menu

চট্টগ্রাম মহানগরীতে

ছোট-বড় অপরাধে জড়িত কিশোর গ্যাং

সংবাদ :
  • নিরুপম দাশগুপ্ত, চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • ঢাকা , শনিবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৯

চট্টগ্রাম মহানগরীতে পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় রয়েছে কিশোর অপরাধীরা। এসব কিশোররা প্রকাশ্যেই জড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতি সংঘাত ও হানাহানিতে। নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়া স্কুল-কলেজপড়ুয়া এসব কিশোরের নানামুখী অপরাধ কার্যক্রম ভাবিয়ে তুলছে নগরের সচেতন মহলকে। এরা বেশিরভাগই অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী ঘরের বখে যাওয়া সন্তান। এরা কথিত বড় ভাইদের ছত্রচ্ছায়ায় এলাকায় চুরি-ছিনতাই-খুনের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়া ছাড়াও সামান্য ঘটনায় খুন করে ফেলা বা বড় কোন অপরাধ সংঘটন করছে কিশোর গ্যাংগুলো। চট্টগ্রাম মহানগরীতে অন্তত অর্ধ হাজারেরও ওপরে কিশোর অপরাধীর বিচরণ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

তুচ্ছ বিষয়ে কথা কাটাকাটি, ফেসবুক-মোবাইল, প্রেম, চুরি-ছিনতাইসহ নানা ইস্যুতে সামান্য মতানৈক্য হলেই এদের মাথায় রক্ত চাপে। গত দেড় বছরে কিশোর অপরাধে নগরীর বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৫টির বেশি মামলা হয়েছে। এছাড়া অধিকাংশ ছিনতাই মামলার বেশিরভাগ আসামিই কিশোর। তবে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এসব কিশোর গ্যাংকে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে কিছু ‘বড়ভাই’ নামধারী রাজনৈতিক নেতা। যাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব কিশোর অপরাধী দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সর্বশেষ পেটে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে আঘাত করে যুবককে খুনের ঘটনায় মো. সোহেল (২০) নামের এক কিশোর অপরাধীকে গত ৪ নভেম্বর সকালে ঢাকার মালিবাগ থেকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছেন খুলশী থানার ওসি প্রনব চৌধুরী। এর আগের দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর খুলশী থানার আমবাগান এলাকায় ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিসের পাশে একটি গ্যারেজে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে পতেঙ্গা পশ্চিম মুসলিমাবাদ এলাকায় স্কুল-কলেজে পড়ুয়া মেয়েদের ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত কিশোর গ্যাংরা বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে। গত ৩ নভেম্বর পতেঙ্গা পশ্চিম মুসলিমাবাদ এলাকায় হযরত আবদুল কাদের জিলানী ( রা.) জামে মসজিদ কমিটির উদ্যোগে ওই এলাকার কিশোর গ্যাং ও তাদের বন্ধু সংগঠন-৪ ক্লাবের কার্যত্রম বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ সভা করেছেন। হাজী মো. নুরুল আবছারের সভাপতিত্ব এবং মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা মো. ফোরকানের সঞ্চালনায় সভায় বক্তারা বলেছিল, কিশোরগ্যাং নামে পরিচিত ওই সংগঠনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় বাড়িওয়ালা ও এলাকাবাসীকে ফাঁসাতে সম্প্রতি গভীর রাতে সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের অফিস ভাঙচুর করে। এতে বাড়ির জমিদার, মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় এলাকাবাসী হতবাক হয়ে যায়। বিগত ৫ মাস আগে ফাতেমা বেগমের কাছ থেকে ঘরটি ভাড়া নেয়ার পর কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচার বেড়ে যায়। সভায় বলা হয়, সংগঠনের সোহেলের নেতৃত্বে এলাকার সোহাগ, সাজু, সাগর এই ভাঙচুর চালায়। এছাড়া ভাঙচুরে অংশ নেন মিসবাহ, সামির, আকাশ, কামবু। এরা স্থানীয় আ’লীগ নেতা ফরিদুল আলম এবং ওয়ার্ড যুবলীগ ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের নেতা মো. মুছার অনুসারী। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ৩০ অক্টোবর পতেঙ্গা থানায় অভিযোগ (নং-১৯৯৬) এবং ১ নভেম্বর সাংসদ এম এ লতিফকে স্বারকলিপি প্রদান করা হয়। ষবায় বক্তারা অবিলম্বে এলাকার কিশোরগ্যাং ও তাদের সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানান।

এদিকে মহানগরীর খুলশী থানাধীন নাসিরাবাদ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের আশপাশ কিশোর গ্যাংয়ের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন স্কুল কলেজে অধ্যায়নরত ছাত্রীরা এসব কিশোর অপরাধীর কাছে প্রতিনিয়ত নাজেহাল হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসবের প্রতিবাদ করায় অনেক অভিভাবককে হুমকি ধমকি এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে আসছে কিশোর অপরাধীরা। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থী স্কুল যেতে অনিহা প্রকাশ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রীরা জানায়, খুলশী থানাধীন আল ফালাহ গলির মুখ থেকে চট্টগ্রাম সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের পেছনের পথ দিয়ে তুলাতলি পর্যন্ত আধ কিলোমিটার এলাকা কিশোররা স্বর্গরাজ্য করে তুলেছে। এ পথ দিয়ে বালিকা বিদ্যালয় ছাড়াও এই এলাকার বিভিন্ন স্কুলে অধ্যায়নরত প্রায় ৬০/৭০ জন শিক্ষার্থী যাওয়া আসা করে। বখাটেরা স্কুল শুরু আর ছুটির সময় বসে থাকে। এরই মধ্যে ছাত্রীরা স্কুলে যেতে বা ছুটির সময় বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করে আসছে।

