menu

দেউলিয়া আইন করার ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর

    সংবাদ :
  • অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , শুক্রবার, ১৫ মার্চ ২০১৯
image

ব্যাংকের ঋণ খেলাপি ও ঋণ অপলোপন নিয়ন্ত্রণে দেউলিয়া আইন (ইনসলভেন্সি অ্যাক্ট) করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, প্রায় সব দেশেই ইনসলভেন্সি আইন রয়েছে। আমাদেরও এই আইন করতে হবে। এই আইন বাস্তবায়ন করতে পারলে ব্যাংক খাতে অনেক পরিবর্তন আসবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। বার্ষিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ ১৬ জন ব্যক্তিকে গুণী গ্রাহক সম্মাননা দেয়া হয়।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামস্-উল-ইসলামের সভাপতিত্বে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। এছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পরিচালক কাশেম হুমায়ুনসহ ব্যাংকটির অন্য পরিচালক ও কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠানে করফাঁকি কমাতে আগামী বাজেটে ভ্যাট কমানো হবে বলে জানিয়েছে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে যারা ট্যাক্স ও ভ্যাট দেন তারা অনেক বেশি দেন, যারা দেন না তারা একেবারেই দেন না। কর ফাঁকির অপবাদ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে চাই। আগামী বাজেটে ভ্যাট কমানো হবে। যারা বেশি দিয়েছেন তারা কম দেবেন। যারা দেন নাই, তাদের কাছ থেকে আদায় করা হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, একসময় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল আস্থার জায়গা। কিন্তু এখন মানুষ ব্যাংকে আসতে ভয় পায়। এই ইমেজ পুনরুদ্ধার করা হবে। আমি এসেছি ব্যাংকের গ্লামার এবং গ্লিটার ফিরিয়ে আনতে। আমরা সেটা পারবই এই আত্মবিশ্বাস আমাদের আছে। দুর্নীতিমুক্ত রাখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগে সংস্কার করা হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এখন যেভাবে চলছে এভাবে চললে কোন দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্বল্প মেয়াদি আমানত গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়া যেতে পারে না। এর মাধ্যমে যারা উন্নয়নের চিন্তা করে তারা বোকার রাজ্যে রয়েছে। সেজন্য ব্যাংক খাতে বন্ড ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। এজন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, এই মুহূর্তে ব্যাংক খাতে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তা হলো স্বল্প সুদে আমান সংগ্রহ করা, স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করা ও উন্নয়ন কর্মকা- এগিয়ে নিতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকুলান করা। অগ্রণী ব্যাংক অনেক আগে থেকেই সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণ করছে। আগামীতে সুদ আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। তবে নতুনভাবে দেয়া ঋণ যাতে খেলাপি না হয় সে বিষয়েও আমাদের নজর রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে দীর্ঘ মেয়াদে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি করতে হলে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য ব্যাংকের ভূমিকই প্রধান।

অনুষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক অগ্রণী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা আমানত, ঋণ, পরিচালন মুনাফা, নিট মুনাফা, আমদানি, রপ্তানি ও রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। অগ্রণী ব্যাংকের কোন মূলধন ঘাটতি নেই। বরং ২০১৮ সাল শেষে ব্যাংকটির ৯৬ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত রয়েছে। ২০১৮ সাল শেষে অগ্রণী ব্যাংকের আমানত দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এ সময় ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। শ্রেণীকৃত ঋণ (খেলাপি ঋণ) দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ২১ শতাংশ। আলোচিত সময়ে এর শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৫২টিতে।

এছাড়া ২০১৮ সালে অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১২৭ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। একই সময়ে লোকসানি শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১টি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রকৌশলগত উন্নয়নের পাশাপাশি সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে সব ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। গভর্নর বলেন, প্রকৌশলগত দিক থেকে সারা বিশ্ব খুব দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে সেই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে হবে। তা না হলে অন্যরা এগিয়ে যাবে এবং অলসরা আগের জায়গাতেই পড়ে থাকবে। সেজন্য ব্যাংকের সকল কর্মকর্তার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

২০১৮ সালে অগ্রণী ব্যাংকের সার্বিক উন্নয়েনে প্রশংসা করে গভর্নর বলেন, অনেক খাতে উন্নয়ন হলেও অগ্রণী ব্যাংক ৮৮৩ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে ব্যাংকটির যে খেলাপি তা আরও কম হতে পারত। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের ভিতরে যেসব সমস্যা আছে তার সমাধান আপনারাই করতে পারেন। কারণ এটা নিয়ে আপনারা সবসময় কাজ করেন। এজন্য আপনারা নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় করুন। তাহলে আমার মনে হয় সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। এছাড়া আর্থিক বিভাগের পক্ষ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা করা দরকার তা করতে আমরা প্রস্তুত।

অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক কাশেষ হুমায়ুন বলেন, আমাদের অর্থনীতি এনেক এগিয়েছে। মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, গড় আয়ুও বেড়েছে। তবে গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংক খাতে দুরবস্থা যাচ্ছে। এই দুরবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ব্যাংকারদের সততার সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনা করতে হবে। তিনি ব্যাংকের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের কাছে কোন ঋণ প্রস্তাব আসার আগে আপনারাই তার যাচাই-বাছাই করেন। আপনাদের মাধ্যমে চার থেকে পাঁচটি ধাপ পেরিয়ে আমাদের কাছে আসে। তাই আপনাদের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদেও পক্ষে বোর্ড মিটিংয়ে বসে ১০ মিনিটে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া কষ্টকর। সুতরাং আপনারা চাইলে খেলাপি ঋণ অনেক কমে আসবে। আমাদের ইচ্ছাকৃত ডিফলটারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনুষ্ঠানে অগ্রণী ব্যাংকের পক্ষ থেকে ভালো গ্রাহক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৬ গুণী গ্রাহককে এ সম্মাননা দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছেন প্রাণ গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী, বসুন্ধরা গ্রুপের আহমেদ আকবর সোবহান, এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান মনজুর এলাহী, সিটি গ্রুপের ফজলুর রহমান, নিটল-নিলয় গ্রুপের মাতলুব আহমাদ, নর্থইস্ট পাওয়ারের খুরশিদ আলম, নোমান গ্রুপের নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের আইয়ুব হোসেন, বিএসআরএমর আলী হোসেন, পিএইচপি গ্রুপের সুফি মিজানুর রহমান, ইস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, এসএমই উদ্যোক্তা নুরুন্নাহার বেগম, প্রাইম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল ও সাধারণ গ্রাহক হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল ও মোহাম্মদ শাহজাহান।