menu

স্বদেশী জাতীয়তাবাদ আর মাটির টানে জরাসন্ধের ‘বন্যা’

বাদল বিহারী চক্রবর্তী

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০
image

বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা সাহিত্যে যে ক’জন যশস্বী ঔপন্যাসিক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে জরাসন্ধের (১৯০২-১৯৮১) নাম উল্লেখযোগ্য। অবিভক্ত ভারতবর্ষের ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এই খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক। এটা তাঁর ছদ্মনাম, আসল নাম চারুচন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর রচিত গ্রন্থ বা উপন্যাসের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও ‘বন্যা’ উপন্যাসটি তৎকালীন রাষ্ট্রনীতি, সমাজ, দেশপ্রেম ও ধর্মীয় বিধি-বিধান সমন্বিত এক অমর উপন্যাস। এ উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ও বিবরণ ছিল গাঁয়ের একটি অনগ্রসর স্কুলের অবস্থা ও অগ্রগতিকে কেন্দ্র করে।

বন্যা উপন্যাসে জরাসন্ধ স্থান, কাল, পাত্র ও পরিবেশ বিবেচনায় নির্বাচন করেছেন ব্রিটিশ শাসনামল। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার একটি গ্রামের নাম- ‘ফুলহাটি’। ব্রাহ্মণী নদীর ধারে স্থাপিত হয়েছে ‘ফুলহাটি বিশ্বনাথ হাই স্কুল’। আর ফুলহাটির মতো এক দরিদ্র অজ পাড়াগাঁয়ের এ-স্কুলটার সার্বিক কল্যাণে যে দু’চার জন আত্মনিবেদিত ব্যক্তির ছিল প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, তাঁদের মধ্যে অন্যতম স্কুলের প্রধান শিক্ষক জগদীশ ব্যানার্জি। প্রয়াত পিতা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড়া স্কুলটির ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাকি চারটা ক্লাস পর্যন্ত ঠেলে নিয়েছিলেন সুযোগ্য পুত্র জগদীশবাবুই। আর তিনিই স্কুলটির নামকরণ করেন পিতার নামানুসারে।

বাস্তব জীবনে জরাসন্ধ অর্থাৎ, চারুবাবু তাঁর কাজের সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা মত ও পথের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা ও বিচিত্র সমাজচিত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে-সমস্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই তৎকালীন পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের দাপটের মধ্যেও খাঁটি ভারতীয় বাঙালির মানসচিত্র ও দেশপ্রেমের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত নজির দেখাতে চেয়েছেন তিনি, তাঁর উপন্যাসে।

উপন্যাসে বর্ণিত ব্রাহ্মণী নদী, বর্ষার দু’মাসে ক্ষরওস্রোত হয়ে যায়। স্কুল ভিজিট করতে আসবেন ইংরেজ সাহেব জন হান্টার। হুগলা পাতার বেড়া আর ছাউনিতে গরিবানা হালে প্রতিষ্ঠিত ফুলহাটি বিশ্বনাথ হাই স্কুল। সাহেবের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে স্কুলের স্থায়ী এ্যাফিলিয়েশান, তথা উন্নতি। তাই সাহেবকে খুশিতে বরণ করার জন্যে স্কুলের কয়েকজন ছাত্রকে পাকা দু’দিন মহড়া দিলেন একটি ওয়েলকাম সঙ গাওয়ার জন্যে। তাই, বড্ড খেদ নিয়েই শুষ্ক হাসির ভঙ্গিতে স্কুলের বৃদ্ধ হেড পণ্ডিত (যিনি একসময় হেড মাস্টারকেও পড়িয়েছেন) ইংরেজির টিচার বীরেশ্বরবাবুকে বলেছিলেন, “চলুক, তোমার ওই ইংরেজি গানই চলুক। বাপের বয়সে কখনো শুনি নি; এবার তোমাদের জন হান্টার না ফান্টার সাহেবের কল্যাণে শোনা যাবে।” লক্ষণীয় যে, লেখক নিতান্ত ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ চেতনা, দেশাত্মবোধ ও ফিরিঙ্গি সংস্কৃতির প্রতি একপ্রকার পরাধীনতার গ্লানি জনিত সুপ্ত ঘৃণার মানসেই নিজের অভিব্যক্তিটা পণ্ডিত মশাইয়ের মুখ দিয়ে প্রকাশ করলেন। তবে সাহেবকে তুষ্ট করা স্কুলের অবস্থান ও পরিবেশে তৈরি ওয়েলকাম সঙটা ছিল বেশ। ছাত্রদেরকে নিয়ে বীরেশ্বরবাবু গাওয়াতে চেষ্টা করেন-

‘উই ওথ্ দ্য ও বিলাভড্ জন,

উইথ ওপেন হার্ট এ্যাট লাভলী ডন,

ইন্ দ্য স্কুল এ্যাট ফুলহাটি;

অন দ্য রিভার-ব্রাহ্মণী...ই...ই...ই।’

কিন্তু দুঃখের বিষয়, ছেলেদের বয়স এমন পর্যায়ে যে, এদের কণ্ঠস্বর কিছুটা কর্কশ, কিছুটা মৈথিলি ও বর্মী; যার ফলে ইংরেজদের সেই প্রাণ মাতানো ঝঙ্কারটা কেউ ওঠাতে পারেনি। অবশেষে ওয়েলকাম সঙের আশা ছেড়ে পণ্ডিতমশাইয়ের শরণাপন্ন হতে হলো, তিনি যেন পাঁচজন ছেলেকে সংস্কৃত স্তোত্রপাঠ শিখিয়ে দেন। আর পণ্ডিতমশাইয়ের নির্দেশমতো এদের প্রত্যেকের গায়ে পরানো হলো খাঁটি ভারতীয় পোশাক। অর্থাৎ, ধূতির ওপর খদ্দরের চাদর। নদীর ঘাট থেকে দেবদারু পাতায় সজ্জিত দুটো সুদৃশ্য লাইন চলে গেছে হেড মাস্টারমশাইয়ের অফিস কামরা পর্যন্ত।

সাহেবের লঞ্চ খুব সকালে পৌঁছার কথা থাকলেও সকাল ন’টা বেজে গেলো। তিনি লঞ্চ থেকে তীরে পদার্পণ করতেই জোড়া শাঁখ বেজে উঠলো দেশীয় রীতিতে। সাহেব এ-সংস্কৃতির প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ‘আস্ক দেম টু স্টপ দ্যাট অ্যফুল নয়েজ; আই কান্ট স্ট্যান্ড ইট’। হেড মাস্টারের ইঙ্গিতে দু’জন শিক্ষক দৌড়ে গিয়ে থামিয়ে দিলো শাঁখ বাজানো। এর ভেতর দিয়েই জরাসন্ধ বুঝিয়ে দিলেন, কায়েমী স্বার্থে শুরু থেকেই ব্রিটিশরা এ-দেশীয় মানুষ ও সংস্কৃতিকে কী হীন দৃষ্টি দিয়ে দেখে আসছিলেন। ‘বন্যা’ উপন্যাসের বিশেষ বিশেষ পৃষ্ঠায় তিনি সমাজ ও পাঠককুলের চক্ষুদান করে গেছেন। এখানেই শেষ নয়, সাহেব সেদিন স্কুলের বারান্দায় পা রাখতেই পূর্ব নির্বাচিত ছেলেরা স্তোত্রপাঠ শুরু করে। তিনি সেই স্তোত্রের মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝলেন না। দোআঁশলা এই জন হান্টার নিজ হাতের ছড়ির সাহায্যে ন্যাড়া মুণ্ডিত জনৈক ছেলের মাথায় মৃদু মৃদু টোকা দিয়ে বললেন,

- টোমার মাটার চুল কোটায় গেলো?

- পৈতে হয়েছে স্যার।

- পৈটে! হোটস্ দ্যাট হোয়াইট স্ট্রিং ডুইং দিয়ার, গলায় এটা কি পেটিয়েছো? - এই বলে ছাত্রের গলা থেকে অবলীলায় পৈতেটা খোলে আনলে বীরেশ্বরবাবু তৎক্ষণাৎ পৈতেটা ছাত্রের গলায় পুনরায় পরিয়ে দিয়ে বললেন,

- দ্যাট ইজ সেক্রেট স্যার।

- সেক্রেট! হু হু হু! -এই বিকৃত হাসিতেও লেখক বুঝিয়ে দিলেন- ফিরিঙ্গিদের কতটুকু তাচ্ছিল্য প্রাচ্যদেশীয় ধর্মের আচারের প্রতি।

