menu

কবি জাহাঙ্গীরুল ইসলাম

স্মৃতি ও কবিতা থেকে

সৈকত রহমান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর ২০১৮
image

জাহাঙ্গীরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে বা লিখতে যদি যাই, দেখি আমাদের ব্যক্তিগত কিছু কথা অনায়াসেই চলে আসে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বছর আমাদের একসাথে চলাফেরা ছিল এবং তারপরও ওদের পরিবার গোপালগঞ্জের মেরি গোপীনাথপুরের শরীফ বংশ। আমার বড় মামাও বিয়ে করেছিলেন এই পরিবারের মেয়ে জাহাঙ্গীরের ফুফুকে। আমাদের গ্রাম দুর্গাপুরেই (ফরিদপুর, বোয়ালমারী উপজেলা) আমার মামা বাড়ি। ছোটবেলায় দেখেছি। বড় মামির বেশ ক’জন ভাইকে। তারা বোন বাড়ি বেড়াতে এলে আমাদের বাড়িতে আসবেনই। তারা গৌরবর্ণ ও খুব সুন্দর দেখতে। রসিক মেজাজের আড্ডাবাজ, ফুর্তিবাজ। গল্প করতে করতে দল ধরে বিকালে তেলজুড়ি বাজারে যেতেন। ফিরতি পথে আবার আড্ডা মেরে যেতেন আমাদের বাড়িতে। জাহাঙ্গীরের আর এক ফুফুকে বিয়ে করেছিলেন আমার এক চাচা। এই চাচার এক ছেলের সাথে বিয়ে হলো জাহাঙ্গীরের বড় বোনের। অর্থাৎ মামাতো-ফুফাতো ভাইবোনে বিয়ে। ইত্যাদি পুরনো নতুন আত্মীয়তার সম্পর্ক আমাদের ওদের পরিবারের সাথে।

জাহাঙ্গীরকে আমি মোটেই চিনতাম না। শুধু ওর বড় বোন মমতা আপা আমাদের ফটু (গোলাম আকিল সিকদার) ভাইয়ের বৌ হয়ে গ্রামে এলে তাকে চিনলাম। তিনিও সুন্দরী আর আলাপী। জাহাঙ্গীরের বাবা, জালালউদ্দীন আহমদ শরীফ। তিনি রেলগাড়ী পরিচালনের চাকুরি করতেন। কাটাতেন দূরে। লালমনিরহাট, পাকশি, রংপুর, রাজবাড়ী, বিভিন্ন স্থানে। এই স্থানগুলোর কথা জাহাঙ্গীর প্রায় বলতেন যখন আমাদের একসময় সখ্য গড়ে ওঠে। ওর বাবাকে আমরা মামা বলতাম। জাহাঙ্গীরের বাবাকে চিনতাম। উনি দুর্গাপুরে বেড়াতে আসতেন। দীর্ঘদেহী, গৌরবর্ণের। সদালাপী, হাস্যোজ্জ্বল মানুষ ছিলেন।

তবে জাহাঙ্গীরের সাথে আমার প্রথম দেখা ১৯৭১ সালে। এক আলো-আঁধারি সন্ধ্যায় অদ্ভুতভাবে। বিলের ধারে আমাদের বাড়ির সামনে বড় পুকুর। পুকুরের পানি আর বিলের পানি একাকার। পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধরত দেশের আতঙ্ক ছিল সন্ধ্যার অন্ধকারগুলিতে আরো বেশি। দুটো ডিঙি নৌকা, আমরা পাশাপাশি হলাম। জাহাঙ্গীর যে নৌকায়, সে নৌকায় ছিলেন আমার বড় ভাই, শোয়েব (শোয়েবুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি প্রশাসনিক ক্যাডার ছিলেন, যুগ্ম সচিব থেকে বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), আর একজন বয়জ্যেষ্ঠ ভাতিজি মতি (মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা থেকে অবসরপ্রাপ্ত, বর্তমানে কানাডার বাসিন্দা)।

