menu

‘রক্তকরবী’ ও রবীন্দ্র-নাট্যদর্শন

এমিলি জামান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০১৯
image

“উপনিষদ বলেন, প্রাণই সত্য, তার মৃত্যু নেই... ‘রক্তকরবী’তে আমি সে কথা বলেছি। হাজার বাঁধনেও শত চাপা দিয়েও প্রাণকে কে কবে মারতে পেরেছে? আমার ঘরের কাছে একটা লোহা-লক্কড় জাতীয় আবর্জনার স্তূপ ছিল। তার নিচে একটা করবী গাছ চাপা পড়েছিল। ওটা চাপা দেবার সময় দেখতে পাইনি, পরে লোহাগুলি সরিয়ে আর চারাটুকুর খোঁজ পাওয়া গেল না। কিছুকাল পরে হঠাৎ একদিন দেখি, ঐ লোহার জালজঞ্জাল ভেদ করে একটা সুকুমার করবী শাখা উঠেছে একটি লাল ফুল বুকে করে, নিষ্ঠুর আঘাতে যেন তার বুকের রক্ত দেখিয়ে সে মধুর হেসে প্রীতির সম্ভাষণ জানাতে এলো। সে বললে, ভাই মরি নি তো, আমাকে মারতে পারলে কই? তখন আমার মনের মধ্যে এই বিষয়ে প্রকাশ-বেদনা দেখা দিল। নাটকটাকে ‘যক্ষপুরী’, ‘নন্দিনী’ প্রভৃতি বলে আমার তৃপ্তি হয়নি, তাই নাম দিলাম ‘রক্তকরবী’।” [রবীন্দ্র নাট্যপ্রবাহ : প্রমথনাথ বিশী, প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ, কোলকাতা ১৯৬৬, পৃষ্ঠা-৩২২]। স্রষ্টার কাছে প্রাণ-পিপাসু রবীন্দ্রনাথের ব্যাকুল চাওয়া তার এক গানের বাণীতেও রূপ ধরেছে। তিনি বলেছেনÑ ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ।’

রবিঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ প্রাণের উত্তাপে সজীব ও সুরভিত সদ্য ফোটা কোনো এক বসন্ত-কুসুম, যার পাপড়িতে বাতাসের কাঁপনে ছড়িয়ে পড়ে অমিত মাধুরীর বর্ণচ্ছটা আর প্রাণমন আকুল করা সুবাস। “রক্তকরবী”র ছত্রে ছত্রে যে পাঠক পঠন-ভ্রমণ চালাননি আর এর মঞ্চরূপ যিনি সতৃষ্ণ নয়নে অবলোকন করেননি, তাকে এটুকু বলেই নিবন্ধকার তার কলম থামিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু, ‘রক্তকরবী’র বিপুল সংখ্যক পাঠক ও দর্শকের কাছে তার দায়বদ্ধতা এতে করে মিটবে না। সাহিত্য-মহলের গবেষণাগারে তাই দ্বিধা-জরজর পায়ে অগ্রসর হতেই হচ্ছে। আসলে ব্যবচ্ছেদের পর প্রজাপতি আর প্রজাপতি থাকে না। তার প্রাণ ও শোভা দুইই হারায়। কিন্তু, শুধু বর্র্ণিল প্রজাপতি হয়ে বসন্ত বাতাসে উড়ে বেড়িয়ে সমাজ ও সমাজে বসবাসরত মানবগোষ্ঠীর কাছে সাহিত্য তার অঘোষিত দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া, যে প্রজাপতি শিল্প-সাহিত্যের অনন্য নির্মাণকলার নিদর্শন, সে তো বিমূর্ত। সে বিশ্লেষণ-যোগ্য, ব্যবচ্ছেদ-যোগ্য না। খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলেও তার প্রাণ ও শোভা কোনোটাই হারায় না।

কলাকৈবল্য রীতির জয়ধ্বজা উড়িয়ে “শিল্পের জন্যেই শিল্প” (Art for art’s sake) বলে চিৎকার-চেঁচামিচি করলেও একথা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে শিল্পের গভীরে কোনো না কোনো জীবনঘনিষ্ঠ বার্তা লুকিয়ে থাকে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সে বার্তা অবশ্যই কল্যাণের। সে বার্তা শুভ সাধনের। আর, সাহিত্য তো শিল্পেরই অন্যতম রূপ।

