menu

সেলিনা হোসেনের সেপ্টেম্বর-উপাখ্যান ও আমাদের ছাপচিত্র

মামুন হুসাইন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

সেলিনা হোসেন / জন্ম : ১৪ জুন ১৯৪৭

“তুমি একটা বই প্রকাশ কর। চাকরির দরখাস্তের সঙ্গে যে সিভি দেবে সেখানে একটি বাড়তি যোগ্যতা যোগ হবে বই থাকলে।” গণঅভ্যুত্থানের বছর, আমদের দেশের সু-বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসনকে ‘এই ভাষায়’ তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের প্রণোদনা যুগিয়েছিলেন ওঁর শিক্ষক আবদুল হাফিজ। পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই গ্রন্থের বিপুল সমারোহ নিয়ে জীবনের এই প্রান্তে পৌঁছে তাঁর অভিজ্ঞান হয়- ‘উপন্যাসের জন্মের সঙ্গে লেখক-পাঠকের সংযোগ-সেতু একটি গভীর দিক। দু’য়ের সেতুবন্ধন ছাড়া লেখার শব্দ ও শিল্পের সাধনায় ধুলো জমে। কোনো লোকই চাইবেন না যে এই ধুলোর আস্তর পাহাড় হোক। আমিও চাই না। পাঠকের আত্মা ছুঁতে না পারাকে আমি অগৌরবের মনে করি।’ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ওঁর নিষ্ঠা ওঁকে ক্রমাগত গৌরবান্বিত করেছে। নানান ভাষায় ওঁর লেখা অনূদিত হয়েছে এবং সম্মাননা, খ্যাতি, অর্জন ইতোমধ্যে দেশ ছাড়িয়ে আরো বহুদূর ছড়িয়ে গেছে। পেছন ফিরে দেখলে- আমার মত দূর মফস্বল শহরের এক অর্বাচীন পাঠকের আত্মা তিনি স্পর্শ করেছিলেন সাতাত্তর আটাত্তর সালের কোন এক শীত-সন্ধ্যায়। এর কয়েক সপ্তাহ আগে, যশোর সামরিক-ছাউনি’র অডিটোরিয়াম, হতে পারে স্কুল ফাইনাল দেয়ার আগে-পিছে সত্যজিতের ‘অশনী-সঙ্কেত’ দেখার এক বিরল স্মৃতি তখন মস্তিষ্কে উত্তাপ ছড়িয়ে। শীতের ছুটিতে মফস্বলের আলো-আঁধার পাবলিক লাইব্রেরির টেবিলে কেউ বলছিলেন, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ সত্যজিত সিনেমা করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এই তথ্য, এতদিন বাদেও বুঝতে পারি, তীব্র এক উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছিল; এবং কোন কিছু না ভেবেই মায়ের লাইব্রেরি কার্ডে বইটি নিয়ে মাকে পড়ার জন্য দিই। কবুল করি- ওঁর বিপুল সৃষ্টি-সম্ভার যে গভীর অভিনিবেশ দাবি করে, তা সবসময় বরাদ্দ রাখতে পারিনি; হয়ত অনেক মনযোগ দিয়ে ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ পড়লাম, ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ পড়লাম, ‘মোহিনীর বিয়ে’ পড়লাম- কিন্তু আলস্য উদ্যাপন করতে করতে কেবল ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ ও ‘চাঁদ বেনে’ শেষ করেছি; কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, প্রীতিলতাকে নিয়ে, জেলে জীবন নিয়ে, ছিটমহল নিয়ে, গালিবকে নিয়ে লেখা ওঁর উপান্যাসগুলো তখনও হয়ত শুরুই করা যায়নি। বরঞ্চ অনেকখানি উদ্যোগী হয়ে আদিবাসী বিষয়ক ওঁর ভাবনার জগত ছুঁয়ে, শুধু-ই ‘লারা’ পাঠ করছি আবার অনেকদিন বাদে। বলা যায় ঠিক এই মুহূর্তে হয়ত এই গ্রন্থটিই কেবল পাঠ করতে চাইছি, এবং তীব্র মন্তব্য-সমালোচনার ঝোঁক এড়িয়ে এক কথায় বলতে পারি- লেখা যেমন লেখকের ব্যক্তিগত থেরাপি, লেখা পাঠকের থেরাপিও বটে; মুমূর্ষু মানুষ, অকাল মৃত্যু-দেখা মানুষ, ধ্বংসযজ্ঞ দেখা মানুষ, তার শোক-বেদনা এবং অন্তর্গত রক্তপাত এড়াতে, বলতে পারি, ‘লারা’ নামক এই গ্রন্থে অনায়াসে অবগাহন করতে পারেন তার ব্যক্তিগত শুশ্রুষার জন্য। লারার জীবন রহস্য, লারার আকাশ ভ্রমণ, লারার ঘরবাড়ি- বলতে কী, আমাদের জন্য এক অবিস্মরণীয় ক্যাথারসিস; এক অশ্রু সজল ঘোর লাগা পৃথিবীর জন্য মায়া, এক অতল বেদনানাশক ওষধি বটে! এই অনাস্বাদিত জগতের রূপ-রস-গল্প স্পর্শের অভিপ্রায়ে এবার সেলিনা হোসেনের আরো সব গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক সরিয়ে আমি লারার খোলসে সেলিনা হোসেন, সেলিনা হোসেনের খোলসে লারা, সেলিনা হোসেনের খোলসে ওঁর নিজের মা, ওঁদের মা-মেয়ের সংসার, মা-মেয়ের বন্ধুত্ব এবং মা-মেয়ের বিচ্ছেদ কাহিনি উল্টে যাই।

