menu

সৈয়দ হকের জলেশ্বরী

পিয়াস মজিদ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ জানুয়ারী ২০১৯
image

মার্কেসের যেমন মাকান্দো, দেবেশ রায়ের যেমন তিস্তা, সৈয়দ শামসুল হকের তেমনি জলেশ্বরী। কল্পনায় গড়ে তোলা জনপদ। আধকোশা নদীর (তারই কল্পিত নাম) তীরে কেন্দ্রভূমি জলেশ্বরী। ভারত সীমান্ত পর্যন্ত উত্তরে চলে গেছে মান্দার বাড়ি, হরিশাল, হস্তিবাড়ি; দক্ষিণে নবগ্রাম, শকুনমারি, বুড়িরচর। উত্তরবাংলার পরিবেশ, রোদছায়া, গাছপালা, মানুষের সারল্য আর সংগ্রামকে ল্যান্ডস্কেপ করে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর কথাভুবন বিস্তৃত করেছেন। যে উত্তরবাংলার আরেক নাম মঙ্গা, সে উত্তরবাংলার অঘোষিত মুখপাত্র কথাকার সৈয়দ হক। বিশাল বাংলার উত্তরাংশ জলেশ্বরীর ভূভাগে যেমন বৈশিষ্ট্যবান তেমনি উত্তরবাংলা ছাপিয়ে গোটা বাংলাই উঠে এসেছে ইতি-উতি এখানে। বাংলার মানচিত্রের রংপুর-কুড়িগ্রাম-গাইবান্ধা- নীলফামারী-লালমনিরহাট- দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-কে এখানে ভীষণ করে খুঁজে পাওয়া সম্ভব তবে সব ভৌগোলিক আয়তন ছাপিয়ে এক বৃহৎ মানবভূগোলই যেন দৃশ্যাকার পাওয়া যায় সৈয়দ হকের জলেশ্বরীতে।

জলেশ্বরীর চরিত্রসমূহ বিচিত্র-বর্ণিল-ব্যতিক্রম। করিমন বেওয়া, বিলকিস, তাহেরÑ এদের কেউ এখানে প্রধান কিংবা কেউই গৌণ নয়। সব মিলে যেন এক অখন্ড চরিত্র। জলেশ্বরী’তে আছে ‘আমরা’ ঘোষণা বন্ধের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি ছাপিয়ে যূথস্বরের অনন্য প্রতিষ্ঠা। এভাবে জলেশ্বরীর মনোহর, সলিম বা সাহেব-চান্দ আর ব্যক্তি Ñএকক থাকে না; হয়ে ওঠে ‘কালেক্টিভ ভয়েস’। আখ্যানের অন্তর্লীন অংশও তখন বিশাল ভূভাগ ও জনগোষ্ঠীর প্রতীকস্বরে ধ্বনি পায়।

জলেশ্বরীর জীবনকে আমরা যতই দূরের মনে করি ততই তা আমাদের অংশী হয়ে ওঠে। ‘কোথায় ঘুমোবে করিমন বেওয়া’ গল্পের ভুখা করিমন বেওয়ার লাশ জলেশ্বরীর কোথাও দাফন হয় না আবার একই সময় জলেশ্বরীর সর্বত্র করিমন বেওয়ার লাশের গন্ধ পাওয়া যায় এবং ‘...আমরা বিকটভাবে আবিষ্কার করি, করিমন বেওয়া আমাদেরই পাশে ঘুমিয়ে আছে, কারণ, সে আর কোথায় ঘুমোবে?’

জলেশ্বরীতে যত কথার বিস্তার তার নেপথ্যে আরো বেশি গুরুত্ব বহন করে দুর্ভিক্ষ-অনাহার আর ক্ষুধার স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ। সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আলাপসূত্রে জানতে পারি জলেশ্বরী সিরিজের তার এক অসমাপ্ত উপন্যাসের নাম ক্ষুধাবৃত্তান্ত। এ উপন্যাস তিনি এখন পর্যন্ত শেষ করে উঠতে পারেননি; কারণ সাহিত্য তাঁর কাছে কেবল ভাষা আর শৈলীর কারুকৃৎ মাত্র নয়। সাহিত্য তাঁর অন্তর্শ্বাস। তাই ক্ষুধিত শিল্পকলার জননে, জলেশ্বরীর জাদুকরকেও অপেক্ষা করতে হয়। তিনি অপেক্ষা করতে থাকেনÑ কবে শেষ হবে তাঁর ক্ষুধাবৃত্তান্ত।

