menu

সোনাভানের কাসিদা

দিলারা মেসবাহ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২০
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

‘অ ব্যাটা - ব্যাটারে। তোর মাওডা মইর‌্যা গেল কেমনে? সোনার মানুষডা আছিল। আমার বুনডারে! খালি হুতাস লাগে। ক্যাম্বা কইর‌্যা কী হইল? খালি হুতাস লাগতাছে। মাবুদ আল্লাহতালা- হুতাস লাগে ব্যাটা’

রজব মিয়া গায়েন- মায়ের খাল্তো ভাই। কুমডার বিচির মতো দাঁতগুলো হলুদ বর্ণের। সাদাসিধা বুড়া মিয়া। চাপ দাড়ি, লাল।

গায়েন চাচা তার হুতাশনের বিবরণ দীর্ঘ লাম্বা করবে এমন আশঙ্কা হয় ছটুর। সত্য কইতে কি, এই সকল বেদনাঘন আলাপ প্রলাপ এহন আর শুনতে ইচ্ছা হয় না ছটুর। সে গর্দান চুলকায়। বামে ডানে চোখ ঘুরায়। মায়ের হাতে লাগান কলমের পিয়ারা গাছে এক ঝোকা পিয়ারা দুলতেছে- সেদিক তাকায় ছডু।

চাচা সেই যে টিটিপক্ষীর মতোন বসছেন দাওয়ায়। যেন সোনাভান বিবির মৃত্যুলোকে শরিক হওয়ার হকদার এক নম্বর তিনি। ছডু পাঁচ আঙুলে মাথাভর্তি উলাঝুলা চুলগুলায় বিলি কাটে। ‘হয়গো চাচাজান গরিবের মরণডাও কেমুন সোজামোজা। চক্ষু বুজলেই শ্যাষ! কোন গণ্ডগোল নাইকা। মায় বেহেশতো গিয়া ঘুমাক। গরিবের সংসারোত্ কাম কাজের কোনুই ইস্টিশান নাইকা। বাত রানধো রে- ঘুচু খেচো টোকাও আর ঘাটোরে। কতোদিন শুকান মরিচ টাইল্যা মায় র্মচের ভর্তা করছে। তিনবেল ঐ ভত্তা দিয়া আমরা বাত খাইছি। বাপডারে কওয়া নাই বলা নাই সর্পে কামড়াইলো! মায় মুন্সি বাড়িত ধান চাল ঝাড়তি ঝাড়তি বুড়ি হইল, অকালে। সবোইতো আল্লাতালার ইচ্ছা, খিয়াল খুশি। নাকি কন চাচাজান! গরীব মান্সের ওম্বা কর‌্যাই চক্ষু বোজা লাগে। ঐ তরিকা। চক্ষু দুইডা মুদলিই হইল। আজরাইলে বড় আসানির সাতে তারে কব্বরের দিশা দেয়। সুঁই দেয়া লাগে না-তিতা বড়ি গেলা লাগে না! কোবরাজ ঠান্ডু মন্ডলের কোচা ভইরা টাহা কড়ি দেওয়া লাগে না। সত্য কিনা কন চাচা। দুইদিনের জ্বর জ্বালায় গেল মায়! ডালিম খাইতো চাইছিল! গরিব মান্ষের অমনেই যাত্রাডা করা লাগে নিচুপে।’

গায়েন পাকা কুলের মতোন ফোলা টোপা টোপা চোখ দুইটা কচলায়া লাল করমচা বানাইছেন ইতিমধ্যে। শ্লেষাভরা গলায় বলে, ‘কথার মতো কথাডা কইছিস ব্যাডা। গরিবের নিদানের বিদান নাইকা। মরনেরও আওয়াজ নাই। বড়লুকের মরনে আতর, লুবান, কপ্পুর, জিলাপি, মিঠাই, হাফেজ, কোবরাজ। মানুষ গণনা কইর‌্যা সুমার করা যায় না। বড়লুকের বাচ্চা মইরাই একখান পরব বানাইয়া ফ্যালায় ব্যাডা।’

গায়েন চাচা চলে গেলে ছডু ছনের ঘরে ঢুকে। মায়ের ছেঁড়া কাঁথাখান যেন তাকাইয়া রইছে! ছডুর মনডা মোচড় দিয়া ওঠে। ছডু বিয়াশাদী করে নাই। করে নাই না হয় নাই। বিয়া করা আইজ কাইলের দিনে? জোক্তা লাগে। বয়সডা তো বইস্যা নাই। সাধ আল্লাদগুলা খালি ঘুম পারে। হাই তোলে মোচড়ায়!

