menu

১৯৭১-এর অপ্রকাশিত ডায়েরি ৫

জিয়াউল হাসান কিসলু

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ জানুয়ারী ২০১৯
image

(পূর্ব প্রকাশেল পর)

১৯ নভেম্বর, ১৯৭১, শুক্রবার

খুব সকালে উঠে চা খেয়ে পিটি করে চা-পুরি খেলাম। তারপর গেলাম বনে। সেখানে এইমবুশীং শিক্ষা দিলাম, ফিরলাম দুপুরে। তারপর তাঁবুতে বিশ্রাম নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে গেলাম। তারপর অল্পক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গেলাম গানের রিহারসেল দিতে। সেখান থেকে ফিরলাম সন্ধ্যায়। ফিরে ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে ২০ টাকা করে সবাই পেলাম, তারপর ভাত খেতে গেলাম। বেশি ভাত খেতে না পেরে দোকান থেকে বিস্কুট কিনে খেলাম। তারপর ৯টা থেকে ১২টা ডিউটি দিয়ে ঘুমালাম।

২০ নভেম্বর, ১৯৭১, শনিবার

আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর আমাদের ক্যান্টনমেন্টে উদ্যাপিত হচ্ছে। সকালে উঠে ফায়ার করতে গেলাম। এসে হালুয়া পুরি-চা খেয়ে গোসল করতে গেলাম। আজ আমি দেশ ছাড়া, মা-বাবা-ভাইবোন ছাড়া। কতকগুলো নতুন মানুষের সাথে ঈদ করছি, জীবনের প্রথম সত্যিই মনটা বেশি ভালো না। জানি না মা-বাবা আমাকে ছেড়ে ঈদ করতে পেরেছে কিনা। গোসল করে এসে কাপড়-চোপড় পরে নামাজ পড়লাম। তারপর ক্যান্টিনে সিঙ্গারা খেয়ে এসে সবার সাথে দেখা করলাম। তারপর পোলাও-মিষ্টি ফল খেয়ে ঘুরলাম। তারপর ফাংশানে গান গাইতে গেলাম। বিকালে গান গেয়ে এসে ঘুরলাম। সন্ধ্যায় সিনেমা দেখতে গেলাম। নাম- অভিমান। সৌমিত্রের নায়ক। এসে ভাত না খেয়ে ঘুমালামা। রাত তখন ৯টা।

২১ নভেম্বর, ১৯৭১, রোববার

সকালে উঠে দাঁত মেঝে হাত-মুখ দুয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পিটি করলাম। আজ ছুটি। এসে চা-পুরি খেয়ে স্টোরে গেলাম। স্টোর থেকে তেল-এরোগ্রাম ও সাবান কিনে তাঁবুতে এলাম। সমস্ত ময়লা কাপড় চোপড় ও মোস্তাফা ভাইর বমি মাখা চাদর-লুঙ্গি ও কম্বল ধুতে গেলাম। সবকিছু দুয়ে গোসল করে এসে গেলাম রাজনৈতিক ক্লাস করতে। সেখান থেকে এসে রুটি খেয়ে তাঁবুতে বিশ্রাম নিলাম। বিকালে হারিকেনে তেল ভরে আনলাম। রাতে মান্নান ভাইর কাছে চিঠি লিখলাম, তারপর ভাত খেলাম।

২২ নভেম্বর, ১৯৭১, সোমবার

খুব সকালে উঠে পায়খানা করে হাত-মুখ ধুয়ে চা-পুরি খেলাম। তারপর মাইন এক্সপ্লটু আনলাম ২০ জনে। তারপর সব রকম মাইন বাস্ট করা দেখলাম। এক্সপ্লটু দিয়ে ট্রেন লাইন উড়ালাম। পানিতে এক্সপ্লটু নিক্ষেপ ও বাস্ট করালাম। দুপুরে সেখান থেকে ফিরেই মাথায় পানি দিয়ে চিনির বস্তা আনতে গেলাম, তারপরই রুটি খেলাম। খেয়েই আবার তাঁবুর আশপাশের ট্রেনস ভর্তি করলাম। তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বিকাল ৩টায় রাইফেল পরিষ্কার করতে গেলাম। সেখানে এলএমজি সাফ করে চা খেলাম। তারপর বিকালে স্বাক্ষর দিলাম। সন্ধ্যায় বনে গিয়ে এমবুস বসে ফায়ার করলাম। তারপর ৩৮ ফিরে ভাত-মাছ খেয়ে ঘুমালাম।

