menu

বুড়ি তিস্তা খননে অনিয়মের পাহাড়

দখলদারদের রক্ষায় তিস্তার গতিপথ ঘুরিয়ে দিল ঠিকাদার!

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, উলিপুর(কুড়িগ্রাম)
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯
image

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) : বহাল তবিয়তে তিস্তাপাড়ের অবৈধ দখলদারদের বাড়ি-ঘর -সংবাদ

কুড়িগ্রামে বুড়িতিস্তা নদী খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সাড়ে ৩১ কিলোমিটার নদী খননে, প্রক্কলন অনুযায়ী স্থানভেদে ১০ ফুট থেকে ৮ ফুট গভীর করে খনন করার কথা থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় তা মানা হয়নি। কোথাও না কেটে, কোথাও আবার নদীর তীর বা পার না বেঁধেই (স্লোভ) খনন অব্যাহত রেখেছে। দখলদারদের রক্ষায় ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে নদীর গতিপথ। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সার্বক্ষণিক তদারকি না থাকায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তাদের ইচ্ছামতো নদী খনন করায় দুই পাড়ের মাটি এখনই ধসে পড়ছে খননকৃত জায়গায়। বিত্তশালীদের পাকা স্থাপনা না সরিয়ে, গরিব কৃষকদের আধাপাকা ধান নষ্ট করে খনন অব্যাহত রাখায় বিক্ষুব্ধ কৃষক ও বুড়িতিস্তা বাঁচাও উলিপুর বাঁচাও আন্দোলনের কর্মীরা। গত সোমবার দুপুরে একটি অংশের খনন কাজ বন্ধ করে দিয়েছে তারা। তাদের সাফ কথা- আগে পাকা স্থাপনা অপসারণ করতে হবে তারপর কৃষকের ধানক্ষেত খনন। এ অবস্থায় বুড়িতিস্তা নদীর দুই পাড়ের মানুষের মাঝে টানটান অবস্থা বিরাজ করছে। বুড়িতিস্তা বাঁচাও উলিপুর বাঁচাও আন্দোলনের শরিক সংগঠন রেল নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির উলিপুরের সভাপতি আপন আলমগীর অভিযোগ করেন, বুড়িতিস্তা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, উলিপুরের গুনাইগাছ ব্রিজের মুখ ভরাট করে অবৈধ পাকা স্থাপনা নির্মাণকে কেন্দ্র করে। যার প্রেক্ষিতে সরকার ডেল্টা প্ল্যানের আওয়তায় এই নদীটি খননের উদ্যোগ নেন। এই কাজে নিয়োজিত মের্সাস তাজ মঞ্জিল প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার এমদাদ হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে, নানা কৌশলে ব্রিজের মুখে খনন শুরু না করে, কালক্ষেপন করতে থাকেন। চাপের মুখে স্কেভেটর মেশিন সেখানে আনলেও রহস্যজনক কারনে কাজ না করে গত ১২মে সেখান থেকে মেশিন সরিয়ে নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে,পাকা স্থাপনা পাশ কাটিয়ে ব্রিজের মুখে নদীর পতিপথ পশ্চিম দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে। নদীর বুক থেকে স্থাপনা সরানো না হলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার হুসিয়ারি দেন তিনি। নারিকেল বাড়ি গ্রামের কৃষক আয়নাল হক জানান, তার জমির আধা পাকা ধান কেটে খনন কাজ শুরু করে। মাত্র ১৫ দিন গেলে ধানগুলো ঘরে তোলা যেত। ফসল রক্ষার জন্য ঠিকাদার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে সময় চেয়েও তা পাননি। এই জমি তাদের রেকর্ডীয় সূত্রে ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি হওয়ার পরও ঠিকাদার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাত থেকে আধা পাকা ধান রক্ষা করতে পারেনি আয়নাল। একই অভিযোগ ভদ্র পাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম, রাকিবুল ইসলাম, আশরাফ আলী ও জয়নাল আবেদীনের। এদিকে খনন কাজের শুরুতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খায়রুল কবির পক্ষে নি.ম ক্রাউন নামের এক ব্যক্তি ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নেন। তিনি শত শত ট্রাক মাটি টাকার বিনিময়ে প্রকাশ্যে ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি শুরু করলে, এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে মাটি বিক্রি বন্ধ হয়। ধামশ্রেণির শুঁড়ির ডাড়া গ্রামের আব্দুল করিম জানান, শুঁড়ির ডাড়া ব্রিজের মুখে খনন না করেই মেশিন অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্কেভেটরের চালক বলেছেন এখানে খনন করা লাগবে না। নদী যে পরিমাণ গভীর করে খনন করা দরকার ছিল ওইভাবে খনন হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে নি.