আহারে ছডুর মা কইতো, ‘সামনের বচ্ছর ছাওয়াল তোরে বিয়া দিবো। বউডা নক্কী পক্ষী হইবো। পুত্লা বৌ হইবো বাপধন। শুধা হাতে বউ গরে তুলবো নানে ছডু। দেহিস।’ ছডু খড়ি দিয়া উঠানে দাগ কাটে। শরম পায় নাকি?

সোনাভান মাঝে মধ্যে কইতো, ‘কুলাডার বাজনা আর শুনবার চাই না। মুন্সি বাড়ির ধানের গোলা টুবু টুবু, আমার প্যাট তো ভরে না! চাইলের, ধানের কুড়া কুলায় নাচাই- আমার তো নিয়াস বন্ধ হয়া আসে। কত্ত বছর হইলো ক’ দেহি বাপধন! মাতায় ঘুরুন্ডি দেয়। কুলাডার বাজনা যেন ঢেঁকির পাড়। হাড় হাড্ডি চুরাচুরা। মাতার ক্যাশগাছি তো কোন কালেই ইইছে যেন কয়েকগাছি পাটের সুতা। কাঁকই দিয়া মাতা ডিল করি না কত কাল! চান্দিডায় কারবালার মাতম’!

সোনাভান নিজেরে নিজে কইছে, ‘সোনাভান আর কাইন্দ না। কান্দনের দিন শ্যাষ হইলো বইল্যা।’

নসু মৃধা সোনাভানের স্বামী আলগা বইসা থাকার মানুষ ছিল না। খেজুর গাছে রসের হাঁড়ি ঝুলাইত। নালি-বাইয়া টপ টপাইয়া মধু ঝরতো। নসু কইতো, ‘বৌ তোর ‘পয়’ লাগছে আমার দিলে রে। হের জন্যি নসুমিয়ার এমন নামডাক।’ বিবি খালি নথ নাড়ায়া হাসত, শিঙি মাছের মতোন খলবল কইর‌্যা।

নসু গাছির খেজুর গাছ, তালগাছে যৌবনের দাপট। তালের রসে তালমিছরি কম করছে সে? তবে তাড়ি করে নাই তেমুন। রস-রসের নাগর! পাটালি, ঝোলাগুড় মিঠাইওয়ালা নসু মৃধা। গুড় জ্বাল দিলে উঠানভরা পাড়াপড়শির ছাওয়াল পাওয়াল বৌ ঝিরাও একটা ঘুরুন্ডি দিয়া যাইত। নাকভরা সর্দি, পেটভরা কৃমি! মুখে কিন্তু গুড়ের নেশা-রসের সুবাসে আধ-পাগলা। নসু গাছি কয়েক ফোঁটা রস ছুট্টুনি হাতের পাতায়-ছড়ায়া দেয়। উসপিস গরম-শতেক মজা তাও। জিবায় কি রহম সোয়াদ। সোনাভানের কোমর তখন সুডিল। কোমরে কালা চুলের ঝাঁপি দোলে। চিকন যুবতীর সারা শরীরে কিসের রোশনাই?

ছডু আর রূপজান মাটির কোলাভরা গুড়ের গুদামে হাত সান্ধ্যাইয়া খাবলা খাবলা গুড় খায়। কৈবর্তপাড়ার কোল ঘেষে নসু মৃধার দুইডা ছনের ঘর। একখান টিনের ঘর। সোনাভানের নিকারি বাপ আদরের মেয়ার বিবাহের কালে গরুমার্কা একথান টিন দিছিল। ...

সেইসব বায়োস্কোপের বাজনার খেয়াল ...

ছড়– কোনকামে লায়েক হয়া উঠপার পারতেছে না। পঁচিশ বচ্ছর সোনাভান সংসারডা ঠেক্না দিয়া রাখছে। ছডু সাইকেল সারাইয়ের কাম শিখছিল কিছু। কোনু কামেই লাগে নাই। সফদার কোবরাজের থানে কিছুদিন তামিল নিছিল। দুই দুইডা রোগী যায় যায় দশা। ছডুর গাছগাছড়ার রস খায়া। কপালে জুটছিল চড় থাপ্পড়, ঘাড় ধাক্কা। সেই থেইকা কানে ধরছে আবোল তাবোলে তার কপাল খুলবে না। আধা বিঘা জমিন রাইখা গেছে বাজান। সেইটুক নিয়া আছে জোয়ান মর্দ। বাপের মতো চওড়া সিনা মাথাভরা ঝাকড়া চুল পাইছে। বুদ্ধিটুক তেমন পাইল না?

ছটুর এখন একলা জীবন। বড় বোনডা রূপজান বিয়া শাদী হইছে। তার ভরা সংসার। সে নিজেই বসা ভাত রান্ধে। কোনদিন মশুরির ডালে ফোড়ন দেয়। আলু ভত্তা ছানে। খিদার উপর কোন দুশমন আছে ত্রিভুবনে!

গরীব মানুষ যেমনে মরনের সাথে দোস্তি পাতে, নিচুপে তেমনি সোনাভান কালাকুষ্টি জানডারে নিচুপে তুইল্যা দিচে মরনের দোস্তের কবলায়! ... এইসব দিনমান মগজের মইধ্যে আনাগোনা করে। ছডু- মায় ডাক পারত। এহন কেউ তারে দিনমান ‘ছডুরে -ছডু বাজান’ কইর‌্যা আন্ধাকোন্ধা খালি ডাক পারে না? ... ওজুর পানি মায়ের মুখখান থেইক্যা গড়াইয়া পড়তো- বিহানবেলায় মায় বিন বিন কইর‌্যা কোরান পাঠ করতো। ছটুর সুব্হে সাদেক নিচুপে ফস্সা হইয়া উঠতো? আহারে- মাও জননী! একখানা লাম্বা শ্বাস বাতাসে হাইটা বেরায়? ... নিচুপে-।

রূপজান বুজির শ্বশুর ভিটা দূর্গানগর। হেই দূর্গানগরেরই চাঁদনি, যুবতী কন্যা! তার বাপ মালদার মানুষ। সুদের কারবারী মহাজন। সোনাভান বিবির আত্মীয় ঘর। তাদের চার চালা টিনের রঙিন ঘরদুয়ার। গোয়ালে সিন্ধি গাই-কালা কুচকুচা। গতর দিয়া আলো ঠিকরায়! ফল-ফলাদি বৃক্ষ লতার শুমার নাই। মহাজনের উঠানটাই একখান দীঘল দীঘির সমান। বড় একখান আশ্চর্যির ঘটনা। চাঁদনি নামের পরীডার নজর পড়ছে চওড়া সিনার ছডুর জোয়ানকির ধান্দায়! বড় বুঝি রূপজানের শ্বশুরবাড়ি মহাজনের বাড়ি থেকে অল্প দূরে। তিন সত্য-দুইজনের মধ্যে মনের বনিবনা ঘটতাছে। যদিও ছটুর বুক দুরুদুরু করে সে তো ঐ পরীবিবির কেনি আঙুলের যুগ্যিও না!

সেদিন ফাগুন মাসের মাঝামাঝি। এইটা যে বসন্তকাল- সেইসব ভাবের কথা, বড় মানুষি খেয়াল কী আছে নিমুরাদে ছটুর। আলতাগোলা বৈকালবেলা। সম্ভব ছাতিম গাছটার কোনাকানচি থেকা মরার কোকিলা কুহু কুহু ডাকতাছে- বেশুমার- কু... হু ... কু... হু? ... ওরা দুইজন দুব্বাঘাসের ভিতর বসছিল। পীরের জলায় একখান ঢোড়া সাপ চ্যালচ্যাল কইর‌্যা পানিত্ সাঁতার কাটতেছিল। কয়ডা টাটকানি, কয়ডা লাল শাপলা গলা উঁচায়া ওগরে দেখতেছিল? ওদের হিসাব নাই! .... রূপের নারী আচমকা ছটুর খসখসা আঙুলগুলা তার মাখন আঙুলগুলা দিয়া চাইপ্যা ধরছিল? ... হুঁস নাই সিনাওয়ালার! নাজেল হয়েছিল কয়টা শব্দ-‘ আমি তুমারে ভালোবাসি মিয়া। তুমি বাসো?’ ছডুর শরীরে কাঁপন! মরার কোকিলা তখনও কুহু কুহু ডাকতাছে! কোকিলার গলা ব্যথা করে না? হারাম-দুই চক্ষের কিরা- ছডু তখন জন্মবোবা। জোয়ান মর্দ কায়দা বোঝে না? সব গন্ডগোল হয়্যা যায় তার। হুঁশে ফিরলে শুকনা গলায় ঢোক গেলে- হলকুমের চারধার কাঁপে। ‘আমরা গরীব মানুষ!’ পরমুহূর্তে খানিক আবেগ আবেশ জড়ায়ে বলে, ‘তুমি আমার স্বপনের মইধ্যে আসো। পরীর সুরত।’ ...