সেদিন সাহেব প্রথমে দশম শ্রেণিতে গেলেন। সেখানেও সাহেবের কিছু কথোপকথন আর মেজাজ পরিলক্ষিত হয়। তখন হেড পণ্ডিত ক্লাশ নিচ্ছিলেন। সাহেবের প্রবেশ করামাত্র পণ্ডিত পাঠদান থামিয়ে দিলে সাহেব বললেন, ‘ইয়েস, আপনি পড়াটে ঠাকুন’। পণ্ডিত মশাইয়ের ক’পাটি দাঁত পড়ে যাওয়ায় নতুন শ্রোতাদের বোঝতে কিছুটা অসুবিধা হয় বৈকি। তিনি পুনঃপাঠদান শুর করলে সাহেবও কিছুই বোঝতে না পেরে পাশে থাকা জগদীশবাবুকে জিজ্ঞেস করেন,

- ডু দ্য বয়েস ফলো হিম?

- ছেলেরা তাঁর কথা শোনে অভ্যস্ত, সুতরাং কোন অসুবিধে হয় না। - হেড মাস্টার বোঝাতে চাইলেন,

- আস্ক হিম টু রিপ্লেস হিজ লস্ট টিথ।

- সামান্য মাইনে পান, উনার পক্ষে অতগুলো দাঁত বাঁধানো-

- ইন দ্যাট কেইস, ইউ সুড রিপ্লেস হিম। - সাহেবের পাষাণ হিয়ার বহিঃপ্রকাশ। এবার ক্লাসের ফার্স্ট বয় দেবেশকে প্রশ্ন করেন সাহেব,

- একজন প্রসিঢ্য বাঙালির নাম বলো।

- দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। - দুঃসাহসী উত্তর দেবেশের।

- হোয়াট ! টিনি কিসের জন্য বিখ্যাটো?

- মহান ত্যাগের জন্য; ফর হিজ গ্রেট সেক্রিফাইস।

সাহেবের মুখমণ্ডল রাগে লাল হয়ে গেলো। তিনি আর কোন ক্লাসে না গিয়ে অফিস কামরাতে এসে জগদীশবাবুকে বললেন, ‘লুক হিয়ার মিঃ ব্যানার্জি, শিক্ষা আর রাজনীটি একসাটে চলটে পারে না। ওই ছেলেটাকে স্কুল ঠেকে সরাটে হবে।’ ব্যানার্জি বোঝাতে চাইলেন, দেবেশ স্কুলের সেরা ছাত্র, তাছাড়া, রাজনীতি নয়, এটা তার ব্যক্তিগত পছন্দ মাত্র। কিন্তু, জন হান্টারের চোখে সি, আর, দাশ একজন থার্ড রেটের পলিটিশিয়ান। এভাবে ঔপন্যাসিক তাঁর কলমে পরাধীন ভারতের সমাজ ও ব্যক্তিত্বকে ব্রিটিশরা কীভাবে অবমূল্যায়ন করতেন, তার আরেকটি উদাহরণ- স্কুলঘরের বেড়ায় ছড়িতে খোঁচা দিয়ে আরো নড়বড়ে করতে করতে হান্টারের বিষোদগার, ‘স্কুল অর এ্যা ক্যাটল্ সেড’।

সন্দেহের অবকাশ ছিল না যে, ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পর্যুদস্ত করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি, এ উপমহাদেশের মানুষ যেন বিদ্যায় বুদ্ধি বা অর্থনৈতিকভাবে চিরদিন অবদমিত হয়েই থাকে, জন হান্টার সাহেবদের মতো অগণিত ইংরেজ তখন ছোট-বড় নানা ধরনের ত্রুটি তোলে ধরে তাদের দুঃশাসনের ভিতটা ক্রমশ পোক্ত করতে যে প্রতিনিয়ত সচেষ্ট ছিলেন, জরাসন্ধের লেখনিতে তা চুলচেরা বর্ণিত।

