menu

হেয়ারিং এইড

শেলী সেনগুপ্তা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
image

মহিবুল সাহেব বেশ সকাল সকাল হাঁটতে বের হন। আজকে আরো সকালে বের হয়েছেন। হাঁটা হলো না। বসে আছেন রমনা পার্কের বেঞ্চে। মনটা খুব খারাপ। আজ খুব মনে পড়ছে রোকেয়াকে। দু’জনের চমৎকার বোঝাপড়া ছিলো। কত সহজে একজন আরেকজনকে বুঝতে পারতো। মহিবুল সাহেবের পছন্দের খাবারগুলো রান্না করতো। দু’জন একসাথে খেতে বসতো। একসাথে চাঁদের আলোতে বসে গল্প করতো। রোকেয়া গান গাইতো আর মহিবুল কবিতা আবৃত্তি করতো। একমাত্র সন্তান সৌম্যকে নিয়ে ওদের সুখের সংসার।

মহিবুল সাহেব সরকারি চাকরি করতেন আর রোকেয়া একটা স্কুলে সায়েন্সের শিক্ষক ছিলো। বিয়ের পাঁচ বছর পর সৌম্যর জন্ম হলে খুশিমনেই স্কুলের চাকরি ছেড়ে ঘরে সৌম্যর দেখাশুনা করা শুরু করলো। মহিবুল সাহেব কখনোই চান নি রোকেয়া ঘরে বসে থাকুক। আবার তিনি জোরও করেন নি।

দেখতে দেখতে অনেক বছর পার হয়ে গেলো। সৌম্য বড় হলো। বুয়েটে ভর্তি হলো। তখন রোকেয়ার আনন্দ দেখে কে! সারাদিন কাটে ছেলের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে। ক্লাস করে ঘরে ফেরার আগেই ওর জন্য খাবার তৈরি করে রাখে, রাতে ঘুমাতে যাবার আগে বিছানা প্রস্তুত।

একসময় সৌম্য পাস করে বের হলো। সাথে সাথে একটা চাকরিও পেয়ে গেলো। এর মধ্যে মহিবুল সাহেব চাকরি থেকে অবসর নিলেন। রোকেয়া আর আগের মতো ছোটাছুটি করতে পারে না, ডায়াবেটিস, এসিডিটি এসব সমস্যা নিয়ে সবসময় ব্যতিব্যস্ত থাকে। প্রায়ই বিছানায় থাকে, কিন্তু নিজের সমস্যার কথা কখনো বলে না।

রোকেয়া হঠাৎ করে সৌম্যর বিয়ে দেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে গেলো। মহিবুল সাহেব চেয়েছেন মাত্র চাকরি পেয়েছে, নিজেকে গুছিয়ে নিক, তারপর বিয়ে হোক। আর সৌম্যর মনে হলো এখন বিয়ে করার অর্থ বিশাল দায়িত্ব নেয়া, তাই মনে মনে চেয়েছিলো এই দায়িত্ব আরো কিছুদিন পরে নিতে। কিন্তু রোকেয়ার জোরাজুরিতে পাত্রী দেখা শুরু হলো। মুখ থেকে কথা বের করতেই মেয়ের অভিভাবকদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেলো। সবদিক দেখেশুনে নায়লাকে বউ করে আনা হলো। চমৎকার মেয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অংকে এম এ পাস। বেশ গুছানো আর সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। রোকেয়ার সাথে সাথে পরিবারের সবারই ওকে পছন্দ হয়ে গেলো। এক মাসের ব্যবধানে নায়লা এ বাড়ির বউ হয়ে এলো। বিয়ের সাত দিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে রোকেয়া বউয়ের হাতে সংসার সঁপে দিয়ে নিজেকে ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেললো। খুব একটা ঘরের বাইরে আসে না। নিজের মতো থাকে। মহিবুল সাহেব অনেক চেষ্টা করেও রোকেয়াকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। ওর এক কথা,

: এখন আমার বিশ্রাম দরকার।

বিয়ের তিন বছর পর সৌম্য আর নায়লার একটা ছেলে হলো। যেদিন হাসপাতাল থেকে নায়লা ফিরে এলো সেদিন শেষবারের মতো ঘরের বাইরে এসেছিলো রোকেয়া। নাম রেখেছে শ্রাবণ। আবার ফিরে গেলো নিজের ঘরে।

এভাবে বিশ্রামে থাকতে থাকতে মহিবুল সাহেব, সৌম্য, নায়লা আর শ্রাবণের মায়া কাটিয়ে চিরবিশ্রামে চলে গেল।