বিশ্ব মানবের বিপন্ন দশা দেখে বিশ্বকবির নেত্রযুগল অসংখ্যবার অশ্রুপ্লাবিত হয়েছে। তাই বারবার করে তিনি সাহিত্য-সুতোয় গেঁথে গেঁথে শত রঙে রঙ করা ‘হাসির ফুলের হার’ বিপন্ন মানবগোষ্ঠীর হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন। তাঁর এই চাওয়ার অন্যতম নিদর্র্শন কথা আর গানে ভরা বার্তাপ্রধান সাহিত্যকীর্তি ‘রক্তকরবী’। তাবড় তাবড় সমালোচকদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথের নাট্যবোধ সম্পর্কে অসংখ্য নেতিবাচক মন্তব্য করে গেছেন এবং করে যাচ্ছেনও। কিন্তু, নাটক যেহেতু সাহিত্যের শাখা, দুই দু’গুণে চারের গণিতশাস্ত্র না, তাই এই শাখায় উঠতে কেউ ডান পা আগে বাড়াবেন আর কেউ আগে বাড়াবেন বাঁ পা। শেকসপিয়ের পূর্বে গেলে, বার্নার্ড শ গিয়েছেন পশ্চিমে আবার মলিয়ের উত্তরে গেলে চেকভ গিয়েছেন দক্ষিণে। কোনোকালেই কারো সঙ্গে কারো মিল হয়নি। ‘রক্তকরবী’র অভাবিত মঞ্চ-সাফল্য দুর্মুখ সমালোচকদের অসংখ্যবার হতাশ করেছে বৈ কি।তাই, রবীন্দ্রনাথের পর্যাপ্ত নাট্যবোধ ছিল, একথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিয়েই ‘রক্তকরবী’ বিশ্লেষণে এগিয়ে যেতে চাইছি। ‘রক্তকরবী’ নিয়ে যারা যারা সমালোচনা করে গেছেন, তাদের বেশিরভাগই সাঁতারু। ডুবুরি নন। স্নায়বিক পরিশ্রমের ধকল এড়াতে তারা আওড়ে গেছেন গুটিকয় বাঁধা বুলি। ভাসাভাসা ভাবে যন্ত্রসভ্যতা, মানুষ, প্রকৃতি ইত্যাদি নিয়ে দু-চার কথা বলে তাদের দায় এড়িয়েছেন। কারণ, রবীন্দ্র-দর্শন তাঁর স্বরচিত এক গীতিকবিতার মতোই রহস্যদীপ্ত, যেখানে তিনি বলেছেন- ‘না দেখিবে তারে, পরশিবে না গো/ তারই পানে প্রাণ মেলে দিয়ে জাগো।’ কিন্তু, না দেখে আর না ছুঁয়ে ওয়ার্ল্ড অব ট্যানজিবিলিটি (world of tangibility)-তে যাদের বসবাস, তাদের জন্যে ‘তারই পাণে প্রাণ মেলে দিয়ে’ জাগা তো খুবই কঠিন কোনো কাজ। ঈশ্বরের সহযোগিতায় মননঋদ্ধ বিশ্বকবি যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, সে উচ্চতায় মিডিওকারদের (mediocre) পৌঁছাতে না পারারই কথা। যাহোক, ‘রক্তকরবী’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে শক্তিধর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের গুটিকয় গায়ে কাঁটা দেওয়া পঙ্ক্তি মনে পড়ে যাচ্ছে। শক্তি বলেছেন-

‘মনে করো, জুতো হাঁটছে, পা রয়েছে স্থির

সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয়।’