ফুলহাটি হাই স্কুলে জগদীশবাবুকে নিয়ে মাত্র দু’জন গ্র্যাজুয়েট টিচার। দরিদ্র গ্রামীণচিত্র আর জগদীশবাবুর বদান্যতায় প্রায় সকল ছাত্র বিনা বেতনে পড়ছে। তবু সেদিন পরিদর্শনশেষে সাহেবকে যখন স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকগণ বিদায় দিলেন, তখন স্কুলের খাতা-রেজিস্টার তো বটেই, লঞ্চে পোরা হলো- উন্নতমানের ঘি-মাখন-পাউরুটি, সুঠামদেহী মুরগী, সন্দেশ, উন্নতমানের ফলের সমাহার, একছড়ি সবরিকলার সাথে আরো কিছু আকর্ষণীয় বস্তু। কিন্তু, বিদায় নেবার আগে হেড মাস্টার মশাইয়ের আর্জি- স্থায়ী এ্যাফিলিয়েশন প্রাপ্তির কথা শোনে সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন। প্রায় ষাট শতাংশ ছাত্র প্রথম বিভাগ পেলেও সাহেবের নিষ্ঠুর চিত্ত গলাতে পারেন নি। তাই, সাহেবের মনকে সংবেদনশীল করার জন্যে এতো কিছু উপহার। এ প্রসঙ্গে ঔপন্যাসিকের একটি অনবদ্য মন্তব্য, যা অন্য লেখকদের বেলায় খুব কমই পাওয়া যায়। সেটা হচ্ছে- “ভেট নয়, উৎকোচ নয়, উপঢৌকন বলাও ভুল হবে, শুধু সাহেব-সুবাদের জন্য বাঁধা বরাদ্দ সামান্য দস্তুর মাত্র; দিয়ে লাভ নেই, না দিলে প্রচুর লোকসান।”

বন্যা উপন্যাসে লেখকের সৃষ্ট সর্বংসহা মহান এক চরিত্র- যাঁর নাম জগদীশ ব্যানার্জি। হান্টার সাহেবের খারাপ রিপোর্ট আর নদীর অপর পাড়ে লোভী ব্যবসায়ী ভূপতিকে (ব্যানার্জির ভূতপূর্ব পেছনের সারির ছাত্র) সাহেবের উস্কানি ও প্রশাসনিক সুবিধায় পাল্টা স্কুল চালু করা, সবই ফুলহাটি স্কুল, বিশেষ করে ব্যানার্জিকে মর্মাহত করে। তা নইলে তখনকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জির মতো বন্ধু থাকতেও বড় কোন প্রতিষ্ঠানে যাননি জগদীশবাবু। হয়তো এটাকেই বলে- নাড়ির টান। তিনি রবিঠাকুরের ‘ফিরে চল্ মাটির টানে’ ব্রত মাথায় নিয়েই মেধাবী পুত্র তপেনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করতে পাঠান কলকাতায়। সেখান থেকে বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর শিক্ষায় ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়।

অন্নপূর্ণা, পুরোদস্তুর ব্রাহ্মণ গৃহিণী, জগদীশবাবুর সহধর্মিণী যিনি, নিত্য আচারনিষ্ঠ হয়ে গৃহদেবতার আরাধনা করে আসছেন। বিভা নামে এক দূরসম্পর্কের তরুণী এ বাড়িতেই থাকে, জগদীশবাবুকে সে পিসেমশাই বলেই ডাকে, আর অন্নপূর্ণাকে পিসিমা। পিসিমার ইচ্ছে, ছেলের বৌ করেই রেখে দেবে বিভাকে। বিভারও স্বপ্ন এমনটিই। কিন্তু, তার মনোবাঞ্ছ্া পূরণে বিধাতা হয়তো তপেনকে সেভাবে ভাবান নি। কেননা, তপেনের টেবিল ও ড্রয়ার পরিষ্কার করতে গিয়ে একদিন বিভা যে টেলিগ্রামটা পায়, তা বাবা জগদীশকে দেয়া- “আই ডিসাইটেড টু ম্যারি হার”- অর্থাৎ ক্যামব্রিজে সহপাঠিনী ইংরেজ সুন্দরী নীলাকে নিয়ে। অসুস্থ স্ত্রীকে এ খবর চেপে যাওয়া সমীচীন ভেবেই নীলকণ্ঠসদৃশ ব্যানার্জি যদিও ছেলের এ টেলিগ্রামটা লুকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু তা আর হলো না। এর মর্মার্থ উদ্ধার করে দিনে দিনে দুশ্চিন্তায় দুর্ভাবনায় অন্নপূর্ণার জীবন সায়াহ্ন এসে যায়।