সেই কমলারঙের বৈকাল ফুরায়! সুরাতন বুজির সংসারডা কওয়া যায় ভরভরন্ত? চামড়ার ব্যবসা দুলামিয়ার। আয় উন্নতি মন্দ না। দুলামিয়া সামাদ প্রামানিক অল্প বিস্তর লেখাপড়া জানা মানুষ। দুলামিয়া তার জানেওয়ালা, খানেওয়ালা। ডেকি মুরগির সালুন, বাতাসি মাছের চচ্চরি! মাসকলাই ডালে বড়মাছের মাথা! শ্যালকের সমাদর না করলি হয়। নিজে হাতে গাওয়া ঘি ঢেলে দেয় ছটুর গরম ভাতে। দুলামিয়ার চোখে চশমা। বিদ্বান বিদ্বান লাগে? পাবনা শাজাদপুরের ধবধবে তপন- হালকা মাটিরঙা পাঞ্জাবী। তাঁর বুঝি আতর, লোবানের সুবাস মনের মধ্যে। বুজির তিনডা ছাওয়াল-চান্দের লাহান। বুজিও তো সুন্দর মানুষ। মায়ের লাহান!

সোনাভান-জননী! দুই ভাইবোনের! তার চল্লিশা না তিরিশা মনে থাকে না ছডুর। ভাইয়ের সাথে বাপমার ভিটায় আসে সুরাতন। খালি দমে দমে ফুঁপায়-কান্দে-। মা নাই যার, তার এ জগতে বুঝি কিচ্ছু নাইকা। হু হু করে পরান।

ছটুর ঘন চুলে হাত বুলায় সুরাতন। ‘ভাইরে মায়ের চল্লিশা তো আজ বাদ কালকা। বড় মসজিদের হুজুর, আর দারুল মাদ্রাসার হাফেজ কয়জনার জন্য গোস্ত ভাত আর পায়েস করা লাগবে। তাঁরা দোয়া দরুদ শরীফ পর‌্যা কোরান খতম বকশায়া দিবেন। মায়ের আত্মাডা আসন পাইব। জীবনডাতো জ্বলুনির মইধ্যেই গেছে। কয়ডা দিন আর সুখের সংসার করছেন। বুঝ্যা দেখ ছটু এই বাড়িডা কেমুন কানতাছে। শন শন কর‌্যা পাটক্ষ্যাতের বাও বাতাস হাইট্যা যায়, বাতাসেও বিন বিন কইর‌্যা কান্দনের আওয়াজ পাই। এই দুনিয়াত্ মাও কি জিনিস রে ভাই! বেহেশ্তের নিয়ামত! নিজের সংসার নিয়া মইজ্যা থাকলাম, মায়ের জন্যি কিছুই করবার পানি নাই মাবুদ আল্লা। আমারে মাফ কইর‌্যা দিও।’ ছটুর সিনার ভেতর চুরচুর কইর‌্যা কি জানি ভাইঙ্গা পড়ে! মুখখান আন্ধার। চোখ দুইডা শুক্না বিলের মাতান ধূ ধূ করে? ...