বইয়ের ভেতর-বাড়িতে ১৯৪৭-এ আবির্ভূত একজন মানুষ কী প্রক্রিয়ায় লেখক হয়ে উঠছেন, দৈবক্রমে প্রকাশিত হচ্ছেন, কী যাদু বলে, ‘হিউম্যান কনডিশনের স্পোকসম্যান’ হয়ে উঠছেন, সুসম্পন্ন হয়ে উঠছেন, সুসংহত হয়ে উঠছেন, গৃহী হয়ে উঠছেন, সন্ন্যাস হয়ে উঠছেন, পৃথিবীর মানুষ হয়ে উঠছেন, জগৎবাসী হয়ে উঠছেন- তার অনেকখানি আভাস যেন খুঁজে পাই। এই ভেসে ওঠা চিহ্নের সঙ্গে আমি আমার কল্পনা এবং আড়াল হওয়া জগত মিশেল দিয়ে আবিষ্কার করি- আমার জন্মের বছর ওঁর স্কুল-ফাইনাল শেষ হচ্ছে। আবছা স্মরণ হয়, বরেন্দ্র শহরে ওঁর প্রমথনাথ গার্লস স্কুলের সামনে সে-সময় ঘোড়ার পায়ে লোহার নাল লাগানো হতো টগবগিয়ে দৌড়ে বেড়ানোর জন্য। ঘোড়ার শরীর মাটিতে জাপ্টে হর্স-সু পরিয়ে দেয়ার কারিগর, এখন এই শহরে প্রায় নিশ্চিহ্ন। ঘোড়ার শব্দ, চাকার শব্দ, এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা বর্জ্য, পদ্মা নদী- এসব দৃশ্যবলী তিনি নিশ্চয় এখনও সামনে আনতে পারেন অনায়াসে। তবে বরেন্দ্র শহরের কোন্ অঞ্চলে ওঁর সম্মানে মা আঁতুর-ঘর করেছিলেন, জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনও। দেখতে পাই টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে, লেখা পোস্ট করে পত্রিকায় ছবি ছাপিয়ে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন। ওঁর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, ওঁর বাংলা বিভাগ, বাংলা বিভাগের মাস্টারমশাই, ওঁর এক্সট্রা কারিকুলার এ্যাক্টিভিটিজ, লাগাতার পুরস্কার প্রাপ্তি- এসব তথ্য ওঁর আত্মজীন বর্ণনার সূত্রে খুব সহজে সঞ্চয় হয়। ওঁ বলেন, ‘আমার একটি সোনালি শৈশব ছিল’। হারানো শৈশব আবিষ্কারের জন্য অযাচিত-অভ্যাসগত হয়ে ওঁর সঙ্গে একবার করতোয়া নদী দেখতে যাই। নদীর পাড়ে একটি গ্রাম আমরা খুঁজে পাই। কথা হয়- মা-মেয়ের সংসার এবং মা-মেয়ের বন্ধুত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া অন্য এক অধরা-অস্পষ্ট জগত নিয়ে। সেলিনা বলেন, মাঝে মাঝে একটি স্বপ্ন ওঁকে নাছোড় করে- ‘তালগাছের মত পোড়া একটি মেয়ে আমার হাতের মুঠোয়।’ মা-মেয়ে স্বপ্ন দেখার খাবনামা লুকিয়ে রেখে তর্ক করে, আনন্দ করে, যুক্তি দেখায়, আর অনর্গল বদলে যাওয়া চারপাশ নিয়ে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গে দৌড়ে বেড়ায়। ডাইনিং স্পেসের আলোয় অথবা গুলশানের লাজিজ রেস্তোরাঁয় মা-মেয়ের সঙ্গে কথা হয় এয়ারফোর্স, হাসান আজিজুল হক, জিভাগো, জিভাগোর লারা, টিনটেড গ্লাস লাগানো গাড়ি, মাদারলেস চাইল্ড, সারামাগো, ব্লাইন্ডনেস, বাচ্চাপরী, সৈয়দ হক, রবীন্দ্রনাথ, রিলিজিওন, কেনজাবুরো ওয়ে, প্রেগনেন্সি, মিরাকল বেবি, বরগুনা, কর্নেল তাহের, সুইজারল্যান্ড, লুসান, নীল আকাশ, খ্যাতিমান পনির, লেকের রাজহাঁস, মুনীর চৌধুরী, লালদিয়ার চর, ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ, গ্লাইডার, নভেরা, ধ্রুব এষ, কবি সাবদার সিদ্দিকী, নানডোস, গুপী, এবং শীতের পাখি নিয়ে! এতসব আলোচনার অনুষঙ্গ উজিয়ে সেলিনা হোসেনের লারা, অথবা লারার সেলিনা হোসেন, হঠাৎ ফিসফিস কথা বলতে শুরু করেন- শুধু মেঘ আর মেঘ/ শুধু আকাশ আর আকাশ/ আমি শুধু জেনে গেছি/ বড্ড বেশি সুন্দর এই পৃথিবীটা। লক্ষ্য করি- এই সুন্দর পৃথিবীর ভেতর হাঁটতে হাঁটতে বোনকে মৃত্যু থেকে বাঁচানোর জন্য বহুকাল সেলিনা রোজ এক বাটি শিশির অপার এক সৃজনশীলতায় তৃণগুচ্ছের শরীর থেকে জোগাড় করেন। সেলিনা গরম ভাতে পানি ঢেলে পোড়া মরিচ দিয়ে খাওয়ার আনন্দ আনেন। সেলিনা সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট হন, মতিয়া গ্রুপে নাম লেখান, প্রেগনেন্সির তীব্র জটিল রাস্তায় হাঁটেন এবং অগ্রিম রক্তপাত দেখতে দেখতে নেয়ার-ডেথ-এক্সপেরিয়েন্স’-এর একটি বাধ্যতামূলক জটায় আটকে যান। কিন্তু শেষমেশ সে-যাত্রা তিনি মৃত্যু-জগত থেকে ফিরে আসেন। দেখা যায়, ঘরে তখন সুবিনয় রায় বেজে চলেছে। সেলিনা জীবন-মৃত্যুর স্বাদ-গন্ধ, বৈপরীত্য এবং ঐক্য নিয়ে ভাবেন, মায়ের মৃত্যু দৃশ্য দেখেন, বদরাগী বাবাকে দেখেন, টেবিলে বিবমিষা জাগানিয়া হরিনের মাংস দেখেন, পোস্তাগোলা শ্মশান দেখেন, হারমান হেস দেখেন, গ্রিক মিথলজির লেথি নদী দেখেন, কন্যার স্মোকিং দেখেন, কন্যার সঙ্গে জয় রাইডে যান... আর হঠাৎ-ই লারাকে নিয়ে সেই ভয়-ভয় স্বপ্ন- তালগাছের মত ওর সারা শরীর পোড়া! লারা মাকে অভয় দেয়- ‘...আমি তোমাকে হাল্কা করে গল্প বলি। তুমি তো জীবনের গল্প লেখো। গল্পই বা বলবো না কেন? আর তোমার জীবনের জন্ম আর মৃত্যুর ঘটনাগুলো তো অন্যরকম।’

