menu

‘হেঁটে যাই জনমভর’: সেলিনা হোসেনের মানবিক তথ্যচিত্র

মোজাফ্ফর হোসেন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

সমসাময়িকতা এই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান একটি বিষয়। তিনটি পর্বেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি এসেছে। প্রতিটা পর্বে খুন হচ্ছে এক বা একাধিক চরিত্র। প্রথম পর্বে বেলফুলকে ধর্ষণ করে খুন করে মহল্লার গুন্ডারা। যৌননির্যাতনের শিকার কেবল মেয়েশিশু না, ছেলেশিশুও হয়

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ‘হেঁটে যাই জনমভর’ উপন্যাসটি ২০১৬ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তিনটি গল্প নিয়ে এগিয়ে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে গল্পগুলো আলাদা মনে হলেও বোধ ও অনুভবের জায়গা থেকে গল্পগুলো একটি গল্পের তিনটি স্তর যেন। লেখক হয়ত প্রথম গল্পটি বলেই থেমে যেতে পারতেন, কারণ আলাদা করে বিবেচনা করলে সেটি সম্পূর্ণ একটি গল্পই বটে। তা তিনি করেননি। তার কারণ হতে পারে তিনি একই চরিত্রকে কতগুলো ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিক্ষেপ করে সময়ের সম্ভাবনাগুলো পরখ করতে চেয়েছেন। ব্যক্তির নানামুখী সম্ভাবনা খুঁজে বের করাই হলো সাহিত্যের কাজ। এজন্যেই অস্কার ওয়াইল্ড বলছেন- ‘literature always anticipates life. It does not copy it, but molds it to its purpose ’. এই উপন্যাসে সাহিত্যের সেই কাজটি যথার্থভাবে করেছেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এই কথাসাহিত্যিক।

উপন্যাসের প্রথম কাহিনির বর্ণনাকারী আরিফুর রহমান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। পাঁচ বছর যাবৎ তার স্ত্রী ডালিয়া নিশ্চল জীবনে চলে গেছে। জীবিত এবং মৃতের মাঝামাঝি অবস্থান করছে সে। তাদের একছেলে এবং একমেয়ে, উন্নত জীবনের সন্ধানে প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছে। আরিফুর রহমান তার একাকিত্ব খানিকটা দূর করেন তার বাসার কাজের লোকদের সঙ্গে কাজের অকাজের কথাবার্তা বলে। মাঝে মধ্যে ছোটবোন এসে কিছুটা সময় কাটিয়ে যায়।

দ্বিতীয় গল্পের নায়ক ওসমান আলী। সে শৈশব হারিয়ে বড় হয়ে ওঠা এক যুবক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। দিনমজুর বাবা এবং ইটভাটার শ্রমিক মা গত হয়েছে। এখানে তার কাছের বন্ধু আছে বদরুল এবং কবরস্থানে পরিচিত একছেলে থাকে; নাম জলফু।

তৃতীয় গল্পের নায়ক মশিরুল। বাবা-মাকে হারিয়ে মশিরুলের একা বাস। কাজের ছেলে মঈন তার দেখাশুনা করে। ওপরের ফ্লাটের বিবাহিত নারী নিশাতের সঙ্গে তার পরকীয়া প্রেম।

এই হলো উপন্যাসের প্রধান তিন চরিত্রের পারিবারিক বা সাংসারিক পরিচয়। উপন্যাসের প্রধান প্রধান বিষয়গুলো আলোচনার ভেতর দিয়ে উপন্যাসটির গল্পটি জেনে নেবো। এই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান প্রসঙ্গ হল মুক্তিযুদ্ধ। উপন্যাসের তিন চরিত্র মুক্তিযুদ্ধে কিংবা যুদ্ধপরবর্তী সময়ে নিখোঁজ হওয়া তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান করছে। এটা তাদের প্রতীকী অন্বেষণ; তারা আসলে এই তিনজনের ভেতর দিয়ে একটি মানবিক বাংলাদেশের সন্ধান করছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিটা তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জায়গা থেকে তুলে আনতে চায়।