সুরাতন জানে তার মায়ে পরহেজগার মানুষ আছিল। ছটু দেখছে মায়ে এশার নামাজে দাঁড়ায়া দিলে দিলে নামাজ আদায় করছেন। মুন্সিবাড়ির কামের সময়তো নামাজের ছুটি নাই। তাই সারাদিনের কাজা নামাজ আদায় কর‌্যা ঘুমাইতো মা। আয়তাল কুরশি কইতে পরতো গড়গড়াইয়া। কতগুলোন সুরা ছিল মুখস্ত। বিধবা হয়্যা দুইডা নাবালক নিয়া ছাব্বিশ বচ্ছর কী লড়াইডা না করছে তার মা। প্যাটের আগুন নিভাইতে নিভাইতে জীবনের সকল রোশনাই হাওয়া। এই বিষয়ডা কী বুঝলো সোনাভান? জীবনডা যে সুন্দরের সুন্দর। মিলাদ, কোরান খতমের খরচাটা সুরাতনই দিল। সহি সালামতে মায়ের চল্লিশ দিনের শোকদিন শেষ হইল। সুরাতন ছডুরে নিয়া আবার স্বামীর ভিটায় যাত্রা করে। কয়ডা সৈয়দী পেয়ারা সীমের বিচি, আনাজি কলার ফানা নিছে ছডু। হাজার হলেও বুনের শ্বশুর বাড়ি। সারাটা রাস্তা নসিবনের ঝাঁকুনি আর বুজির ফোঁপানি। ছটুর মন কয় সংসারের মানুষজন সুখের হাসি হাসতাছে, খালি এতিম তারা দুই ভাইবোন অঝোরে কানতাছে! ... অঝোরে কান্তাছে? ...

গায়েন চাচা সেও কান্দে হয়তোবা। চাচা মায়ের রান্নাবাটি খেলার সাথি আছিল। পুষ্কারিনীর শাপলা ঢ্যাপ তোলারও সাথিজন। সাদা দিলের মানুষটা। ধুলিউরা গাঁয়ের ঘরজামাই।

কতদিন ঢ্যাপ আনছে তারা কোচড় ভইরা! সোনাভানের সাদা ফর্সা দাদীজান ট্যাপের খই ভাজতেন। ওরা জুলজুল করে চেয়ে থাকত, কালাকুষ্টি কড়াইডার ভিত্রে বড় বড় মুক্তার দানা। গায়েন চাচার দোতারা এহন আর আগের মতো সুরবাহারে মাতোয়ারা হয় না। দম থাকে না। গায়েন সাঁথিয়া বাজারে সোহাগপুরের লুঙ্গি গামছা, মোটা বুননের শাড়ির দোকান দিছেন।

মায়ের কব্বরে খেজুর কাঁটার টাল। কয়ডা লোবান কাঠি জ্বালায় সুরাতন। ধোঁয়ার মইধ্যে কান্দন ভরা! সুরাতনের নাকে ঝাপটা দিয়ে যায় গো। ... কবরের দোয়া দরুদ পড়তে বইসা সুরাতন কান্দে জারে জার। কহন ছটু গাও ঘেষা বসছে খিয়াল নাই তার। ভাইডার চক্ষু লালজবা। মুনাজাত ধরে ভাইডা- ‘মাবুদ আল্লা আমার মায়ে কোনু পাপ করে নাইকা। তুমি ভালো জানো মওলা মাবুদ! তারে কব্বরের আগুন আজাব না দিও আল্লাপাক। হেয় জনমভর দুখের আগুনে পুড়ছে। গরীব মানুষের গোনাখাতা মাফি মাাঙ্গে সাত আসমানের মালিক রে।’

গায়েন চাচা কয়েকজন আশ-পড়শি নয়া কব্বরের ধারে। গায়েনের কতো কতা মনে পড়ে। শচীন কাকুর মটরশুটির খ্যাতে বইস্যা তারা আবিত্তি মটরশুটি খাইছে কতোদিন-। বষ্যাকালে নসুর জলায় কই ধোরছে! সেইগুলা মগজের মইধ্যে কলকলায়! আহারে বড়নুকের গরে জন্মাইলে এই সোন্দর ময়না বাড়া ভাত খাইতো। সাত রঙের শাড়ি কাপড় পরতো!... এতো সহাল সহাল রঙিলা দুনিয়াদারি ছাইড়্যা নিচুপে কব্বরে ঢুইক্যা যাইতো কি? কান্দে গায়েন-মাটির তলে কেমনে শুইয়া আছ বুজি গো? মাগরিবের আজান পড়ছে! ছাপড়া মসজিদে। অন্ধ হাফিজ গরিবুল্লাহর আজানের সুর মধুর মতো। বৃক্ষের পাতায় কাঁপন ধরে! ....

কবর একলা পড়ে থাকে? ঝিঁঝিঁ পোকার মাতম। রাতচরা পক্ষী ডাকে! সুরাতন ডরায়! ফিস ফিস করে কয়, ‘ছডুরে বাই মায়ের কব্বরে খিয়াল রাহিস কিন্তু। শিয়াল কইল আসে এই বাঁশবনে। দেহিস মায়ের কব্বর খাবলায় না জানি। বাই রে খিয়াল রাহিস।’

ছটুর বুকখান চওড়া সিনার তলে কাঁপে। আহারে... আরো কয়ডা খাজুর ডাল বিছায়া রাখবনে। চোরা মকবুলার লাশ খান দুই দিনের মাথায় শিয়ালে টাইন্যা নিছিল। সত্য গটনা! মায়তো কইতে পারবে না মাটির গরটায় কেমুন গরম! মুনকির নাকিরের সওয়ালের জওয়াব দিতাছে মায়ে। হেতো পরহিজগার মানুষ। ডর কী! আত্মাডা কি বাতাসের মইধ্যে মইজ্যা গেছে। যেন চোকে ভাসে! সোনাভানের বুকখান খালি ধড়পড় করতো। ছডু কোবরেজ বিল্লাল তরফদারের কাছে থেকা অর্জুন ছালের গুড়া আনে। মায়ের কেমুন বেদিশা মতো ভাব! ....

সেদিন মুন্সি বাড়িত্ ঝড়ি তুফান। বড় বিবি গুলবাহারের কানের দুলের একখান নাই! গোসলের আগে তাকের উপর খুলে রাখছিলেন বিবি। কানের দুল- যে সে দুল না! নবরতœ গাঁথা। হিরা, পান্না, মুক্তা বাঁধান। রোদ পড়লে হিরা চিকমিক করত- সোনভানও দেখছে। বড়বিবির বাজখাই গলা-দেহ ভরা যেমুন চর্বি, তেমুনই ত্যাজখান! অন্ধি সন্ধি খোঁজাখুঁজি। নাই!...

সোনাভান পুরানা কামের মানুষ। নামাজী, শীতল স্বভাব খান। বড়বিবি তারে বললেন, ‘যাতো মানিক দুর্গানগর না হলি চান্দাইকোনা। ফকির মুরতাজরে নিয়া আয়। হেই কামেল ফকির। বাটি পড়া, চাল পড়া দিব! চোরার মুখে রক্তবমি হইবে নে। বাটি চ্যালচ্যালাইয়া চোরার দিক নিশান করবোনে। হেই ফকির শুনছি নোখের মইধ্যে চোরার মুখ আটকাইতে পারে। ফজল জায়গীরদাররে নিয়া যা। টাহা পয়সা যা লাগে দিয়া দিবোনে।’ কামের কাম কিচ্ছু হইল না!.... বড় বিবির হুতাশনে মুন্সি বাড়িত্ থমথমা!

ধানচাল ঝাড়নের কামডা আর পোষায় না, শরীলডায় কুলায় না। এমনে বাড়িত্ মায় ঘুরে ঘারে-ভাত রান্দে একবেলা। শাক তোলে জঙ্গল থেকা।... এরই মইধ্যে মায় কব্বরে শুইতে চল্যা গেল নিচুপে?... মরনের কালে মায় খালি কইছিল, ‘জুরে জুরে কলেমা পড় বাজান। চিল্লানি দিয়া পড়। আমি যাইতাছি বাজান।’

হায় আল্লাখুদা- চুম্কি বিবির মুখখান চক্ষুর মইধ্যে নাচানাচি করে ক্যা? এহন ক্যান বা ছুরাতন বুর বাড়িত্ যাইতে মন চায়। ঐহানে কী হাত্তি ঘোরা আছে? যাদুটোনা করছে পরীডা! কী দশা হইবে তার? ..... এই নিয়া আর কোনু ভাবনা করবো না সে, খোদার কসম। এতোকালে হুঁশ হইছে, জীবনডা পয়সা কড়ির রসে তাজা থাহে। আর ভাবাভাবি নাই- জোয়ারের সোত যেদিক মন চায় যাক গা।