‘রক্তকরবী’-র রাজা যখন অন্তর্যাতনায় দগ্ধ হয়ে বলেনÑ ‘ঠকিয়েছে। আমাকে ঠকিয়েছে এরা। সর্বনাশ। আমার নিজের যন্ত্র আমাকে মানছে না’, তখন নাটকের রসজ্ঞ পাঠক এবং এর মঞ্চরূপ উপভোগকারী সচেতন দর্শক সমগ্র চেতনা দিয়ে উপলব্ধি করেন যে রাজার সময়টা বড় সুখের সময় না। কিন্তু, রাজা কেন তার অহঙ্কার ও নিষ্ঠুরতার উদ্যাপনে আর সুখ খুঁজে পাচ্ছেন না, ‘রক্তকরবী’ এ নিয়ে ভাবিয়ে তোলে আমাদের। এ নাটক এ-কারণেই একইসঙ্গে সাংকেতিক ও তত্ত্বপ্রধান সাহিত্যকর্ম বলে স্বীকৃত। একদা রবীন্দ্রনাথ মানব-চরিত্রের নেতিবাচক প্রবণতাগুলো তুলে ধরতে গিয়ে গীতার শ্লোক অনুসরণ করে বলেছিলেন- ‘অহংটাকে চিরন্তন করে রাখতে চাইলে মানুষ ব্যর্থ হয়।’ ‘রক্তকরবী’-র অহং আঁকড়ে থাকা রাজাও পরিশেষে ব্যর্থ হয়েছেন। জীবন-সায়াহ্নে পৌঁছে তিনি বুঝে ফেলেছেন যে সুদীর্ঘকালব্যাপী তুচ্ছ পাগড়ি বাঁচাতে শুধু শুধু মাথা বলি দিয়ে গেছেন তিনি। আত্মসংশোধনের তাড়নায় রাজা ভেঙ্গে ফেলেছেন তার ধ্বজা। কবি ও সাহিত্যশিল্পী শঙ্খ ঘোষ ‘রক্তকরবী’-র মর্মোদঘাটন করতে গিয়ে কৌতূহলী পাঠক সমীপে পৌঁছে দিয়েছেন গুটিকয় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তিনি বলেছেন- ‘এটা মনে রাখতে হয় যে প্রত্যক্ষ একটা লড়াইয়ের ডাক ছিল এই নাটকের শেষে, যে লড়াইতে ফাগুলালদের মতো শ্রমিকদের সঙ্গে এসে মিশতে চেয়েছিলেন বুদ্ধিজীবীও (intellectuals), পুঁথির জাল থেকে বেরিয়ে এসে।’ পুঁথির জাল থেকে যেমন বুদ্ধিজীবীরা বেরিয়ে এসেছিলেন, ‘রক্তকরবী’-র মকররাজাও তেমন তার জাল ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। এ নাটক প্রযোজনা করতে গিয়ে শিল্পরসিক নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্র এক দারুণ শিল্পসুষমা তাঁর মানসেন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগ করেছিলেন। ‘রক্তকরবী’-র নায়িকা নন্দিনীর সঙ্গে সংলাপে প্রথমে আসে বালক কিশোর, তারপর অধ্যাপক, তারপর গোকুল আর সবশেষে রাজা। তার মানে প্রথমে এক সতেজ বালক-কণ্ঠ, তারপর এক প্রবীণের, তারপর গোকুলের ধাতব বৈশিষ্ট্যধারী উচ্চকণ্ঠ আর তারপরেই শম্ভু মিত্রের ভাষায় রাজার ‘গম্ভীর গভীর কন্ঠস্বর’। শম্ভু মিত্র বলেছেন- ‘বাজনাটা বাজে চারটে আলাদা বাজনার সঙ্গে তাল দিয়ে। এ যেন দারুণ একটা orchestration (অর্কেস্ট্রেশান)-এর মতো। রবীন্দ্রনাথের সাঙ্গীতিক ক্ষমতা এইভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর নাটকে।’ আমরা বলতে পারি যে, ‘রক্তকরবী’-র নন্দিনীও কি সঙ্গীত-অলঙ্কৃত এক আকর্ষক চরিত্র নয় (?), যার নাম নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নির্মাণ করেছিলেন গুটিকয় কাব্যদীপ্ত পঙ্ক্তিমালা।

‘অবসাদ-বন্ধভাঙা মুক্তির সে ছবি,

সে আনিয়া দেয় চিত্তে কলনৃত্যে

দুস্তর-প্রস্তর-ঠেলা ফেনোচ্ছল আনন্দ জাহ্নবী,

বীণার তন্ত্রের মতো গতি তার সংগীত স্পন্দিনী

নাম কি নন্দিনী!’