১৯৯০-এ প্রকাশিত হয়েছিল সৈয়দ শামসুল হকের জলেশ্বরীর গল্পগুলো। তারপর ২০১০-এ ননফিকশনাল গদ্য সংকলন জলেশ্বরীর দিনপত্রী। বইয়ের নামত জলেশ্বরী হাতেগোনা হলেও ভাবগত দিক থেকে সৈয়দ হকের জলেশ্বরী সিরিজ বহুবিস্তৃত। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপনে এখানে জড়ো করা যায় জলেশ্বরী সিরিজের বইপত্রের নামসমুদয়Ñ দূরত্ব, দ্বিতীয় দিনের কাহিনি, নিষিদ্ধ লোবান, অন্তর্গত, ত্রাহি, শকুনমারির খবরাখবর, না যেয়ো না, স্তব্ধতার অনুবাদ, শঙ্খলাগা যুবতী ও চাঁদ, চোখবাজি, ময়লা জামার ফেরেশতারা, বকুল রঙিন স্টুডিও, গুপ্ত জীবন প্রকাশ্য মৃত্যু, উড়ে যায় মালতি পরি, কুয়াশায় শাদা ঘোড়া ইত্যাদি।

এর মধ্যে ছয়টি উপন্যাসÑ দূরত্ব, নিষিদ্ধ লোবান, দ্বিতীয় দিনের কাহিনি, ত্রাহি, স্তব্ধতার অনুবাদ, উড়ে যায় মালতি পরি, কথাকাব্য অন্তর্গত এবং সাতটি গল্প নিয়ে জলেশ্বরীর প্রথম খ-ের এ আয়োজন। পরবর্তী খ-গুলোতে জলেশ্বরী সিরিজের সমস্ত রচনাই অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আশা রাখি।

‘স্তব্ধতার অনুবাদ’-সূত্রে সৈয়দ হক জানান দেনÑ

“আমাদের ভেতরে এক উলংগ মানুষ বাস করে, অতঃপর এই উলংগ মানুষটিকে স্মরণ করে আমাদের কথা শুরু করিÑ আপনি কি তাকে চেনেন?

সে আপনার ভেতরেও বাস করে, বড় গভীরে এবং সমস্তক্ষণ প্রস্তুত হয়ে; আপনার নিদ্রা আছে, তার নেই। আপনি যখন কারফিউ দেয়া শহরে ঘরের দরজা বন্ধ করে বাতি নিবিয়ে চৌকির নীচে লুকিয়ে আছেন, সে তখন আপনার ভেতর থেকে লাফ দিয়ে বেরোয় এবং বাইরে সড়কে ঐ যে বুটের শব্দ তুলে হেটে যাচ্ছে ঘাতক, চোখের পলকে তাকে খতম করে সে বেতার কেন্দ্র দখল করে ঘোষণা করে স্বাধীনতাÑ অথচ আপনি তখনো চৌকির নিচেই আছেন। কিংবা আপনি যখন শ্রাবণের একটি প্রভাতে শোনেন আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছে আপনার পিতা এবং তাঁর লাশ পড়ে আছে সিঁড়িতে, আপনার ভেতর থেকে সে বেরোয়, সুবাসিত পানিতে তাঁকে গোসল করিয়ে নগরীর কেন্দ্রস্থলে দাফন করে এবং তারপর এই হত্যার বিচার সে চিৎকার করে চায়Ñ অথচ আপনি তখন ভাষাহারা নপুংশকের ভূমিকায়।”

এভাবে বাংলাদেশের ক্ষতলাঞ্ছিত ইতিহাস তার যাবতীয় মূক-স্তব্ধ আবরণ ছেড়ে বলিষ্ঠ ভাষারূপ পায়, সবাক হয়। শিল্পহীন ইশতেহার সৈয়দ হকে অলভ্য বরং দেখি শিল্পের ইতিবাচকে জাতীয় জীবনের নঞর্থক অধ্যায় ধবল জ্যোৎস্নার অবয়ব পায়। তখন আমাদের গূঢ় উপলব্ধি জন্মে ‘সামগ্রিক স্তব্ধতা জন্ম দেয় সামগ্রিক স্তব্ধতারই; মৃত কেবল মৃতই প্রসব করতে পারে’।