তারা সমবয়সি তিনজন ডিঙ্গিটাতে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আমি জাহাঙ্গীরকে কোনোদিন দেখিনি। প্রশান্ত ললাটের শান্ত সে তরুণের প্রতি আমার কৌতূহল মিটাতে মতি রসিক মেজাজে বলে, চাচা তুমিও তো কবি, এই আর একজন কবি আছে আমাদের নৌকায়। আমাদের ‘ঠান্ডু মামা’, তোমাদের হলেন বিয়াই, ফটু কাকার শালা, যা বললে ভালো চিনবে। দু’চারটি কথা। আমার সাথে এক সমবয়সি ভাতিজা ছিল নৌকায়। ওরা তিনজনই বয়জ্যেষ্ঠ, তাই আমরা দুজন তখনকার মতো পৃথক হলাম। কিন্তু পরদিন সন্ধ্যায় ঘটনাক্রমে আমি জাহাঙ্গীরের সঙ্গী হয়ে গেলাম। তখনো তাকে ‘ঠান্ডু ভাই’ বলেই জানি, জাহাঙ্গীরুল ইসলাম নামটি তখনও পাইনি। একটা একমাল্লাই ছইওয়ালা কেরায়া নৌকায় দু’জন চলেছি আমাদের গ্রাম থেকে মাইল দুই আড়াই দূরে কুমারদের এক গ্রামে। বোয়ালমারীর দিক থেকে আসা বারাসিয়া নদীর পাড়ের কাছাকাছি। যে বারাসিয়া নদী ধরে অনেকবার রাজাকার, আলবদর, পাকিস্তানী মিলিশিয়ারা লঞ্চে যাতায়াত করেই চলেছে। বোয়ালমারী বাজারটাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শ্মশান করে রেখেছে। বহু গণহত্যা হয়েছে তাদের দ্বারা।

আমাদের টাবুরে নৌকাটা বন্যার মদো চারদিকে আসা ভয়াবহ পানিতে চলে একঘণ্টার মধ্যে এসে অন্ধকার কুমারদের গ্রামে ভিড়ে। দু’এক বাড়িতে বাতি আছে কি নেই। এ গ্রামের মানুষ সবই প্রায় ভিটেবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। গ্রামটায় পাকিস্তানিরা তাদের দোসরদের সাথে হানা দিয়ে বিরান করে ফেলেছে। আমি নৌকায় থেকে গেলাম। ‘ঠান্ডু ভাই’ একটু দূরে এক কুড়ে মতো ঘরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফিরে এলেন, তাকে এগিয়ে দিতে এলেন এক তরুণ। তার গায়ে খাটো চাদরের নিচে আগ্নেয়াস্ত্র ঝোলানো। আমরা ফেরার পথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলাপের এক পর্যায়ে ঠান্ডু ভাই বললেন: তার গেরিলা বাহিনিতে যোগ দেবার কথা। বিহারের ট্রেনিং সেন্টারের কথা। তিনি চাচ্ছেন বোয়ালমারির এই ক্যাম্প থেকে ছাড়পত্র নিয়ে নিজের এলাকা গোপালগঞ্জের দিকে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগ দিতে। তিনি তখন রাজবাড়ী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করা তরুণ। আমি গোপালগঞ্জ কায়েদে আজম কলেজে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু কলেজ) ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। কয়েকদিনের মধ্যে হাঠৎ একদিন শোয়েব ভাই আমাদের গ্রামের আর তিনচারজন ভাতিজা মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভারত চলে যায়। আমি ও আমাদের গ্রামের লুৎফর, সুরুজ, লতিফসহ কিছুদিন পর যুদ্ধে যোগ দিতে পাড়ি দেই ভারতে।

যুদ্ধশেষে স্বাধীন বাংলাদেশ। আমি ফিরে এসেছি গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু কলেজে। জাহাঙ্গীর ভর্তি হয়ে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলা বিভাগে। এ বছর আমি একটি ছোট সাহিত্য পত্রিকা ‘নিসর্গ’ বের করি। জাহাঙ্গীর তার জন্য দু’তিনটি কবিতা দিয়েছিলেন। আগুন, চিঠি, নির্মুক্ত এখন পালাও। এ কবিতাগুলো তাঁর কবিতা সমগ্রেও আছে। ১৯৭৩-এ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়তে গেলাম। জাহাঙ্গীর ভাইর সাথে ঘুরে প্রথম বিভিন্ন হল, ক্যাফেটোরিয়া, শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন, টিএসসি চিনলাম। অনুভব করলাম ইতিমধ্যে তিনি কবিদের দলেও ভর্তি হয়ে গেছেন। কুড়ি পঁচিশ পয়সায় একটি ডালপুরি, সিংগাড়া বা চা। শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে কবিদের আড্ডা। আসেন সেখানে তরুণ কবিরা, রাজনৈতিক তরুণেরা, রেডিওর প্রোগ্রাম কর্মকর্তাগণ, নাট্যকর্মী, সাংবাদিকগণ। নির্মলেন্দু গুণ কবি হিসেবে অগ্রসর হয়ে আছেন। তাঁর দ্বিতীয় কাব্য ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ এরই মধ্যে প্রকাশ করেন। তখনো রফিক আজাদের বই নেই, আবুল হাসানের নেই। সিকদার আমিনুল হকের নেই। এরকম অনেকের কথা বলা যায়।

যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় কেবল বসেছেন, আমরা স্বপ্ন দেখছি তার হাতে ধীরে ধীরে সোনার বাংলা দেখতে পাব। কবিরা নতুন বাংলাদেশের জন্য বাংলা ভাষায় নতুন কবিতা লিখবে। নতুন স্বপ্নের বাংলাদেশের ধারক হয়ে উঠতে চাইছে তারা।

একদল কনিষ্ঠতম কবিরাও তখন এসে গেছে। জাহাঙ্গীরুল ইসলামকে পেলাম, তাঁর অল্প কিছু কবিতা এখানে-ওখানে ছাপা হয়েছে এবং তরুণ প্রতিভার স্বাক্ষর তৈরি হচ্ছে। দৈনিক বাংলার তখন সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবীব। পত্রিকাটির সাহিত্য বিভাগ তাঁর সরুচির ছাপে সাহিত্য প্রেমিকদের কাছে সমীহযোগ্য হয়ে ওঠে। জাহাঙ্গীরের বেশ কটি কবিতা তাতে পর পর ছাপা হলো। একজন তরুণ কবির জন্য বিষয়টি গ্রেটমার্কস ছিল। একরকম নতুনত্বের ভালোলাগা ছিল কবিতাগুলোয়। সেই ছোট লিরিকটি ভোলা যায় না, সারাবেলা খোলা ছিলো/একটিবার আমি না হয় বেরিয়ে পড়েছি/তুমি কেন দুয়ার ঠেলে ছড়িয়ে পড়লে না/ চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে/পানি ছেড়ে যাওয়ার শব্দ শুনেছিলাম/তোমার পোশাকে/তুমি কেন একটু গোলাকার হয়ে ছড়ালে না/ আমি তো সেই কবে নদী থেকে ফিরেছি/ জালে ও জলের ভিতরে/এখনো জড়িয়ে পড়ার মতো মাছ দেখি/মাছরাঙা পাখিটিও দেখি/একটিবার আমি কেন তোমাকে দেখি না/সারাবেলা খোলা ছিলো/একটিবার আমি না হয় বেরিয়ে পড়েছি।’ (সারাবেলা খোলা ছিল)

কবিতা সম্পূর্ণ একটি যে আর্ট তা তরুণ বয়সেই ভালো বুঝেছিলেন জাহাঙ্গীর। যা কিছু লিখতে যাচ্ছেন ভেবেচিন্তে অগ্রসর হচ্ছেন। দ্রুত কিছু করে বাজিমাত করার মতলব ছিল না কখনোই। দুজনেই থাকতাম জহুরুল হক হলে। আমার এক বছর আগে এসেও জাহাঙ্গীর সিট পাননি। হলের অডিটোরিয়ামের দোতলার একটি বড় কক্ষ। টেবিল টেনিসের সরঞ্জামাদি ছিল সেখানে। খেলাধুলা চলে মনে হয় না। জাহাঙ্গীর আমাকে সেখানে থাকতে নিয়ে এলেন। বিছানা বালিশ যৎসামান্য। টেবিল টেনিসের টেবিলগুলোই খাটের কাজ দিচ্ছিল। গান, কবিতা লেখা আর গল্প-আনন্দ করেই কাটছিলো সেখানে আমাদের রাতগুলো। ফাঁকে ফাঁকে ডিপার্টমেন্টের ক্লাস। কিন্তু ছাত্রত্বের শৃঙ্খলার যে জীবন তা মোটেই হয়ে উঠছিলো না।

জাহাঙ্গীরদের পরিবার থাকত তখন রাজবাড়ীতে। তিনটি বোন পড়ছে তখন স্কুলে। আরও তিন ভাইও তখন লেখাপড়া করে। বাবা মা। আটজন সদস্যের জন্য ছোট্ট একটি রেল-কোয়ার্টার। জাহাঙ্গীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। বাবা তেমন কিছুই আর্থিক সহযোগিতা তাঁকে দিতে পারেননি। আর্থিক স্বাবলম্বন খুঁজে পেতে ‘পদক্ষেপ’ নামে একটি সাপ্তাহিক সংবাদ পত্রিকায় কাজ জুটে গেল। পুরনো ঢাকার হাটখোলা রোডে একটি বাড়িতে ছিল ‘পদক্ষেপ’ পত্রিকার কার্যালয়। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সেখানে সহযোগি সম্পাদকের কাজ করেছেন তিনি। পত্রিকাটি মূলত ছিল তখনকার যুবলীগের একটি কার্যক্রম।

কবিতা নিয়ে তার শক্ত হিসেব-নিকেশ ছিল ভিতরে ভিতরে। একটি কবিতাকে ফর্ম এবং ভাবনা বৈশিষ্ট্যে কতদূর মনোগ্রাহী করা যায় পাঠকের কাছে, তার জন্য ভাবতেন অনেক। কয়েকদিন ধরে। একটি কবিতা দুলাইন লিখে শুরু করেছেন অথবা নামটাই আউড়েছেন মনে মনে। সেই দুটো লাইনকে সম্পূর্ণ কবিতায় রূপ দিতে খাটতেন, রাত জেগে বা অবসর পেলেই। নাম ঠিক রেখে বিষয় হাতড়াতেন, জট খুলতে চাইতেন কোথায় রয়েছে সেই কবিতার সোনার মোহর বা রসের সন্ধানে শব্দের অনুসন্ধান করতেন। সব থেকে বড় কিন্তু কবির নিজের জীবনে সবকিছু অনুভব করা, কীভাবে দেখছেন তিনি দিনদুনিয়াকে।

