menu

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

স্বতন্ত্র, বিচিত্র ও অভিনব

ওবায়েদ আকাশ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২১
image

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত / জন্ম : ৬ অক্টোবর ১৯৩৩; মৃত্যু : ১৭ নভেম্বর ২০২০

তীব্রভাবে সমালোচিত ও তীব্রভাবে গ্রহণযোগ্য চিলের কবি নিকানোর পাররার কেন বলেছিলেন যে, ‘কবিতায় সব কিছু চলে’? ল্যাটিন ভাষা বুঝতে না পারার অক্ষমতায় তাঁর মূল কবিতা পড়তে না পেরে বঞ্চিত হয়েছি তাঁর কাব্যের প্রকৃত শিল্পকুশলতা এবং নির্মাণঋদ্ধতা থেকে। কিন্তু ভাষান্তরিত ইংরেজি এবং বাংলায় যতোটা পাঠ নিয়েছি, তাতে অন্তত অকপটে বলা যায় না, তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর কবিতার সরাসরি সাযুজ্য রয়েছে। তবে একই ভূখণ্ডের দুই প্রভাবশালী ও নোবেল বিজয়ী কবি গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল ও পাবলো নেরুদার সঙ্গে পাশাপাশি যখন তাঁর নাম উচ্চারিত হয়, তখন তাঁর যে কোনো বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করার আগে কয়েকবার ভেবে নিতে হবে। যেমন পাররার ‘এন্টি পোয়েট্রি’ বা ‘প্রতিকবিতা’কে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। গত শতকের বিশ^ কবিতায় একমাত্র নিকানোর পাররাই কবিতাকে এভাবে সরাসরি এন্টি পোয়েট্রি নাম দিয়ে প্রচার করেছেন, এবং তাঁর কবিতাতেও তাঁর স্বাক্ষর রেখেছেন। পাররার এই বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে দেশি বিদেশি অনেক প্রিয় কবির কবিতায়। এত কথা বললাম যে কবির কবিতার সাথে বক্তব্যের বন্ধুত্ব খুঁজতে গিয়ে, তিনি পঞ্চাশের দশকের বাংলা কবিতার প্রবল শক্তিধর ও স্বতন্ত্র ধারার কবি সদ্য প্রয়াত অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত।

অলোকের কবিতা সম্পর্কে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি বিশে^র তাবত উপকরণের প্রায় সবই তাঁর কবিতায় ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখেন অনায়াস সাবলীলতায়। বিষয়রে ভারিত্ব কিংবা লঘুত্ব তাঁর কবিতা নির্মাণকৃতিকে প্রভাবিত করে না। ঘটনা কিংবা অঘটনাও প্রকৃত কাব্যমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কাজটি করতে পারতেন তাঁরই সমসাময়িক, তাঁরই বন্ধুস্থানীয় আরো কেউ কেউ, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতার শহিদ বিনয় মজুমদার এবং কবি উৎপলকুমার বসু। এঁদের কবিতার দুরন্তপনায় কাছে পাঠকমাত্র উদ্দীপিত হয়েছেন, যা কিছু তাই ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন মনের জোরে, ইচ্ছার প্রাবল্যে। বলতে গেলে এই দশকের কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মাহমুদ, শহিদ কাদরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়- এঁদের প্রত্যেকের কবিতার একক স্বাতন্ত্র্য তাঁদেরকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। কিন্তু কবিতার উদরে সব কিছুকে হজম করার দুঃসাহস সব কবির থাকে না। হয়তো এমন ভিন্ন কোনো পারদর্শিতায় তাঁরা উজ্জ্বল, যা অন্য কবির কবিতায় থাকে না। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার এই স্বাতন্ত্র্য চিহ্নায়ক দিকটি সহজে দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে, তিনি সব কিছুকে কবিতা করে তুলতে পারেন। সহজ আলাপচারিতার ভেতর থেকে নির্বাচিত উক্তি খুঁজে তাকে কাব্যরূপ দিতে পারেন এবং এক অপরিহার্য পরিণতিতে তাকে ছেড়ে দিতে পারেন।