সেলিনা আবারও নিজেকে অন্যরকম আবিষ্কারের প্রতিজ্ঞা নেন লারার খোলসে। সুবচনী হাঁসের পিঠে আনন্দে-উদ্বেলিত মা-মেয়ে তখন ভেসে চলেছে আকাশের রাজ্যে। উড়তে-উড়তে তারা প্রুফ্রক, ইকারুস, ল্যান্ডিং, বুড়িগঙ্গা, সেসনা-১৫০ নিয়ে কথা বলতে বলতে নতুন এক পুত্র সন্তানের পরিকল্পনা করে, আর হঠাৎ সে নিজেকে আবিষ্কার করে বরগুনার সমুদ্র মোহনায়- তীব্র পূর্ণিমা, জলস্রোত এবং মাঝিদের অবারিত সঙ্গীত!

সেলিনা বাইরের আমি এবং অন্তঃপুরবাসী আত্মার মেলবন্ধন খোঁজার জন্য জ্যোৎস্নার স্রোতে পা ডুবিয়ে বসেন। আবার সেই স্বপ্ন আসছে যেন, তারিখ দেখা যাচ্ছে, সেই গণকের উচ্চারণ- ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮ আপনার হাতে প্রিয়জনের মৃত্যু আছে...! কী ভেবে সেলিনা এবার কুষ্টিয়া শহরের ‘জগো ইঙ্ক কোম্পানি’র অধিপতি, যিনি একদা চিঠিপত্রে মৃদু উত্তাপ ছড়িয়েছিলেন মহামহিম রবীন্দ্রনাথের সাথে, সেই বিপুল প্রাণশক্তির আঁধার জগদীশ গুপ্ত’-এর সঙ্গে কথা বলে প্রিয়জন বিসর্জিত করার প্রস্তুতি নেন গভীর ভেতরে আর কুমীরে নেয়া ছেলেটির মায়ের সঙ্গে কথা বলে দুঃসংবাদ শোনার বল ও শক্তি আনেন মনে মনে। আর অপেক্ষা করেন সেই শুভ-অশুভ মুহূর্তের জন্য, যখন আমাদের শহর জুড়ে নেমে আসবে ২৭শে সেপ্টেম্বরের এক গভীর উত্তাল-উন্মত্ত মেঘরাশি আর ‘দেবতার গ্রাস’ চাক্ষুষ করার জন্য মা সন্তানকে রাগ করে বলবেন- ‘চল্ তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে!’ সেলিনা স্বপ্ন-স্বপ্ন ভয়, বেদনা এবং সঞ্চিত সাহসে গণকের সিদ্ধান্ত চাক্ষুষ করতে অধিষ্ঠান হন ভেঙে পড়া এক উড়োজাহাজের শরীরে : মৃত নির্জন উড়োজাহাজের ভেতর উড়োজাহাজের ভুল যন্ত্রপাতি আর লারার সামান্য চিহ্নাবলী।

সেলিনা লারার পুড়ে যাওয়া জিন্সের এক টুকরো, একটা কাঁচ ভাঙা চশমা, পোড়া কলম ও আংশিক পুড়ে যাওয়া ডায়েরি, পুড়ে যাওয়া একটি জুতা, চাইনিজ সিল্কের পার্স, তার ভেতরে দশ টাকা দিয়ে বান্দরবন থেকে কেনা এক জোড়া রুপালি দুল- এ সব সঞ্চয় করে রাখেন ওঁর আচলে। আর সঞ্চয়ে থাকে লারার শেষ এক দুটি ফোটোগ্রাফ: ‘পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া অবয়ব। চোখ আড়াল করে বাম হাতটা কপালের ওপর রাখা। সেই একই ভঙ্গিতে কফিনের বাক্সে শুয়ে আছে। মাথায় চুল নেই, হেড ফোনের বেল্ট লেগে আছে। সাদা কাপড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে ডান পায়ের পাতা। সেটি অক্ষত।’ ... সেলিনা এবার বহুদিনের স্বপ্ন দেখার বর্ণনা’য় ক্ষান্ত দেন- ‘এভাবেই শেষ দেখা হল আমার লারাকে। যে আমাকে বলেছিল, দুঃখই লেখকের স্থায়ী সুখ।’

