menu

স্মৃতিতে অনন্য জীবনানন্দ

ওবায়েদ আকাশ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
image

এখনো পর্যন্ত বাংলা কবিতার প্রধানতম কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি এই আসন অলঙ্কৃত করেছেন তাঁর জীবিতাবস্থায়ই। গত শতকের তিরিশের দশকের পঞ্চ পা-বের একজন তিনি। কিন্তু তিনি কখনো তা মনে করতেন না। তাঁর বিবেচনায় এই সব হিসাব কিংবা দশকের বিভাজন কোনোই মূল্য পায় নি। আজ তাই তিনি সময়-কাল-যুগ পেরিয়ে প্রধানতম কবি। তাঁর একটি সহজাত কাব্যভূমি রয়েছে; যা তিনি নির্মাণ করেছেন বহু বহু অভিজ্ঞতা ও অধ্যবসায়ের চূড়ান্ত মীমাংসা দিয়ে। তাঁকে তাই অতিক্রম করা অন্য কোনো কবির পক্ষে সম্ভব হয়নি। এখনো যে কোনো কবিকর্মী কিংবা সমালোচকের মুখে, যে কোনো সংকট ও দোদুল্যকালে জীবনানন্দ দাশ উদারহণ হিসেবে উঠে আসেন।

শতাব্দি পেরিয়ে গেল, আর ক্রম-উজ্জ্বল আর অপ্রতিদ্বন্দ্বি এই কবি আমাদের বাংলা কবিতার অহঙ্কার। তিনি আমাদের কাব্যচেতনা ও কাব্যসৌন্দর্যের প্রধানতম রূপকার। তাঁকে চিত্ররূপময়, নির্জনতম কিংবা রূপসী বাংলার কবি বলে সীমায়িত করা যায় না। তিনি কবি, কবিই। প্রকৃতার্থে কবি। নির্বিশেষ কবি। তাঁর আপাদমস্তক তিনি স্বনির্মিত-প্রকৃতিজাতম, অভিজ্ঞতানিসৃত স্রষ্টা। তাঁকে নিয়ে তাই আমাদের আগ্রহ প্রবল। এই প্রাবল্য ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। তাঁকে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে যত্রতত্র শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন তাঁর পরবর্তী সময়ের প্রায় প্রতিটি কবি-সাহিত্যিক কিংবা কাব্যসমালোচক। প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য সাহিত্যপত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন কিংবা সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, দৈনিকের বিশেষ সংখ্যা। প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য সংকলন; যাদের প্রত্যেকটিরই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। লেখায় রয়েছে ভিন্নতা কিংবা অভিনবত্ব। আবার কোনো কোনো পত্রিকা কিংবা সংকলনে একই লেখা মুদ্রিত হতে দেখা যায়। এর যৌক্তিক কারণও রয়েছে। একশ কুড়ি বছর পেরিয়ে নিশ্চয় তাঁর নিকটজনের কোনো নতুন লেখা আশা করা যায় না। তারা জীবৎকালে যা লিখেছেন সেটাই এখন মহার্ঘ সম্বল। তাই সেই লেখাগুলো বারবার বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সংকলনে মুদ্রিত হতে দেখা যায়। বিশেষ করে জীবনানন্দের সহযাত্রী লেখক, তাঁর আত্মীয়স্বজন, সম্পাদক-লেখকদের একই লেখা বারবার মুদ্রিত হলেও অযৌক্তিক মনে হয় না লেখার সারার্থের কারণেই।

তরুণ কবি সজল আহমেদ সম্পাদিত ‘স্মৃতিতে জীবনানন্দ’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে কবি প্রকাশনী থেকে। এ বই তেমনি একটি সংকলন যেখানে অধিকাংশ লেখকই স্মৃতিচারণ করেছেন তাদের দেখা জীবনানন্দকে নিয়ে। জীবনানন্দের ভাই-বোন-স্ত্রী থেকে তিরিশের দশকের তাঁর নিকট-সম্পাদক-লেখক এবং গত শতকের প্রণিধানযোগ্য লেখকগণ এই সংকলনের লেখক। এ সংকলনের অধিকাংশ লেখা পুরনো হলেও তার আবেদন চিরকালীন। এত বড় কবিকে কাছ থেকে দেখা আর তা নিয়ে স্মৃতিচারণ- নিঃসন্দেহে ভাগ্যবানদের কাজ। সেই সব ভাগ্যবান-ভাগ্যবতীদের লেখা একত্রিত করে প্রকাশিত হয়েছে সংকলনটি।

গ্রন্থটি পাঠ করে আমার কাছে মনে হয়েছে, সম্পাদক সজল আহমেদের নিষ্ঠা ও শ্রমের তুলনা হয় না। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থেকেই কাজটি করতে পেরেছেন। এবং জীবনানন্দ সম্পর্কে মহার্ঘ লেখাগুলোই তিনি সংকলনভুক্ত করেছেন। এখানে এমন অনেক লেখকের লেখা আছে- যা আগে কখনো পড়া হয়নি বা জানাও ছিল না; কিন্তু লেখাগুলো পুরনো। সজল হয়ত সামগ্রিক পাঠকের কথা চিন্তা করে এই পুরনো লেখাগুলোকে আমাদের সামনে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন।

বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী লাবণ্য দাশ, ছোটভাই অশোকানন্দ দাশ, তদীয় স্ত্রী নলিনী দাশ, জীবনানন্দের বোন সুচরিতা দাশ, মেয়ে মঞ্জুশ্রী দাশ, জীবনানন্দের সহযাত্রী কবি-সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, সুবোধ রায়, অরুণ মিত্র, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখকদের লেখা থেকে ব্যক্তি ও লেখক জীবনানন্দের আচার, প্রকৃতি ও অধ্যবসায় সম্পর্কে যেমন জানা যায়, তেমনি তাঁর লেখার শক্তিমত্তাও অনুধাবন করা যায়। সম্পাদক যে বিষয়টি মাথায় রেখেই কাজটি সম্পন্ন করেছেন, তা সম্পূর্ণ গ্রন্থ পাঠে স্পষ্ট হবে।

জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে আমরা জানি যে, তিনি সব সময় গুরুগম্ভীর, চারদিকে একটা বেষ্টনী তৈরি করে একা একা নির্জনতাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাঁর বোন সুচরিতা দাশের স্মৃতিকথায় জানা যায় :

“কত সময় দেখেছি, স্বপ্নলোক থেকে নেমে এসে হাসি, পরিহাস, কৌতুকে, গল্পে কেবলমাত্র আমাদের সঙ্গেই নয়, বাইরেরও যারা তাঁর সান্নিধ্যে যেতে সংকোচ করেনি তাঁদের সঙ্গে এক হয়ে যেতেন। এত মজার মজার কথা বলতে পারতেন যে, হেসে কুটিপাটি হয়ে যেতে হতো। যে মানুষ অত গুরুগাম্ভীর্যের কবিতা লিখতেন, তিনি যে অমরচারিদিক উচ্চকিত করে প্রকম্পিত হাসি হাসতে পারতেন, বা অন্যকেও হাসিয়ে হাসিয়ে ক্লান্ত করে দিতে পারতেন তা যেন না দেখলে বিশ্বাস করাই যায় না। কখনো কখনো তাস খেলার নেশা চাপত।” [কাছের জীবনানন্দ, পৃ: ৯৪]

জীবনানন্দের ছোটভাই অশোকানন্দ জীবনানন্দ কাব্যের প্রবণতা, বিষয়প্রকরণসহ নানা দিক তুলে ধরেছেন তাঁর ‘বাল্যস্মৃতি’ প্রবন্ধে। তিনি অসাধারণ বিশ্লেষণ করেছেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকের। জীবনানন্দ দাশ যে শুধু কল্পনাবিলাসী এবং স্বপ্নবিলাসী কবি ছিলেন না; তার ‘তার সাতটি তারার তিমির’ কাব্য যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত সে ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। তাছাড়া জীবনানন্দ দাশ ছিলেন মানুষের দুঃখবোধকে খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা মানুষ। তিনি তার ভেতর দিয়ে নিজে যাপন করেছেন। আর্থিক ও মানসিক অস্থিরতা তাঁকে সুস্থির হতে দেয় নি। তাঁর যতটুকু ব্যক্তিগত আবেষ্টন তা তিনি নিজেকে একটু দূরে রাখার জন্য তৈরি করেছিলেন। কারণ তাঁর চোখে তাঁর স্বপ্নের পৃথিবী ধরা পড়ে নি। তিনি বাস্তবতই চেয়েছিলেন অন্য এক পৃথিবী যা হবে বিশুদ্ধ কবিতার মতো। আর এই বিশুদ্ধ কবিতার ধারাটাই তিনি বহন করেছেন আজীবন। অশোকানন্দ লিখেছেন:

“কোনো কোনো তথাকথিত সাহিত্যিকের মনে একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে বা ছিল যে জীবনানন্দ কেবলমাত্র স্বপ্ন-বিলাসী- সংগ্রামশীল মানবজীবনের গতি ও বেগ তাঁর কাব্যে প্রতিফলিত হয়নি, ইতিহাসবেদ থাকলেও সমাজবেদ নেই। আমার মনে হয়, জীবনে মাত্র পূর্বজ কবিতা পাঠ এবং অনবিনিবেশ পাঠের থেকেই এ ধারণা হয়েছে। এ-কথা অবশ্য সত্য যে, জীবনানন্দ কোনো ‘প্রাক-নির্দিষ্ট চিন্তা বা মতবাদের দানা’ বহন করে কবিতা লিখতেন না; কারণ, তিনি মনে করতেন যে, ও রকম ধারণা নিয়ে বিশুদ্ধ কবিতা লেখা সম্ভব নয়।” [পৃ: ৭২]

জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দাশ সম্পর্কে অনেক রকম গল্প শোনা যায়। তার অভিনয় করার বাসনা ও স্বাধীন জীবনাচার নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। সে সম্পর্কে জীবনানন্দের মনোভাব তেমন একটা প্রকাশ্যে আসে না। একটি আলোচ্য গ্রন্থে ‘মানুষ জীবনানন্দ’ রচনায় লাবণ্য দাশ সে সম্পর্কে একটি গল্প বলেছেন :

“১৯৫৪ সালের ১২ই মার্চ আমি যখন ‘চলোমি’ ক্লাব থেকে রঙমহলে রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ বইতে মেজো বউরানীর পার্ট করলাম, তখন বিরুদ্ধ সমালোচনা হয়েছিল বৈকি। কেউ কেউ এ মন্তব্যও করেছিলেন, ‘তুমি কি শেষে তোমার বউকে স্টেজে নামাবে নাকি?’ উত্তরে কবি বলেছিলেন, ‘আমি এখনও মরিনি। আমার স্ত্রী কী করবেন না করবেন সে দায়িত্ব আমার উপরে ছেড়ে দিলেই সুখী হব। আর এ তো সামান্য একটা ক্লাব থেকে থিয়েটার। যদি তাঁর ইচ্ছে থাকেÑ সিনেমাতে অ্যাকটিং করতে দিতেও আমার আপত্তি হবে না।” [পৃ: ৩৮]

সুবোধ রায়ের ‘জীবনানন্দ স্মৃতি’তে তাঁর সারাক্ষণের বই ও পাঠকেন্দ্রিক জীবন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি লিখেছেন :

“কথাটা মিথ্যে নয়। মেতে যেতেন, সর্বক্ষণ ডুবে থাকতেন বইয়ের মধ্যে। পড়তেন বেশিরভাগ ইংরেজি বই। যেদিন, যখন, যতোবারই গেছি বারান্দায় হাফ-ইজিচেয়ারে দেখেছি অধ্যয়নরত, একাগ্রচিত্ত জীবনানন্দকে। বাঁপাশে আরো দু’একখানা বই। জীর্ণ-বিবর্ণ একটা অক্সফোর্ড ডিক্সনারি, তিনরকম ইংরিজি দৈনিক, আনন্দ বাজার, যুগান্তর, দেশও আছে তার মধ্যে। আর সামনে ফুটরেস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে একটা খালি চেয়ার। আর বারান্দায় অনুপস্থিত মানেই নির্ঘাত বিছানায় শুয়ে বই পড়ছেন।” [পৃ: ১৩০]

এদের পাশাপাশি এ সংকলনে মুদ্রিত হয়েছে- নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শামসুর রাহমান, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পুর্ণেন্দু পত্রী, আলোক সরকার, ভূমেন্দ্র গুহ, ক্লিনটন বুথ সিলি, পবিত্র সরকার, কায়সুল হক, জয় গোস্বামী প্রমুখের স্মৃতিচারণ ও কাব্যবিশ্লেষণমূলক লেখা।

‘স্মৃতিতে জীবনানন্দ’ গ্রন্থটি শুধু স্মতিচারণমূলক একটি গ্রন্থ নয়, সকলের লেখার স্বতন্ত্র ও সম্মিলিত সুরে পূর্ণাঙ্গ জীবনানন্দকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ আছে এতে। সম্পাদকের শ্রম সার্থক হয়েছে নিঃসন্দেহে বলা যায়।

-ওবায়েদ আকাশ

  • জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ৮০

    নিজের মতো করেই ভাষা তৈরি করতে হবে

    newsimage

    জ্যোতিপ্রকাশ দত্তজ্যোতিপ্রকাশ দত্ত বাংলা কথাসাহিত্যের অপরিহার্য উচ্চারণ। তাঁর গল্পের স্বাতন্ত্র্য ও কাব্যনির্ভরতা

  • জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের রচনা-

    শূন্যে সেই উদ্যান

    newsimage

    এক পর্বতসানুদেশে এক পর্ণকুটিরের কথা শোনা ছিল। ক্ষীণস্রোতা তটিনীর তীরে। পাইনের বন সারি

  • গিরিশ কারনাড

    সমাজ সংস্কৃতির অম্লান আলো

    গৌতম গুহ রায়

    newsimage

    হতে পারতেন ইংরেজি ভাষায় কবিতা লেখা সফল ভারতীয় কবি, হতে পারতেন দর্শনের

  • পোস্টমডার্নিজম, উত্তরআধুনিকতা এবং উত্তরচেতনা

    জিললুর রহমান

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) খ. পোস্টমডার্নিজম পোস্টমডার্নিজমের ‘Post’-শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার ‘postis’ থেকে। ‘postis’-এর অর্থ

  • তাহাদের কথা

    মাকিদ হায়দার

    newsimage

    মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ হাজার হাজার বছর আগে। এক সময় এই মানুষেরা বনজঙ্গলে

  • বসতভিটে গো ভালোবাসা নাও

    দিলারা মেসবাহ

    newsimage

    বসতভিটে গো ভালোবাসা নাও দিলারা মেসবাহ লোকমুখে শুনি আমাদের অবসন্ন ভিটে ক্ষয়রোগে শয্যাশায়ী প্রায়! আহা