গত শতকের পঞ্চাশের দশকের বাংলা কবিতার আর একটি বড় বিশিষ্টতা হচ্ছে, সেই সময়ের প্রত্যেক কবি, যারা প্রয়াত হয়েছেন- শেষ সময়টি পর্যন্ত তারা তাদের সময়কে ভুলতে দেননি। উত্তরপ্রজন্মনির্ভরতাকে পাত্তা দেননি; বয়সের ভারে ফুরিয়ে যাননি, কারো উদারতা কিংবা সহমর্মী দৃষ্টির ধার ধারেননি। শিল্পের প্রতি প্রবল দাপুটে কমিটমেন্ট থেকে তাদের ব্যক্তি ও শিল্পের প্রতি যে কনফিডেন্স তৈরি হয়েছে, তা দিয়ে তাঁরা পাড়ি দিলেন বাংলা কবিতার গৌরবের প্রায় পৌনে এক শতক। আর হাতেগোনা যে ক’জন বেঁচে আছেন তাঁদের বেলায়ও এর ব্যত্যয় চোখে পড়েনি। এই বেঁচে থাকাদের সর্বশেষ নিভে যাওয়া আলোকস্তম্ভটির নাম কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাহিত্যচিন্তক।

৮৭ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে তাঁর রচিত গ্রন্থসংখ্যার চেয়ে, গ্রন্থের আলোকস্ফূর্তি ও তার বিস্তার পাঠক ও সমালোচক মহলে তাঁকে প্রতিনিয়ত সময়ের তরুণদের প্রতিদ্বন্দ্বি করে রেখেছে। বলা যায়, তাঁর প্রথম কটি কাব্যগ্রন্থ- যৌবন বাউল, নিষিদ্ধ কোজাগরী, রক্তাক্ত ঝরোখা, ছৌ-কাবুকির মুখোশ, গিলোটিনে আলপনা থেকে গত বছরের সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থটি অবধি আজকের প্রজন্মের কবিদের হিংসার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আর তাঁর রচনার এই ক্ষুরধারতা এতোটাই সাবলীল ও সময়ের ভাংচুর যে, প্রতিনিয়ত তিনি সময়োত্তরের একজন কবিতার শিক্ষক হিসেবে বেঁচে ছিলেন। তাঁর প্রয়াণ তাই বাংলা কবিতার সামান্যমাত্র ক্ষতি নয়, একটি অধ্যায়ের থেমে যাওয়া; কবিতার একটি অনুসন্ধানী পথনির্দেশনার থেমে যাওয়া।

তিনি কবিতা লেখার মতোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন সম্পাদনাকে। ‘সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত’ নামে তিনি ও কবি শঙ্খ ঘোষ মিলে যে বিদেশি কবিতার সম্পাদনা করেছেন, কয়েকটি প্রজন্মকে এভাবে বিদেশি কবিতার সঙ্গে আর কোনো বই পরিচিত করাতে পারে নি। এখনো পর্যন্ত কেউ অন্য দেশের অন্য ভাষার কবিতা সম্পর্কে ধারণা নিতে চাইলে সবার আগে স্মরণ করেন ‘সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত’র কথা। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন ‘আধুনিক কবিতার ইতিহাস’-এর মতো মহার্ঘ গ্রন্থ। এছাড়া ‘হাইনের কবিতা’, ‘অঙ্গীকারের কবিতা’র সম্পাদনা, বিশেষ করে কবি ও বিদগ্ধ পাঠক মহলে ব্যাপক পঠিত গ্রন্থ। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শিল্পিত সমাজ’ ও ‘স্থির বিষয়ের দিকে’ তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ও চিন্তার স্বচ্ছতাকে প্রমাণ করে। তাঁর ননফিকশন রচনা যেমন- ‘শরণার্থীর ঋতু ও শিল্প ভাবনা’, ‘ভ্রমণে নয় ভুবনে’ পাঠকের শিল্প ভাবনাকে নাড়িয়ে দেয়।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর শেষ দিকের কিছু কাব্যগ্রন্থ যেমন- আলো আরো আলো, সে কি খুঁজে পেল ঈশ্বরকণা, নিরীশ্বর পাখীদের উপাসনালয়ে, এখন নভোনীল আমার তহবিল, তোমরা কী চাও শিউলী না টিউলিপ-এ আরো পরিণত ও আরো স্বতন্ত্রতায় আবিষ্কার করা যায়।