উপন্যাসে চিত্রনাট্যরূপ দিতে সকল ঔপন্যাসিক যেমন এক বা একাধিক ভিলেন বা খল চরিত্রের পাত্র-পাত্রী সৃষ্টি করেন, জরাসন্ধও তাঁর ‘বন্যা’-য় ‘নৃপতি’ নামে এক চরিত্র, যে তপেনদের ক্যামব্রিজের সহপাঠী; সরকারী বৃত্তি নিয়ে নয়, বড়ভাই ভূপতির অঢেল অর্থের বদৌলতে। নীলাকে তারও পছন্দ। কিন্তু মেধাবী নীলা মেধাবী তপেননেরই বাগদত্তা। আর সেই সম্পর্ককে বেশি করে উপভোগ করতেই দুজনে চলে যায় শীতের উইকএন্ডে কোন এক মোটেলে; বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়নি তখনো। সেখানে ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে তপেনের প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লেগে জ¦রে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গভীর রাতে পাশের নীলার কক্ষে চলে আসে তপেন। নীলার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও নীলার কক্ষেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দেয় দুজন। তাৎক্ষণিক আবেগ আর অসতর্কতায় সে রাত থেকেই এক শক্তিশালী নিউমোনিয়ায় আকান্ত হয়ে সাত দিনের মাথায় মৃত্যুর নিকষ কালো জগতের অনন্ত শয্যায় শায়িত হয় তপেন। দিশাহীন নীলা ফিরে আসে মায়ের কাছে।

কিছুদিন পর যখন নীলা বুঝতে পারে যে, সে মা হতে চলেছে, তখন অকপটে সব মাকে জানায়। নীলা মায়ের কথা অনুযায়ী গর্ভপাত করতে রাজি না হলে নির্ধারিত সময়ে একটি সুন্দর ফুটফুটে পুত্র সন্তান লাভ করে। দেখতে ঠিক তপেনের মতো। এদিকে যখন নৃপতি নীলার বিধবা মা- মিসেস ব্রাইটকে টাকা খাইয়ে বশ করে যেন নীলাকে তার হাতে তোলে দেন। আর তাই, নীলাকে না জানিয়ে নবজাতককে কোন অনাথ আশ্রমে পাঠানোর ইচ্ছায় মিসেস ব্রাইট যখন পেপারে বিজ্ঞাপন দেন, পেপার দেখে নীলা সিদ্ধান্ত নেয় কোন এক গভীর রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে। ‘এসন্তান যাঁদের, তাঁদের হাতে তোলে দিতে হবে।’

অগ্নিযুগে যে ক’জন ইউরোপীয় নারী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গিয়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা রেখেছিলেন, মিসেস নেলী সেনগুপ্তা তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ঔপন্যাসিক হয়তো তেমনি একজন ভারতপ্রেমী তথা বাংলাপ্রেমী চরিত্রের নারী সৃষ্টি করেছেন তাঁর ‘বন্যা’ উপন্যাসে। হ্যাঁ, সদ্য বিধবা মিসেস নীলাই সে বিদূষী নারী, যে তার জন্মস্থানের সকল বন্ধন ছিন্ন করে চলে আসে বীরভূমের শ্বশুরালয়ে, স্কুলের একজন কৃতি শিক্ষয়িত্রীর ভূমিকায়- যে তার সবটুকু ধ্যান জ্ঞান নিয়োজিত করতে। হান্টার- উত্তর বন্ধু স্কুল ইন্সপেক্টরের সহযোগিতায় স্কুলের কাক্সিক্ষত স্থায়ী এ্যাফিলিয়েশান এনে দিতেও বেগ পেতে হয়নি তার। মিঃ ব্যানার্জিও তাকে আপন মেয়ের মতোই দেখছিলেন। কিন্তু এখানে এসেও যে শান্তি নেই, তা অত্যন্ত সুন্দর লেখার প্রবাহে বুঝিয়ে দিলেন জরাসন্ধ। তাঁর ভাষায়- এক ‘ইভিল স্টার- অযাচিত দুর্গ্রহ, যার হাত থেকে বুঝি বা সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে গেলেও নিস্তার নেই।’ সেই খল যুবক নৃপতি ছুটিতে দেশে আসে। নদীর ওপার থেকে বিপরীত পাড়ে ব্যানার্জির নদীতীর ঘেঁষা বারান্দার একটা আরাম কেদারায় শিশুপুত্র কোলে নিয়ে বসা নীলাকে দেখতে তার ভুল হলো না। তার পরের দিনই এসে হাজির। ব্যানার্জিকে রীতিমতো তার খলদাপটে বানোয়াট তথ্য দেয় যে, নীলার কোলের শিশুটি নাকি তারই ঔরসজাত। ব্যানার্জি এমন বানোয়াট কথা তো বিশ্বাসই করেন নি, উল্টো প্রচণ্ড ধমকে তাকে সেদিন তাড়িয়ে দেন। নীলা বুঝতে পারে- এ প্রাপ্য সুখ ও অধিকার তার ভাগ্যে হয়তো আর নেই।