রবীন্দ্রনাথের কতিপয় সাহিত্যকর্মের প্রণোদনা-বিষয়ে শঙ্খ ঘোষ রসজ্ঞ পাঠককে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা উপহার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-‘লোহা-লক্কড়ের স্তূপ ভেদ করে ফুলের ফুটে ওঠার সঙ্গে ‘রক্তকরবী’ নাটক, রেলপথে আসবার সময়ে পথের ধারে ছোটো ছোটো ক্ষণকালীন বুনোফুলের সৌন্দর্য দেখে ‘চিত্রাঙ্গদা’-র ভাবনা, কিংবা চলন্ত ট্রেনের তন্দ্রালুতার মধ্যে একটি স্বপ্ন দেখে ঘোর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ‘রাজর্ষি’-র গল্প এমন কোনো কোনো প্রসঙ্গ আমাদের জানা আছে। এ জানায় কি আনন্দ নেই কোনো? কোনো জ্ঞান? এসব জানার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবার কি দরকার নেই কোন্ গূঢ় মনস্তত্ত্বের তাপে বা চাপে রূপ পাচ্ছে এই সৃষ্টিগুলি? সেই রূপেরই বিবরণ থেকে, তার বিবর্তনের বিশ্লেষণ থেকে অনেক রহস্যের কি উন্মোচন হয় না?’ এর উত্তর নিশ্চয়ই তা হয়। আর, তাতে করে আমাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও বেশ খানিকটা সহযোগিতাপুষ্ট হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের ‘অচলায়তন’, ‘তাসের দেশ’ ও ‘রক্তকরবী’ তত্ত্বনাটকত্রয়ীর আলোচনা একত্রে করা যেতে পারে।বিষয়ের দিক দিয়ে নাটক তিনটিতে মিল রয়েছে। ‘অচলায়তন’-এর ঘুমের দেশ এক আধ্যাত্মিকতাবিহীন দেশ, যেখানে আচার-প্রধান ধর্মব্যবস্থা ও কুসংস্কার খুঁটি গেড়ে অবস্থান করছে।‘তাসের দেশ’-এর অবস্থা আনন্দ-বর্জিত যান্ত্রিকতায় কন্টকিত। এই একই অবস্থা ‘রক্তকরবী’-তেও দৃশ্যমান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালখন্ডে জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট নাট্যকারবৃন্দ ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন প্রাণদীপ্ত অস্তিত্ব অপ্রকাশিত রাখার যে নীতিমালা রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রচলিত ছিল, তা তাদের সৃষ্টিসম্ভারে দেখিয়েছিলেন। আইনের আতিশয্যে অর্থাৎ অতিনিয়মবদ্ধতার regimentation-এ (রেজিমেন্টেশনে) কীভাবে প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে, তা দেখানোর মধ্যে কোনো পরাবাস্তবতার সাহিত্যিক উদ্যাপনের লক্ষ্য ছিল না। তাতে ছিল জাগতিক এক তিক্ত সংকট তুলে ধরার প্রচেষ্টা। রবীন্দ্রনাথও ঐ সংকট-চিত্রই ‘রক্তকরবী’-র অবয়বে ফুটিয়ে তুলেছেন। ৪৭ফ বা ৬৯ঙ হয়ে যাওয়া মানুষগুলো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ডুমুরের ফুলের মতো কোনো অবিশ্বাস্য দৃশ্য না। তবুও একথা সত্য যে ‘রক্তকরবী’ নিরাশার অন্ধকারে আলো জ্বেলে দেয়। নন্দিনীর তেজোগর্ভ বাণী (‘মৃত্যুর মধ্যে তার অপরাজিত কণ্ঠস্বর আমি যে এই শুনতে পাচ্ছি’), গগনেন্দ্রনাথের আঁকা ছবিতে মৃত রঞ্জনের বীর্যদীপ্ত ঊর্ধ্বমুখী শরীরী অবস্থান ইত্যাদি নিঃসন্দেহে নিকট ভবিষ্যতের আলোকিত দিনের ইঙ্গিত বহন করে। নাটকের শেষে পাকা ফসল তোলার গানও আশার বাণীই শোনায়।

