menu

ঢাকা চেম্বারের ওয়ার্কশপ

কর্মরত জনগোষ্ঠীকে পুনঃদক্ষ করে তোলার আহ্বান

    সংবাদ :
  • অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক
  • ঢাকা , রবিবার, ২২ নভেম্বর ২০২০
image

কর্মরত মোট জনগোষ্ঠীকে ২০২৫ সালের মধ্যে পুনঃদক্ষ করে গড়ে তোলার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) নেতারা। গতকাল ডিসিসিআই আয়োজিত ‘নতুন কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা প্রেক্ষিত ভবিষ্যৎ ব্যবসা-বাণিজ্য’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এই আহ্বান জানান তারা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে ওয়েবিনারে যোগদান করেন। এছাড়া জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) দুলাল কৃষ্ণ সাহা, বাংলাদেশে ইউএনডিপি-এর আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জী, ইউনিডো’র আবাসিক প্রতিনিধি জাকি উজ জামান এবং বাংলাদেশস্থ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আবাসিক প্রতিনিধি তুমো পুটিয়ানেন ওই ওয়েবিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এনকেএ মবিন ওই ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন।

স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই’র সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, জনসংখ্যার আধিক্যতা থাকলেও বাংলাদেশের শিল্প খাতে দক্ষ লোকবলের প্রচুর অভাব রয়েছে এবং আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২.৩ শতাংশ বেকার। বিশ^ব্যাংকের হিসাব মতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশের বিশ^বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করার পর প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকারত্ব সমস্যায় ভুগছে। বৈশি^ক প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ফলে দক্ষতা ও বৈশি^ক শ্রমবাজারের গতি-প্রকৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ অবস্থার আলোকে প্রথাগত দক্ষতার পাশাপাশি নতুন পরিস্থিতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং এর যথাযথ বাস্তাবায়ন করতে হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে আমাদের কর্মরত মোট জনগোষ্ঠীর ৫০ শতাংশকে পুনঃদক্ষ করে তুলতে হবে। শিল্প খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের শিক্ষা কারিক্যুলাম যুগোপযোগীকরণের প্রস্তাব করেন এবং এ লক্ষ্যে শিল্প ও শিক্ষা খাতের সমন্বয় আরও বাড়ানোর দরকার।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকবিলায় প্রথম থেকেই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সরকার স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার ফলে আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থিতিশীলতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নীতি সহায়তা প্রদান নিয়ে নতুন আঙ্গিকে ভাবতে হবে। বৈশি^ক প্রযুক্তি বিপ্লবকে মেনে নিয়ে এটির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা না গেলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কর্মরত জনগোষ্ঠীর পুনঃদক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানো দরকার। তিনি প্রশিক্ষণ প্রদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠাসমূহের আধুনিকায়নেরও প্রস্তাব করেন। এছাড়া তিনি তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সারদের সহযোগিতার জন্য ব্যাংকিং কার্যক্রমের আরও সহজীকরণের আহ্বান জানান। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) দুলাল কৃষ্ণ সাহা দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী, বিশেষকরে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে বেসরকারি খাত এবং এনজিওসমূহকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। বাংলাদেশে ইউএনডিপি-এর আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জী বলেন, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা থাকলেও দক্ষ জনবল তৈরিতে যুগোপযোগী শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে যা অত্যন্ত ভাবনার বিষয় এবং এ অবস্থা উত্তরণে সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারকে একযোগ কাজ করতে হবে। তিনি বাংলাদেশে শিক্ষাকার্যক্রমের ডিজিটাল ব্যবস্থা আরও বেশি হারে ব্যবহারের ওপর জোরারোপ করেন।

ইউনিডো-এর আবাসিক প্রতিনিধি জাকি উজ জামান বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ করা সম্ভব হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক ব্লক-চেইন খাতে বাংলাদেশি তরুণদের নিজস্ব জায়গা করে নিতে আরও উদ্ভাবনী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আবাসিক প্রতিনিধি তুমো পুটিয়ানেন বলেন, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, শ্রমবাজারের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনের নিরিখে শ্রমখাতের আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। তিনি সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় বাড়ানোর এবং বিশেষকরে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার যুগোপযোগীকরণের ওপর জোরারোপ করেন। আইএলও-এর আবাসিক প্রতিনিধি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে দেশের বেসরকারি খাতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান।

আয়োজিত ওয়েবিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ-এর চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিবছর ২.২ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হয় যা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে আঙ্কটাড-এর হিসাব মতে, ২০২০ বৈশি^ক বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রায় ৪০ কমে যাবে এবং বৈশি^ক এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রায় ৫০% অস্তিত্ব রক্ষা হুমকির মুখে পড়বে যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৩.১ মিলিয়ন লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে তবে এজন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও তার সঠিক বাস্তবায়ন একান্ত আবশ্যক। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে তথ্য-প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিয়ত উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সার্বিক অবস্থায় বিবেচনায় তিনি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ও দক্ষতা উন্নয়নে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্প ও শিক্ষা খাতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, তথ্য-প্রযুক্তি খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় নীতিমালার সংস্কার, দেশের কারিগরী শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি প্রণোদনা প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব করেন। ওয়েবিনারের নির্ধারিত আলোচনায় গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান, অ্যাঙ্করলেস বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা সহযোগী ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাহাত আহামদ এবং জেনারেশন আনলিমিটেড, ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার ম্যারিয়্যান ওহলার্স অংশগ্রহণ করেন। অ্যাঙ্করলেস বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা সহযোগী ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাহাত আহামদ বলেন, বাংলাদেশের স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, যাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতি সহযোগিতার মাধ্যমে আন্তঃকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।

গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মরত জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বাড়ানো এবং পিপিপি-এর আওতায় দক্ষতা উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ আবশ্যক বলে মত প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের শিক্ষা কারিকুলামের আধুনিকায়ন এবং যুগোপযোগীকরণে ওপর জোরারোপ করেন। জেনারেশন আনলিমিটেড, ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার ম্যারিয়্যান ওহলার্স জানান, শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণ প্রদান কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো খুবই জরুরি এবং বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে এখনই কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন ও তার দ্রুত বাস্তবয়নের ওপর গুরুত্ব প্রদানের আহ্বান জানান। তিনি দক্ষতা উন্নয়নে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে শিল্পখাতের সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন।