menu

কুষ্টিয়ায় রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর

মামলা হচ্ছে ফুটেজ দেখে জড়িতদের চিহ্নিত করা হবে ভাস্কর্য ভাঙার নিন্দা ও বিক্ষোভ

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক ও প্রতিনিধি, কুষ্টিয়া
  • ঢাকা , রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০
image

ভাস্কর্য অপসারণের দাবি নিয়ে ইসলামী সংগঠনের নেতাদের আন্দোলনে যখন দেশে অস্থিতিশীল অবস্থা চলছে এমন পরিস্থিতে রাতের আঁধারে শহরে ভাঙচুর করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য। কুষ্টিয়া থানার অদূরে শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়কে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে নির্মাণাধীন জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙা নিয়ে শহরে তুমুল উত্তেজনা শুরু হয়। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ঘটনার পর থেকে কুষ্টিয়াসহ সারাদেশে মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন- দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে একটি মহল থেকে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তবে কে বা কারা এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে তা এখনও খুঁজে পায়নি পুলিশ। এ ঘটনার পর জেলার সবগুলো ভাস্কর্যে অতিরিক্ত নজরদারি শুরু হয়েছে। কুষ্টিয়ার ঘটনার পর দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থাপনায় ভাস্কর্য রক্ষণাবেক্ষণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টির সমাধান হওয়া দরকার। এমন পরিস্থিতি চললে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।

ভাস্কর্য ভাঙচুর হওয়া এলাকা কুষ্টিয়া-৩ আসনের (কুষ্টিয়া সদর) সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, কুষ্টিয়ায় এ ধরনের নোংরা কাজ কোনভাবেই বরদাশত করা হবে না। যারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে এবং মদদ দিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ইতিমধ্যে পুলিশকে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, কুষ্টিয়া শহরের ৫ রাস্তার মোড় অত্যন্ত ব্যস্ততম এলাকা। কুষ্টিয়া পৌর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে জাতির জনকের ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয় বেশ কিছুদিন হলো। জাতির জনকের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের একটি ছবির আদলে ভাস্কর্যটি নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিছুদিন পরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করার কথা ছিল। শুক্রবার রাতে কোন এক সময় ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করা হয়। দুর্বৃত্তরা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের মুখমণ্ডল এবং হাতের অংশ ভাঙচুর করে। একে ভাস্কর্যটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শনিবার সকালে স্থানীয়রা ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করা অবস্থা দেখতে পায়। এরপর খবর পেয়ে পুলিশের কর্মকর্তা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং পৌর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। শহরের বঙ্গবন্ধু সুপার মার্কেট চত্বর ও থানা মোড়ে আওয়ামী, জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন ভাস্কর্য ভাঙ্গার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন করে।

কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী বলেন, ধারণা করা হচ্ছে যারা আওয়ামী লীগবিরোধী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে যারা মানতে পারে না, তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ব্যাপারে মামলা করা হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভির আরাফাত জানান, সিসি টিভির ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শীঘ্র তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, কালেক্টরেট চত্বরসহ জেলায় যতগুলো ভাস্কর্য আছে সবগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ইউএনওদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, পৌরসভার উদ্যোগে শহরের ব্যস্ততম পাঁচ রাস্তার মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে গত মাসে। একই বেদিতে বঙ্গবন্ধুর তিন ধরনের তিনটি ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া এই বেদিতে জাতীয় চার নেতার ভাস্কর্যও থাকবে। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য স্থাপনের কাজ প্রায় সম্পন্নের পথে। হঠাৎ করে শুক্রবার রাতে দুবর্ত্তরা এই ভাস্কর্যটির ডান হাত, পুরো মুখমণ্ডল ও বাঁ হাতের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলে। তিনি বলেন, নভেম্বর মাসে পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে শহরের পাঁচরাস্তা মোড়ে বঙ্গবন্ধুর তিনটি ভাস্কর করার সিদ্ধান্ত হয়। তিনটি প্রধান সড়কের দিকে মুখ করে তিনটি ভাস্কর করা হচ্ছে। নিচের দিকে জাতীয় চার নেতার মুর‌্যাল থাকবে। দরপত্রের মাধ্যমে যশোরের ভাস্কর মাহবুব জামাল শামীম কার্যাদেশ পান।

সম্প্রতি রাজধানীতে এক সমাবেশে ইসলামী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক ভাস্কর্য, মূর্তি অপসারনের দাবি তুলে বক্তব্য দেন। ওই সমাবেশে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মিত ভাস্কর্যও অপসারণ করাার দাবি তোলেন সরকারের কাছে। তার এমন বক্তব্যের পর সারাদেশে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। মাওলানা মামুনুল হকের এমন বক্তব্যকে ধৃষ্টতা হিসেবে আখ্যা দেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা। আওয়ামী লীগ থেকেও এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করা হয়। এমন পরিস্থিতে মাওলানা মামুনুল হককে প্রতিহত করার ঘোষণা আসে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন থেকে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে একটি মাহফিলে যোগদান করতে যাওয়া মাওলানা মামুনুল হককে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান নেন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীতে দুদফা বিক্ষোভ মিছিল বের করে ভাস্কর্যবিরোধী হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। তৌহিদি জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলাও চালায় হেফাজতের নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ গত ৪ ডিসেম্বর জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররম থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিচার্য করে। এক পর্যায়ে পণ্ড হয়ে যায় হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি। এর আগে এক বিক্ষোভ মিছিল থেকে হেফাজতে ইসলামের ১৯ নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনে এসে মাওলানা মামুনুল হক দাবি করেন তিনি জাতির জনকের ভাস্কর্য অপসারণ নিয়ে কোন কথা বলেননি। তার বক্তব্য ভুলভাবে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের পরও গত শুক্রবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ সব ধরনের ভাস্কর্য অপসারণের দাবি নিয়ে পুনরায় রাস্তায় নামে হেফাজতে ইসলাম।

বিভিন্ন মহলের নিন্দা

এদিকে কুষ্টিয়ায় নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় কুষ্টিয়াবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জেলার সুশীল সমাজ এ ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার রফিকুল আলম টুকু বলেন, লালন, রবীন্দ্র, মীর মশাররফ, কাঙ্গাল হরিনাথের এ পুণ্যভূমি কুষ্টিয়ায় আজ আতঙ্কিত কলঙ্কের দাগ কেমন দগদগ ঠেকছে, শুকাবে না কোনদিন। তিনি বলেন, মূর্তি এবং ভাস্কর্য এক নয়। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য দেখে শিশুরা তাকে জানবে, শিখবে তার নেতৃত্বে এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল। সেই ভাস্কর্য ভাঙচুর একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা।

জেলা জাসদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক কারশেদ আলম বলেন, বিজয়ের মাসে এমন ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে এ কারণে যে, যারা জাতির পিতার ভাস্কর্যে ভাঙচুর করেছে তারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। তাদের ধৃষ্টতায় আমরা হতবাক।

কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট লেখক সমাজ সেবক ও মানবাধিকার কর্মী হাসান টুটুল রাতের আঁধারে জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি কীসের বীরত্ব দেখাচ্ছে। তিনি এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দাবি করেন। তা না হলে ঐ অপশক্তিরা দেশের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করবে।

যুবলীগ নেতা ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবু তৈয়ব বাদশা বলেন, ’৭৫ সালের সেই হায়েনা ঘাতকেরা এখনও বিদ্যমান। যারা বঙ্গবন্ধুর ঐ ঊর্ধ্বমুখী তর্জনীকে ভয় পায় তারা ভাস্কর্য ভেঙে জানান দিতে চাইছে স্বাধীনতাবিরোধীরা এখনও ঘাপটি মেরে থেকে গোপনে দেশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করছে। দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এদের প্রতিহত করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙচুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা

কুষ্টিয়ায় রাতের আঁধারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ’।

গতকাল এক বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ বলেছে, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে দেশ আজও স্বাধীন হতো না, পরাধীন থাকত। দেশের মানুষ পাকিস্তানের গোলাম হয়ে থাকত। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জনের এই মাসে একদল দুষ্কৃৃতকারী রাতের আঁধারে জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আমরা এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। যারা জাতির পিতাকে অবমাননা ও অমান্য করে তারা স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরোধী।’

বিশ^বিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. রফিকুল আলম এবং কোষাধ্যক্ষ ও জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে ইস্যু তৈরি করতে একটি বিশেষ মহলের ইন্ধন রয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। তাদের প্ররোচনায় এই ইস্যু সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের এই দুস্কর্ম বাংলাদেশের সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। হাজার বছরের পরিসরে যে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি এদেশে গড়ে উঠেছে তা এই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র মানতে পারছে না। তারা এই দেশকে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ভাবধারায় ফিরিয়ে নিতে চায়। এসব সংশ্লিষ্ট ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সেসব রাতের আঁধারের শক্তি ও মদদদাতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।