আরিফুর রহমান সন্ধান করেন বন্ধু ও একাত্তরের সহযোদ্ধা সঙ্গীতশিল্পী আলতাফ মাহমুদের। কথকের বয়ানে, ‘জুয়েলের কাছে যুদ্ধের কথা শুনে আলতাফ মাহমুদ আমার মাথায় জেগে ওঠে। ও এখন আর বন্ধু না। ও আমার ইতিহাস। আমার স্বাধীন দেশ। আমি ওর গানের সুরে নিজেকে ভাবতে পারি। আমার বিষণ্ণতা কাটতে থাকে।’

ওসমান আলী খুঁজে বেড়ায় স্টপ জেনোসাইড’র স্রষ্টা জহির রায়হানকে। তৃতীয় চরিত্র মশিরুল খুঁজছে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ছিলেন। একদিন পাক-সৈন্যরা তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আর তার সন্ধান পাওয়া যায় নি। এভাবেই উপন্যাসের প্রধান তিন চরিত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর নিজেদের অস্তিত্বের হেতু ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে। তারা তিনজনেই ঘোষণা করে, দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেদিন সম্পন্ন হবে সেদিন তাদের অনুসন্ধান শেষ হবে।

মুক্তিযুদ্ধকে আমরা যদি এই তিন চরিত্রের ঐতিহাসিক অস্তিত্বের অন্বেষণ হিসেবে ধরি, তবে তাদের ব্যক্তিক অনুসন্ধানও- কোথাও কোথাও বায়োলজিক্যাল, কোথাও কোথাও আত্মিক অস্তিত্বের- এই উপন্যাসের আলাদা একটা থিম হয়ে ওঠে। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আরিফুর রহমান প্রায়ই অস্তিত্বের সংকটে ভোগেন। মাঝেমধ্যে তার মনে হয় যেন অন্য কেউ তার সবটুকু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’ এই অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয় তার না পাওয়া থেকে। স্ত্রী নিথর জীবনযাপন করছে। সে একঅর্থে থেকেও নেই। স্ত্রীকে ভীষণ ভালবাসত সে। এখনো বাসে। একসময় সাম্যবাদী সমাজপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতো। সে স্বপ্ন তার পূরণ হয়নি। কিন্তু স্বপ্নটা তার পেছনে এখনো ছায়ার মতো লেগে আছে। ছেলে-মেয়েরা তার ইচ্ছাপূরণে সারথি হবে ভেবেছিল, তাও হয়নি। এসব স্বপ্নভঙ্গ তাকে নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সে বাড়ির সবটুকু জুড়ে তার স্ত্রীকে খুঁজে বেড়ায়, ছেলে-মেয়েদের ঘরে ঢুকে তাদের উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করে, ঘরে-বাইরে খুঁজে ফেরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদকে, মেঘজুড়ে খুঁজতে থাকে নিজের কৈশোরকে, বেলফুলকে জুড়ে খুঁজতে থাকে হারানো ঐতিহ্য। এভাবেই সে নিজের অস্তিত্ব অন্বেষণ করে।

দ্বিতীয় গল্পের প্রধান চরিত্র ওসমান আলী তার শৈশবকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার শৈশব ছিল তিতপুঁটির আঁশের ওপর লালরঙে আঁকা। নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শৈশবের সেই স্মৃতিটুকু হারিয়ে গেছে। ওসমানের মায়ের পান্তার হাঁড়িতে ব্যাঙ ডাকত, ওসমান এখন সেই ব্যাঙের অস্তিত্ব অন্বেষণ করে। ওসমান তার বন্ধুকে বলে, ‘আমি ঠিক করেছি, দেশের পাহাড়ি এলাকায় যাব। পাহাড়-ঝরা দেখব। গাছ-পাখি-ফুল দেখব। খুঁজে দেখব ওখানে আমার শৈশব আছে কিনা। শৈশব ফিরে পাবার স্বপ্ন আমাকে ভীষণ কাঁদায়।’ ওসমান দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করে, ‘খোঁজা আমার ফিলসফি’।

