menu

বেহরুজ বুচানির বন্দিশালা থেকে ছোড়া বুলেট

‘পাহাড় ছাড়া কোনো বন্ধু নেই’

সংবাদ :
  • মালেকা পারভীন
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ এপ্রিল ২০১৯

http://print.thesangbad.net/images/2019/April/03Apr19/news/Untitled-15.jpgলেখাটি শুরু করেছিলাম সাহিত্য সম্পর্কিত একটি বিশেষ ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে। সেই প্রতিক্রিয়ার সাথে স্বাভাবিকভাবে আবেগের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু বেশিরভাগ সময় যা হয়, নির্বিকার বাস্তবতার কাছে আলুথালু আবেগের পরাজয় ঘটে। অপারগ বাস্তবতাকে পরিহার করা যায়না; আবেগের সাথে আপোস রফা করে আপাত সামাল দিতে হয়।

লেখাটি যখন শুরু করেছিলাম তখনই শেষ করতে পারলে সবদিক থেকে ভালো হতো। আমার কাছে বিষয়টি অসাধারণ মনে হয়েছে যার সাথে মানবতা এবং সাহিত্য এর চিরন্তন আবেদন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। একটাই সান্ত্বনা নিজের জন্য: পশ্চিমা সাহিত্য জগতে ঘটনাটা যেভাবে আলোচিত হয়েছে, আমাদের দেশের সাহিত্য আলোচনায় সেটার ততটা প্রতিফলন দেখা যায়নি। কাজেই বিষয়টির নতুনত্ব এখনও ফুরিয়ে যায়নি।

http://print.thesangbad.net/images/2019/April/03Apr19/news/Untitled-13.jpgগত জানুয়ারির শেষে বিশ্বসাহিত্য জগতে দারুণ একটি ঘটনা ঘটে গেছে। ব্যাপারটা একই সাথে বিস্ময় এবং আনন্দের। অবশ্য, আনন্দ আর বিস্ময় অনেক সময় হাত ধরাধরি করে আসে। আমার কাছে সাম্প্রতিক ঘটনাটি এভাবেই ধরা দিয়েছে। বলছি, পাপুয়া নিউগিনির মানুস দ্বীপের শরণার্থী আটক কেন্দ্রে বন্দি ইরানি কুর্দি সাংবাদিক, লেখক, সংস্কৃতিকর্মী বেহরুজ বুচানির কথা।

এ বছরের (২০১৯) অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাবান সাহিত্য পুরস্কার ‘ভিক্টোরিয়ান প্রাইজ ফর লিটারেচার’ জয় করার মধ্য দিয়ে বুচানি সারা বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছেন। বন্দিদশায় রচিত ‘নো ফ্রেন্ড বাট দ্য মাউন্টেনস: রাইটিং ফ্রম মানুস প্রিজন’ নামের বইটির জন্য তিনি এক লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার অর্থ মূল্যের পুরস্কারটি অর্জন করেন। তবে শুনতে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, পেছনের ঘটনা ততটা সুখকর নয় মোটেও। পস কারণেই বুচানির পুরস্কারপ্রাপ্তি আলাদা মনোযোগ এবং গুরুত্ব দাবি করে।

ইতিমধ্যে সংবাদ মাধ্যম মারফত বুচানি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য আমরা জেনে গেছি। তাঁর পুরস্কার সংবাদের শিরোনামটি পড়ে আর সাথে জুড়ে দেওয়া লেখকের ছবিটি দেখে কিছুক্ষণের জন্য আমার মনের আঙিনায় এক নামহীন স্তব্ধতা নেমে এসেছিল। কিছুক্ষণ। তারপর খবরটির আদ্যোপান্ত পড়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হলো এমন: উচিৎ হয়েছে। যেমন হবার কথা তেমনই হয়েছে। আজ হোক, কাল হোক, এমনই হবার কথা। সেটাই হয়েছে যা হওয়া উচিৎ। বুচানির শ্মশ্রুমন্ডিত গাঢ় বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন মুখের দিকে চেয়ে আমার অবশ্য একজনের কথাই চটজলদি মনে পড়ে গেলো : কার কথা মনে পড়বে আর ক্রাইস্টের কথা ছাড়া! ইন্সটিঙ্কট বলে, আমার মতো অনেকের মনের আরশিতেই বুচানির মুখচ্ছবি একই অবয়বের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। যদি ঘটে থাকে, এমনটাই ঘটবার কথা। অন্যথা হবার নয়।