তাহাজ্জুতের ওয়াক্তে ছডুর ঘুম ভাইঙ্গা যায়। মায়তো এই সুময় ওজু করতো খুটুর মুটুর শব্দে ঘুম টুইটা যাইত। মায় কইতো, ‘তাহাজ্জুদের নমাজডা আসমান সমান সোয়াবের।’

ছটুর ঘুম টুইট্যা গেছে। দুই ব্যাটারির টর্চ হাতে সে মায়ের কব্বর দেখ্যা আসে। শিয়াল বেজি কিচ্ছু নাই। পরহেজগার বান্দার কব্বরখান-ফিরিশতারা পাহারা দেয়। ভাঙ্গা চোকির তলে মায়ের ময়ূর আঁকা টিনের সুটকেসখান। এইডার হকদার তো সেই! তোরঙ্গডা খুলতে যায়া কর কর কইর‌্যা একডা আওয়াজে ছনের ঘরডা ভইর‌্যা যায় - কেমুন গায়েবি আওয়াজ। ডালাডা এহনও মজবুত। তালাডায় খালি জং ধরছিল! মায়ের গন্ধ! একখান ধান তাবিজের লহর। ছটুর বৌয়ের জন্যে রাখছে মায়! পাঁচশ টাকার খান তিন পাতা, কিছু খুচরা খাচরা। রুমালে বান্ধা ছিল। একখান ওষুধের কৌটা। ঢাকনা খুলতেই ছটু সোজা হয়া বসে! জ্বলজ্বল করতাছে একখান মনি মুক্তার স্বর্নের দুল! কিন্তু একখান- কিন্তু একখান!

  • লুইস গ্লুকের কবিতা

    ব্যক্তি থেকে বিশ্বজনীনতায় রূপায়ন

    অনন্ত মাহফুজ

    newsimage

    পঁচিশ বছর বয়সে লুইস গ্লুকের প্রথম কবিতাগ্রন্থ ফার্স্টবর্ন প্রকাশিত হবার পর কবিতাঙ্গনে

  • বিশেষ সাক্ষাৎকার

    বাক্য নিজেই কথা বলার একটি উপায় খুঁজে নেয়

    সাক্ষাৎকারে লুইস গ্লুক ভূমিকা ও অনুবাদ : ফজল হাসান

    newsimage

    ২০২০ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের দৌড়ে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে পরিচিত একাধিক কথাসাহিত্যিক এবং

  • লুইস গ্লুকের কবিতা

    ‘তাজা বাতাসে জড়ানো নতুন পৃথিবী’ অনুবাদ : অশোক কর

    newsimage

    গ্রিটেল, অন্ধকারিত্বে এমন পৃথিবীই আমরা চেয়েছিলাম। যারা আমাদের মরে যেতে দেখেছিলো, ওরা এখন মৃত।

  • লুইস গ্লুকের কবিতা : ২

    ‘সেটিই নগর যেখানে আমি হাওয়া হয়ে যাই’ অনুবাদ : মুজিব রাহমান

    বাগান বাগান তোমাকে সমীহ করে। তোমার খাতিরে সে নিজেই মেখে নিয়েছে সবুজ রঞ্জক, গোলাপের লাল

  • শ্রদ্ধাঞ্জলি রশীদ হায়দার

    শরতের মেঘের মতো বিনয়ী ছিলেন যিনি

    আদিত্য নজরুল

    newsimage

    ‘মাত্রা’ গল্পের মাধ্যমেই রশীদ হায়দারের সাথে আমার পরিচয়। আমার আগ্রহ বেড়ে যায়

  • বিস্মৃত রাজনৈতিক মঞ্চের কথক মহিয়সী জায়নাব আখতার

    মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ

    newsimage

    প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন বইটি সাধারণ অর্থে অব্যাহতভাবে লেখা কোনো স্মৃতিকথা নয়।

  • টক অব দ্য কান্ট্রি

    পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

    newsimage

    কেবলমাত্র একটা তুচ্ছ সন্দেহকে কেন্দ্র করেই তাদের এক দশকের নিশ্চিদ্র দাম্পত্য গেছে