তৃতীয় গল্পের মশিরুল তার কৈশোরের স্মৃতি খোঁজে ডাইরির পাতায়। স্মৃতির ভেতর দিয়ে সে তার অস্তিত্বের তলানিতে পৌঁছে জীবনের স্বাদ উপভোগ করতে চায়। নদীতে ভেসে গেছে তার বাবার লাশ। সে এখন নদীর কাছে গিয়ে বাবাকে খোঁজে।

উপন্যাসের তৃতীয় প্রধান থিম হলো মানবিকতা। মানবিকতা শব্দটি আমি এখানে একটু প্রসারিত অর্থে ব্যবহার করছি।

প্রথম গল্পের মূলচরিত্র আরিফুর রহমান ভীষণ মানবিক এক চরিত্র। তার প্রমাণ আমরা পাই আক্ষরিকভাবেই নিষ্ক্রীয় স্ত্রীর প্রতি তার ভালবাসা ও মমত্ববোধ থেকে। তিনি নিয়ম করে স্ত্রীকে খাবার খাওয়ান, কাপড় বদলে দেয়া এসব নিত্যদিনের কাজগুলো করেন। স্ত্রীর এভাবে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে আটকে থাকাতে তাকে বিন্দুমাত্র বিরক্ত মনে হয় না। অথচ তার মতো অবস্থায় পড়লে অনেক পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করত বা দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবত। আরিফুর রহমান রাস্তা থেকে ফুল বিক্রেতা কিশোরী বেলফুলকে ঘর পরিষ্কার করার কাজ দেন। বলেছেন যখন খুশি আসতে, যেভাবে ইচ্ছে কাজ করতে। বেলফুলের মাঝে তিনি তার মেয়ের শৈশবকে দেখতে পান। এভাবে তিনি শ্রেণিবৈষম্যের কথা ভুলে যান। ভাবেন বেলফুলকে গান শেখাবেন। তাকে তার গানের নতুন কলি হিসেবে আবিষ্কার করবেন। জুয়েল রাস্তার ধারে জুতা সেলাই করে। আরিফুর রহমান তাকে বাজার করার কাজ দিয়েছেন। জুয়েলের দায়িত্ববোধের নমুনা পেয়ে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে তোকে আমি স্যার বলে ডাকব।’ নিঃসন্তান ছোটবোনকে বলেন জুয়েলকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করতে। পাশের বাড়ির কাজ করতে আসা নেইলা বুয়া রান্না করে দেয়। নেইলা বুয়ার প্রয়োজন হলেই টাকা ধার দেন তিনি। আরিফুর রহমান যে জুয়েলকে বলেন, ‘মানুষকে দেখতে হয় বুকের চোখ দিয়ে’, এই উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্রের ক্ষেত্রে সেই দেখাটা সত্য হয়ে ওঠে। মানবিকতা বোধ কেবল আরিফুর রহমানের ভেতর না, গল্পের অনন্যা চরিত্রদের ভেতরও দারুণভাবে ফুটে ওঠে। উপন্যাসের কাজের মানুষ বেলফুল, জুয়েল, নেইলা বুয়া কেউ কাজে ফাঁকি দেয় না। জুয়েলকে রাস্তার ধারে কুড়িয়ে পায় সুরেন দাস। সুরেন দাস তার ধর্মকে জুয়েলের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। সে জুয়েলকে বলেছে, ‘কুড়িয়ে পাওয়া ছেলের ধর্ম আমি জানব কী করে, সে জন্যে তুই জুয়েল। আমার মানিক। তোর মায়ের বুকের ধন।’ জুয়েলও দায়িত্ববোধ থেকে বেশি লেখাপড়া না শিখে বাবার জুতা সেলাইয়ের কারবারে হাত লাগিয়েছে। বাবার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবে না। জুয়েল বলে, ‘বুড়ো হলে যখন মরব, তখন সবাইকে বলে যাব, আমাকে যেন চিতায় পোড়ানো হয়। বাবার ধর্মই আমার ধর্মই।’ এর চেয়ে অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক গল্প আর কী হতে পারে! জুয়ের-বেলফুলের সম্পর্কটাও অতি মানবিক সম্পর্ক। জুয়েল বেলফুলকে বোনের মতো ভালোবাসে। বেলফুলও জুয়েলকে সেইভাবে মানে। বেলফুল যখন ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে জুয়েল তখন ভীষণভাবে আহত হয়, বেদনায় কঁকিয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় অংশে ওসমান আলীও মানবিক চরিত্র। সে কবরের পাহারাদারদের সম্পর্কে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও রাস্তার ছেলে জলফুর সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তৃতীয় অংশে মশিরুলও আরিফুর রহমানের মতো কাজের ছেলে মঈনের সঙ্গে তথাকথিত মালিক-চাকর সম্পর্ক ভেদ করে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে দেখা যায়। যে কারণে মঈন মশিরুলকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘আপনি আমার বাবার মতো, মায়ের মতো, ভাইয়ের মতো, বোনের মতো- আমার চৌদ্দগুষ্টির মতো।’