বখাটেদের ভয়ে তটস্থ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক জানান, তুলাতলির মুখ থেকে বালিকা বিদ্যালয়ের পিছনের রাস্তা আল ফালাহ গলির মুখ পর্যন্ত এসব কিশোররা নিয়মিত আড্ডা দিয়ে আসছে। এদের কোন শিক্ষা-দীক্ষা বলতে কিছু নেই। এসব বখাটেদের কেউর বাবা বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে কারাবন্দী, আবার অনেকের মা-বোন গার্মেন্টেসে চাকরি করে, কারও বাবা ঠেলা গাড়ি চালায়, কারও মা বাসায় কাজ করে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।

জানা গেছে, গত বছর নগরীর জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসপারকে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে হত্যার ঘটনায় সাব্বির নামে এক কিশোরকে দায়ী করা হয়। পরে নগর পুলিশ অপরাধ চক্রে জড়িত কিশোর এবং অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকা তৈরি করে। তালিকায় প্রায় ৫৫০ জন কিশোর অপরাধীর নাম চলে আসে। বিভিন্ন থানার কর্মকর্তাদের দিয়ে তৈরি স্পটের সংখ্যা ৩০০-তে গিয়ে ঠেকে। অর্থাৎ এসব স্পটে কিশোর অপরাধীরা আড্ডা বসায়। সন্ধ্যার পর এসব স্পটে আড্ডায় দেখা গেলে কিশোর-তরুণদের আটকের ঘোষণাও দেয়া হয় নগর পুলিশের পক্ষ থেকে।

সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে কিশোর অপরাধের ঘটনায় নগরীর ১৬টি থানায় অন্তত ২৫টি মামলা হয়েছে। মারামারি, খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব মামলা হয়েছে। গত ৬ এপ্রিল এক স্কুলছাত্রীকে উত্যক্ত করার জেরে কিশোরদের দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ প্রেক্ষিতে গোলপাহাড় এলাকার যুবলীগ কর্মী এমএইচ লোকমান রনি নিহত হন স্থানীয় সন্ত্রাসী সাইফুল ইসলামের গুলিতে। এর দু’দিন পর পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় সাইফুল। গত ১০ মে নগরীর পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর পিলখানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ছুরিকাঘাতে খুন হন মোস্তাক আহমেদ (৩৫)। এ ঘটনায় জড়িত ১০-১৫ জনের সবার বয়স ১৮ বছরের কম। ১৪ মে নগরী ডবলমুরিং থানার হাজিপাড়ায় রিকশাচালক রাজু আহমেদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেয় ১০-১২ জনের কিশোর। ১৪ এপ্রিল ইয়াবা সেবনের টাকা না পেয়ে বাবা রঞ্জন বড়ুয়াকে ছুরিকাঘাতে খুন করে তার ছেলে রবিন বড়ুয়া। কোতোয়ালি থানার কাজিরদেউড়ীর ব্যাটারি গলিতে এ ঘটনা ঘটে। বাবার ঘাতক এই কিশোরের বয়সও ১৮ বছরের নিচে।

কিশোর অপরাধের বলি জাকির হোসেন সানি (১৮)। গত ২৬ আগস্ট দুপুরে নগরের খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কে ওমরগণি এমইএস কলেজের ফটকের অদূরে ইক্যুইটি ভবনের সামনে ছুরিকাঘাতে খুন হয় সানি। এর আগে গত ১৬ আগস্ট আগ্রাবাদ মৌলভীবাজার তিন রাস্তার মোড় থেকে মেয়েঘটিত বিষয় নিয়ে মারামারির অভিযোগে সোহাগ গ্রুপের আট সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত আসামিরা সদ্য কৈশোর পার হওয়া তরুণ।

পুলিশ সূত্র মতে, কোচিংভিত্তিক, রাজনৈতিক, স্কুল-কলেজভিত্তিক, চাকরিজীবী- এ ধরনের অন্তত ১৫টি ক্যাটাগরির আড্ডার স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল। তালিকা তৈরির পর কয়েকমাস স্পটগুলো নিয়মিত পুলিশের নজরদারিতে ছিল। কিন্তু এখন সেই আড্ডাস্থলগুলো আবারও সরব কিশোর-তরুণদের আনাগোণায়।

তবে ঘটনা ঘটলেই অ্যাকশনে যাচ্ছি উল্লেখ করে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তবে অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু পুলিশি অ্যাকশন দিয়ে তো এই ধরনের সামাজিক অপরাধ একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এছাড়া তাদের যারা নিয়ন্ত্রক, তাদেরও আমরা আইনের আওতায় আনার কাজ করছি। কিশোর অপরাধী এবং অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোর তালিকা আমাদের কাছে আছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যেসব স্পটে কিশোর-তরুণরা নিয়মিত আড্ডা দেয়, সেই স্পটগুলো আমাদের নজরদারিতে রয়েছে।