menu

সাড়ে চার মাসে ৪২০ কোটি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

    সংবাদ :
  • অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , রবিবার, ২২ নভেম্বর ২০২০
image

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের সাড়ে চার মাসে অর্থাৎ ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত ৪২০ কোটি ডলার (৪.৩০ বিলিয়ন) ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে কখনই এতো কম সময়ে এতো বেশি ডলার কেনেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। আর চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে কিনেছে ৫১০ কোটি ডলার। গত বৃহস্পতিবারও ২০ মিলিয়ন ডলার কিনেছে ব্যাংকটি। করোনা মহামারীর মধ্যে টাকার মান ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে এসব ডলার কিনেছে।

আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের ক্রয় মূল্য ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। প্রায় এক বছর ধরে টাকা-ডলারের বিনিময় হার প্রায় এই একই জায়গায় স্থির রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৫ নভেম্বর টাকা-ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৭৫। চলতি বছরের ৩০ জুন শেষে তা কিছুটা বেড়ে ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। কয়েক দিনের মাথায় তা ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে এসে এখনও সেই দরে লেনদেন হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালের আগে তিন বছর বাজারে চাহিদার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে নিয়মিত। ওই সময়ে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন প্রায় সব ব্যাংকই ডলার কিনতে ধরনা দিচ্ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে।

তবে চলতি বছরের শুরু থেকে পরিস্থিতি উল্টো হয়ে যায়। জানুয়ারি থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৫১০ কোটি ডলার কিনে বাজারে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সরবরাহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সাড়ে আট মাসে মাত্র ৪২ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রথম দুই প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ এবং এপ্রিল-জুন) বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে ৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার কেনা হয়। এরপর থেকে কোন ব্যাংক ডলার কেনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসেনি।

বিপরীতে গত বছর বিভিন্ন ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কিনেছিল ১৬২ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর আগের বছর ২৩৭ কোটি ১০ লাখ এবং ২০১৭ সালে ১২৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনে। এ তিন বছরের মধ্যে শুধু ২০১৭ সালের শুরুর দিকে কয়েকটি ব্যাংক সাড়ে চার কোটি ডলার কিনেছিল। মার্চে করোনাভাইরাস মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার শুরুর দিকে ধস নামলেও পরে রপ্তানি আয় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কমে যাওয়ার আশঙ্কার বদলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে। তারসঙ্গে বেড়েছে বিদেশি ঋণ সহায়তাও। অন্যদিকে আগের সময়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় কমছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪২ শতাংশ বেশি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ১২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে অর্থবছরের তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আমদানি ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায় এই তিন মাসে পণ্য আমদানিতে ১২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে বাংলাদেশ।

যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম। এই তিন মাসে ১৩৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিদেশি ঋণ সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। এ সময়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে এই ঋণ সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ। আবার বেসরকারি খাতে নেয়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর কারণে অনেকে এখন ঋণ পরিশোধ করছেন না। সবমিলিয়ে অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে এখন ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে। ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার উদ্বৃত্ত থাকলে তা কিনে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেননা প্রতিটি ব্যাংকের ডলার ধারণের একটি সীমা রয়েছে। কোন ব্যাংকের আমদানির দায় পরিশোধের তুলনায় রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বেশি হলে ওই ব্যাংকে ডলার উদ্বৃত্ত হয়। এক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত থাকা ব্যাংক প্রথমে সংকটে থাকা ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রির চেষ্টা করে। কোন ব্যাংকের আগ্রহ না থাকলে অর্থাৎ মুদ্রাবাজারে বিক্রি করতে না পারলে তখন বাংলাদেশ ব্যাংক তা কিনে নেয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে। ডলার বিক্রি করলে রিজার্ভ কমে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে রেমিট্যান্স। এরসঙ্গে যোগ হয় ডলার কেনা। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বেশিরভাগ সময় রিজার্ভ ৩১ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছিল। মহামারীর প্রভাব শুরুর পর গত মার্চ শেষে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। কয়েক মাসের ব্যবধানে গত ২৯ অক্টোবর তা বেড়ে ৪১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে।

গত ৬ নভেম্বর এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং ডলার কেনার কারণে গত কয়েক দিনের মধ্যে রিজার্ভ ফের ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।