সমসাময়িকতা এই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান একটি বিষয়। তিনটি পর্বেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের বিষয়টি এসেছে। প্রতিটা পর্বে খুন হচ্ছে এক বা একাধিক চরিত্র। প্রথম পর্বে বেলফুলকে ধর্ষণ করে খুন করে মহল্লার গুন্ডারা। যৌননির্যাতনের শিকার কেবল মেয়েশিশু না, ছেলেশিশুও হয়। দ্বিতীয় পর্বে জলফুকে যৌননির্যাতন করে খুন করে এক হোটেলের মালিক। সম্প্রতি শিশুহত্যা বা শিশুনির্যাতনের যে বীভৎস চিত্র আমরা খবরের কাগজে দেখি, তারই একটি রূপ আমরা এখানে দেখতে পাই। পাহাড়ি অঞ্চলে ক্ষুদ্রনৃগোষ্টীদের যে যন্ত্রণা, মূলস্রোতে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা, চারিদিকে আর্মি ক্যাম্প নিয়ে বেঁচে থাকা, এ সবই সমসাময়িক বাস্তবতা। দ্বিতীয় পর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল ঘটনায় কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি এসে বিদ্ধ করল ওসমানকে। ওসমান যখন হাসপাতালে, তখন একদল ছাত্র এসে স্লোগান দিতে শুরু করল, ‘ওসমান হত্যার বিচার চাই। হত্যাকারীর ফাঁসি চাই।’ অথচ ওসমান তখনো বেঁচে। এভাবেই একটি ঘটনায় রাজনৈতিক ফল আদায়ের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে কোনো না কোনো পক্ষ। তৃতীয় গল্পে খুন হয় মশিরুলের কাজের ছেলে মঈন। সে ছিনতাইকারীদের হাত থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে আনতে গিয়েছিল। মানুষজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তার বীরত্ব এবং তার খুন হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। কেউ এগিয়ে এল না তাকে বাঁচাতে। মানুষের এমন বিচ্ছিন্নতা একেবারে সমকালীন একটি বিষয়। এ পর্বে লঞ্চ ডুবে যাওয়ার খবর শোনা যাচ্ছে। এমন অনেক সমসাময়িক বিষয় উপন্যাসটিতে এসেছে।

