menu

ডোরিস লেসিংয়ের গল্প

সূর্যোদয় এবং অন্যান্য সত্য

অনুবাদ : কামরুল ইসলাম

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০
image

ডোরিস লেসিং

সেবারের শীতের সময়টা প্রায় রাতেই সে অন্ধকারে সাড়ে চারটা! সাড়ে চারটা! বলে চিৎকার করে উঠত যতক্ষণ না তার মস্তিষ্কে কথাগুলো গেঁথে যেত। অতঃপর সে ঘড়ির দিকে মুখ ঘুরিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত যাতে জেগে উঠলেই প্রথমে তা তার চোখে পড়ে। প্রত্যেক সকালেই কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে চারটা। ঘড়িটির এলার্ম-নব বেজে উঠত স্বতঃস্ফূর্তভাবে আর তার অবচেতন মন জেগে থাকত আর গুনে যেত রাতের অতিক্রান্ত ঘন্টাগুলো, যখন সে আয়াসে ঘুমে আচ্ছন্ন থাকত। সে কাঁথার নিচে গুঁটিসুটি মেরে থাকত শেষ উষ্ণ-মুহূর্তের জন্য। তার মনে এ ধারণাও থাকত যে, তার এই দুর্বলতা সে অনায়াসেই পরাস্ত করতে পারে। এই আনন্দ-মুহূর্তের জন্যেই সে প্রতিরাতেই এলার্ম সেট করে রাখত, যখন সে জেগে উঠত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রসারিত করত এবং ভাবত তার শরীরের সব অংশেই তার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

উষ্ণতায় উদ্দীপ্ত শরীর; বাহু, পদযুগল এবং আঙ্গুলগুলো মনে হলো সৈনিকের মতো আদেশের অপেক্ষায়। বিষয়টি আনন্দের যে, মূল্যবান সময়গুলো ঐচ্ছিক ঘুমে অতিক্রান্ত হয়েছে। মনে পড়ে তার, একদা সে তিন রাত না-ঘুমিয়ে সারাদিন ক্লান্তিবিহীন কাজ করে প্রমাণ করেছিল যে, ঘুম এখন তার কাছে ভৃত্যের মতো আদেশপ্রাপ্ত কিংবা প্রত্যাখ্যাত। ঘুমের অদূরে সে দ্যাখে জীবনের বহমান তরঙ্গগুলো কীভাবে রঙ্গ করে করে দূর সময়ের দিকে চলে যায়।

এবার বালক তার পূর্ণ দৈর্ঘ্য প্রসারিত করল, তার মাথা ও হাত দেয়াল স্পর্শ করল এবং পায়ের বুড়ো আঙ্গুল বিছানার প্রান্তে চেপে ধরে মাছ যেমন জল থেকে লাফিয়ে ওঠে, সেরকমভাবে সে লাফিয়ে উঠল। তখন বেশ ঠাণ্ডা অনুভব করল সে।

সে সব সময়ই অতি দ্রুত জামা-কাপড় পরিধান করত যাতে সে রাতের উষ্ণতাটুকু দুই ঘণ্টা পর সূর্যোদয় অবধি ধরে রাখতে পারে। কিন্তু আজ যখন সে পোশাক পরিধান করল তার হাত দুটো অবশ মনে হলো এবং সে জুতোও ধরতে পারছিল না। সে জুতো পরিধান করল না পিছে আবার পিতা-মাতা জেগে ওঠে যারা জানত না যে, তাদের পুত্রধন প্রতিদিনই প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করে।