জলেশ্বরী সিরিজে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ কোন আপতিক বা সূত্রচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়, মৌলত মুক্তিযুদ্ধই যেন প্রধান বিষয় হয়ে জলেশ্বরীর হিম ও তাপ, আঙ্গিক ও ভাষাভাগ নির্মাণ করে।

জলেশ্বরীর ভূগোলে এসে আমাদের চেনা অভিজ্ঞতার গল্প হয়ে যায় ‘গল্প-প্রবন্ধ’। এখানে ব্যবহৃত গ্রামীণ পটভূমি থাকে না নেহায়েত আমাদের পরিচিত গ্রাম। সীমানা ছাড়িয়ে প্রেক্ষাভূমি পায় দিগন্তের বিস্তার। জলেশ্বরীর গ্রাম একই সঙ্গে বাস্তব ও অতিবাস্তবের মূর্ততামি ত। নিষিদ্ধ লোবান-এ বিলকিসসহ মুক্তিযোদ্ধাদের পদভারে প্রত্যন্ত জলেশ্বরী যেমন হয়ে ওঠে পবিত্র-মহান এক ভূমিখন্ড ।

হঠাৎ অবলোকনে বোধ হবে রংপুরের ভাষা বলবান জলেশ্বরীতে। তবে রংপুরের হয়েও এখানের সমুদয় কথকতা যেন বাংলা-ভাষাবিশালের রং-লাগা। আর বিশেষ ভাষাবৈশিষ্ট্য এখানে কোনো অঞ্চল বিভাজনের চাবিসূত্র নয় বরং কথ্যভাষারূপের সাবলীল ব্যবহার জলেশ্বরীর কথা ও কাহিনিকে করে তুলে আমাদের আরো আপন। তাই পাঠক লক্ষ করবেন, মানভাষার পাশাপাশি লোকভাষার অভূত ব্যঞ্জনায় ভাস্বর জলেশ্বরী কিন্তু ভাষা-প্রসাধনের দৃষ্টি-কাঙাল কসরত নয়, প্রয়োগের যাথার্থ্যই জলেশ্বরী সিরিজের কোথাও কোথাও এমন আঞ্চলিক ভাষাবিভূতির ব্যবহার ঘটিয়েছেÑ

“বইসেন, বইসেন সংগ্রাম করি বাংলাদেশ বানায়ে কি আল্লার গোড়ত পাপ কচ্ছিনু? হিন্দু হয়া গেছেন? আগে হামারা বেশি মোছলাম ছিনু? জবাব দিবে কাই? গরীবের মুখে ভাত উইঠবে, নেংটি যায়া লুংগি হইবে, ব্যটা বেটি নিয়া দিন গুজরান কইরবে তার জন্যে সংগ্রাম কচ্ছিনু আল্লার ঘরে বাড়ি দিবার জন্যে নেয়ায় আল্লার পাওনা সেজদা ফাঁকি দিবার জন্য নোয়ার জানি রাখেন। মুই রাশিয়া আমেরিকা চেনাঁ না, রাজনীতিও বোঝোঁ না, মুঁই বিটিশ আমলেও খাইছে, পাকিস্তানেও খাইছে, বাংলাদেশও খায়। মানুষগুলো নিকাশ করেন। আসল বাংলাদেশ হইবে। বর্তমান চলতি থাইকলে, হামার মতো হইবেন, ব্যাটা জেলে যাইবে, বেটির ইজ্জত যাইবে, কোনদিন দেইখবেন হামার মাথা কাটি নিছে, সুপারি বাগানে পড়ি আঁছো।”

(ত্রাহি)

খন্ড কবিতার মধ্যবিরতিতে সৈয়দ হক প্রায়ই নোঙর করেন দীর্ঘকবিতার বন্দরে। অন্তর্গত ঠিক দীর্ঘ কবিতা নয়; তারই ভাষ্যানুসারে ‘কথাকাব্য’। কথাকাব্যের অবয়বে এখানে বিধৃত হয়েছে রক্তাক্ত একাত্তর। যেখানে আমাদের অপূর্ব ও নৃশংস অভিজ্ঞানÑ

চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়,

চোখ ভেসে যায় মানুষের চোখ,

মানুষের তো চোখ আছে,

সে চোখ শুধু দ্যাখে না,

সে চোখ কাঁদে, সে চোখ ভিজে আসে, ভেসে যায়...।

এরপর প্রকরণ নিয়ে আর কোন জিজ্ঞাসা থাকে না বরং মনুষ্যচোখে জমা এই অপরিমেয় অশ্রুর উৎস সন্ধানে জলেশ্বরীর ভূগোল-গহীনে যাত্রা শুরু হয় পাঠকের।

অন্তর্গত’র সূচনাভাগে তিনি বলেছিলেন সাহিত্যের কোন ফর্ম মৃত নয়, একটি বিশেষ কালে একটি বিশেষ ফর্ম তার সমস্ত সম্ভবপরতা নিঃশেষিত করে নতুন সময়ে নতুন সম্ভবপরতা আবিষ্কৃত হবার অপেক্ষায় থাকে। সে প্রেক্ষিতেই অন্তর্গত’র কাঠামোংশ যথাযথ ব্যাখ্যা হয়ে যায়। এখানে এসে পাঠক অভিনতুন আঙ্গিকে জাজ্বল্য দেখতে পাবেন তার কথামালা-নিজস্ব।

“সারাদিন অত্যন্ত মন্থর কেটে যাবার পর আচমকা রাত নামে, কেননা দিনের ভিতরে স্মৃতি রচিত হবার অবকাশ সম্ভবত আর নেই। প্রথমে বিশাল একজোড়া ডানার মতো ছায়াপাত সমস্ত বস্তু এবং অস্তিত্বের ওপর অনুভব করা যায়; পরে রোদের ভেতরে সারাদিন বিভিন্ন উৎস বেরিয়ে এসে শব্দগুলো যে স্তব্ধতাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল অদৃশ্য পঙ্গপাল যেনবা তারা ক্ষান্ত হয়। এখন স্তব্ধতা আবার তার অলৌকিক ফলের মতো কান্তি ফিরে পায়, রাত গভীরতর হয়; স্তব্ধতা পূর্ণতর। তাহের তার গন্তব্য জলেশ্বরী পৌঁছায়।” (দ্বিতীয় দিনের কাহিনি)

এই দেশে যতবার মঙ্গা ততবার সৈয়দ হক। যতবার খাকি উর্দি ততবার সৈয়দ হক। যতবার মোল্লাতন্ত্র ততবার সৈয়দ হক। যতবার দুঃখ ও দারিদ্র্য ততবার সৈয়দ হক। আর যতবার চড়ায় আটকা পড়বে আমাদের স্বপ্নসমুদয় ততবার ‘তাহের’ চরিত্রের মতো অনিবার্য গন্তব্য হয়ে জলেশ্বরী জেগে উঠবে মৃতের দেশে জীবনের সোচ্চার জয়মন্ত্র হয়ে।

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

    নিভৃত ও বিচিত্র

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    সাহিত্যের নিত্য পরিবর্তনের উৎসমুখে সরব উপস্থিত হয়ে যিনি সর্বদা নিজেকে বদলে নিতে

  • ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’

    প্রান্তজনের দস্তাবেজ ও জাদু-বাস্তব কথকতা

    আহাম্মেদ কবীর

    newsimage

    স্বপ্নতাড়িত জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক এবং প্রজন্মান্তর খোয়াব, সংগ্রাম, জীবনাচার, বাসনা, কামনা, বিলাস আর

  • ১৯৭১-এর অপ্রকাশিত ডায়েরি ৫

    জিয়াউল হাসান কিসলু

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশেল পর) ১৯ নভেম্বর, ১৯৭১, শুক্রবার খুব সকালে উঠে চা খেয়ে পিটি

  • পঙ্ক্তিভারে মুখরিত সন্ধ্যা

    newsimage

    রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। নির্দিষ্ট সময় থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পর পৌঁছালাম কবি

  • ধারাবাহিক উপন্যাস ৩

    ‘মৌর্য’

    আবুল কাসেম

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) দেবরাজ জিউসের কন্যা মিউসের নাম থেকে মিউজিক নামটা এসেছে। তিনি

  • মহাদেশের মতো এক দেশে ২

    কামরুল হাসান

    newsimage

    অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের মাঝে সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে নবীন। তবু মহাদেশ

  • মুহম্মদ সবুরের কবিতা

    newsimage

    শান্তির পতাকা তুষার কিংবা উষ্ণতা- এই প্রবাসে কী বিভ্রমে অনিচ্ছায়; ডুবে যেতে হয় উষ্ণ-শীতল