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসম্ভার বৈচিত্র্য-প্লাবিত। তাঁর রাজাকেন্দ্রিক নাটকগুলোর রাজারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক। রাষ্ট্রচালনায় ঔপনিবেশিকতার স্বাক্ষর বহন করে ‘মুক্তধারা’-র রাজা। ‘রাজর্ষি’-র রাজা গোবিন্দমাণিক্যের প্রকৃতি অনেকটা ঋষি ও রাজার সমন্বিত প্রতিফলন। ‘অচলায়তন’-এর রাজাকে তেমন একটা শক্তিধর রাজা বলে মনে হয় না। ‘ডাকঘর’-এর রাজা যেন এক বিমূর্ত দর্শন। ‘রথের রশি’-র রাজার পাশে যেন কোনো সুহৃদ বা বন্ধুর ছায়া নেই। আর, ‘রক্তকরবী’-র মকররাজ পুঁজিবাদের আদর্শ দৃষ্টান্ত।

‘রক্তকরবী’ রূপকাশ্রিত তত্ত্বনাটক। এতে রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ জীবন-ঘনিষ্ঠ বার্তা। যে মানুষটার মন সারাক্ষণ শুধু লাভের অঙ্ক কষে, তার মনে সহজ আনন্দের ছোঁয়া লাগতে পারে না। এজন্যেই ফুসফুসে খানিকটা তাজা হাওয়া ভরে নেওয়ার লক্ষ্যে তাকে কোনো এক সময় আত্মসর্বস্বতার জানালাবিহীন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়। মানুষের এই প্রবণতা সহজাত। রবীন্দ্রনাথের স্বলিখিত বক্তব্য এই যে এ নাটকে কর্ষণজীবী ও আকর্ষণজীবীর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে। ‘রক্তকরবী’-র রঞ্জন এমন এক ইঙ্গিতধর্মী চরিত্র, ‘রাজা’ নাটকের রাজার মতো মঞ্চে যার শারীরিক উপস্থিতি ঘটানো হয় না। কিন্তু, রঞ্জনই মূল আকর্ষণ হয়ে নাটকের দর্শককে তার দিকে ধাবিত করায়। প্রতীকী নাটকে এটা একটা প্রার্থিত শৈল্পিক কৌশল। এই কৌশল প্রয়োগের ফলাফল নন্দিনী-চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। নন্দিনী রঞ্জনের প্রাণময় সত্তার সুর-সুরভিত সঙ্গীত। আর, তাই সে যক্ষরাজের অবচেতন সত্তায় তার (রাজার) স্বনির্মিত বন্দিশালা ভেঙে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পেরেছে। নাটকের এক দৃশ্যে রাজার হাতে একটা মরা ব্যাঙ দেখে নন্দিনী কৌতূহলী প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। উত্তরে রাজা জানায় যে ব্যাঙটা পাথরের কোটরে তিন হাজার বছর ধরে আত্মগোপন করে ছিল। এর কাছ থেকেই রাজা জেনে নিয়েছে টিকে থাকার মন্ত্র। কিন্তু, টিকে থাকা আর বেঁচে থাকার প্রভেদ রাজাকে বুঝিয়ে দিয়েছে নন্দিনী। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘She (Nandini) is the figure, around whom, the whole theme (of `Raktakarabi’) revolves.’ সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব অমিয় চক্রবর্তী তাঁর স্নেহের সম্পর্কের একজনকে লিখেছেন- ‘রক্তকরবী’-র নায়িকা আমার মনে হয় শ্রীমতী রাণু (লেডি রাণু) দ্বারা অনুপ্রাণিত। তিনি ঐ সময়ে (‘রক্তকরবী’ রচনার কালখন্ডে) প্রায়ই রবীন্দ্রনাথের কাছে আসতেন কাশী থেকে। তাঁর একটি স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য এবং চারিত্রিক মাধুর্য কবিকে আনন্দিত করে।’ অমিয় চক্রবর্তীর অনুমানে সত্যের ছোঁয়া রয়েছে বলেই মনে হয়। এই অনুমান-সূত্রে গেঁথে দেওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সুহৃদ এলম্হার্স্টের লেখা পত্রাংশ, যা তিনি একদা লেডি রাণুর কন্যাকে লিখেছিলেন- Tagore had decided in fairness to Ma (Ranu) and to her coming marriage that he must cut completely all affectionate correspondence and personal meetings with Ma (Ranu). Ma (Ranu) felt deserted. Gurudev too felt the break.’ আরো একটা তথ্য ‘রক্তকরবী’ রচনার অন্যতম প্রণোদনা হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। সেটা হচ্ছে- এ নাটক রচনার প্রায় সমকালে রবীন্দ্রনাথ কোনো এক জায়গায় বলেছিলেন- ‘কিছুকাল আমেরিকার প্রৌঢ়তার মরুপারে ঘোরতর কার্যপটুতার পাথরের দূর্গে আটকা পড়েছিলুম। ... সেই ধ্বংসশাপগ্রস্ত ভান্ডারের কারাগারে জড়বস্তুপুঞ্জের অন্ধকারে বাসা বেঁধে সঞ্চয়গর্বের ঔদ্ধত্যে মহাকালকে কৃপণটা বিদ্রুপ করেছে; এ বিদ্রুপ মহাকাল কখনোই সইবে না।... আমি এই ঘন দেয়ালের বাইরের রাস্তা থেকে চিরপথিকের পায়ের শব্দ শুনতে পেতুম।’ যাহোক, ‘রক্তকরবী’-র রচনাকর্ম শুরু হবার পর মাসিক পত্রিকায় ছেপে বেরোতে এক বছরের বেশি সময় লেগেছিল। বদলে বদলে রবীন্দ্রনাথ মোট দশবার নাটকটা লিখেছিলেন। দশটা স্বতন্ত্র পান্ডুলিপি আজও সংরক্ষিত আছে। আর, ছাপা হয়ে গিয়েছে চারটা পান্ডুলিপি।