চৌকাঠ পেরোতেই তার পায়ের তলা মাটির ঠাণ্ডা স্পর্শে সঙ্কুচিত হলো এবং পায়ে ব্যথা অনুভূত হলো শীতের প্রচণ্ডতায়। তখনো রাত, তারাগুলো জ্বলজ্বল করছিল আকাশে, বৃক্ষগুলো কালো মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে ছিল নীরবে। দিনের আবির্ভাবের দিকে তার নজর গেল। সূর্যোদয়ের দিকে আকাশে কোনো আলোর আভাস দেখা গেল না। সতর্ক জন্তুর মতো জানালা দিয়ে অন্ধকার কক্ষটি সে দেখে নিল যেখানে তার পিতা-মাতা ঘুমিয়ে আছে। অতঃপর পা টিপে টিপে সে ভেতরের অন্য একটি জানালার দেয়ালের কাছে গেল, যেখানে গত রাতে সে বন্দুকটি প্রস্তুত করে রেখেছিল। ইস্পাতের ঠাণ্ডায় অবশ হাত পিছলে যাচ্ছে দেখে সে বন্দুকটিকে বাহুর ভাঁজে নিরাপদ আশ্রয়ে নিল। কুকুরগুলো জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে থাকলেও ওদের কান ছিল সজাগ, ওরা লেজ নাড়িয়ে আনন্দভরে বন্দুকটিকে অভিনন্দন জানাল। তার সতর্ক কণ্ঠস্বর বাড়ি থেকে অন্তত ১০০ গজ দূরত্ব পর্যন্ত কুকুরগুলোকে নীরব রেখেছিল। অতঃপর কুকুরগুলো জঙ্গলের দিকে ছুটল চিৎকার করতে করতে।

বালকটি কল্পনা করল তার পিতা-মাতা ঘুমের মধ্যে হয়ত পাশ ফিরে বলছে, আবার সেই কুত্তারা! একঝাঁক বৃক্ষের আড়ালে বাড়িটি ঢেকে গেলে, সে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে নিল। বাড়িটিকে খুব ছোট ও নিচু দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল তা লম্বা উজ্জ্বল আকশের নিচে গুঁটিসুটি মেরে আছে। তারপর সে আবার সমুখে দৃষ্টি ফেরাল, পিছনে পড়ে রইল ঘুমকাতুরে মানুষ দুটো, সে তাদের ভুলে গেল।

তাকে সূর্যোদয়ের পূর্বে আরো চার মাইল যেতে হবে। সুতরাং তাকে চলতে হবে দ্রুত। ইতোমধ্যে গাছে গাছে পাতাদের সবুজ পাতার রঙ ফুটে উঠেছে এবং বাতাসেও প্রভাতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তারাগুলোও নি®প্রভ হয়ে আসছে। ভেল্ট-এ হাঁটার জুতো সে কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছে। শত সহস্র প্রভাতের শিশিরে জুতোগুলো শক্ত হয়ে গেছে। এই জুতোর প্রয়োজন তখনই হবে যখন মাটি হবে অসহ্য গরম। সে তার আঙ্গুলের ফাঁকে চরম ঠাণ্ডা ধুলোকণার উপদ্রব অনুভব করল এবং সে ভাবল- আমি এভাবে শত শত মাইল পায়ে হেঁটে যেতে পারি। আমি সারাদিন হাঁটতে পারি। এবং কথনো ক্লান্ত হবো না।

লতাগুল্মময় অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে সে হেঁটে যেতে লাগল, যাকে দিনের আলোতে হয়ত রাস্তাই বলা যেত। কুকুরগুলো আরো নিচের রাস্তা দিয়ে প্রায় অদৃশ্যভাবেই ছুটে যাচ্ছিল। সে তাদের হাঁপানির শব্দ শুনল। কখনো কখনো সে পায়ের কাছে তাদের ঠাণ্ডা নাকের স্পর্শ অনুভব করছিল, পরক্ষণেই আবার তারা দূরে সরে যাচ্ছিল। এভাবেই চলছিল কুকুর ও মানবের অরণ্য যাত্রা। কুকুরগুলো প্রশিক্ষিত ছিল না, তবে তারা শিকারের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে পারত। এক ধরনের বন্য অদ্ভুত আলোর ঝলকানিতে কিছুক্ষণের মধ্যে এদের চেহারায় বন্যতার ভাব ফুটে উঠল। অরণ্যভূমি প্রভাতী রঙে উদ্ভাসিত হলো, যদিও তখনও সূর্য তার আপন রঙে ধরিত্রীকে রাঙিয়ে দেয় নি।

