menu

ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড এবং ননগেজেটেড কর্মকর্তারা বৈষম্য বঞ্চনার শিকার

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন
  • ঢাকা , রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২০

শুধুমাত্র আন্তঃক্যাডার নয়, ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড এবং ননগেজেটেড কর্মকর্তারাও বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এসব স্তরে অনেক কর্মকর্তার আট থেকে ১০ বছরেও পদোন্নতির জট খুলছে না। শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ পদোন্নতি পাচ্ছেন না, আবার কোন কোন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে। সরকারের প্রায় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগেই এই চিত্র বিরাজ করছে বলে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ‘আইসিটি’ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদোন্নতি বঞ্চিত ও পদ বিলুপ্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সান্ত¡না দেয়ার লক্ষ্যে এখন নবম গ্রেডে ‘আইসিটি অফিসার’ ক্যাডার পদ সৃষ্টির আশ^াস দেয়া হচ্ছে। ‘আইসিটি অফিসার’ ক্যাডার পদ সৃষ্টির জন্য সরকারের ‘আইসিটি বিভাগ’র ইতোমধ্যে একটি প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এছাড়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে কর্মরত গবেষণা কর্মকর্তা, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা ও প্রটোকল কর্মকর্তাদেরও পদোন্নতি হচ্ছে না। এই তিন পদের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য ওপরের স্তরে নতুন পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। আবার বিদ্যমান নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, অন্যান্য পদের সঙ্গে মিল রেখে পদোন্নতির কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ‘সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট’র দুটি পদ রয়েছে। এই স্তরের একদাপ ওপরের অর্থাৎ ‘সিস্টেম ম্যানেজার’রও (৩-গ্রেড) একটি পদ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘সিস্টেম ম্যানেজার’র পদটি শূন্য থাকলেও কাউকে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না। জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট আবু বাতেন তালুকদার সংবাদকে বলেন, ‘সাত বছর আগে আমি সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি। বর্তমানে আমরা দু’জন সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট আছি। কিন্তু ওপরের স্তরে (সিস্টেম ম্যানেজার) পদ ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও আমরা পদোন্নতি পাচ্ছি না। অনেক চেষ্টা-তদবির করেছি, কিন্তু পদোন্নতি না হওয়ার কারণও জানতে পারছি না।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্টের একটি পদ থাকলেও ২০১৪ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক পরিপত্রের কারণে এই পদটি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগে শুধুমাত্র সিস্টেম এনালিস্টের পদ থাকবে।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট মোফাখারুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ‘আমি ২০১২ সালে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট পদে পদোন্নতি পেয়েছি। ফিডার পদ অনুযায়ী, তিন বছর পর আমার পদোন্নতি হওয়ার কথা। কিন্তু ভবিষ্যতে পদোন্নতি তো দূরের কথা, আর কেউ এই মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্টই হতে পারবেন না। আমিও আর কোন পদোন্নতি পাব না। কারণ আমি অবসরে গেলে অটোমেটিক পদটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০১৪ সালের ১৮ মার্চ এক পরিপত্রে ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের আইসিটি, বাজেট ও আইন সংক্রান্ত অনুবিভাগ/অধিশাখা/শাখা/স্থাপনের বিষয়ে নিম্নরূপ প্রমিত পদ-বিন্যাস কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারণ সম্পর্কিত’ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। মূলত জনবলের সংখ্যার ভিত্তিতে ‘বড়’, ‘মধ্যম’ ও ‘ছোট’-এই তিনভাগে ভাগ করা হয়। এরমধ্যে ৩০০ এবং এর অধিক জনবল বিশিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ‘বড়’ (১২টি); ১৫০ থেকে ৩০০ পর্যন্ত জনবল বিশিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ‘মধ্যম’ (১৬টি) এবং ১৫০ এর কম জনবল বিশিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ‘ছোট’ (২৯টি) ক্যাটাগরির নির্ধারণ করা হয়।

পরিপত্র অনুযায়ী, বড় মন্ত্রণালয় ও বিভাগে একজন সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট, একজন সিনিয়র প্রোগ্রামার ও একজন প্রোগ্রামারসহ আইসিটি সংক্রান্ত ১৮টি পদ, মধ্যম মন্ত্রণালয় ও বিভাগে একজন সিস্টেম এনালিস্ট, একজন প্রোগ্রামারসহ আইসিটি সংক্রান্ত ১৩টি পদ এবং ছোট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে একজন সিস্টেম এনালিস্ট ও একজন প্রোগ্রামারসহ আইসিটি সংক্রান্ত ৯টি পদ থাকবে।

এই পরিপত্র অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বড় মন্ত্রণালয়ের ক্যাটাগরির অন্তুর্ভুক্ত। কিন্তু পরবর্তীতে এই মন্ত্রণালয় ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ’ এবং ‘কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ’এ ভাগ হলে জনবলের সংখ্যার নিরিখে তা ছোট হয়ে যায়। এ কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্টের পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একই কারণে আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্টের পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

অপর একটি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, ‘সরকার একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে, আরেক দিকে আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করছে, এটাতো হতে পারে না।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্টের এক দাপ ওপরে সিস্টেম ম্যানাজারের একটি পদ সৃষ্টিসহ আরও কিছু দাবি করেছিলাম। সরকারের বিভিন্ন স্তরে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা ও চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। সর্বশেষ আইসিটি বিভাগে লিখিতভাবে দাবিসমূহ দিয়েছি। তারা ‘আইসিটি অফিসার’ ক্যাডার পদ সৃষ্টি চেষ্টা করছে।’

গবেষণা-পরিসংখ্যান ও প্রটোকল কর্মকর্তারাও পদোন্নতি বঞ্চিত

প্রায় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগেই গবেষণা কর্মকর্তা, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা ও প্রটোকল কর্মকর্তার নিজস্ব ও স্থায়ী পদ রয়েছে। বিদ্যমান নিয়োগবিধি অনুযায়ী, এই তিন স্তরের কর্মকর্তার ওপরের দাপে পদোন্নতির কোন সুযোগ নেই। এজন্য ওইসব কর্মকর্তার পদোন্নতির জট খুলতে ২০১২ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির ১৬তম সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা স্বাক্ষরিত ওই সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যমান নিয়োগবিধিতে অন্তর্ভুক্ত নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সৃষ্ট এমন ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড (প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা) এবং ননগেজেটেড (দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা) পদসমূহের জন্য নতুন কোন নিয়োগবিধি প্রণয়ন অথবা এ সব পদ অন্তর্ভুক্ত করে ‘বাংলাদেশ সচিবালয় (ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড এবং ননগেজেটেড কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০০৬’ সংশোধন করা যায় কিনা বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরীক্ষা করে দেখবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে একটি মন্ত্রণালয় ও একটি বিভাগের দু’জন গবেষণা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেছেন, ‘নিয়োগবিধি সংশোধনের জন্য আমরা ৭/৮ বছর ধরেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চেষ্টা-তদবির করে আসছি। কিন্তু ফলাফল শূন্য। আমরা গবেষণা, পরিসংখ্যান ও প্রটোকল অফিসারদের পদোন্নতির রাস্তাও দেখিয়েছি, কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। ওই তিনপদে কর্মরত অফিসারদের ‘ডেপুটি ডিরেক্টর’ পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দেয়ার প্রস্তাব করেছি। এর বিকল্প হিসেবে বলেছি, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে সহকারী সচিব করা হয়। ঠিক তেমনি ওই তিন পদের কর্মকর্তাদের ‘সিনিয়র সহকারী সচিব’ পদে পদোন্নতি দেয়া যায়।’