menu

গান গেয়ে সংসার চলে না বাউল সরোয়ারদী’র

সংবাদ :
  • মাহবুবুল ইসলাম সুমন, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮
image

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) : সরোয়ারদী বাউলের গান শুনছেন প্রতিবেদক সুমনসহ (সর্বডানে) শ্রোতারা -সংবাদ

আশা পূর্ণ হলো না ... আমার মনের বাসনা, বিধাতা সংসারের রাজা ... আমায় করে রাখলেন প্রজা ...। বাউল স¤্রাট লালন সাইজীর ভবসংসার বিমুখী এই গানটি যখন একতারার তালে নিজের কন্ঠে লালনের সুুরে গাওয়ার চেষ্টা করছিলেন এক বাউল, তখন চলতি পথে থমকে দাঁড়ায় কয়েকজন উঠতি বয়সী যুবক। বাউলের একতারারার সাথে হাততালিতে তাল মিলিয়ে তারা আরও গভীর ভাবের পরিবেশ তৈরি করে গান শুনছিল। এক পর্যায় বাউল চোখ বন্ধ করেই দরদী গলায় গাইতে থাকেন আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়, পারে লয়ে যাও আমায়, মিলন হবে কত দিনে, পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়সহ অনেক গান। বাউলের এমন গানে প্রকৃতিও যেন তার সাথে তাল মেলাচ্ছিল। তার কন্ঠের সুর ভেসে বেড়াচ্ছিল বাতাসে, আর পথিকরা আনমনেই বাউলের সাথে গুণগুণ সুরে গাইছিল সেসব গান। চলতি পথে হঠাৎ এমন ভাব পরিবেশে থমকে যাবে যে কেউ। গান শুনে ১০-২০ টাকা করে দক্ষিণা দিয়ে যান পর্যটকরা। মনমাতানো এমন ভাবের পরিবেশ দিবালোকে প্রায় সময়ই তৈরি হয় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে (সোনারগাঁ জাদুঘর)। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গান শেষে তার জীবনকর্ম নিয়ে কথা হয় বাউলের সাথে। অনেকটা চেপে রাখা কষ্ট নিয়েই তিনি জানান, তার নাম সরোয়ারদী (৩৮), লোকে সরোয়ারদী বাউল বলেই ডাকে। পার্শ্ববর্তী আড়াইহাজার উপজেলার দড়িবিষনন্দী গ্রামে তার বাড়ি। অভাব-অনটনের কারণে প্রাথমিকের পর আর লেখাপড়া হয়নি। স্বপ্ন ও শখের নির্লোভ অনুসরণের প্রেমময় চিন্তায় মনের টানে ১৪/১৫ বছর বয়স থেকেই গান গাওয়ার চেষ্টা করতে করতে এখন তিনিই বাউল। ৯ বছর যাবত দেশের বিভিন্ন স্থানে একতারা হাতে গান গেয়ে গেয়েই ৫ সদস্যের সংসার চালাচ্ছেন। ছোটকাল থেকেই তার বাউল ভাব দেখে বাবা মা বিয়ে করিয়ে দেন সংসারী হওয়ার জন্য, কিন্তু তিনি সংসারী হলেও বাউল হওয়া থেকে ফেরাতে পারেনি সংসারের পিছুটান। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রীর সংসার। বাউল গানের মধ্যে প্রবেশ করে অন্যসব কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন আগেই। তাই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। কিন্তু কি করা সংসার তো চালাতে হবে, তাই পথে প্রান্তরে গান গেয়ে যা পান তা দিয়েই সংসার চালান তিনি। গান গেয়ে কোনদিন দেড় থেকে দুইশ’ আবার কমও হয়, সেই টাকা দিয়েই সংসার চালাতে হচ্ছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও শরীর খারাপ থাকলে বের হন না বলে না খেয়েই দিন পার করতে হয় মাঝে মধ্যে। সংসারে টানাটানির কারণে স্ত্রী কর্তৃক নীরব যন্ত্রণা পেতে হয়, তবুও সংসার ছাড়তে রাজি থাকলেও গান ছাড়তে নারাজ বাউল সরোয়ারদী। স্বামীর এমন ভাব দেখে নিজের বিলাসিতাকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের নিয়ে কষ্ট করেই তার স্ত্রী সংসার করছেন বলে স্ত্রীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। তবে নির্দিষ্ট কোন শিক্ষকের কাছ থেকে গান শেখেননি। স্রষ্টা প্রদত্ত্ব কন্ঠের কারণেই মানুষকে গানে আকৃষ্ট করতে পারেন তিনি, তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিক্ষক ও বিটিভি’র শিল্পি সালাহউদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে মাসে দু’বার ঢোলের সাথে গানের তাল ধরে রাখার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। জীবন সংসার ও বাউল জীবনের সুখ-দুঃখের কথার মাঝে হতাশার সুরে তিনি বলেন, এই সমাজে ‘জ্ঞানী পাওয়া যায় অনেক কিন্তু গুণী পাওয়া দুষ্কর’। মানুষ গুণের কদর করা ভুলে যাচ্ছে বললেই চলে।