তবে কবিতায় জীবনের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি থাকাটা তার কাছে বড় বিষয় ছিল। আমাদের সে সব গল্প হতো। জীবনের গল্পকে ভালোবাসতেন। মানুষ, মানুষের সমাজ, দেশ, বিশ্ববোধ এসব তার ভাবনা-আলোড়নের ক্ষেত্র ছিল। পরিচ্ছন্ন, উন্নত আদর্শের জীবনচর্চা, ন্যায়নিষ্ঠ-কল্যাণকর সমাজ তার উদ্দিষ্ট ছিল সন্দেহ নেই। কবিতা ছিল তার জ্ঞানে, নশ্বর পৃথিবীতে দুর্লভ ধনের মতোই প্রিয়। একে অর্জন করা এক দুঃসহকষ্টসাধ্য। কবি উৎপলকুমার বসু, কবিতা সম্পর্কে একটি ক্ষুদ্র উক্তি করেছেন, ‘কবিতা ম্যাজিকমাত্র এবং রসায়ণ এবং দক্ষতা।’ জাহাঙ্গীর ওই ক্ষুদ্রবাক্যকে অনুধাবণ করেছেন খুবই সফলভাবে তার কবিতার কাজে। অবশ্যই উৎপলের বাক্য মনে করে নয়, কর্মকান্ডের নিজস্ব ধরনটাই তাকে উৎপলের ধারণার ধারেকাছে নিয়ে গেছে।

তিনি বহু বহু শ্রমসাধ্য কাটাছেঁড়া করতেন কবিতায়। সময় নিতেন অবিশ্বাস্যরকম দীর্ঘ। অর্থাৎ তাঁর পছন্দ মতো বাক্য গঠনে বহু শব্দর অনুসন্ধান নিয়ে মাথা ঘামাতেন। তবে তাঁর পক্ষপাত ছিল সাধারণে চল এমন শব্দ যা ধ্বনি ও অর্থগতভাবে চূড়ান্ত আভা ছড়ায়। কবিতাকে এমন নতুনতের আভায় নির্মাণ করার ইচ্ছাই রাখতেন, ব্যক্তও করতেন কথা প্রসঙ্গে। বাংলা ভাষায় মানুষ অহরহ বাক্য বিনিময় করছে পরস্পর। সাধারণের বোধবুদ্ধি আস্থা অবিশ্বাসের মধ্যে বাক্য বিনিময়ের আবেগ বা ঝোঁক থেকে নানা ঝলকের দুর্লভ সব শব্দ ব্যবহারের ধরন বেরিয়ে আসে। বাক্য গঠনেও অভিনব সব কৌশল লক্ষ্য করা যায়। অসচেতনভাবেই বা জীবনধারণের বিচিত্র ছন্দে মানুষ ভাষাবোধে এসব গুণাবলির অধিকারি যেন। তার কবিতাচর্চার মধ্যে এ ধরনের মৌখিক চর্চার শব্দবন্ধ খুব লক্ষ করি আমরা। তবে জাহাঙ্গীর তার নিজস্ব ভাবনার ক্ষেত্রে কাব্যকৌশলে তাকে উচ্চমার্গী একটি কাব্যিক স্থানে নিয়ে যান। যেমন ‘দখল’ কবিতার শুরুটা এরকম: “লম্বা মোচ আর জুলফি আর বুকে/ঝুলিয়ে তাবিজ/দেখেছি অনেকদিন আমার হৃদয়/নাছোড়বান্দা ধরেছে/নজরুলের গান।/খাবার টেবিলে কিংবা টেবিলে তার/দূরদর্শিতা জ্ঞান দিয়েছে আমাকে/দেখুন, হাতের চেয়ে পাখনায় অনেক/সুবিধা বেশি।”

একটি কবিতাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপে দাঁড় করাতে কখনো দীর্ঘ সময় চলে যেতো। ছ’মাস আগে যে কবিতার চার লাইন শুনিয়েছিলেন, তাকে নিয়ে এসেছেন ছ’মাস পর। লিখছেন, কাটছেন পছন্দ মতো শব্দও বিন্যাস করছেন। বিষয়বস্তুকে কোনোভাবে নতুন করে গড়ে তোলা যায় তারই প্রচেষ্টা থাকত।