বলতে কী, লারার খোলসে সেলিনা হোসেন, এই জায়গায় আমাদের চমকে দেন। সমীহ আদায় করে নেন এবং নিজেকে বিপুল এক প্রাণশক্তির আঁধার হিসেবে পরিচিত করেন। ওঁর রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করার ‘মগ্নতা’ আমরা এবার অনেকখানি আঁচ করতে পারি। ব্যক্তিগত ব্যথার জগতকে বুকে ধারণ করার এই সাহস, ধ্যান, আয়োজন আমাদেরকে জাগ্রত করে। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে স্পর্শ করে লারার উদ্দেশ্যে নিবেদন করি: ‘...তুমি এমন শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলে যে, ব্যক্তিমাত্রেই, তোমার অদ্ভুত মনোহর মূর্তি ও প্রভূতমাধুরীপূর্ণ ভাবভঙ্গি দৃষ্টিগোচর করিয়া, নিরতিশয় পুলকিত ও চমৎকৃত হইতেন। তুমি সকলের নয়নতারা ছিলে। সকলেই তোমার আপন প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় জ্ঞান করিতেন। এই নগরের অনেক পরিবারের সহিত আমার প্রণয় ও পরিচয় আছে; কিন্তু কোনো পরিবারেই, তোমার ন্যায়, অবিসংবাদিত সর্বসাধারণের নিরতিশয় স্নেহভূমি ও আদরভাজন অপত, এ পর্যন্ত, আমার দৃষ্টিপথে পতিত হয় নাই।’

মানুষের ভালবাসা, মানুষের মৃত্যু দেখা এবং বিপুল শূন্যতা নিয়ে এবার আমাদের মস্তিষ্কে বিবিধ ঘূর্ণন তৈরি হয়। লারা যখন শরীর জুড়ে কয়লা ঘষে-ঘষে ইকারুসের আকাশ অনুবাদে লিপ্ত তখন আনমনে অনুভব হয়, ‘অনন্তের কাছে, একটি সৌরজগত নিভে যাওয়া, পাতা ঝরে যাওয়া, মানুষের মরে যাওয়া, সব সমান- অতএব আমাদের শোক এবং সুখ-দুঃখ আমাদেরই।’ ওক্টভিও পাজ বলতেন, ম্যাক্সিকান মানুষের মৃত্যু তার আত্মপরিচিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত- ‘Death defines life.... Each of us dies the death he is looking for, the death he has made for himself. ... Tell me how you die and I will tell you who you are.’

পোতাশ্রয়ের মত রবীন্দ্রনাথকে ভর করে এই অনুভূতির বিস্তার আরো ছড়িয়ে দেয়া যায়- ‘এক একটা বিচ্ছেদ এবং এক একটা মৃত্যুর সময় মানুষ সহসা জানতে পারে এই ব্যথাটা কী ভয়ঙ্কর সত্য। জানতে পারে যে, মানুষ কেবল ভ্রম ক্রমেই নিশ্চিন্ত থাকে। কেউ থাকে না- এবং সেইটি মনে করলে মানুষ আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে।’ কী হয়, ভয় তাড়াতে, বেদনা এড়াতে, বেঁচে থাকার খানিকটা স্ফূর্তি আনতে তখনই আবার দুর্গার মৃত্যু সংবাদ পড়ি- ‘দুর্গা আর চাহিল না।’ মৃত্যু সংবাদ কী অবিচল আস্থায় পরিবেশন করেন জীবনানন্দ নিজেও- ‘কোনোদিন আর জাগিবে না আর/জানিবার গাঢ় বেদনার/অবিরাম অবিরাম ভার/সহিবে না আর।’ মৃত্যুর পঙ্ক্তিতে দাঁড়ানো সন্তানের জন্য পরাক্রমশালি সম্রাটের আহাজারিও কখনও ভেসে আসে- ... ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও/আমার সন্ততি সুস্থ থাক। ...পাথর করে দাও আমাকে নিশ্চল/আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক। ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর/আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক। বুঝতে পারি- মৃত্যুর এইসব বিবিধ পরিপ্রেক্ষিত খুঁজতে খুঁজতে আরো বহুদূর যাওয়া চলে, অথবা মৃত্যু বিষয়ক প্রবন্ধ-বক্তৃতা-উদ্ধৃতি নিশ্চয় আরো তীব্র বিস্তৃত করা যায়। এই ধারাবাহিকতার একসময় উপস্থিত হন সুবিখ্যাত ইসাবেল আয়েন্দের পলা- পলা আচ্ছন্ন থাকতে থাকতে মৃত্যুবরণ করে ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর। আর লারা ওর বিপজ্জনক সৌন্দর্যময় কিউমুল মেঘরাজ্য পাড়ি দিতে দিতে হারিয়ে যায় ১৯৯৮-এর ২৭শে সেপ্টেম্বর। লারার খোলসে পলা, এবং পলার খোলসে সেলিনা হোসেনকে প্রতিস্থাপন করার একটি ঝোঁক এবার এড়াতে পারি না সহসা। পলার ভূমিকা, অনুচ্ছেদ এবং পৃষ্ঠাগুলো উল্টে উল্টে দেখি- ইসাবেল কোমায় আক্রান্ত কন্যা পলার উদ্দেশ্যে, এই লেখা লিখছেন হাসপাতাল করিডোরে নির্ঘুম জেগে-জেগে। আবিষ্কার করি- জগতের সকল মায়ের শোক, মায়ের ব্যথা, মায়ের জল, অসহায়ত্ব, ক্রোধ, বিবমিষা যেন একই তারে বাঁধা-