এখানের ঘাসগুলো তার কাঁধ বরাবর। মলিন রজতশুভ্র বৃষ্টি ঝরাল গাছগুলো। তার শরীর ভিজে উঠল। অনড় কাঁপুনিতে তার সমস্ত শরীর আড়ষ্ট হবার উপক্রম হলো। জন্তু-জানোয়ার হেঁটে গেছে এরকম একটি নতুন রাস্তায় উঠল সে। তারপর সে মাঠের কিনার দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। খরগোশের মতো লাফাতে লাফাতে সে যাচ্ছিল, সে নেটিভদের দেখে শিখেছে এই দৌড়। এই ধরনের দৌড়ে কোনো ক্লান্তি আসে না কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসও দ্রুত হয় না।এভাবে সে পাড়ি দিল একটি ফার্মের চাষ করা অংশ।

পিছনে অরণ্যভূমি নিচু ও কালো। সমুখে মলিন ধূসর ঘাসের নিম্নভূমি অঞ্চল। সামনে থোকা থোকা ঘাস পানির ভারে নুয়ে আছে এবং এদের মাথায় পানির ফোঁটাগুলো হীরকখণ্ডের মতো চকচক করছিল।

প্রথম পাখিটি তার পায়ের কাছাকাছি জেগে উঠল, অতঃপর একঝাঁক পাখি শীৎকার দিয়ে বাতাসে লাফিয়ে পড়ে দিনের ঘোষণা দিল এবং তার পিছনে বনভূমিও জেগে উঠল গানে গানে, সে শুনতে পেল সমুখে দূরে কোথাও বনমোরগের ডাক। মনে হলো তারা গাছ থেকে উড়াল দিয়ে গভীর ঘন ঘাসের মধ্যে নেমে আসছে এবং সে ভাবল তাদের জন্যেই তার এখানে আসা।

তার একটু দেরি-ই হয়ে গিয়েছিল। এতে সে কিছু মনে করল না। সে ভুলে গেল যে সে এখানে শিকারে এসেছে। পায়ের পাতার ভারসাম্য ঠিক রেখে সে একটু ফাঁকে ফাঁকে পা ফেলতে শুরু করল। আনুভূমিকভাবে দুই হাতে বন্দুকটি দোলাতে দোলাতে সে এগিয়ে চলল সামনে। সে দেখল গোলাপী রঙের মেঘগুলো সোনার হ্রদের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে।

গোটা প্রকৃতিই যেন জেগে উঠল তার ভেতর। এটা ছিল তার বহন-ক্ষমতার বাইরে। বন্য চিৎকারে এবং একধরনের অপরিচিত কোলাহলে সে লাফিয়ে উঠল বাতাসে, তারপর সে পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করল, এও ছিল একধরনের বন্যতা। এ ছিল প্রকৃতপক্ষে পাগলের মতো আচরণ, বেঁচে থাকার আনন্দে এ এক পাগলা চিৎকার যৌবনের পূর্ণ আশ্বাসে।

যখন সে গাঢ় হলুদ ও সোনালি রঙের কোলাহল বেয়ে নিম্নভূমির দিকে ধাবিত হলো, তখন পৃথিবীর সমস্ত পাখি তার সম্মানে গান গেয়ে উঠল। দ্রুত পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সে দৌড়াতে শুরু করল এবং যতই দৌড়াচ্ছিল ততই আনন্দ-চিৎকারে তার সমস্ত শরীর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। সে ভাবল, এ এক অভাবনীয় ঘটনা, তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে এরকম ঘটনা তার জীবনে ঘটতে পারে। সে আরো ভাবল যে, যে কোনো মুহূর্তে ঘন ঘাসের জালে আটকে তার পায়ের গোড়ালি ভেঙে যেতে পারে। অতপর জঙ্গল ছেড়ে চঞ্চল মৃগের মতো লাফিয়ে সে একটি উঁচু শিলাখণ্ডের উপরে উঠল। এখান থেকে একটি ঢালু পথ সমুখে নদীর দিকে নেমে গেছে।