হলে আমরা তখন সিট পেয়েছি। জহুরুল হক হলের বর্ধিত ভবন উঠেছি। সেখানে প্রায়ই এক কক্ষে থাকতাম আমরা। ফরিদপুর, বোয়ালমারীতে থাকতেন ওর সেঝো খালা। ছেলেমেয়ে নিয়ে এক সুখী পরিবার। জাহাঙ্গীর বেড়াতে যেতেন সেখানে। একবার ফিরে এলেন সেখানকার স্মৃতি নিয়ে। সেখানে আবেগঘন কিছু ব্যাপার ছিল। লিখতে লেগে গেলেন কবিতা। এই সময়ে শব্দানুশীলন নিয়ে বেশ জোর মাথা ঘামানো ছিল। চিত্রকল্প, উপমা, ছন্দ, অনুপ্রাস ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিচ্ছিল। তা ছিল কবির প্রথম যৌবনের সৃষ্টিশীলতার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়। কবিতা সমগ্রে স্থান পাওয়া প্রাক্তন কবিতাটি। সেই দূর মফঃস্বল-থানা শহরের স্মৃতি আঁকা যেন কতিাটিতে। কিন্তু ‘য়ালমারী’ কবিতাটিতে সেঝো খালা উপস্থিত হলেন, তিন দশক পর পুনরায়। সেঝো খালা যদিও ‘প্রাক্তনে’ উপস্থিত নেই সরাসরি। তাঁর বাড়ির আঙ্গিনায়-পরিবেশের স্থানগুলোর ল্যান্ডস্কেপ ইঙ্গিতে আছে। কিন্তু প্রাক্তনের চেয়ে ‘য়ালমারী’ বেশ ভালো লাগে আমার। এ কবিতার কাব্যগরিমা অনেক স্বচ্ছ ও কোথায় যেন কবিতায় চিরন্তনী দিগন্তকে এঁকে দিয়েছেন কবি: “আমি দেখি, শুধু দেখি,/একটি অলৌকিক য়ালমারীর ভিতরে আমি...।” এখানে সেঝো খালার ছবিটিকে কবি যে শৈল্পিক স্থানে ফ্রেমবন্দি করেছেন তাকে আমাদের প্রিয় ঘরের দেয়ালে রাখতেই হবে। এ প্রসঙ্গে তার মাকে নিয়ে লেখা ‘আমার মা একটি কদুর ফুল’ ও ভালো লাগার কবিতা। এ কবিতাটিও দীর্ঘদিন ধরে কবি লিখেছিলেন। আশির দশকের গোড়ায় কবিতার নামটি তার মুখে শুনেছিলাম। ২০০৮, জানুয়ারিতে সম্পূর্ণ কবিতার স্বাক্ষর পাচ্ছি। ছাপা হয়েছে কবিতা সমগ্রে। যে কবিতা অন্য কোথাও আগে ছাপা হয়নি।

‘প্রাক্তনে’, ‘অর্থ অবাক বাঁক ঘুরে পুকুরে ডুবে থাকে/যথা রজকিনী আঁখির নমুনা, নানা অঙ্কিত উপমা রেখে/চলে যেতে হয় কোনোখানে, -একটি দুলতুল্য মাছ খুঁজিতেছে/আকাশের গালে একটি তিলের মতো চিল ওধারে/খিলখিল কেউ চলে গেলে যাহা ঢেউ বলে সবাই চিনেছে/আমি তাকে কখনো চিনি না।’ ভাষার কারকাজ দক্ষতা অনুশীলন পর্বের কবিতা এরকম আরো কিছু আছে। কিন্তু ‘য়ালমারীর ভিতর প্রাণভ্রমরা আছে। কবিতার আত্মা সাধারণ গদ্য-কথার ভিতর দিয়ে অলৌকিকের মতো জায়গা নিয়েছে। কবির জন্য তৃপ্তিদায়ক সৃষ্টি এ কবিতা, আমরা ভুলে যাই না প্রায় কখনোই। এর সবটা মিলে আঁটো-আর্টের এক চিত্র আঁকা। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানতাম, এই সেঝো খালার বাসার প্রতি কবির এক ভালোলাগা। সে জন্য বিশেষ এক অর্থ কাহিনি হয়ে আমার কাছে ধরা দেয়, এ কবিতাটি পাঠ করলে।