Listen, Paula. I am going to tell you a story, so that when you wake up you will not feel so lost. ... ¸ memories of childhood are dramatic, like everyone else, I suppose, because the benalities are lost; with me, it may also be my sense of the tragic.... Death laid its hands on you Monday, Paula. It came and pointed to you, but found itself face to face with your mother and grand mother and, for now, has backed off. ... `Earth, welcome my daughter, receive her, take her to your bosom; Mother Goddess earth, help us. ... Near dawn on Sunday December 6, after a miraculous night in which the veils that conceal reality were parted, Paula died. ... Her life ended without struggle, anxiety, or pain, in her passing there was only the absolute peace and love of those of us who were with her. ...I had gradually been letting go; first I said goodbye to PaulaÕs intelligence, then to her vitality and her company, nwo finally, I had to part with her body. I had lost everything, and my daughter was leaving me, but the one essential thing remained: Love. In the end, all I have left is the Love I give her. ... I am the void. I am everything that exists, I am in every leaf of the forest, in every drop of the dew, in every particle of the ash carried by stream, I am Paula and I am also Isabel, I am nothing and all other things in this life and other lives, immortal.

পলা এবং ইসাবেল বদল হতে হতে লারা এবং সেলিনা হোসেন-এর ছায়া আসে এক দু’বার। লক্ষ্য করি দিনলিপিতে বিভূতিভূষণ জন্ম-মৃত্যুর চরম এক অস্পষ্ট ছায়ার কথা বর্ণনা করেছেন- ‘...সুখ-দুঃখ জন্ম-মৃত্যু সবই খেলা দুদিনের। কিছুতেই ব্যথিত হবার কিছুই কারণ নেই। নদী-বেয়ে যেসব ভেসে যাচ্ছে, কে জানে হয়ত দূরে কোনো অজানা নক্ষত্রে ওর মৃত্যু নবজীবন লাভ করেছে।’ সেলিনা ধরা যাক, বহুদিন পর আমাদের যৌথ-প্রণোদনায় তাঁর মৃত কন্যার নবজীবন উদ্যাপনের জন্য পুন্ড্রের গন্ডগ্রামে রওনা হয়েছেন শৈশবের নবান্ন উৎসব চাক্ষুষ করার ছলে। মোটর আটকে যেয়ে পথে সেদিন এক চেনা-অচেনা লজ্জাবতীর বাগান, বিপুল জলমগ্ন দিঘি এবং রাস্তার ধাঁধাঁ তৈরি হয়। দিঘির অপরূপ পরিসর ছুঁয়ে সেলিনার বিভ্রম হয়, যেনবা এই জলপ্রবাহ প্রাচীন সেই লেথি নদীর অপর এক নির্ভুল জলরঙ- যে নদীর কাছে গেলে মানুষের দুঃখ মৃত্যুবরণ করে, যে নদীর জল পান করলে মানুষের পুরনো স্মৃতি লোপ পায় এবং সে নবজীবন লাভ করে! পুরনো বেদনাদায়ক স্মৃতি বিসর্জন দিয়ে এবার ওঁরা লজ্জাবতীর পাতা বুঁজিয়ে দেয়ার খেলা খেলেন, আর প্রতিজ্ঞা নেন- ‘কঠিন কর্মক্ষেত্রে মর্মান্তিক শোকেরও অবসর নেই। অবসরটা নিয়েই বা ফল কী?’ সুবচনী হাঁসের পিঠে ভেসে যেতে-যেতে রবীন্দ্র-আকাশ পরিভ্রমণ করতে-করতে তখন অনুভব হয়- ‘... জীবন একটা গম্ভীর বিদ্রুপ; ... আমরা আমাদের সুখদুঃখের চেয়ে বড়ো, আমরা প্রতিদিনের তুচ্ছ বন্ধন থেকে মুক্ত।’ কে জানে, হয়ত এই বন্ধন এড়ানোর জন্যই, সুসম্পন্ন সুসংহত সুসংযত আমাদের এই মেয়েটির একটি বৃহৎ প্রশস্ত আকাশের জন্য ভেতরে-ভেতরে একদিন তীব্র ক্ষুধা তৈরি হয়েছিল। আমরা জীবন নামক সেই ফুৎ পিপাসার ক্ষুধার রাজত্বে ডুবে যেতে-যেতে, বহুদিন পর একখন্ড বই কখন বিবলিওথেরাপি’র অংশ হয়ে ওঠে, তার খানিকটা আভাস পাই, পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া ‘লারা’ নামক একটি মানব-গ্রন্থের অবশিষ্ট পৃষ্ঠায়। আর স্থির করি- গাছ উল্টো করে লাগালেও বাঁচে যদি ভালবাসা থাকে। লারা, ফিসফিস করে- ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, আর কাঁদতে ইচ্ছে করলে একা কান্না করো।’ আমরা অবাক হই- কোথাও তখন দূর বরগুনার সমুদ্র মোহনায় উল্টো করে লাগানো বৃক্ষের শেকড় থেকে জ্যোস্নার স্লোত তৈরি হয়েছে এবং খসে পড়া তারার রাজ্য ছিন্ন করে জলভেজা একখন্ড সন্ধ্যা-রাতের সুর ভেসে আসছে বাঁশির; আমরা অবাক হই- বাঁশির ভেতর এবেলা মানুষের যুগপৎ কান্না ও গলার স্বর কেবল গভীর-গম্ভীর এক বিদ্রুপে লিপ্ত।

