menu

সুন্দরবনে এক যুগে বনরক্ষী হতাহত ৩০

সংবাদ :
  • এমাদুল হক শামীম, শরণখোলা (বাগেরহাট)
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

বিশ্বের একক বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় যুগ যুুগ ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে আসছেন গোটা সুন্দরবনের উভয় রেঞ্জের সহস্রাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী। বনজ সম্পদ রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গভীর সমুদ্র ও জঙ্গলে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে গত এক যুগে প্রায় ৩০ বনরক্ষীর হতাহতের ঘটলেও নিহতের পরিবারগুলোর জন্য বনবিভাগে নেই তেমন কোন সুবিধা। অপরদিকে, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ও সহযোদ্ধার অনাকাংক্ষিত মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না নিহতের স্বজন ও সহযোদ্ধা বনকর্মীরা। নানা মৌলিক সুবিধা হতে বঞ্চিত থেকেও পরিবার পরিজন ছেড়ে গভীর বনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলদস্যু, বনদস্যু ও হিংস্র্র প্রাণীকূলের সঙ্গে প্রতিনিয়িত লড়াই করে সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষা করতে হয় বনরক্ষীদের। কিন্তু দুর্ঘটনার কবলে পড়ে কোন বনরক্ষীর মৃত্যু হলে তার পরিবার পরিজন পাচ্ছেন না তেমন কোন সুযোগ-সুবিধা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের আওতাধীন ২,৪৩,০৪৭ হেক্টর বনভূমির সম্পদ রক্ষায় নানা সঙ্কটের মধ্যেও পেশাগত দায়িত্ব পালনে (মাঠ পর্যায়ে) নিয়জিত রয়েছেন উভয় রেঞ্জের ৭৫টি ক্যাম্প, টহল ফাঁড়ির সহস্র্রাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বন রক্ষাসহ সরকারী রাজস্ব আদায়, সামাজিক বনায়নসহ বনজ সম্পদ সুরক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করতে গিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সিডর, আইলা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসসহ নানা দুর্যোগ মোকাবেলার পাশাপাশি হিংস্র্র বাঘ, কুমির, জলদস্যু ও বনদস্যুদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে বনকর্মীদের। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গত ২০০৮ সালে পূর্ব সুন্দরবনের ভোলা ক্যাম্পে বনদস্যুদের গুলিতে আফসার উদ্দিন (৫৪) নামের এক বনরক্ষী কর্তব্য পালন কালে নিহত হয়। এ সময় দস্যুদের ছোড়া গুলিতে ওই ক্যাম্পের অপর এক বনরক্ষীর একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। ২০০৭ সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছ্বাসে মো. সায়েদুর রহমান (৫৫) নামের এক বনরক্ষীর পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। এছাড়া সর্বশেষ গত ২০ নভেম্বর পূর্ব সুন্দরবনের বগী স্টেশনের বনরক্ষীরা বলেশ্বর নদীতে টহল দিতে গেলে সোহেল রানা তালুকদার (৩৮) নামের এক বনরক্ষী ট্রলার থেকে পা ফসকে নদীর মাঝের চর এলাকায় ডুবে যায়। পরে নিখোঁজ ওই বনরক্ষীকে উদ্ধারে বনবিভাগ, ফায়ার সার্ভিস ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা যৌথ অভিযান শুরু করে। নিখোঁজের ৩ দিন পর সুন্দরবনের ডুমুরিয়া টহল ফাঁড়ি এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় সোহেলের ক্ষত বিক্ষত মৃত. দেহ উদ্ধার করেন বনবিভাগ। বনজ সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা কারণে গত ১ যুগে গোটা সুন্দরবনের প্রায় ৩০ বনকর্মী বিভিন্নভাবে আহত ও নিহত হয়েছেন। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে অবহেলিত রয়েছেন তারা। পরিচয় না দেয়ার শর্তে, বনবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, তেল, জলযান, আবাসন সুবিধা, স্বাস্থ্য সেবা সহ নানা সংকট উপেক্ষা করে বনকর্মীরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবার পরিজন ছেড়ে বিভিন্ন মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েও সেকেলের জরাজীর্ন ও পরিত্যাক্ত বাসস্থানে জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন বনরক্ষীরা। অথচ দেশের অন্যান্য বাহিনীদের সরকারী নানা সুযোগ সুবিধা রয়েছে। কিন্তু বনরক্ষীরা আজও নানা ভাবে অবহেলিত। তিনি বনকর্মীদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য দুর্ঘটনায় মৃত্যু বন কর্মীর পরিবারকেগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি ওই পরিবারের একজন যোগ্য সন্তান কে চাকরি দেয়ার জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন। এ বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবনের ডি.এফ.ও মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, সুন্দরবনের মাঠ পর্যায়ে কর্মরত বনরক্ষীরা নানা সঙ্কটের মধ্যে কর্তব্য পালন করে চলছে। দুর্ঘটনায় নিহত বনকর্মীসহ অন্যদের বিভিন্ন দাবির বিষয়টি সরকার বিবেচনা করলে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। তাহলে সুন্দরবন সুরক্ষায় বনরক্ষীরা আরও আন্তরিক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।