কবিতা নিয়ে তাঁর সাথে কত রকম মতবিনিময় হতো। কিন্তু জাহাঙ্গীর তর্ক জিনিসটিকে মনে হয় অসুন্দর ভাবতেন। কোনটি ঠিক কবিতা, কোনটি ঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি, তার ঠাওর এ ব্যাপারে ছিল টনটনে। তাঁর অবিস্মরণীয় কিছু কবিতা লেখার মূল্যে একথার সত্যতা মিলবে। জীবনানন্দ দাশের ‘উপমাই কবিত্ব’-এ কথাটি তাঁর ভালোলাগার একটি উক্তি। যথাযথ রসাশ্রয়ী-উপমা কবিতায় বসানোর বেলায় সত্যি তাঁর জুড়ি মেলাভার। একটি যুৎসই উপমার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে দেখেছি বহুক্ষণ বা দিনের পর দিন। এই ধৈর্য অবাক করা। উপমা কাব্যের বড় আর্ট, কবিতার ক্ষেত্রে সে উপমা বা চিত্রকল্প যাই অনুশীলন হোক তা বিষয়ের সাথে অঙ্গাঙ্গি হতে হয়। এই আর্ট অনুশীলনকে কবিতার বিষয়গত আনুগত্যে প্রকাশের বেলায় বিষয়কে দুর্বল হতে দেননি কখনোই। এই উপমাশক্তিতে তাঁর কাব্যের অন্তরভাগ সমৃদ্ধ ও উপভোগ্য। কবিতা সমগ্রের ‘বাণী’- কবিতা: ‘তোমাকে বলার মতো কিছু কথা/জড়ো করি রোজ, সমুদ্রে শ্যাওলার গভীরে/নিস্তব্ধ সাঁতার কাটার মতো আমি ভাবি,/ মাছের চোখের গাঢ় কাজলের মতো,/তুমি একা হয়তবা সংসারের কাজে,/ফ্রিজে সতেজ রাখতে চাও যেভাবে, পচে গলে/যাওয়া যা কিছু আমাদের ব্যর্থতার মতো/জীবনানন্দের কবিতার মতো লম্বা রাস্তা ধরে/আরেকটু সামনের দিকে, ঘনজঙ্গলের ছায়ার/নিচে অজানা উৎকণ্ঠায় কোনো পাখির ডানা/কাঁপানো শব্দের মতো কিছু কথা, প্রাগৈতিহাসিক/গুহার অন্ধকার থেকে উচ্চারিত উজ্জ্বল/কোনো পঙ্ক্তির মতো।’