পূর্বেই বলেছি এটি একটি মানবতাবাদী উপন্যাস। এবং মানবতাবাদের অংশ হিসেবেই এখানে নারীবাদের কিছু বিষয়আশয় চলে এসেছে। উপন্যাসের নারীনির্মিত ও লেখকের নারীভাবনা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। প্রথমপর্বের নায়ক আরিফুর রহমান ভীষণভাবে জেন্ডার সচেতন মানুষ। অধিকারের জায়গায় তিনি নারী-পুরুষকে আলাদা করে দেখতে চান না। কাজের মেয়ে বেলফুল ছেলে না মেয়ে তা কখনই তিনি চিন্তায় রাখেন না। বেলফুলের মাঝে যেমন নিজের মেয়ের অতীত খোঁজেন, তেমন খোঁজেন নিজের শৈশবও। অসুস্থ স্ত্রীর প্রতি আরিফুরের যে অসম্ভব প্রেম, তাও নারীবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশংসনীয়। আরিফুর রহমানের প্রিয় কবি স্যাফো- পৃথিবীর প্রথম লেসবিয়ান কবি। স্যাফো পড়ার অভিজ্ঞতা গল্পকথক তুলে ধরছেন এভাবে- ‘তাঁর (স্যাফোর) কবিতা পড়লে আমার মাথা ঝিমঝিম করত। মনে হতো, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক বিপুল দ্রোহ। শিল্পের সাধনায় একজন একক নারী পুরুষতন্ত্রকে চিহ্নিত করেছিলেন কত হাজার বছর আগে। সরাসরি বলেননি, বলেছেন নারীর অধিকারের জায়গা চিহ্নিত করে।’ আবার স্ত্রী যখন আরিফকে মনে করিয়ে দেয় যে তার বিষয় অর্থনীতি, সে কেন জেন্ডার বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে, তখন তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অর্থনীতির বাইরে নয়। একে অর্থনীতির সঙ্গে না জড়ালে সমাজকাঠামো এগোবে না। জেন্ডার আলোচনা বাদ দিয়ে অর্থনীতিকে দেখা একটি ভুল শিক্ষা।’ ন্যারেটর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এক কবির মায়ের নির্যাতনের কথা তুলে ধরে বলেন ঐ মায়ের নির্দেশ ছিল তার মেয়েদের প্রতি ‘নো সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স ইন আর্মড কনফ্লিক্ট’ এই আন্দোলনটা চালিয়ে যাওয়া। এখানে উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘ যুদ্ধাক্রান্ত দেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ‘রেজুলেশন ১৩২৫’ প্রকাশ করেছে কয়েকবছর আগে। এতে যুদ্ধের শত্রু ও মিত্র উভয় পক্ষকে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে নির্দেশনা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোথাও সেটি মানা হয়েছে এমন খবর শোনা যায়নি। যারা মানছে না, জাতিসংঘ তাদের বিপক্ষে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে বলে কোনো দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে নেই।

উপন্যাসের নেইলা বুয়া আত্মসচেতন নারী। সে তার মেয়েকে বলে, ‘যেই বাসায় বেডা মানুষ একলা থাহে, হেয় বাসায় তোর কামে যাঅনের কাম নাই। বেডা মানুষরে বিশ্বাস কী? সব বেডাই ভাল্লুক।’ নারী হিসেবে আত্মসম্মানবোধ বেলফুলেরও আছে। তাকে জুয়েল এটাসেটা কিনে দেয় বলে সেও জুয়েলকে আইসক্রিম কিনে দিয়ে তার মান বাড়াতে চায়। এমনি করে সেলিনা হোসেন এই উপন্যাসের নারীচরিত্র নির্মিতির সময় জেন্ডার-বিষয়ে সচেতন থেকেছেন।

উপন্যাসে আরিফুর রহমানের ঘনঘন কবি স্যাফোর কবিতা এবং গুন্টার গ্রাসের টিন ড্রাম উপন্যাস পাঠকে আমরা তার ব্যক্তিমানসের প্রতীকী উপস্থাপন হিসেবে দেখতে পারি। ইমেজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কাচের ঘরকে। উপন্যাসের প্রায় তিনটি কাহিনিতেই কাচের ঘরের প্রসঙ্গ আসছে। প্রধান চরিত্র কাচে দেয়ালের ভেতর তাদের অব্যক্ত বাস্তবতাকে দেখতে পাচ্ছে। মাকড়সার জ্বাল দেখে বেলফুলের ভয় পাওয়ার দৃশ্যপটটিও রূপক হিসেবে দেখার সুযোগ আছে। এভাবে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন কখনো বস্তুগত কখনো বায়বীয় চিত্রকল্প ও দৃশ্যকল্প তৈরি করে উপন্যাসের আবহ নির্মাণ করেছেন। এতে যেমন এই উপন্যাসটি আরো বেশি শৈল্পিক হয়েছে তেমনি বিষয়ভিত্তিক অতিরিক্ত তথ্য এখানে সংযুক্ত হয়েছে।