ম. ক্রাউন বলেন, ‘আমরা মাটি বিক্রি করছি না,শিফটিং করছি’। গুনাইগাছ ব্রীজ ও উলিপুর পৌর এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নদী খননে নানা অনিয়মের চিত্র। গুনাইগাছ ব্রিজ এলাকায়, ব্রিজের মুখ ভরাট ও বন্ধ করে মার্কেট গড়ে তুলেছেন আখতারুজ্জামান অপু। সেখানে মার্কেটের অর্ধেক অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা ভুমি অফিসের সার্ভেয়ার এসে মাপজোক করে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করে দেন। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন ওই স্থাপনা অপসারণ না করে খননে ব্যবহৃত মেশিন অন্যত্র নিয়ে যায়। এলাকার মানুষজন অভিযোগ করেন, সরকারি দলের কতিপয় ব্যক্তি দখলদারের পক্ষ নিয়ে উচ্ছেদ কাজে বাঁধা দেয়ায় পাকা স্থাপনা অপসারণে ঠিকাদার বিরত থাকেন। এ প্রসঙ্গে মের্সাস তাজ মঞ্জিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারি এমদাদ হোসেন বলেন, স্থাপনা ভাঙ্গার কাজ তার নয়। বুড়িতিস্তা বাঁচাও উলিপুর বাঁচাও আন্দোলনের অন্যতম শরিক সংগঠন উলিপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাইদ সরকার বলেন, বুড়িতিস্তা নদী দখল করে বিপণী বিতান গড়ে তোলার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। উলিপুরের হাজার মানুষ সে আন্দোলনে অংশ নেয়। যদি ওইসব স্থাপনা না সরানো হয়, তাহলে বাকি কাজ বন্ধ করে দিয়ে হলেও উলিপুরবাসীকে নিয়ে আবারও আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসুত্র জানায় ১৭ কোটি টাকা ব্যায়ে দু’টি গ্রুপে প্রধানমন্ত্রীর ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় বুড়ি তিস্তার খনন কাজ শুরু হয়। ১৯ কিলোমিটার খননের জন্য মেসার্স তাজ মঞ্জিল প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার এমদাদ হোসেন কাজ পান অপর গ্রুপে সাড়ে ১২ কিলোমিটার অংশের খননের কাজ পান মেসার্স খায়রুল কবির নামে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ দুটি গ্রুপে ২ ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ দেয়া হয়। দখলদারদের স্থাপনা অপসারণ না করে স্কেভেটর মেশিন সরিয়ে নেয়া ও অনিয়ম দুর্নীতি প্রসঙ্গে দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-সহকারী প্রকৌশলী শরীফুল ইসলাম দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন কাজে ফাঁকি দেয়ার কোন উপায় নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের টাস্কফোর্স পরিদর্শন করার পর চূড়ান্ত বিল দেয়া হবে। উলিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল কাদের জানান, গত ১২ মে তারিখে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।

ওই সভায় চিলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান শওকত আলী বীর বিক্রম অভিযোগ তোলেন, চিলমারী উপজেলার অংশে বুড়িতিস্তা নদী খননে অনিয়ম হচ্ছে। স্কেভেটর দিয়ে খনন না করে শ্যালো ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন করে খনন করা হচ্ছে। বুড়িতিস্তা খনন কমিটির সভাপতি, কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলেন, তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলবেন। সেখানে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রয়েছে বলে শুনেছি। আরও কাগজপত্র পরীক্ষা করে ও সরেজমিনে ঘটনাস্থলে ঘুরে এসে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। পৌর এলাকায় বুড়িতিস্তার প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষকের জমি কিভাবে খনন করা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদি হয়ে থাকে সেটাও তিনি দেখবেন- কিভাবে খনন হল।