menu

ওয়াসার এমডি পদে তাকসিমকে ষষ্ঠবার নিয়োগের প্রস্তাব

উচ্চপদে পরিবর্তন দরকার মনে করেন বিশেষজ্ঞরা পুনর্নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূত : টিআইবি বর্তমান এমডির মেয়াদ বৃদ্ধি প্রশ্নে দ্বিমত অনেক বোর্ড সদস্যের

  • ঢাকা , রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
image

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে ষষ্ঠবারের জন্য নিয়োগ পাচ্ছেন বর্তমান এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। তার মেয়াদ আরও তিন বছর বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন ঢাকা ওয়াসার বোর্ড সভা। গতকাল ‘ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের ৯৭তম সভায় (অনলাইন মিটিং) এই প্রস্তাব করা হয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান এমডির মেয়াদ বৃদ্ধিতে দ্বিমত পোষণ করেছেন দুই-একজন সদস্য। তারা বর্তমান এমডির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। বোর্ড সভার এই সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আকারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে পাঠানো হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা অনুমোদন করবেন। ঢাকা ওয়াসার এমডি পদে প্রকৌশলী তাকসিম এ খান প্রথম নিয়োগ পেয়েছিলেন ২০০৯ সালের ১৩ অক্টোবর। এ পর্যন্ত জনপ্রশাসনের সব রেকর্ড ভেঙে তাকে পাঁচবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগামী ১৪ অক্টোবর তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তবে ওয়াসার মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এমডি পদে একই ব্যক্তিকে একাধিকবার নিয়োগ দেয়াকে জনমনে প্রশ্নে সৃষ্টি করছে। যেহেতু ১১ বছর যাবত ওয়াসার এমডি নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘব করতে পারেনি। তাই ঢাকা ওয়াসার উচ্চ পদের পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন নগর বিশেষজ্ঞরা। এদিকে ঢাকা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালককেই পুনর্নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূত। এই দুর্নীতি সুরক্ষাকারী পথ পরিহারের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

ওয়াসার এমডির নিয়োগের বিষয়ে বোর্ডের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীন সংবাদকে বলেন, বর্তমান এমডির মেয়াদ আগামী ১৪ অক্টোবর শেষ হবে। তাই নতুন এমডি নিয়োগ নিয়ে বোর্ড সভায় আলোচনা করা হয়। এখানে বর্তমান এমডির মেয়াদ বৃদ্ধি ও নতুন এমডি নিয়োগ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

তবে বর্তমান এমডির মেয়াদ বৃদ্ধিতে দ্বিমত পোষণ করে ঢাকা ওয়াসার বোর্ড সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ওয়ালিউল্লাহ শিকদার সংবাদকে বলেন, বোর্ড সভায় অনলাইনে ৯ জন সদস্য যুক্ত ছিলেন। সভায় বর্তমান এমডির বিরুদ্ধের আসা বিভিন্ন দুর্নীতি অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়া এমডির নিয়োগের বিষয়ের দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছি। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় দেন না। আমরাও এই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। তাই ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান এমডির মেয়াদ বৃদ্ধিতে দ্বিমত পোষণ করি।

জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার এমডি পদে প্রকৌশলী তাকসিম এ খান প্রথম নিয়োগ পেয়েছিলেন ২০০৯ সালের ১৩ অক্টোবর। এ পর্যন্ত জনপ্রশাসনের সব রেকর্ড ভেঙে তাকে পাঁচবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগামী ১৪ অক্টোবর তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। দ্বিতীয় দফায় : প্রথম দফা দায়িত্ব পালন শেষে ২০১২ সালের ১৩ অক্টোবর তাকসিম এ খানকে এমডি হিসেবে আরেক দফায় এক বছরের দায়িত্ব দেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। প্রথম দফার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ওয়াসা বোর্ড এমডির মেয়াদ আরও তিন বছর বৃদ্ধির জন্য একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু তৎকালীন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ তিন বছরের মধ্যে দুই বছরের প্রস্তাব নাকচ করে মাত্র এক বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধি করেন। তৃতীয় দফায় : ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর ১ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ওয়াসার এমডির। তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব ও প্রতিমন্ত্রী আরও ২ বছরের জন্য তাকসিম এ খানকেই নিয়োগ দেন। চতুর্থ দফায় বৃদ্ধি : ২০১৫ সালে তৃতীয় দফার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বোর্ড আবারও তাকসিমের মেয়াদ তিন বছর বৃদ্ধির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। তৎকালীন মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ এক বছর কেটে দিয়ে দুই বছরের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠালে তা অনুমোদিত হয়। পঞ্চম দফায় : চতুর্থ দফার মেয়াদ শেষ হয় ২০১৭ সালের অক্টোবরে। তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাকসীম এ খানের মেয়াদ আরও তিন বছর বৃদ্ধি করেন। যা আগামী ১৪ অক্টোবর শেষ হবে। ষষ্ঠবারে মতো তার মেয়াদ আরও তিন বছর বৃদ্ধির জন্য ঢাকা ওয়াসা বোর্ড প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

