menu

বাংলামটরে ‘জিম্মি’ অবস্থার অবসান

এক ছেলের লাশ উদ্ধার মাদকাসক্ত বাবা আটক

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮
image

বাংলামটরে জিম্মি অবস্থার অবসান (বামে)। মৃত শিশুর স্বজনের আহাজারি(১৬ পাতা) -সংবাদ

আড়াই বছরের এক ছেলের লাশ ও চার বছরের এক ছেলেকে জীবিত উদ্ধারের মধ্য দিয়ে রাজধানীর বাংলামটরের এক বাড়ি ঘিরে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তার অবসান ঘটেছে। এ ঘটনায় তাদের ‘মাদকাসক্ত’ বাবা কামরুজ্জামান কাজলকে পুলিশ আটক করেছে। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছয় ঘণ্টার জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে র‌্যাব, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ টিমকে কয়েক দফা ধাওয়ার মুখে পড়তে হয়েছে ঐ মাদকাসক্ত বাবার। স্বজনরা ছোট শিশুর মৃত্যুর জন্য মাদকাসক্ত বাবাকে দায়ী করলেও তার মৃত্যু কিভাবে হয়েছে তা নিশ্চিত নয় পুলিশ। তবে ছোট সন্তানকে ‘হত্যার’ অভিযোগে বাবাকে আটক করা হয়েছে। কামরুজ্জামান মাদকাসক্ত এবং মানসিকভাবে অসুস্থ বলে জানিয়েছে স্বজন ও পুলিশ।

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, বাংলামটরের লিংক রোডের ১৬ নম্বর বাড়িতে কামরুজ্জামান কাজল নামের এক ব্যক্তি তার ছোট ছেলেকে ‘হত্যা করে’ আরেক ছেলেকে কোলে নিয়ে দা হাতে ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছেন খবর পেয়ে সকালে দোতলা বাড়ি ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একপর্যায়ে পুলিশ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে কামরুজ্জামান দা নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া করে। আত্মীয়স্বজনদেরও ঢুকতে বাধা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে আত্মীয়স্বজনরা জীবিত থাকা এক সন্তানকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে ওঠে। বহু চেষ্টা এবং বোঝানোর পর বেলা ২টার দিকে পুলিশ কৌশলে তার বড় সন্তান কাজলকে কোলে নিয়ে হাতে দাসহ নিচতলার সিঁড়ির কাছে আসেন। এ সময় পুলিশ পেছন থেকে কাজলকে ধরে ফেলে, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তার বড় ছেলে সুরায়েতকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে দেখা যায় আড়াই বছরের এক শিশুর লাশ সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায় টেবিলের ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে। ছোট ছেলে সাফায়াতের কাফনে জড়ানো লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। স্বজনরা দাবি করেছে মাদকাসক্ত কাজলই তার ছোট ছেলেকে খুন করে বড় ছেলেকে জিম্মি করে বাড়ির ভেতরে ওই জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। তবে আটক হওয়ার পর কাজল পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, সাফায়াতের মৃত্যু হয়েছে বৈদ্যুতিক শকে, তিনি তাকে হত্যা করেননি।

স্বজনরা জানায়, কামরুজ্জামান কাজল মনু মেম্বারের ছেলে। তারা ১৬ ভাই বোন। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। ওই বাড়িতে ৫ ভাই সবাই একসঙ্গে থাকতেন। কিন্তু তার বাবার মৃত্যুর পর কাজল মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। কাজলের মাদকাসক্তির কারণে পরিবারে অশান্তি শুরু হয়। মাদকাসক্ত কাজল দা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভাইদের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে অসংলগ্ন আচরণ করতেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে তারা সবাই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে থাকতে শুরু করেন। ওই বাড়িতে কাজল তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন। কিন্তু সে কোনভাবেই সুধরায়নি। একবার মাদক সেবনের কারণে স্বজনরা তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিল। পরে ৩ মাস জেল খাটলে স্বজনরাই আবার জামিন করিয়ে আনে। এরপরও সে ভালো হয়নি। বরং দিনকে দিন তার মাদকের আসক্তি বেড়েই যাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে স্ত্রী ও সন্তানদের মারধর করতেন। সর্বশেষ ৩ মাস আগে স্ত্রীকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে স্ত্রী রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যান। এসব কারণে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে তার সম্পর্কও ভালো ছিল না।