২৩ নভেম্বর, ১৯৭১, মঙ্গলবার

খুব সকালে উঠে পায়খানা করে চা-পুরি খেলাম। তারপর গেলাম আমাদের ক্যান্টনমেন্ট হতে প্রতি ৩/৪ মাইল দূরে পাহাড়ে সেখানে দূরের ফায়ার ট্রেনিং নিলাম। দুপুরে সেখানেই ভাত খেলাম। ফিরার পথে গ্রেনেড ছোড়ালাম আর তা দেখলাম। ফিরলাম প্রায় সন্ধ্যায়। ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে গেলাম ক্যান্টিনে। সিঙ্গারা-লাড্ডু খেয়ে এসে ভাত খেলাম। তারপর তাঁবুতে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম।

২৪ নভেম্বর, ১৯৭১, বুধবার

খুব সকালে উঠে ড্রেস পরে তাঁবুর আশেপাশে আমাদের খোঁদা ট্রেনস আমরাই বুঝালাম। তারপর পিটি করে চা-পুরি খেলাম। তারপর স্টেইনগান সাফ করলাম। পরে তাঁবু খোললাম। দুপুর হয়ে গেল। ক্যান্টিনে গিয়ে সিঙ্গারা, জিলাপি খেলাম। এসে হাত-মুখ ধুয়ে ও মাথা ধুয়ে তৈল মাথায় দিলাম। তারপর বেলায়েত ভাইকে আমার পাঞ্জাবিটা ধুইতে দিলাম। এবং বেগের বেল্ট আটকালাম। তারপর গাছের ছায়ার তলে বিশ্রাম নিলাম। স্টেইগান পরিষ্কারের সময় আমাদের পলিটিকাল মুটিবিটরের কাছে কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। স্বার্থক হলো। তারপর আমাদের সমস্ত তাঁবু খুলে ফেললাম। সন্ধ্যায় স্টোর থেকে ৩ প্যাকেট বিস্কুট কিনলাম। পথের জন্য। রাতে ভাত-মাছ খেয়ে আমাদের ক্যাম্প হতে ৮/১০ মাইল দূরে জয় বাংলা ট্রেনিংয়ে রওয়ানা হলাম।

২৫ নভেম্বর, ১৯৭১, বৃহস্পতিবার

খুব সকালে উঠতে হলো। উঠে বসে থাকলাম। একটা অয়েল ক্লথ তার ওপর একটা লুঙ্গি, গায়ে সামান্য চাদর, মাথায় গামছায় বাঁধা পুরি ভাজা। পাশাপাশি দুজন ঘুমালাম, আমি আর আনোয়ার। গত রাত্রে ১টায় পৌঁছে ঘুমালাম মাত্র ৩ ঘণ্টা। ঘুমার পর উঠে বসে আর উঠতে পারছিলাম না। আজই শেষ দিন ট্রেনিং সমাপ্ত। আজ রাতে এই জায়গা হতে ক্যাম্পে যাবার কথা ছিল। কিন্তু চারুলিয়া স্টেশনে ট্রেন এসে গেছে বলে দিনেই রওয়ানা হয়ে গেলাম। এসে গোসল করে চা খেলাম। রাতে থাকার জন্য অন্য ডরহম-এ জায়গা ঠিক করলাম। তারপর রুটি খেয়ে ঘুম পাড়লাম।