রোকেয়ার চলে যাওয়াটা অনেকের কাছে তেমন কিছু ছিলো না, কারণ অনেক আগে থেকেই সে পরিবার বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু মহিবুল সাহেব একা হয়ে গেলেন। একই ঘরের একই বিছানার অন্য পাশটা শূন্য হয়ে গেলো। এ শূন্যতা মহিবুল সাহেবের বুকের ভেতর অজানা বাতাসের কান্নার মতো হাহাকার তুলে দিলো। ঘুম কমে গেছে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে পাশের শূন্য জায়গায় হাত রেখে কারো পরশ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। ব্যর্থ হয়ে পায়চারি করে রাত পার করেন। তারপর মর্নিং ওয়াকে চলে যান। আজকাল কানেও কম শোনেন। রোকেয়া হেয়ারিং এইড কিনে দিয়েছিলো। ওটা ছাড়া এক মুহূর্ত চলে না। আগে মাঝে মাঝে খুঁজে না পেলে রোকেয়া খুঁজে দিতো, এখন খুঁজে দেয়ার কেউ নেই দেখে হারায়ও না।

শ্রাবণ বড় হয়েছে। ফাইভে পরে, দাদাভাইয়ের সাথে খুব ভাব। প্রতিদিন কিছু সময় দাদাভাইয়ের সাথে কাটায়। না হলে ওর মন ভরে না। মহিবুল সাহেব ওর মধ্যে জীবন খুঁজে পান। রোকেয়া মারা যাওয়ার পর একাকিত্ব কাটানোর জন্য শ্রাবণকে সবসময় কাছে পেতে চান। তাতে নায়লা খুব একটা খুশি হয় না। কখনো কখনো বলে ফেলে

: বাবা, শ্রাবণ এখন পড়ছে।

তিনি অপেক্ষা করেন পড়া শেষ করে নাতি আসবে। কখনো আসে আবার কখনো আসে না। মহিবুল সাহেব অপেক্ষা করতে করতে একসময় ভুলে যান তিনি এতোক্ষণ কিসের অপেক্ষা করছিলেন। নায়লা একটা স্কুলে যোগ দিয়েছে, অংকের শিক্ষক হিসেবে বেশ নামও করেছে। ওর কাছে এখন অনেক ছেলেমেয়ে পড়তে আসে। ড্রইং রুমের পাশের রুমটাতে ব্যাচ করে পড়ায়। তাতে সারাক্ষণ ফ্ল্যাটটা সরগরম থাকে। তখন কোন কাজ না থাকাতে, শ্রাবণ বাবামায়ের রুমে বসে টিভি দেখে, আর তাতে নায়লা খুব বিরক্ত হয়। এখন শ্রাবণেরও একটা রুম দরকার। অথচ এ ফ্ল্যাটে বেডরুম মাত্র তিনটা।

এটা নিয়ে অনেকদিন থেকে নায়লা ঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছে। প্রতিদিন রাতে নায়লার কথা শুনতে আর ভালো লাগে না। বিছানা থেকেই শুরু হয় বাবার উপর বিরক্তি প্রকাশ। বাবা এতো আগে ঘুম থেকে ওঠে কেন। উঠেই কেন ডাইনিং স্পেসের বেসিনের কল ছাড়ে। জলের শব্দে নায়লার ঘুম ভেঙ্গে যায়। রাতে বাবার কাশির শব্দে নায়লা ঘুমাতে পারে না। বাবা নিজের বারান্দায় বসে সন্ধ্যাবেলা গান করেন তাতে নাকি ওদের ছেলে শ্রাবণের পড়ার ক্ষতি হয়। প্রতিদিন এতো কথা শুনতে শুনতে সৌম্য অস্থির।

কালরাতে নায়লা চূড়ান্ত করেছে, বেশ বড় বড় শব্দে বলেছে,

: এখন তো বাবা ওল্ড হোমে চলে যেতে পারেন, সেখানে তিনি নিজের বয়সী লোকের সাথে বেশ ভালো থাকবেন। তাতে শ্রাবণেরও একটা রুম হলো। এখন বড় হয়েছে ওর আলাদা রুম দরকার।

আর সৌম্য যথাযম্ভব কণ্ঠ নামিয়ে বলছে,

: আমি তো কবে থেকেই বলছি তোমাকে, তাকে বাবার রুমে আরেকটা খাট দিয়ে দাও, সাথে একটা পড়ার টেবিল।

: না, এটা আমি কখনোই করবো না।

: কেন করবে না? তাতে সমস্যা কোথায়? শ্রাবণ তো বাবার সাথে ভালোই থাকে। দু’জনের সময় ভালো কাটবে।

: দেখো, আমি আমার ছেলেকে সস্তা সেন্টিমেন্ট নিয়ে বড় হয়ে উঠতে দেবো না। তাই আমি চাই না সে ওই রুম কারো সাথে শেয়ার করুক। যা করতে হয় তুমি দ্রুত করো, নাহলে আমিই কিছু একটা করবো।

সৌম্য কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে গেলো। নিজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করছে। বাকি রাত আর ঘুম হলো না।

সকালে উঠে বাবার ঘরে গিয়ে দেখে বিছানা শূন্য। অনেক আগেই উঠে কোথায় যেন গেছে। সৌম্যর মনটা ধক করে উঠলো। বাবা কিছু শুনে ফেলেনি তো? শুনতেও পারে। নায়লা তো খুব একটা আস্তে কথা বলে নি। কাজের মেয়ে মদিনাকে জিজ্ঞেস করলো,

: মদিনা, বাবা কোথায়?

: দাদাজান তো এ সুময় আঁডতে জায়, আইজ মনে অয় তরা কইরা গেছে।

: হাঁটতে যাওয়ার সময় তুই দেখিস নি?

: আমিই তো দরজা লাগাই, আইজ দেহি বাইর থেইক্যা তালা মাইরা চাবি লইয়া গ্যাছে।

সৌম্য দ্রুত স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে সামনের পার্কের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলো। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। যেতে যেতে নিজেকে গালি দিচ্ছে। কেন নায়লা থামাতে পারলো না? বাবা যদি শুনে ফেলে কী হবে। ভাবতে ভাবতে পার্কে গেট দিয়ে ঢুকেই দেখে, নাগেশ্বর গাছের নিচে সিমেন্টের বেঞ্চে বাবা একা বসে আছে। মাথাটা বুকের কাছে ঝুলে আছে। সৌম্যর বুকের জানালায় বাতাসের দাপাদাপি শুরু হলো। যে বাবা ছোটবেলা থেকে বাইরের সব ঝড়ঝাপটা থেকে আড়াল করে এতো বড় করেছে আজ সে বাবাকে কটু কথা থেকে আড়াল করতে পারলো না। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে।

সৌম্য ছোটবেলার মতো পেছন থেকে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে পড়লো। মহিবুল সাহেব অনেকদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে বুকে টেনে নিলেন। সৌম্যর মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে নাক গুঁজে ঘ্রাণ নিলেন। গভীর কণ্ঠে বললেন,

: খোকা, তোর চুলের গন্ধ এখনো ঠিক আগের মতোই আছে রে।

: কী বলছো বাবা!

: তোর কি মনে আছে, তোর মা আর আমি সারাক্ষণ তোর চুলের ঘ্রাণ নিতাম।

সৌম্য হেসে ফেললো,

: মনে নেই আবার?

মুহিবুল সাহেব আজ ওকে বুকের মধ্যে ধরে রেখে আনন্দ পাচ্ছেন, ছাড়তেই ইচ্ছে করছে না।

বাবা-ছেলে পাশাপাশি বসে আছে। একটা-দুটো নাগেশ্বর ফুল ওদের শরীর ছুঁয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। সকাল এখন বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রোদের তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে। সৌম্য বললো,

: বাবা, বাসায় চলো। রোদ কড়া হয়ে যাচ্ছে।

: হ্যাঁ বাবা, চলো।

হঠাৎ সৌম্য বিষণ্ন কণ্ঠে বলে উঠলো,

: বাবা, কাল রাতের কথাগুলো...

কথা বাড়াতে না দিয়ে মহিবুল সাহেব বললেন,

: খোকারে, একটা ভুল হয়ে গেছে।

: কী ভুল?

: কাল থেকে আমার হেয়ারিং এইডটা খুঁজে পাচ্ছি না, কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। আরেকটা কিনতে হবে। তোমার খরচ বাড়িয়ে দিলাম।

সৌম্য অবাক হয়ে গেলো, সাথে আনন্দিতও। মহিবুল সাহেবকে আরো গভীরভাবে আঁকড়ে ধরলো। ভেবে খুব ভালো লাগছে বাবা কাল রাতের কথাগুলো শুনতে পায় নি। তাও না বলে পারলো না,

: কাল কখন হারালে বাবা?

: দুপুর নাগাদ।

সৌম্য আরো খুশি হয়ে গেলো।

: তুমি ভেবো না, এবার আরো ভালো দেখে কিনে দেবো।

: আচ্ছা বাবা।

সৌম্যর কাঁধে মাথা রেখে হেঁটে যেতে যেতে মহিবুল সাহেব কান থেকে একটা কিছু খুলে নিজের পেছনে ফেলে দিলেন। তারপর দুই প্রজন্মের দু’জন দৃঢ় পায়ে রাস্তা পার হয়ে বাসার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ব্যালকনি থেকে শ্রাবণ দাদুকে দেখে হাত নাড়ছে। সেখান থেকে চিৎকার করে বলছে, ‘দাদু, কাল থেকে কিন্তু আমিও পার্কে যাবো, শুনছো?’

মহিবুল সাহেব হাত নাড়লেন। আর মনে মনে ভাবলেন,

‘আমার সৌম্যটা এখনও শ্রাবণের মতো শিশুই রয়ে গেলো, এমনই থাকুক সারাজীবন, বড় হওয়ার দায় অনেক বেশি’।