স্বজনরা জানায়, গতকাল ভোরে কাজল ফোন করে স্বজনদের জানায়, তার ছোট ছেলে মারা গেছে। ঘটনা শুনে কামরুজ্জামান কাজলের ভাই নুরুল হুদা উজ্জ্বল ঘটনাস্থলে আসেন। ‘সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কাজল বাসা থেকে বের হয়ে পাশে থাকা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় গিয়ে জানান, তার ছোট ছেলে নূর সাফায়েত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। এটা যেন মাইকে ঘোষণা করা হয়। তারপর মাদ্রাসার ছাত্রদের পবিত্র কোরআন খতম দেয়ার জন্য নিয়ে যেতে চান। এ কথা শোনার পর আবদুল গাফফার নামে একজন খাদেম মাদ্রাসা থেকে তার সঙ্গে যান। কাজল ঘরে হুজুরকে দিয়ে কাফনের কাপড় পরান। ঘরের মধ্যেই জানাজার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু স্বজনরা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে তাদের দা নিয়ে ধাওয়া করেন। এতে স্বজনদের সন্দেহ হয় সেই তার ছেলেকে হত্যা করে লাশ ঘরের মধ্যে আটকে রেখেছে। আরেক ছেলেকেও হত্যা করতে পারে এমন আশঙ্কায় স্বজনরা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ আসে। পরে কাজল পুলিশকেও ধাওয়া করে। এ অবস্থায় পুলিশ চারদিক থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখে। ঘটনাস্থলে পুলিশ ছাড়াও র‌্যাব এবং ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিটও আসে। একপর্যায়ে পুলিশ গিয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পুলিশ গিয়ে দেখে একজন হুজুর কাজলের সঙ্গে একটি রুমে বসে আছেন। এক ছেলের গলায় দা ধরে বসে আছেন কাজল। আর আরেক ছেলেকে কাফনের কাপড় দিয়ে টেবিলের ওপর ঢেকে রাখা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাবার হাতে ছেলে খুনের গুঞ্জনে কয়েকশ উৎসুক মানুষ ওই বাড়ির সামনে ভিড় করে। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন কাজল। পরে গোয়েন্দা পুলিশের একজন সদস্য ওই বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করলে কাজলের দায়ের কোপে হাতে আঘাত পান। স্থানীয় বাসিন্দা আকিল জামান বলেন, ৩ থেকে ৪ মাস আগে স্ত্রীকেও মারধর করেন কাজল। প্রতিবেশীরা এসে তার স্ত্রীকে উদ্ধার করেন। নির্যাতন সইতে না পেরে স্ত্রী চলে গেছেন। এরপর থেকে দুই বাচ্চাকে নিয়ে কাজল ওই বাড়িতে থাকতেন। স্থানীয়রা জানায়, ৫ কাঠার ওই বাড়িটি দোতালা। বাড়ি সংলগ্ন কয়েকটি রুম রয়েছে যেগুলো দোকান হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। দোকান ভাড়া থেকে যে আয় আসতে তা কাজলই পেত। এ সম্পত্তি নিয়ে ভাইদের সঙ্গে বিরোধও ছিল। তবে ওই বাড়ি ও দোকানের মালিক কাজলই।

র?্যাব-২-এর উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহীদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, শিশুটির বাবা বসে আছেন, তার পাশে একজন হুজুর বসে আছেন। শিশুটিকে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো একটি টেবিলের ওপর রাখা হয়েছে। শিশুটির বাবাকে কোন সাহায্য লাগবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কারো সাহায্য লাগবে না। আপনারা কেন এসেছেন? আপনারা চলে যান।’

পুলিশের রমনা জোনের উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার সাংবাদিকদের বলেন, মৃতদেহ উদ্ধারের পর শিশুর গায়ে কোন কাটাছেঁড়া বা ক্ষত নজরে আসেনি। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে আমরা বলতে পারছি না। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার আগে আমরা তার বাবা বা কাউকে দায়ী করছি না।

ডিসি মারুফ হোসেন সরদার এক শিশুকে উদ্ধারের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ঘটনাস্থলে আসার পর দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে এর সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হই।