নিবন্ধে পূর্ব-উল্লিখিত শম্ভু মিত্রের অর্কেস্ট্রেশনের তাৎপর্য, অথবা এই নাটকের প্রতিমা-প্রয়োগের যেসব নাট্যসম্মত কর্মকান্ডের কথা কেউ কেউ ভাবতে চান, তা একেবারে সূচনা মুহূর্তেই আপনা-আপনি চলে আসেনি। বুদ্ধি ও হৃদয় ব্যবহার করেই এর রচয়িতাকে অগ্রসর হতে হয়েছে। শব্দ-প্রতিমার অনেক রকমের যোগ-বিয়োগ ও স্থান-পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যে প্রতিমার অর্থময়তা বেড়ে গেছে, সেটারও বিশ্লেষণ সহযোগিতাপ্রাপ্ত হয়েছে একাধিক পান্ডুলিপির পারম্পর্যে। যেমন-নন্দিনীকে ‘ফাঁকা আকাশের তারা’ বলে মনে হয়েছে অধ্যাপকের। এই শিল্পসম্মত তুলনাটা প্রথমবার বিশুর মুখে বসানো ছিল। সে নিজেকে ‘মরু পাহাড়ের নির্জন চূড়া’ বলে ভেবেছিল। এটা পরবর্তীতে বিশুর থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে রাজার কণ্ঠে। আর, এটা যেন অধিকতর শিল্পদীপ্ত। নাটকের শেষদিকে শঙ্খিনী নদীর একটা চারিত্র্য-চিত্র ছিল অধ্যাপকের মুখে। তারই স্মৃতি স্মরণে জীবিত রেখে নাট্যকার অনেক দিন পরে, কিন্তু নাট্যঘটনার অনেক দিন আগে রঞ্জন-প্রসঙ্গে এনে দিয়েছেন এই শঙ্খিনী নদীর উপমান, যে নদী হাস্যমুখর আবার ভাঙনেও পারদর্শী। নাটকটা এমন করেই ধাপে ধাপে কর্ষিত হয়ে উঠেছে। আরো বেশি অর্থপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর অন্তর্গত বার্তা। নাটকটার বিচার-বিশ্লেষণ করতে বসে আমাদের পুরো মনটা সেদিকে আকর্ষিত হয়। এই তথ্য জেনেও আমদের চমক লাগতে পারে যে এর নায়িকার পূর্ব-নির্ধারিত নাম ছিল খঞ্জন বা খঞ্জনী। সবকিছু জানতে জানতে আমাদের পৌঁছতে হবে নাটকের অন্তর্মহলে। ‘খঞ্জন’ বা ‘খঞ্জনী’ নামের অবয়বে যে চঞ্চলতার ছবি আঁকা রয়েছে, নন্দিনী নামের অবয়বেও তা ফোটানো নাট্যকারের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল। তবে, চরিত্রের পরিচয় তার নামে না। নায়িকার পূর্ব-নির্ধারিত নাম খঞ্জন ছিল, এ তথ্য না জানলেও আমরা নন্দিনীর প্রাণোচ্ছ্বলতা অনুভব করতে পারতাম। স্বাধীনতার প্রাণদীপ্ত অগ্রনায়ক, বিপ্লবী রঞ্জনের প্রিয়া নন্দিনী তো আমাদের কাছে প্রাণ-প্রাচুর্যেরই প্রতীক। সে তো রঞ্জনের পালের হাওয়া।