দ্বিতীয় দিনও নৃপতির পুনরাগমন, এবং একই বিতণ্ডায় গলাধাক্কা। সে রাতে আর নীলার শরীরটা ভালো ছিল না বিধায় খোকাকে বিভার কাছে রেখে নীলা তপেনের ঘরেই একলাটি ঘুমোতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুম আসছিলো না যেন তার। অথচ এখানে থাকাও যে নিষ্কলঙ্ক হবে, তেমনও নয়; শ্বশুরালয়ের মায়া ত্যাগ করার আগে তাই বিভাকে সে যা লিখে গেল, তা- “তপেনের ওপর তোমার অধিকারও কম ছিল না; তাই খোকাকে তোমার কাছেই রেখে গেলাম।”

গভীর রাতে ঘাটে বাঁধা খেয়ার দড়ি বিচ্ছিন্ন করে নীলা নিজেই যখন বৈঠা চালিয়ে উজানের পথে গন্তব্যহীনে চলে যায়, বিশাল এক বানের জলরাশি এসে তখন তাকে তলিয়ে নিয়ে যায়, না-ফেরার দেশে। ভোরে খোকার ক্রন্দনে সবার ঘুম ভাঙলে সব খোজাখুঁজির পর মিঃ ব্যানার্জি আর স্কুলের দপ্তরি- মধু ঘাটে এসে দাঁড়ায়। নির্বিকার পাথরের মূর্তি যেন। উচ্চৈঃস্বরে ডাকলেও আর সাড়া পেলো না নীলার। মধুর হাতে কিছু টাকা আর স্কুল থেকে রেজিগনেশান দেয়ার দু’কপি লেটার- (একটি মহকুমা প্রশাসক ও অন্যটি স্কুল কমিটিকে দেবার জন্যে) বিভা ও ঘুমন্ত নাতিকে কোলে নিয়ে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালেন ব্যানার্জি। বাড়ির সমস্ত স্থাবর স্কুলে দান করে আগে থেকে মধু কর্তৃক ঠিক করা গরুর গাড়িতে ওঠে গেলেন ব্যানার্জি; বিভাকেও ওঠতে বলেন। তিনি যেন হালভাঙা নাবিকের ন্যায় শুধু বললেন, “কাল যখন সব জানাজানি হয়ে যাবে, তখন সকল কলঙ্কের কালিমা এসে পড়বে এই অবোঝ শিশুটির মাথায়। কিন্তু তা থেকে যে ওকে রক্ষা করতেই হবে মা।” ‘কোথা যাবো পিসেমশাই?’ বিভার এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যানার্জি বললেন, “তা তো জানি নে মা; কথা হচ্ছে- পথে বেরোলেই পথের সন্ধান”। বাঙালির প্রশ্নবিদ্ধহীন জন্মের উৎস সন্ধানী এক চরিত্রসচেতনতার ইঙ্গিত পাই আমরা জরাসন্ধ-সৃষ্ট এ ব্যানার্জি চরিত্রে।

‘বন্যা’-র এহেন সর্বগ্রাসী চিত্রে একেকটি চরিত্র, পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান কীভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তার সার্থক রূপায়ন দেখালেন জরাসন্ধ তাঁর অমর উপন্যাস ‘বন্যা’-য়। স্বদেশী জাতীয়তাবাদে আর মাটির টানে বিশ্বাসী না থাকলে এমন আত্মত্যাগ সম্ভব হতো না।