ভাষার ক্ষেত্রে সেলিনা হোসেন যতটা সম্ভব সরল থাকার চেষ্টা করেছেন। তিনটি গল্পে গল্পের মেজাজ অনুযায়ী ভাষার কিছুটা বদল হয়েছে। প্রথম গল্পের আরিফুর রহমান অসুস্থ স্ত্রীর পাশে একাকী একধরনের কাব্যময়তার ভেতর বাস করেন। তাই এখানে ভাষাটা কোথাও কোথাও কবিতার রূপ পেয়েছে। প্রথমপর্বটা শুরুই হয়েছে চমৎকারভাবে, ‘জীবনভর মনে করেছি যে আমি একটি কাচের ঘরে বাস করেছি। যেদিকে তাকিয়েছি, সেদিকেই দেখেছি নিজের চেহারা। কখনো সে চেহারা খুব অন্তরঙ্গ মনে হয়েছে। কখনো একদমই অচেনা। যেন অন্যকেউ আমার সবটুকু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো মনে হয়েছে যে ঘরকে আমি কাচের ঘর মনে করেছি, সেটা আসলে কোনো ঘরই নয়। সে এক বিশাল প্রান্তর।’ উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশে ভাষাটা আরো নির্মেদ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এই অংশের প্রধান চরিত্র। সে গ্রাম থেকে উঠে আসা। তাই ভাষাটার ভেতর সেই সরলতা ও দ্রোহ আছে। তৃতীয় অংশের নায়ক এক উঠতি গবেষক। সে পূর্ববাংলার ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে চায়। তাই এই অংশের ভাষা আরো বেশি নির্মেদ ও স্বচ্ছ। এই অংশে কয়েকবার ঐতিহাসিক বইয়ের বক্তব্য সরাসরি উক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে এসে বর্ণনা কিছুটা ডকুফিকশনের আদলে এগিয়েছে।

এই উপন্যাসের বর্ণনারীতিতে সেলিনা হোসেন নতুন কৌশল অবলম্বন করেছেন। শুরুটা হয় প্রথম ব্যক্তির বয়ানে। অর্থাৎ গল্পের নায়ক ন্যারেটর হিসেবে অবতীর্ণ হলেন। এরপর মাঝে মধ্যে লেখক ন্যারেটর হিসেবে আসছেন। দ্বিতীয়পর্ব এবং তৃতীয়পর্ব আবার শুরু হচ্ছে প্রথমপর্বের ন্যারেটরের কথা দিয়ে। তিনি নতুন পর্বের চরিত্রকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তার হাতে মাইক্রোফোন ধরিয়ে সরে যাচ্ছেন। নতুন নায়ক নতুন ন্যারেটর হিসেবে আসছে। এখানেও মাঝে মাঝে লেখক আসছেন, টিকা টিপ্পনী দিয়ে সরে যাচ্ছেন। উপন্যাসের শেষদিকে আবার ন্যারেটরের দায়িত্ব পালন করছেন উপন্যাসের প্রথম ন্যারেটর, আরিফুর রহমান। সবমিলে বলা যায় উপন্যাসটির মূল ন্যারেটর তিনিই, সহকারী ন্যারেটর লেখক সেলিনা হোসেন এবং খন্ডকালিন ন্যারেটর ওসমান এবং মশিরুল। অর্থাৎ পুরো উপন্যাসটিতে আমরা চারজন ন্যারেটরকে পেলাম। উত্তরাধুনিক সাহিত্যে মেটান্যারেটিভ বলতে যদি আমরা মনে করি, ‘একটা গল্পকে দাড় করাতে অন্যগল্প বলা’, তাহলে এই উপন্যাসে তার কিছুটা প্রয়োগ ঘটেছে।