অলোকরঞ্জনের এই সবার ভেতর থেকে আলাদা হয়ে যাবার একটি কারণ- তিনি শান্তি নিকেতনে বিশ্বভারতীতে ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করাকালীনই প্রথাবিরোধী সাহিত্য আন্দোলন বা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। একই মানসিকতা নিয়ে বেঁচে ছিলেন শেষ ক্ষণ পর্যন্ত। কবি-সমালোচক-সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু প্রতিষ্ঠিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য পড়িয়েছেন প্রায় পনেরো বছর। এবং গত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউট অনুষদে শিক্ষকতা করেছেন। জার্মান সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের একটা সেতুবন্ধও রচনা করেছেন এই বিশিষ্ট বাঙালি কবি।

সময়ের কবিদের আলোকিত বন্ধুত্ব, অর্ধশতাব্দির ইউরোপবাস এবং বিশ্বকবিতার অসীমে অবগাহন তাঁকে পরিপূর্ণ একজন বিশ্ব নাগরিক ও বিশ্বমানের একজন বিশিষ্ট কবির জায়গা দিয়েছে। তাঁর কবিতা পাঠ তাই আমাদের এমন একটি

ভুবনে ভ্রমণানন্দ, যা চেনা-অচেনার আলো-আঁধারিতে এক নবতর পর্যটনের আস্বাদ দেয়।

তাঁর কবিতা পড়ামাত্র, এটুকু ধৈর্য হারানোর অভ্যাস থাকতে হবে যে, যেমন তিনি ভোরবেলা বাড়ি থেকে বের হওয়ামাত্র যে নির্ধারিত পথটিতে অগ্রসর হবার কথা, তার আগেই তিনি ব্যবহার করে বসেন বাড়ির অন্দর দরজা। এবং সেখানে এমন একটি সরুপথ ধরে যাত্রা শুরু করেন যে, সন্ধ্যায় ফিরে আসা অবধি সেই সরুপথটি প্রধান সড়কের মর্যাদা পেয়ে যায়। যে কারণে তিনি যে বিষয় দিয়ে কবিতার প্রারম্ভ রচনা করেন, পরিণতিতে তার কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কেন যেন তার এই বিষয় হারানোর মধ্যেও একটা গভীর ছন্দোময়তা থাকে। যে ছন্দের হয়তো প্রত্যক্ষ দুলুনি নেই, কিন্তু নির্ভারতার অসীমতা আছে। যে কারণে অলোকরঞ্জনকে আবিষ্কার করতে গিয়ে তাঁর কাব্যভাষাকে অভিনব ও অপ্রচলিত মনে হয়। এবং তাতে এতো এতো বৈচিত্র্য ও সেই বৈচিত্র্যের অর্থময়তা থাকে যে, পাঠক খুব অনায়াসে এই কাব্যভুবনে দীর্ঘক্ষণ বিচরণ করেও ক্লান্ত হন না।

একজন আধুনিক কিংবা আধুনিক-উত্তর মানুষের জীবনাচরণকে আমরা এভাবে আবিষ্কার করতে পারি; জন ও যানবাহন বিস্ফোরণে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান শহরের মানুষের শিডিউল বিপর্যয়, বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব, হতাশাগ্রস্ততা, উদ্দেশ্যহীনতা, লক্ষ্যভ্রষ্টতা সময়ের অগ্রসর কবির কবিতায় সুইয়ের মতো সেলাই করে যাচ্ছে শব্দে, ছন্দে। যে কারণে তাঁর কবিতায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে স্বাভাবিক পরিণতি ঘটার কথা তা ঘটছে না। ভাঙছে পারম্পর্য। অলোকরঞ্জনের কবিতায় এই সমসাময়িক বৈশিষ্ট্যগুলো অনায়াসে ঘটে যেতে দেখি। তাঁরই এক যহযাত্রী কবি উৎপলকুমার বসুর কবিতায় আরো কিছুটা ভিন্নতর উপায়ে এই পারম্পর্যহীনতা রয়েছে প্রবল। এ প্রসঙ্গে তাঁকে একটি প্রশ্ন করেছিলাম যে, “আপনার কবিতার শুরু থেকে শেষ- কোনো পারম্পর্যতা নেই কেন?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “তুমি যে প্রতিদিন কাজের জন্য ঘর থেকে বের হও, তুমি কি নিশ্চিত যে, স্বাভাবিকভাবে প্রতিটি কাজ তুমি সুসম্পন্ন করে ফিরে আসতে পারবে?” ভেবে বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না যে, সময়টা এতোটাই বদলে গেছে যে, সময়ের অগ্রগামী কবি, লেখক বা শিল্পী মাত্র এইপ্রকার বিচ্ছিন্নতার রূপকার। সময়ের প্রয়োজনেরই কিংবা তাদের দৃষ্টি ও চিন্তার অনিবার্যতার কারণেই শিল্প তার পারম্পর্য হারাচ্ছে। এই পারম্পর্যহীনতাই বুঝি সময়ের পারম্পর্যতা। সারা বিশ্বের কবিতায় আজ এই দৃশ্যমান অসংলগ্নতা চড়ে বসেছে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর জার্মানিতে বসবাস করে হয়তো যে কবিতামগ্নতা যাপন করেছেন, স্বভাব সারল্যেই তাঁর কবিতায় এই সাযুজ্যহীনতার মধ্যে পারম্পর্যের চাষ। কিংবা তিনি কবিতার সংযুক্তিকে এমনভাবে কৌশলান্তরে উপস্থাপন করেন যে, তা না সুররিয়ালিটি, না ম্যাজিক রিয়ালিটি, না পোস্ট মডার্নিটি, না অধুনাবাদী। তবে তা যে কিছুটা কবি বা আত্মকেন্দ্রিক, তাও পাঠকের এক অভিনব আবিষ্কার।