ব্যক্তিসত্তাকে নিয়ে সমূহ সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ানোর বিষয়টি তাঁর কবিতায় বারবার দেখা দেয়। ব্যক্তির অস্তিত্ব, সম্মান, অধিকার- এ সব সুরক্ষার বিষয় তৈরি হয় সামাজিক মধ্যস্থতার দরুন। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় স্তরগুলো ব্যক্তি সংকটকে প্রবল এবং জটিল করে। ১৯৭৫-এ বাঙালির প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং পরবর্তীতে তাঁর সুযোগ্য রাজনৈতিক সহচর, উত্তরাধিকার, মুক্তিযোদ্ধা চার নেতাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘোরতর অন্যায়ের সাথে জুলুম নেমে আসে সমাজে- যা দেখতে হয় সবার সাথে একজন কবিকে। সমাজ-দেশের সংকটের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে কবির অস্তিত্ব হতে থাকে বিপন্ন, পর্যুদস্ত। ‘জন্মসূত্র’ কবিতায় বিস্তৃতভাবে আরো অন্যান্য কবিতার বিশেষ বিশেষ পঙ্ক্তিতে সময়ের সংকটকে কবি ভালো করেই উপস্থিত করে দেখিয়েছেন: “হয়ত জন্মিনি এখনও, শুধু ঝড়ের তা-বে/অবিন্যস্ত বৃক্ষের মাথায় বসিয়ে রেখেছো/পাখিদের মতো, বাস্তবিক এখনো জানি না/কী কাজে পারদর্শী হতে পারি/এমন দুর্গত মনুষ্য জীবনে/ আমি তো সামান্যজন, জন্মিনি এখনো তাই/তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ছুঁড়ে দেয় সরাসরি চোখের ভিতরে,/যেন এক্ষুণি ছুরি ঢুকিয়ে উপড়ে ফেলবে চোখ,/হাতের পাঞ্জা কেটে নিয়ে যাবে/যদি আর লিখি বেফাঁস কবিতা।” এরপরটুকু “তাহলে কি জন্মেছি আমি? সবার অলক্ষে/নিয়তির নির্মম হাস্যরসে রঞ্জিত করেছি নিজেকে/দেব শিশু নই, নই কারো জারজ সন্তান, তবু যদি/অকারণে মতিভ্রম হয় এই সংসারের তাবৎ জৌলুসে/ আমার হৃৎপিন্ড আমি আপেলের মতো/ছিঁড়ে এনে রেখে দেব তোমাদের সোনার থালায়।”

এক দার্শনিক নৈর্ব্যক্তিকতায় তিনি উদারনৈতিক মহত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, তাই এভাবে বলতে পেরেছেন: “এখনো ঠিকমতো সকাল হয়নি বিকশিত/নম্রমধুর/জ্বালাময়ী, নীলাকাশ জুড়ে/কুসুম কোমল কমলার রঙে আবৃত/শাড়িতে মুগ্ধ সঙ্গিনীর ললাটে/না হয়, বিপ্লবে, বিরহে বাঙালির মনে/শতাব্দীর সেরা সকাল আসুক/জাতীয় ফুলের মতো অন্য এক, একা নিঃশব্দে/অনন্ত রাত থেকে... আমাদের সম্পূর্ণ জীবনে, জন্মান্তরে, কবিতায়।”

  • বিশেষ সাক্ষাৎকার

    কিছুটা এমার্জেন্সি কবির বাঁচার মধ্যে থাকে

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    newsimage

    প্রশ্ন : এই যে এত বছর বিদেশে থাকা, বছরে একবার করে আসা,

  • সমর সেন : কেন প্রাসঙ্গিক

    দারা মাহমুদ

    newsimage

    কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ দু’জন অপরিচিত তরুণ

  • রমা চৌধুরী

    মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নভেলায়

    খালেদ হামিদী

    newsimage

    আমার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একমাত্র উপন্যাসিকা ‘সব্যসাচী’তে রমা চৌধুরী আছেন, নভেলাটির শেষাংশে, এভাবে:

  • দিদি ও আমার দিন-যাপনের খসড়া

    আলাউদ্দিন খোকন

    newsimage

    ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বিকেল ৫টা। দিদি চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউ-তে। জন্মাষ্টমির বন্ধ চলছে।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    একটি মনোরম সন্ধ্যার আর্তি কাজী সুফিয়া আখতার বেঙ্গল বইয়ের লাইব্রেরিতে বুধবার বিকেলে হঠাৎ করেই

  • অপ্পো কথার গপ্পো

    লিটন চক্রবর্তী মিঠুন

    newsimage

    আর দশটা বিষয়ের মতো সাহিত্যও হরেক রকম। নানা তার চেহারা, বিচিত্র তার

  • জনক

    শামীম আহমেদ

    newsimage

    বাড়ির আঙিনায় ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল সৈকতের। চারদিকে বিদঘুটে অন্ধকার। জেনারেটর