  • ‘হেঁটে যাই জনমভর’: সেলিনা হোসেনের মানবিক তথ্যচিত্র

    মোজাফ্ফর হোসেন

    newsimage

    কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ‘হেঁটে যাই জনমভর’ উপন্যাসটি ২০১৬ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে।

  • মোহাম্মদ রফিকের কবিতা

    newsimage

    যেন আবহসংগীত টের কি পাও নি, সংগোপনে আমাদের মৃত্যু হয়ে গেছে; এই পুঁচকে একটাই জীবন মাড়িয়ে

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    পতনের গোপন পয়ার শ্বেতা শতাব্দী এষ ঘুরেফিরে যদি সেই প্রেমের কথাই বলি- তবে বলতে হবে

  • নতুনের গন্ধ

    রাহমান ওয়াহিদ

    newsimage

    এই গপ্পোড্যা হামি কবার (বলতে) চাচ্চিনু না। হামি মুক্যু সুক্যু মানুষ। হাল

  • অসম্পূর্ণ গল্প ( শেষ পর্ব )

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) নবম অধ্যয় গতকাল সন্ধ্যার এই সময়টার কথা মনে করার কথা চেষ্টা

  • পরাবাস্তবের আড়ালে

    ঝরে পড়া মায়ামুগ্ধতা

    মুহিম মনির

    newsimage

    জানালার ওপাশে ফুটে আছে বাতাবি ফুল। এপাশে বসে আছি একফোঁটা জলের আশায়।

  • ঊষা ও গামিনি

    বিক্ষত সময়ের ভাষ্য

    পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

    newsimage

    ‘ঊষা ও গামিনি’ কাব্যগ্রন্থটি তরুণ কবি সৌম্য সালেক-এর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যা তার

  • গোপেন্দ্রনাথ সরকার রচনা সংগ্রহ

    বিলু কবীর

    newsimage

    এই আলোচনাটা বই নিয়ে। কিন্তু সঙ্গত বাস্তবতায় তা লেখক মূল্যায়নের সাথে একাকার।

  • কবিতা ও কবিগান

    ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত

    newsimage

    কবিতা প্রাচীনতম সাহিত্য। প্রকৃতি ও জীবন, মহাবিশ্বের বিস্তৃত গ্রহতারা থেকে শুরু করে