এ মুহূর্তে অলোকরঞ্জনের অন্তত একটি কবিতা পাঠ অবশ্য জরুরি মনে করছি, কেননা এতো কথার ফুলঝুরি কি অনর্থ নাকি নিতান্ত সম্পর্কিত ভেবে দেখা যাবে। তাও আবার কবিতাটি তুলে দিচ্ছি তাঁর অতি সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ‘ঝাউ-শিরীষের শীর্ষসম্মেলনে’ (২০১৯) থেকে:

মেরুদণ্ডে গোলাপ রেখেছিলাম, ঈর্ষাষণ্বিত যত

ধুরন্ধর নেমে এসে গোলাপ ছিনিয়ে নিয়ে গেল,

কিন্তু কেন কেঁদে উঠি, মেরুদণ্ড স্বয়ং গোলাপ।

এইমাত্র যেই বলি ‘মেরুদণ্ড স্বয়ং গোলাপ’

ওরা এসে তৎক্ষণাৎ প্রাণান্তকর পরিশ্রমে

আমার নিজস্বতম মেরুদণ্ড নিয়ে চলে গেল।

কী জানি কী ভেবে শেষে শিরদাঁড়া ফিরিয়ে দিয়ে গেছে,

আমি দ্বারপ্রান্তে রাখি উচ্ছিষ্ট অব্যবহার্যখানি,

এখন আমার ব্যাপ্ত মেরুদণ্ড সমস্ত আকাশ।

মেরুদণ্ড নিয়ে শিরদাঁড়া ফিরিয়ে দেয়া কিংবা গোলাপ ছিনিয়ে নেয়া মানে মেরুদণ্ড ছিনিয়ে নেয়ার যে মেটাফোর তিনি রচনা করেন- এ জাতীয় মেটাফোর স্বভাব স্বাতন্ত্র্যেরই নামান্তর। আমাদের বাংলা কবিতার যে ধারাবাহিক উত্তরাধিকার- চর্যাপদ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ থেকে সাম্প্রতিকতম সময় অবধি বাংলা কবিতার যে মেইনস্ট্রিম স্রোতে, সময়োত্তীর্ণ কবিরা বিভিন্ন সময়ে তার কূল ছাপিয়ে প্লাবিত করেছে জনপদ, ঢেলেছে পলি, উর্বর করেছে ভূমি, ফলেছে সোনার ফসল। কৃষকের ঘর ভরে উঠেছে আনন্দে। কৃষকের সৃজনবেদনা তৃপ্ত করেছে সমগ্র ক্ষুধার্ত মানুষকে। এই হচ্ছে সৃষ্টি, উপযোগ ও উপভোগের ধারাবাহিকতা। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত শেষতক একজন মেইনস্ট্রিম কবি, একজন প্রথাবিরোধী স্রষ্টা। তবে এই সাংঘর্ষিক অবস্থানের নির্দোষতা এভাবে দেখেন সৃজনশীলরা যে, প্রথাবিরোধিতা বা এন্টি স্টাবলিশমেন্টের যে মূল স্রোতে সকলকে আসলে সেখানেই একাত্ম হতে হয়। কারণ প্রথার ভেতরে থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি করা যায় না। প্রথাকে ভাঙা মানেই নতুন কিছু সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি করা। জীর্ণতাকে ভেঙেই নতুনকে আহ্বান করতে হবে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সেদিক থেকে প্রথাভাঙারই একজন কারিগর। প্রচলিতকে উপেক্ষা করেছেন, কবিতায়, চেতনায়। যে কারণে এন্টি স্টাবলিশমেন্টের মুখপত্র লিটল ম্যাগাজিনকে তিনি আশ্রয় করেছেন শেষ পর্যন্ত। পাঠ নিয়েছেন মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ থেকে শেক্সপিয়র, গ্যেটে, তলস্তয় প্রমুখের বিশ্বপাঠশালায়। আর আমরাও একই ধারাবাহিকতায় সংযোজন করি অলোকরঞ্জনের নাম : পাঠ করি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আলো আরো আলো’ থেকে ‘মোমের আলোয়, আবার মাধ্যমিকে’ :

