘গ’ ধারা অনুযায়ী বিবাহিত ব্যক্তি ছাত্রলীগের কমিটিতে স্থান পাবেন না। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ৫-এর ‘গ’ ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কমিটিতে স্থান পাওয়া আঞ্জুমান আরা অনু ইডেন কলেজের গণিত বিভাগের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১৬ সালে তার ছাত্রত্ব শেষ হয়। তারপরও ওই বছরের ১ নভেম্বর কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি যুগ্ম-আহ্বায়কের পদ পান। প্রায় দুই বছর আগে এই নেত্রী সংসার জীবন শুরু করেছেন। বিয়ে করার বিষয়টি গতবছর তিনি সাংবাদিকদের কাছে স্বীকারও করেছিলেন।

বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আঞ্জুমান আরা অনু বলেন, আমার বিয়েটা তো উন্মুক্ত, আমি তো গোপন করে বিয়ে করিনি। আমাদের পার্টিতে মেয়েদের রাজনীতির সুবিধার্থে অনেক নিয়মই শিথিলযোগ্য। তার ভেতর মেয়েদের বিয়ের বিষয়টিও শিথিলযোগ্য।

এ বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর মুঠোফোনে বারবার কল দেয়া হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।