বুচানি সম্পর্কে পাওয়া সংক্ষিপ্ত তথ্যগুলি এমন: সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে বুচানি ইরান ছেড়ে ইন্দোনেশিয়ায় চলে যান। সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় লাভের উদ্দেশ্যে নৌকায় করে দু’বার দেশটিতে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। প্রথমবার নৌকা ডুবে যায় এবং ইন্দোনেশিয়ার জেলেরা তাঁকে উদ্ধার করেন। পরে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে পঁচাত্তর জন অভিবাসন-প্রত্যাশীর সাথে আবারও নৌ-যাত্রা শুরু করেন। এবার অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনি নৌকাটিকে আটক করে ফেলে এবং বুচানিসহ সব অভিবাসন-প্রত্যাশীকে মানুস দ্বীপের আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করে। নিজের দেশে বন্দি হতে চাননি বলে ইরান ছেড়ে পালিয়ে এলেও বুচানির শেষ রক্ষা হয়নি।

২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে নৌকাযোগে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিস্টমাস দ্বীপে পৌঁছানোর পর প্রথমবারের মতো আটক হন বুচানি। তারপর ওই বিতর্কিত আটক কেন্দ্রে বসেই ফার্সি ভাষায় বই লেখা শুরু করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত আটক কেন্দ্রটি নিয়ে বিতর্কের জেরে তা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের শেষে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেখান থেকে অন্য অভিবাসন-প্রত্যাশীদের সাথে তাঁকে মানুস দ্বীপের আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় থেকে মানুস দ্বীপেই বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন বুচানি- শ’খানেক মানুষের সাথে।

অস্থি-মজ্জায় লেখক মানুষ তিনি। প্রতিবাদী সত্তা বইছে তাঁর ধমনীর লোহিত কনিকায়। শরীরটাকে আটকে ফেলেছে বলে মনটাকে তো আর বাঁধতে পারেনি। সেটা সম্ভবও নয়। তাই এই বন্দিদশার চূড়ান্ত সদ্ব্যবহার করলেন বুচানি সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে। আটক কেন্দ্রের ভেতরে বন্দিজীবনযাপন করতে করতে একটি আস্ত বই লেখার কাজ সেরে ফেলেন তিনি। আর আধুনিক প্রযুক্তির সুফল কাজে লাগিয়ে মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ছোট ছোট বার্তা আকারে তাঁর উপন্যাসের অনুচ্ছেদগুলো পাঠিয়ে দিতে থাকেন ওমিদ তোফিঘাইয়ান নামের একজন অনুবাদকের কাছে। এভাবে লেখা হয়ে গেলো ‘নো ফ্রেন্ড বাট দ্য মাউন্টেনস: রাইটিং ফ্রম মানুস প্রিজন’ নামের এক অভূতপূর্ব বীরত্বগাথা। লেখক হো তো অ্যায়সা হি হো! (লিখতে গিয়ে ভাবছি, ভাগ্যিস, মোবাইল ফোনটাও জব্দ করে ফেলেনি তারা! নিশ্চিতভাবে এটাও ঘটেছে ভাগ্যের ফেরে!)

শরণার্থী আটক কেন্দ্রে নিঃসঙ্গ বন্দি অবস্থায় হোয়াটস অ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে যে বইটি লিখে ফেলেছেন বুচানি, সেই বই নিয়েই এখন বিশ্ব-সাহিত্য জগতে চলছে এতো হৈ হৈ রৈ রৈ কা-! অস্ট্রেলিয়ার চলতি বছরের শীর্ষ সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও বুচানির ‘পাহাড় ছাড়া কোনো বন্ধু নেই’ নামের বইটি ভিক্টোরিয়ান প্রিমিয়ারস লিটারারি অ্যাওয়ার্ডসের নন-ফিকশন শাখাতেও পুরস্কার জিতে নিয়েছে। এর অর্থমান পঁচিশ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার। কথায় তো আর এমনি বলে না, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে!’ আর ‘খোদা যখন দেন, এমন ছাপ্পর ফেরেই দেন!’

পুরস্কারপ্রাপ্তির পর বন্দিদশা থেকে সংবাদ মাধ্যমের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বুচানি বলেন, তাঁর ভেতরে এক অদ্ভুত ধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে : ‘একদিক থেকে আমি ভীষণ আনন্দিত, কারণ আমরা আমাদের এই দুরবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছি... কিন্তু অন্যদিক থেকে মনে হচ্ছে আমার আনন্দ উদযাপনের কোন অধিকার নেই। কারণ এখানে আমার অনেক বন্ধু আছে যারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।’ ‘আমাদের জন্য প্রথম বিষয়টি হচ্ছে স্বাধীনতা পাওয়া, এবং এই দ্বীপ থেকে মুক্ত হয়ে নতুন জীবন শুরু করা।’

‘হোয়াটসঅ্যাপ আমার অফিসের মতো। আমি কাগজে লিখতাম না, কারণ সেসময় প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি মাসে প্রহরীরা আমাদের ঘরে এসে হামলা করতো এবং আমাদের জিনিসপত্রে তল্লাশি চালাতো। আমি আমার লেখাগুলো হারিয়ে ফেলার ভয়ে শঙ্কিত ছিলাম। সেকারণে আমার জন্য ভালো ছিল লিখে ফেলে তা তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দেওয়া।’

সংবাদ মাধ্যমের কাছে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে বুচানি বলেন, ‘পুরস্কার প্রাপ্তির এ ঘটনাকে আমি উদ্যাপন করতে চাই না। কারণ আমি এখনও আমার চারপাশে থাকা লোকজনকে দুর্ভোগ পোহাতে দেখছি। আমাদেরকে স্বাধীনতা দিন। আমরা কোনও অপরাধ করিনি। শুধু অভিবাসন প্রত্যাশা করছি।’

http://print.thesangbad.net/images/2019/April/03Apr19/news/Untitled-14.jpgবুচানি সম্পর্কে আরও তথ্যের খোঁজে জানলাম, ২০১৩ সালে প্রথমবার আটক হওয়ার পর থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ওই বিতর্কিত আটক কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন তিনি। সাংবাদিক বলে কথা! এ ব্যাপারে ইত্যবসরে তাঁর বিশেষ পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। বুচানির ছবি কয়েকবার দেখার পর আমারও মনে পড়লো, পুরস্কারপ্রাপ্তির আগে শরণার্থী হিসেবে দ্বীপের বন্দি পরিবেশ সংক্রান্ত তাঁর কোন না কোন সংবাদ আমার চোখে পড়েছে! কেননা, ব্রিটিশ গার্ডিয়ান পত্রিকায় নিয়মিত লেখার পাশাপাশি তিনি মানুস দ্বীপের বন্দিজীবন নিয়ে নিয়মিত টুইট করেন এবং অস্ট্রেলিয়ার কঠোর অভিবাসন নীতি নিয়ে অনলাইনভিত্তিক আন্দোলনকর্মীদের সাথে তর্ক-বিতর্কে অংশ নেন। মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এমনকি একটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করে ফেলেছেন!

বুচানি পাপুয়া নিউ গিনিতে শরণার্থীর মর্যাদা পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আরও অনেক শরণার্থীর মতো তিনিও সেখানে থাকতে ইচ্ছুক নন। তিনি পাপুয়া নিউ গিনির আটক কেন্দ্র থেকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের অনুমতি পাননি বলে মেলবোর্নের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানেও উপস্থিত হতে পারেননি।

বুচানিকে নিঃসন্দেহে অনেক রকম প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হয়েছে, হচ্ছে। এখনও তাঁর বন্দি জীবনের অবসান হয়নি। কবে হবে তাও অনিশ্চিত। তবে সবচেয়ে যা কৌতূহলোদ্দীপক তা হলো যেখানে ভিক্টোরিয়ান প্রাইজ ফর লিটারেচার পুরস্কারের জন্য আবেদনের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে প্রার্থীকে সাধারণভাবে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতিধারী হতে হবে, সেখানে আপাতভাবে অযোগ্য বুচানির মতো একজন বন্দি শরণার্থীর বইটির সাহিত্য মূল্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিচারকরা এতোটাই অভিভূত হয়ে পড়েন যে, তাঁদের বিশেষ সুপারিশে এটিকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়।

‘নো ফ্রেন্ড বাট দ্য মাউন্টেনস’, এই অদ্ভুত সুন্দর কাব্যিক নামের বইটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করতে গিয়ে বিচারকবৃন্দ এটিকে শিল্প এবং সমালোচনামূলক তত্ত্বেকর একটি চমকপ্রদ নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেন যাকে কোন সাধারণ ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয় বলে তাঁরা অভিমত দেন: ‘সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ থেকে ঘন সন্নিবিষ্ট বর্ণনা, কবিতা থেকে ডিস্টপিয়ান সুররিয়ালিজমসহ এতে এক স্বতন্ত্র বর্ণনা রীতি ব্যবহৃত হয়েছে। সুন্দর এবং সুনির্দিষ্ট লেখা যার মধ্যে সারা বিশ্বের সাহিত্যিক ঐতিহ্য এর বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে, বিশেষ করে (বুচানির নিজস্ব) কুরদিশ ধারা।’

এ তো গেলো বুচানির পুরস্কারপ্রাপ্তির অব্যবহিত পরে মিডিয়ার বদৌলতে জানতে পাওয়া তাঁর সম্পর্কিত কিছু তথ্যাদি। এসব কিছুই বুচানির বইটি পড়বার জন্য আমাকে উদগ্রীব করে তুলেছে। আশা করছি, খুব তাড়াতাড়ি তা বাস্তবায়িত হবে। ইতিমধ্যে বইটি থেকে যে কিছু উদ্ধৃতাংশ এবং তাঁর যে সামান্য বক্তব্য পড়লাম, তাতেই তাঁর লেখনির বিশেষত্ব, লেখক হিসেবে তাঁর সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা আর অনুভূতির তীব্রতার মাত্রা সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে গেছি।

আমি আরও বিমোহিত হলাম যখন দুদিন বাদে বুচানির পুরস্কার গ্রহণ উপলক্ষে দেওয়া বক্তৃতাটি শুনলাম। পুরস্কার নেবার জন্য মেলবোর্নে সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে প্রদত্ত ভাষণটি আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। বুচানির সুলিখিত বক্তব্যটি আমি একাধিকবার শুনেছি, পড়েছি আর বারবার শিহরিত হয়েছি। বিশেষ করে এই কারণে যে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বাইরে শব্দ এবং সাহিত্যের শক্তি সম্পর্কে উচ্চারিত বুচানির কথাগুলোর আবেদন চিরকালীন। এসবই আমার, আমার মতো অসংখ্য সাহিত্যপ্রেমীর হুবহু মনের কথা।

অভিবাসন-প্রত্যাশী বন্দিদের প্রতি অনুসৃত নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে বুচানি যখন বলেন, এতো কিছুর পরেও, যেখানে আমাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে, এই পুরস্কার প্রাপ্তির ঘটনায় তিনি আনন্দিত। বুচানির ভাষায়: ‘এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, অমানবিক প্রক্রিয়া এবং শাসন-কাঠামোকে প্রতিরোধ করবার জন্য শব্দ এখনও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আমি সবসময় শব্দ এবং সাহিত্যে বিশ্বাস রেখেছি। আমি মনে করি, শাসনযন্ত্রের পরিবর্তন এবং একে মোকাবেলা করার জন্য সাহিত্যের শক্তি অপরিসীম। সাহিত্য আমাদেরকে স্বাধীনতা দিতে পারে... আমি সত্যি বিশ্বাস করি, এই বন্দিশালার কপাট থেকে শব্দ অনেক বেশি শক্তিশালী।’