২৬ নভেম্বর, ১৯৭১, শুক্রবার

খুব সকালে উঠে বিছানাপত্র গোছায়ে মুখ ধুইলাম। চা-পুরি খেয়ে কমলা পেলাম। তারপর কম্বল ৩.২৫ টাকা জমা দিলাম। আজ এখান থেকে বিদায় নেব। চিরদিন এখানকার স্মৃতি মনে থাকবে। ভুলব না আমাদের ক্যাপ্টেন তারা শিং-কে ও অন্যকে। বেলা ৯টায় গেলাম গ্যালারিতে। সেখানে সমস্ত ক্যান্টনমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ৫ মিনিট বক্তৃতা দেয়ার পর আমার পবিত্র শপথনামা পাঠ হলো। অতঃপর জাতির সম্মানার্থে পতাকার সামনে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হলো। তারপর গ্রেনেড নং-৭৭ ও পেট্রোলের বোতল ব্রাস্ট করা হলো। পরে আমাদের বিশিষ্ট পলিটিকাল মুটিবিটর ১৫ মিনিট বক্তৃতা দিলেন এবং জয় বাংলা স্লোগানের সাথে সভা শেষ। অতঃপর অস্ত্রাগারে গিয়ে রাইফেল সাফ করতে দিলাম তাঁবু খুললাম। তারপরে এসে কার্ড ও চধুংষরঢ় নিলাম। গোসল করে ভাত খেলাম। চা খেয়ে বিছানাপত্র গুছালাম। সন্ধ্যায় সবাই গান গেয়ে ট্রেনে উঠলাম। উঠে রুটি খেলাম।

২৭ নভেম্বর, ১৯৭১, শনিবার

খুব সকালে উঠে রুটি খেলাম। তারপর পানি খেয়ে হাত-মুখ ধুলাম। তারপর বিস্কুট ও কমলা খেলাম। ট্রেন চলছে। বেলা ৮টায় এসে নামলাম ‘কল্যাণী’তে। কল্যাণী নদীয়া জেলাম। সেখান থেকে কল্যাণী Rest camp-এ এসে থামলাম বেলা ১১টায়। সেখানে কিছু আজেবাজে জিনিস খেয়ে পেটকে সান্ত¡না দিলাম। প্রায় সন্ধ্যায় বড় এক চামচ খিচুড়ি খেলাম। একটা ঘরে আমার সাথে অচেনা দুই গেরিলাসহ আশ্রয় নিলাম। রাত ১০টায় ভাত খেলাম। বিছানাপত্র করে ঘুমালাম। খুব শীত করছিল। মাথায় ছিল আমার বেগটা।

২৮ নভেম্বর, ১৯৭১, রোববার

খুব সকালে উঠে মুখ ধুয়ে রোদ পোহালাম। তারপর পায়েস খেয়ে গেলাম আমাদের নাম দিতে। নাম দিয়ে আনোয়ার আর আমি এক দোকানে বসে চা-পুরি খেলাম।

দুপুরে ভাত খেয়ে কল্যাণী স্টেশনে গেলাম। স্টেন থেকে ট্রেনে উঠে নামলাম দমদম জংশনে। আর এক ট্রেনে গিয়ে নামলাম বারসাত। সন্ধ্যা ৭টায় সেখান থেকে মুরি-টুরি খেয়ে আর এক ট্রেনে গিয়ে নামলাম টাকিতে। ২৪ পরগনা জেলায় রাত্রে এক কলেজে সবাই ঘুমালামা। রাত্রে মেজর জলীল সাহেবের ভাত দিবার কথা ছিল। কিন্তু রাঁধতে রাঁধতে ভোর হয়ে যাবে বলে না খেয়ে ঘুমাই।

২৯ নভেম্বর, ১৯৭১, সোমবার

খুব সকালে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে খিচুড়ি খেলাম। তারপর রোদ পোহালাম। বেলা ৯টায় রওয়ানা হলাম। বাগুনডিয়ার উদ্দেশ্যে। বেলা ১০টায় বাগুনডিয়া পৌঁছলাম। এখানে পৌঁছার আধঘণ্টা পর ক্লাস করতে গেলাম। সেখানে কর্নেল ওসমানি বক্তৃতা দেন। মেজর জলীলও উপস্থিত ছিলেন।

দুপুরে গোসল করে ভাত-মাছ খেলাম। তারপর তাঁবুতে বিছানা করে বিশ্রাম নিলাম। বিকালে মাঠে সবাই ৫ মিনিটের জন্য একত্রিত হলাম। তারপর গেলাম পায়খানায়। বর্তমানে আমি বাগুনডিয়া জবংঃ পধসঢ়-এ আছি। সন্ধ্যায় গেলাম নিটকতম বাজারে। জিলাপি-চা-চানাচুর খেলাম। রাতে এক মুঠ ভাত খেয়ে বাকি ফেলে দিয়ে ঘুমালাম।

৩০ নভেম্বর, ১৯৭১, মঙ্গলবার

খুব সকালে উঠে দাঁত মেজে, হাত-মুখ ধুলাম। তারপর আবার পিটি করলাম। সেখান থেকে এসে চা-পুরি খেয়ে গেলাম মাঠে সবাই। সেখানে আমাদের নাম লেখা হলো। হয়ত শীঘ্রই দেশে যাব। তারপর তাঁবুতে এসে ড্রেস খুলে গেলাম দোকানে। সাবান কিনে কাপড়-চোপড় ধুইলাম। তারপর গোসল করলাম। দুপুরে ভাত খেলাম ও বিশ্রাম নিলাম।

বিকালে ক্যাপ্টেন সেলিমের গ্রুপে আমার ফাইনাল নাম উঠল। পড়লাম অজয়দার আন্ডারে।

সন্ধ্যায় বাজারে ঘোরাফেরা করলাম ও পিয়াজু খেলাম। রাতে হোটেল থেকে ডিম কিনে এনে ক্যাম্পের ভাতের সাথে খেতে বসে খেতে পারলাম না। তারপর হোটেলে গিয়ে ভাত-গোস্ত-ডাল খেলাম। পান খেয়ে ঘুমালাম। (চলবে)

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

    নিভৃত ও বিচিত্র

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    সাহিত্যের নিত্য পরিবর্তনের উৎসমুখে সরব উপস্থিত হয়ে যিনি সর্বদা নিজেকে বদলে নিতে

  • ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’

    প্রান্তজনের দস্তাবেজ ও জাদু-বাস্তব কথকতা

    আহাম্মেদ কবীর

    newsimage

    স্বপ্নতাড়িত জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক এবং প্রজন্মান্তর খোয়াব, সংগ্রাম, জীবনাচার, বাসনা, কামনা, বিলাস আর

  • পঙ্ক্তিভারে মুখরিত সন্ধ্যা

    newsimage

    রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। নির্দিষ্ট সময় থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পর পৌঁছালাম কবি

  • ধারাবাহিক উপন্যাস ৩

    ‘মৌর্য’

    আবুল কাসেম

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) দেবরাজ জিউসের কন্যা মিউসের নাম থেকে মিউজিক নামটা এসেছে। তিনি

  • সৈয়দ হকের জলেশ্বরী

    পিয়াস মজিদ

    newsimage

    মার্কেসের যেমন মাকান্দো, দেবেশ রায়ের যেমন তিস্তা, সৈয়দ শামসুল হকের তেমনি জলেশ্বরী।

  • মহাদেশের মতো এক দেশে ২

    কামরুল হাসান

    newsimage

    অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের মাঝে সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে নবীন। তবু মহাদেশ

  • মুহম্মদ সবুরের কবিতা

    newsimage

    শান্তির পতাকা তুষার কিংবা উষ্ণতা- এই প্রবাসে কী বিভ্রমে অনিচ্ছায়; ডুবে যেতে হয় উষ্ণ-শীতল