menu

চট্টগ্রামে ওয়ান সিটি-টু টাউন বাস্তবায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে কর্ণফুলী টানেল

সার্বিক অগ্রগতি ৫৮ শতাংশ-সড়ক ও সেতুমন্ত্রী প্রকল্প শেষ হবে ২০২২ সালে ডিসেম্বরে

সংবাদ :
  • ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ
  • ঢাকা , রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

করোনার সংকট কাটিয়ে পুরোধমে চলছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল নির্মাণের কাজ। ৯ হাজার ৮৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামের এই টানেলটি। এরমধ্যে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা দেবে চীন সরকার। এছাড়া বাকি ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি ২১ লাখ টাকা বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব ফান্ড থেকে ব্যয় করা হবে। জি-টু-জি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি নির্মাণ করছে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেড। এ পর্যন্ত প্রকল্পে সার্বিক অগ্রগতি ৫৮ শতাংশ। ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফররত চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একত্রে এই টানেল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছিলেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টানেল নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা রয়েছে প্রকল্প সূত্র জানায়। প্রকল্প সূত্র জানায়, টানেলটি কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম পাশে সি বিচের নেভাল গেট পয়েন্ট থেকে নদীর ১৫০ ফুট নিচ দিয়ে অপর পাশে গিয়ে ওঠবে। দক্ষিণ পাড় থেকে সংযোগ সড়ক দিয়ে বাঁশখালী সড়কে গিয়ে মিলবে। টানেলটির দৈর্ঘ্য সাড়ে ৩ কিলোমিটার। এর পূর্ব প্রান্তে প্রায় ৫ কিলোমিটার ও পশ্চিম প্রান্তে ৭৪০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর থেকেই টানেলটি নির্মাণে আগ্রহ দেখায় সিসিসিসি। জি-টু-জি ভিত্তিতে এতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখায় চীন সরকার। এজন্য ২০১৪ সালে ৯ জুন চীন সরকারের সঙ্গে ও ২২ ডিসেম্বর সিসিসিসির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। ‘ওয়ান সিটি অ্যান্ড টু টাউন’ মডেলে দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কে সংযুক্তিসহ ৭টি উদ্দেশ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী নদীর তলদেশে চার লেনের টানেল সড়ক নির্মাণ করছে। নদীর তলদেশে দুইটি টিউবের ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। কর্ণফুলীর তলদেশে মাটি খুঁড়ে টিউব ঢোকানোর জন্য চীন থেকে আনা ৯৪ মিটার দীর্ঘ ও ২২ হাজার টন ওজনের বোরিং মেশিন কাজ করা হচ্ছে। একটি টিউব দিয়ে গাড়ি শহরপ্রান্ত থেকে প্রবেশ করবে, আরেকটি টিউব দিয়ে ওপার থেকে শহরের দিকে আসবে। টানেলের প্রতিটি টিউব চওড়ায় হবে ৩৫ ফুট এবং উচ্চতায় প্রায় ১৬ ফুট। একটি টিউবে বসানো হবে দুটি স্কেল। এর ওপর দিয়ে দুই লেনে গাড়ি চলাচল করবে। পাশে থাকবে একটি সার্ভিস টিউব। মাঝে ফাঁকা থাকবে ১১ মিটার। যেকোন বড় গাড়ি দ্রুত চলতে পারবে এই টানেল দিয়ে। টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড (সংযোগ সড়ক) এবং ৭২৭ মিটার ওভারব্রিজ আনোয়ারা উপজেলাকে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে সরাসরি কক্সবাজারের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ফলে চট্টগ্রাম শহরের যানজট কমাসহ ভ্রমণ সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়।

টানেলের অগ্রগতি বিষয়ে গত বুধবার এক ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন টানেল নির্মাণ কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৫৮ ভাগ। সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রামকে ঘিরে। এরইমধ্যে নদীর তলদেশ দিয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি টিউবের মধ্যে একটি খনন ও রিং স্থাপন কাজ শেষ হয়েছে। আরেকটি টিউবের খনন কাজ আমরা আশা করছি নভেম্বর মাসে শুরু করা যাবে। করোনাভাইরাস মহামারীর শুরু থেকে অর্থাৎ মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে টানেল নির্মাণে অগ্রগতি হয় পাঁচ শতাংশ। দুই প্রান্তের ভায়াডাক্ট নির্মাণ কাজও এগিয়ে চলেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান।

ওবায়দুল কাদের বলেন, করোনা সংকটের শুরুতে প্রায় ৩০০ চীনা নাগরিক ছুটিতে নিজ দেশে অবস্থান করছিল। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে তারা বাংলাদেশে ফিরে আসে এবং কোয়ারেন্টিন পিরিয়ড শেষ করে কাজে যোগ দেয়। করোনাকালের প্রথমদিকে সীমিত পর্যায়ে কাজ চললেও টানেলের খনন কাজ বন্ধ হয়নি। প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এগিয়ে গেছে খনন কাজ। এখন পুরোদমে কাজ চলছে। প্রয়োজনে দিনরাত কাজ করে হলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার আহ্বান জানান সেতুমন্ত্রী।

টানেলের দুই প্রান্তের সংযোগ সড়কের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে নির্দেশা দিয়ে তিনি বলেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত বা যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে যেন কোনরূপ ভোগান্তি না হয়। টানেল নির্মাণ প্রকল্পের একটি ব্যতিক্রমী দিক হল, শহরের একপ্রান্তে হওয়ায় নির্মাণ কাজে কোনরূপ জনভোগান্তি নেই। তবে নির্মাণকালে আন্তর্জাতিক মানদ-ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই কাজ করতে হবে। পাশাপাশি মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। টানেলের কাজ শেষ হলে বদলে যাবে চিরচেনা চট্টগ্রাম-এই আশাবাদ ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, নদী, পাহাড় আর সাগর-মোহনার চট্টগ্রাম পাবে নবরূপ। নদীর ওপাড়ে গড়ে উঠবে আরেক চট্টগ্রাম। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আবাসন ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে। চীনের সাংহাই নগরীর মতো চট্টগ্রাম হবে ওয়ান সিটি-টু টাউন।

এ বিষয়ে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী সংবাদকে বলেন, প্রকল্প এলাকায় মোট সাড়ে ৮০০ শ্রমিক কাজ করছে। এরমধ্যে ৫৯৪ জন বাংলাদেশি শ্রমিক ও ২৩৪ জন চীনা শ্রমিক রয়েছে। করোনার আগে প্রায় ৭০০ চীনা শ্রমিক কাজ করতো। করোনা চলাকালে অনেক শ্রমিক চীনে চলে যায়। পরে তারা আবার ফিরে এসেছে। এখন পুরোধমে প্রকল্পে নির্মাণ কাজ চলছে। আশা করা যায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে।