menu

২১ প্রতিষ্ঠান ও ১৫ খাদ্যসামগ্রীকে মানহীন ঘোষণা শিল্প মন্ত্রণালয়ের

রমজান উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন

সংবাদ :
  • অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , বুধবার, ১৬ মে ২০১৮
image

খাদ্যসামগ্রি তৈরি করে এমন ২১ প্রতিষ্ঠান ও ১৫ খাদ্য ও পানীয়জাতীয় পণ্যকে মানহীন ঘোষণা করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এসব পণ্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) দন্ডে মানহীন হওয়ায় এই ঘোষণা দেয়া হয়। গতকাল শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু রমজান উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন। মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে অনুষ্ঠানে বিএসটিআইয়ের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এসএম ইসাহাক আলি পণ্যগুলো নাম তুলে ধরেন। আকস্মিক অভিযান চালিয়ে সেসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যে মান ঠিক নেই বলে জানান ইসাহাক আলি।

কারখানাগুলো হচ্ছে- পুরানা পল্টনের রাজিব এন্টারপ্রাইজ, মতিঝিলের আলহেরা এন্টারপ্রাইজ, মিরপুরের ঢাকা ওয়াসা, মিরপুরের এনএম এন্টারপ্রাইজ, বাড্ডার এ ওয়ান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, তেজগাঁওয়ের সমকাল ক্যান্টিন, তেজগাঁয়ের ভূমি রেজিস্ট্রি অফিস ক্যান্টিন, গুলশান-১ এর লাইটিং প্যালেস, গুলশান-২ এর আল নূর রেস্তোরাঁ, বারিধারার মিতু-মুক্তা হোটেল, বাড্ডার নীল ফাস্ট ফুড অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, গুলশানের মেজবান রেস্টুরেন্ট, শেরেবাংলা নগরের শিউলি হোটেল, তেজগাঁওয়ের বধুয়া হোটেল অ্যান্ড সুইটস, মালিবাগের ইউনিক ফাস্ট ফুড, তেজগাঁওয়ের অন্তর ড্রিংকিং ওয়াটার, তেজগাঁওয়ের ফেইথ ড্রিংকিং ওয়াটার, দক্ষিণখানের এক্সিম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, মিরপুর-২ এর মাশাল্লা হেলথ ডেভেলপমেন্ট কোং, মর্নডিউ পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার এবং রাজারবাগের নীল গিরি মার্কেটিং কোং।

মানহীন পণ্যগুলো হচ্ছে- ড্যানিশ লাচ্ছা সেমাই, বগুড়া স্পেশাল ঘি, অরিজিনাল বাঘাবাড়ি ঘি, আফতাব মিল্ক, ঢাকা প্রাইম পাস্তুরিত দুধ, ফার্ম ফ্রেশ মিল্ক (পাস্তুরিত দুধ), ফার্টিফাইড সয়াবিন তেল- কোড-ডি (ড্রাম), ফার্টিফাইড সয়াবিন তেল-কোড-জি (ড্রাম), ফার্টিফাইড পাম অলিন- কোড-এইচ (ড্রাম), ফার্টিফাইড সয়াবিন তেল- কোড-আই (ড্রাম), ফার্টিফাইড পাম অলিন-কোড-জে (ড্রাম), ফার্টিফাইড সয়াবিন তেল-কোড-কে (ড্রাম), ফার্টিফাইড পাম অলিন-কোড-এল (ড্রাম), ফার্টিফাইড সয়াবিন তেল- কোড-এম (ড্রাম), ফার্টিফাইড সয়াবিন তেল- কোড-পি (ড্রাম)।

সংবাদ সম্মেলনে শিল্পমন্ত্রী বলেন, রমজান মাসে নির্ভেজাল খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইফতার ও সেহরিতে অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত ২৪ ধরনের খাদ্য পণ্যের মোট ২৮৬টি নমুনা আগাম সংগ্রহ করে বিএসটিআইয়ের ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৭৫টি নমুনার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৩৯টি নমুনা কৃতকার্য এবং ৩৬টি অকৃতকার্য হয়েছে। বাকি ১১১টি নমুনা পরীক্ষাধীন রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নমুনা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এ সময় তিনি রমজান উপলক্ষ্যে বিএসটিআই-এর কার্যক্রম তুলে ধরেন। শিল্প মন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাসে ভোক্তা পর্যায়ে ভেজালমুক্ত খাদ্য-পানীয় এবং পণ্যসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি বিএসটিআই বিশেষ ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে থাকে। এবারও সে লক্ষ্যে বিএসটিআই কার্যক্রম শুরু করেছে।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনা : রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষায় যাতে অসাধু ব্যবসায়ী-বিক্রেতাগণ ভেজাল/নিম্নমানের খাদ্যপণ্য ও পানীয় প্রস্তুত এবং বিপণন হতে বিরত থাকেন, সে লক্ষ্যে বিএসটিআই ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঢাকা মহানগরিতে প্রতিদিন অতিরিক্ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এটি শুরু হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে বিএসটিআই’র আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমে এ ধরনের ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, যা রমজান মাসব্যাপী অব্যাহত থাকবে। আকস্মিকভাবে পরিচালিত অভিযানগুলোতে রোজাদারগণ সচরাচর যে সব খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে থাকেন, যেমন : মুড়ি, কলা, খেজুর, আম, সফ্ট ড্রিংক পাউডার, কার্বোনেটেড বেভারেজ, ফ্রুট সিরাপ, ফ্রুট জুস/ ফ্রুট ড্রিংকস, ভোজ্যতেল, সরিষার তেল, ঘি, পাস্তুরিত দুধ, নুডুলস, ইনস্ট্যান্ট নুডুলস, লাচ্ছা সেমাই, সেমাই, পানি, ডেক্সট্রোজ মনোহাইড্রেট ইত্যাদির ওপর বিশেষভাবে নজর রাখা হবে।

ঢাকা মহানগরীর বাইরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা : ঢাকা মহানগরীর বাইরেও পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলায় মোবাইল কোর্ট কার্যক্রমের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সিডিউল অনুযায়ী এসব এলাকায় রমজান মাস জুড়ে মোবাইল কোর্ট চলবে। ভেজাল প্রতিরোধে আগাম নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষণ : রমজান মাসে নির্ভেজাল খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ইফতার ও সেহ্রিতে অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত ২৪ ধরনের খাদ্য-পণ্যের মোট ২৮৬টি নমুনা বাজার থেকে আগাম সংগ্রহ করে বিএসটিআই ল্যাবে পরীক্ষণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৭৫টি নমুনার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৩৯টি নমুনা কৃতকার্য এবং ৩৬টি অকৃতকার্য হয়েছে। বাকি ১১১টি নমুনা পরীক্ষাধীন রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নমুনা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

বিশেষ মোবাইল কোর্টে বিএসটিআই’র প্রতিনিধির অংশগ্রহণ : পবিত্র রমজানে অতীতের মতো জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, ডিএমপি ও এপিবিএন-এর যৌথ উদ্যোগে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। এসব মোবাইল কোর্টে নিয়মিতভাবে বিএসটিআই’র প্রসিকিউটিং অফিসারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে এ অভিযানের স্বচ্ছতা সম্পর্কে কোন ধরনের প্রশ্নের অবকাশ থাকবে না।

ইফতারে নিরাপদ পানি সরবরাহের উদ্যোগ : আমরা সবাই জানি, পানির অপর নাম জীবন। সম্প্রতি যত্রতত্র অপরিশোধিত পানি জারভর্তি করে বিক্রয়/বিপণন করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় এ সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের প্রেক্ষিতে বিএসটিআই’র ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অতি সম্প্রতি এ সংক্রান্ত ১৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ৭৪টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৭৪টি মামলা দায়ের এবং ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২৬টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা, ৫৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- প্রদান এবং ২৬,৫০০টি নিম্নমানের ও অবৈধ পানির জার ধ্বংস করা হয়েছে। পবিত্র রমজানে নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মৌসুমী ফলমূলে ফরমালিনের ব্যবহার প্রতিরোধের উদ্যোগ : বিগত বছরগুলোতে বিএসটিআই’র নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের ফলে দেশে ফলমূলে ফরমালিনের ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরায় মৌসুমী ফল যেমন-আম, লিচু ইত্যাদিতে ফরমালিনের প্রয়োগ প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিএসটিআই’র রুটিন ওয়ার্কের পাশাপাশি মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে সার্ভিল্যান্সের মাধ্যমে বাজার থেকে ফলমূল ক্রয়পূর্বক বিএসটিআই’র ল্যাবরেটরিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অঙ্গঅঙ্গই পদ্ধতিতে ফরমালিনের উপস্থিতি নির্ণয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। চলতি অর্থবছরে বাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের ৪৩০টি ফলমূল ক্রয় করে ফরমালিনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এর কোনটিতে ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

পণ্যের মানবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম : পবিত্র রমজান মাস ছাড়াও সারাবছরই ভোক্তা সাধারণ যাতে মানসম্মত খাদ্যপণ্য গ্রহণ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে বিএসটিআই’এর উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন অব্যাহত রয়েছে। এর অংশ হিসেবে বেশকিছু খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যেমন-ড্রিংকিং ওয়াটার, ভোজ্যতেল ও বেকারি পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় জনসচেতনতামূলক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে।

প্রসেস ফুড এবং শিল্পজাত পণ্যের মান সনদ প্রদান বিএসটিআই’র প্রধান কাজ। এছাড়াও সময়ের প্রয়োজনে ও জাতীয় স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন উপলক্ষে যেমন- মৌসুমী ফলে ফরমালিন পরীক্ষা, ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের পণ্য বিরোধী অভিযান, নকল পানির জারের বিরুদ্ধে অভিযান, ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ ছাড়া ভোজ্যতেল বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। ভেজাল/নকল খাদ্য ও পণ্য উৎপাদন এবং বিপণন প্রতিরোধে বিএসটিআই সব সময় সোচ্চার। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি সারাবছর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জেলা/উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া ওজনে কারচুপিরোধেও বিএসটিআই আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই, ২০১৭ থেকে ১৩ মে, ২০১৮ পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ গত প্রায় ১১ মাসে ভেজালবিরোধী অভিযানে মোবাইল কোর্ট/সার্ভিল্যান্স টিমের মাধ্যমে নিম্নমানের/ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী/বিক্রেতার বিরুদ্ধে বিএসটিআই যেসব আইনানুগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সংবাদ সব সময় মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার ও প্রকাশ হয়ে আসছে। পবিত্র রমজানে পরিচালিত বিশেষ অভিযানের খবরাখবরও গণমাধ্যমে ব্যাপকহারে প্রচার করলে, নিম্নমানের পণ্য উৎপাদনকারী ও খাদ্যে ভেজালকারীরা শাস্তির বিষয়গুলো জেনে এ ধরনের অবৈধ, অনৈতিক ও হীন কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকবে। এতে করে সম্মানিত রোজাদারগণ তথা ভোক্তাসাধারণ বিশেষভাবে উপকৃত হবেন বলে আমি মনে করি। অতীতের মতো এবারও আপনারা পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআই গৃহীত বিশেষ কার্যক্রম সফল করতে ‘জাতির বিবেক’ হিসেবে সরকারের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবেন-এটাই আমার প্রত্যাশা। সংবাদ সম্মেলনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের রুটিন দায়িত্বপালনরত (অতিরিক্ত সচিব) মো. দাবিরুল ইসলাম, বিএসটিআই’এর মহাপরিচালক সরদার আবুল কালামসহ শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিএসটিআই’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।