“সব পরীক্ষা কোনোক্রমে পার হয়ে গিয়েও

মস্ত হলঘরে

প্রশ্নোত্তর লিখতে বসে কেঁপে উঠছি খুব

চড়ুইদের মেরুণ কলস্বরে।

আজকে বিষয় রাষ্ট্রভাষা, আমার দেবনাগরী

এম্নিতেই অনভ্যাসে ম্লান,

ঝাপসা হল মোমের আলোয় আমার অক্ষর

ঠিক যে রকম বঙ্গসন্তান।

এবার হব অনুত্তীর্ণ- জানলা দিয়ে দেখি

টিফিন হাতে দাঁড়িয়ে ওই আমার চাঁদের কণা,

তার খোঁপার মঞ্জরীতে খেলা করছে হাওয়া-

কী সুন্দর দেখাচ্ছে তা বাংলাতেও বোঝাতে পারবো না।”

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন কিছু উল্লেখযোগ্য পুরস্কার। তার মধ্যে জার্মানিতে গ্যয়ঠে পুরস্কার, স্বদেশে আনন্দ পুরস্কার, প্রবাসী ভারতীয় সম্মান, রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রভৃতি।

  • ধ্রুপদী স্রষ্টা

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    হিন্দোল ভট্টাচার্য

    newsimage

    অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল যখন তখন সকাল বেলা সাড়ে ১১টা। ফোন

  • অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    অধিবিদ্যার কবি

    উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    এক বেশ্যা অনায়াসে ভিতরমদিরে ঢুকে যায় বুদ্ধ মন্দিরেরে দরজা বন্ধ হয়ে গেল এক

  • মহাতর্জনী আর যুদ্ধ ঘোরের মেটাফোর

    নাসরীন জাহান

    newsimage

    পুরো যুদ্ধের সময়টাই বলা যায় আমার স্বপ্নে বাস্তব ঘোর লড়াইয়ে কেটেছে। যেখানে বেশিরভাগ সময় বাস্তব জয়ী হয়েছে। মনে পড়ে, যুদ্ধ শুরুর দুমাস পর এক মিশনে

  • সাময়িকী কবিতা

    এখন আমায় তরুণতর সতীর্থেরা বলে অলোকদা, আপনি আমাদের মাথার ওপর আছেন। ভাবি আমি কি তবে তাদের জরাজীর্ণ আচ্ছাদন ছলে ও কৌশলে?

  • এখানে এখন : সামাজিক সংকটের নির্মাণ

    সানজিদা হক মিশু

    newsimage

    সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বাংলা নাট্যসাহিত্যের কিংবদন্তি। তাঁর ৮৫ তম জন্মক্ষণে সংক্ষিপ্ত

  • ঘুম

    শাশ্বত নিপ্পন

    newsimage

    বুকের বাঁ পাশটায় একটা অস্বস্তিকর ব্যথা নিয়ে আনিস ওজুতে বসে। দু’ঠোঁটের মাঝে

  • গ্রাম-গ্রামান্তরে

    প্রথম পূর্ণ ডিজিটালাইজড শিক্ষা বোর্ড যশোর

    রুকুনউদ্দৌলাহ

    newsimage

    দেশের অনেক কিছুতে যশোর প্রথম হওয়ার গৌরবের অধিকারী। যুক্ত বাংলার প্রথম জেলা