বুচানির এই কথাগুলো আমার মনের তারে এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনায় সুর তোলে। কেননা, তাঁর বক্তৃতাটি পড়ার কিছুদিন আগেই এবারের বইমেলায় প্রকাশিতব্য আমার বইয়ের ব্ল্যার্বের জন্য লেখক পরিচিতির অংশে যা লিখেছিলাম তা যেন ওই একই অনুভবের অনুরণন। সাহিত্যের প্রতি নিজের অনুরাগ প্রসঙ্গে বলেছিলাম: ‘শব্দ তাঁর প্রেম, সাহিত্য তাঁর ভালোবাসা।’ দুদিন পরে বুচানির ভাষণটি পড়ে আমি কিছুক্ষণের জন্য শব্দহীন হয়ে থাকি।

তারপর বুচানি আরও যেমনটা বলেছেন, আমরাও যা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এতোসব প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁর এই অসামান্য গৌরব অর্জন কেবল ওই আটক কেন্দ্রের সকল বন্দির জন্যই বিজয় নয়, এটি শিল্প আর সাহিত্যের জন্যও এক বিশাল প্রাপ্তি; এবং সর্বোপরি, এটি মানবতার বিজয়। মানুষ এবং মানবিক মর্যাদার বিজয়। সত্যিই তাই। সেকারণে এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে বুচানির সাথে সাহিত্যপ্রেমী আমরা প্রত্যেকে সাহিত্যের শক্তিকে উদযাপন করেছি। এর চিরকালীন আবেদনের কথা আরও একবার স্মরণ করেছি।

সহজ, সরল, প্রাঞ্জল ভাষায় প্রদত্ত বুচানির ভাষণের প্রতিটি শব্দ আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। হয়তো অনেকেরই তাই হয়েছে। হবারই কথা। কেননা, এর প্রতিটি বাক্যের পেছনে আছে তাঁর তীক্ষè সংবেদনশীল অনুভূতি আর তিক্ত-ঘর্মাক্ত অভিজ্ঞতার নির্যাস। তাই নোবেল বিজয়ী বিভিন্ন সাহিত্যকদের পুরস্কার গ্রহণ উপলক্ষে দেওয়া বক্তৃতার সাথে বুচানির ভাষণটিরও অসামান্য সাহিত্যমূল্য সম্পর্কে কোন দ্বিধার অবকাশ নেই।

এই লেখায় আমি এমন একজন লেখক সম্পর্কে বলেছি যার বই আমার এখনও পড়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তাঁকে পড়বার জন্য আমি এর মধ্যে মোটামুটি একটি ভালো প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি। কিছু কিছু লেখকের লেখা পড়বার জন্য এমন মানসিক পূর্ব-প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় বৈকি!

যেমনটা হয়েছিল আরেকজন দেশ-ত্যাগী ইরানি লেখক আজার নাফিসির বেলায়। ‘দ্য রিপাবলিক অব ইমাজিনেশন’ বইটির নাম দেখেই তা পড়বার জন্য আমি অস্থির হয়ে উঠি। তারপর একসময় আমার বইটি পড়ার সৌভাগ্য হয়। অনেকদিন পরে একটি বই পড়ে, বা পড়তে পড়তে, আমার ভেতরে তুমুল আলোড়ন উঠেছিল। বারবার মনে হয়েছিল, ইশ, এই বইটা তো আমার লিখবার কথা ছিল! এই অনুভূতি বলে দেয়, দেশ-কাল-পাত্রভেদে মানব মনের ওপর সাহিত্যের চিরন্তন প্রভাবের কথা। বিশ্বসাহিত্যের অনুরাগী যে কোন পাঠকের পড়ার তালিকায় নাফিসির বইটি থাকা উচিৎ। এখন আমি তাঁর ‘রিডিং ললিটা ইন তেহরান’ পড়বার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।