যেহেতু ১১ বছর যাবত ওয়াসার এমডি নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘব করতে পারেনি। তাই ঢাকা ওয়াসার উচ্চ পদের পরিবর্তন দরকার বলে মনের করেন নগর বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান সংবাদকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকে নগরবাসী জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যেহেতু ১১ বছর যাবত ওয়াসার এমডি নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘব করতে পারেনি। তাই নগরবাসীর মতে নেতৃত্বের পরিবর্তন দরকার। সংস্থার উচ্চপদে পরিবর্তন হলে কাজের গতি বাড়বে। এছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা দীর্ঘদিনের। ১৯৭১ সালে স্যার প্যাট্রিক গেডেস ঢাকা শহরের পরিকল্পনায় জলাশয়, খালবিল-নদীনালার গুরুত্বের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ওয়াসার উদাসীনতার কারণে আজ ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে হবে।

এদিকে ঢাকা ওয়াসা বোর্ড বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পুনর্নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূতভাবে বলে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গণমাধ্যম ও নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ তথ্য সূত্র অনুযায়ী ঢাকা ওয়াসার বোর্ডের বিশেষ সভায় শুধুমাত্র বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নাম উল্লেখ করে তাকে আবারও তিন বছর মেয়াদে পুনর্নিয়োগের সুপারিশ চূড়ান্ত করার কথা বলা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই পদে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়েছিল কিনা, কারা আবেদন করেছিলেন, কেন তারা যোগ্য বিবেচিত হলেন না, বা কেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকই একমাত্র উপযুক্ত প্রার্থী, কেন সংশ্লিষ্ট বিধি অবমাননা করে মেয়াদের পর মেয়াদ একই ব্যক্তিকে নবায়ন দান অপরিহার্য, এসব প্রক্রিয়াগত প্রশ্নের উত্তর যাচাই করা হয়েছে কিনা, তার কোন উল্লেখ নেই। পক্ষান্তরে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রায় দশকব্যাপী দায়িত্বকালে জনদুর্ভোগের বিষয়টি কারও অজানা নয়। টিআইবির গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য সংশ্লিষ্ট সকল সূত্রে ওয়াসার ছোট-বড় অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সেবা পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভূতপূর্ব বিস্তারের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এবং তার কোন কোন বিষয় তদন্তাধীন রয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, সরকারপ্রধান যেখানে বারংবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতার’ কথা বলছেন, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন, তখন এর একটা সুরাহা হবে। কিন্তু ঘটনা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আমরা আর হতাশার কথা বলতে পারছি না। আমরা এখন ওয়াসায় শুদ্ধাচার বা সুশাসনের সম্ভাবনার কথা বলতেও লজ্জা পাচ্ছি এবং এই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও সুরক্ষাকারী তোড়জোড়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এই পথ পরিহারের জন্য মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

ড. জামান বলেন, ‘২০০৯ সালে ঢাকা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিতর্কিত নিয়োগের পর প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় টানা পাঁচ মেয়াদে ১১ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, প্রতিবারই তার নিয়োগ নবায়নের ক্ষেত্রে কোন না কোনভাবে আইন ও নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে। এমনকি প্রথমবার নিয়োগের সময়ই অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তী নিয়োগে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য দালিলিক নির্দেশ দেয়া হয়। তারপরও কখনও বয়সসীমা বাড়িয়ে, আবার কখনও বা বোর্ডের সাম্প্রতিক সভার সুপারিশ পাশ কাটিয়ে পুরনো সভার তামাদি সুপারিশ ব্যবহার করে, এমনকি বোর্ডের মতামত গ্রহণেরই তোয়াক্কা না করে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে, এমনকি একটি ক্ষেত্রে একজন বিতর্কের ঊর্ধ্বে মন্ত্রীর লিখিত নির্দেশ অমান্য করে দৈব প্রক্রিয়ায় পুনর্নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়। যা শুধু আইনেরই সুস্পষ্ট ব্যত্যয় নয় বরং ক্ষমতার অপব্যবহার ও যোগসাজশের সংস্কৃতির নির্লজ্জ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দৃষ্টান্ত।’

আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক দাবি জানান, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সর্বশেষ বর্ধিত মেয়াদ আগামী ১৪ অক্টোবর ২০২০ শেষ হবার পূর্বেই যথানিয়মে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট খাতে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নতুন ব্যবস্থাাপনা পরিচালক নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। একইসঙ্গে, এই সংস্থার এবং এর সেবাগ্রহীতা জনগণের কল্যাণে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ ও অব্যাহত পুনর্নিয়োগ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি ওয়াসার সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করে অনিয়ম ও দুর্নীতির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এটা নিশ্চিত যে, ঢাকা ওয়াসা বোর্ড তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করছে না বা করতে দেয়া হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, বিশেষ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধে অপারগতার কারণে ঢাকা ওয়াসা বোর্ডেরও অপসারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানাই।’