নিবন্ধে শেষের আঁচড় টানার লগ্ন এগিয়ে আসছে। কী যেন বলেছিলাম? বলেছিলাম ‘রক্তকরবী’ সুবর্ণ আগামীর প্রতিশ্রুতি। না, একটুও মিথ্যে বলিনি। ‘ধুলার আঁচল’ যদি ‘পাকা ফসলে’-ই ভরে যায়, তাহলে কি রাজ্যে দারিদ্র্য, অন্নকষ্ট, নিরানন্দ কোনোটাই আর টিকে থাকতে পারে!? অবশ্যই পারে না। আর, রাজা যদি রাজ্যবাসীর ভিড়ে এসে মেশে, তাহলে কে আর মিছেমিছি অনুভব করতে যাবে পরাধীনতার গ্লানি! সে রাজ্যে তো প্রাণখুলে সবাই এ গানই শুধু গাইবে-

‘আমরা সবাই রাজা

আমাদের এই রাজার রাজত্বে।

... ... ...

আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার

ত্রাসের দাসত্বে।’

জয়তু রবীন্দ্রনাথ! জয়তু ‘রক্তকরবী’!

তথ্যসূত্র

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম (নাটক) ‘রক্তকরবী’

২. গুটিকয় পুরনো সাহিত্য-বিষয়ক পত্র-পত্রিকা

৩. শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধ-গ্রন্থ ‘কবির অভিপ্রায়’ (প্যাপিরাস, কলকাতা)

  • গল্প সংখ্যা

    তালুকদারের হৃদয়-বাসনা

    দিলার মেসবাহ

    newsimage

    তোতা মিয়া তালুকদারের ছায়ার চেয়েও নিকটে। মিয়া সারক্ষণ হাসতে থাকে। মুদ্রাদোষ। তোতার

  • ভালো মানুষ

    হাইকেল হাশমী

    newsimage

    আমরা যখন তাকে পতিতাপল্লী থেকে উদ্ধার করলাম তখন সে অজ্ঞান ছিল। তার

  • রোদনপাখি

    শিপা সুলতানা

    newsimage

    ঘোর অন্ধকার রাত, তবু গ্রামে ঢুকতে কোনো অসুবিধা হলো না আমার। গ্রামে

  • সফুরার কুড়িয়ে পাওয়া মোবাইল এবং

    ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন

    newsimage

    চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়। হঠাৎ করেই ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ।

  • অসম্পূর্ণ গল্প (পর্ব ২)

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) তৃতীয় অধ্যয় - আমি কিন্তু আসলেই ডাক্তার, ভাই! ইন্টার্নি করা হয়ে

  • নৈঃশব্দ্যের ঢেউ : যাপিত জীবনের ভাবানুবাদ

    newsimage

    তাহমিনা খানের কবিতার বই ‘নৈঃশব্দ্যের ঢেউ’ বেশ কিছু কবিতার বহুবিস্তৃত ভাবনায় সংকলিত

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    অশ্বচালক ইদ্রিস সরকার কাঁটা তারে ছিন্ন হয় হৃদয়ের অনন্ত সাহস সারিবদ্ধ পাখি বৃক্ষে বৃক্ষে খোঁজে