তার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসল, সে আর গান গাইতে পারল না। শিলাখণ্ডের ওপর ভারসাম্য রক্ষা করে দাঁড়াল এবং নিচু গাছপালার মধ্য দিয়ে জ্বলজ্বল করা বিস্তৃত জলরাশির দিকে তাকাল এবং সে হঠাৎ করে বলে উঠল, আমার বয়স পনের! পনের! শব্দগুলো তার কাছে নতুন মনে হলো এবং সে চমৎকারভাবে পূর্ণ উত্তেজনায় সেগুলো আওড়ে চলল। সে তার জীবনের বছরগুলো হাত দিয়ে অনুভব করল যেন সে মার্বেল গুনে যাচ্ছিল, যেন প্রত্যেকটি শক্ত, পৃথক ও নিরেট, প্রত্যেকটি চমৎকার, ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর। এইতো সে, যে এই মৃত্তিকারই পনের বছরের কোনোকিছু, এই ধীর গতির জল, এই বাতাসের একধরনের চ্যালেঞ্জের মতো গরম কিংবা ভ্যাপসা দুপুরবেলা, অথবা ঠাণ্ডা জলের মতো সতেজ। তার মনে হলো, পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা সে করতে পারে না।

যখন সে দাঁড়িয়েছিল সেখানে, একটি স্বপ্নিল আবেশে সে আচ্ছন্ন হলো; ব্যাপারটি এরকম যে, একজন বালক শুনছে ‘অসীমতা’ শব্দটি এবং চেষ্টা করছে তা বুঝতে এবং সময় তার মনকে অধিকার করে বসল। একটি অদ্ভুত ব্যাপকতায় তার জীবন তার সামনে এখন, এটা এমন কিছু যা তার একান্ত নিজেরই, তার মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল, সে চিৎকার করে বলে উঠল- পথিবীর সমস্ত বিখ্যাত ব্যক্তি যেমন ছিলেন আমি এখন সেই রকম, এমন কিছু নেই যা আমি হতে পারি না, এমনকিছু নেই যা আমি করতে পারি না, পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যার আমি অংশ নই, এসবই আমার ইচ্ছা-নির্ভর। আমি এখন পৃথিবীকে ধারণ করি। আমি তা-ই করতে পারি আমার মন যা চায়। যদি আমি ইচ্ছা করি, পৃথিবীতে যা ঘটতে যাচ্ছে, তা বদলে দিতে পারি, পৃথিবীর সবকিছু আমার উপর নির্ভরশীল। আমার সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবী।

তার কণ্ঠস্বরের সাহস ও সত্যতা তাকে এমনভাবে উল্লসিত করল যে, সে আবার গান গাইতে পারল। নদীর গহবর থেকে সেই গানের প্রতিধ্বনি ভেসে এলো। সেই প্রতিধ্বনি শোনার জন্য সে থেমে থেমে গান গাইতে শুরু করল। তার মনে হলো, সে গান গাচ্ছে আর পৃথিবী তার গানের উত্তর দিচ্ছে। তার চিৎকার কিংবা গানের সুন্দর কুণ্ডলী পাকানো প্রতিধ্বনি শোনার জন্য আরো কিছুক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকল, একটি নতুন চিন্তা এসে তার মাথাকে আচ্ছন্ন করল, তার মনে হলো, কেউ যেন আড়াল থেকে তার সব কিছুর উত্তর দিচ্ছে কিংবা তাকে উৎসাহিত করছে। অতঃপর তার মনে হলো, কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে নতুন কন্ঠস্বর। সে তা শুনলো এবং হত-বিহ্বল হলো, তার মানে এই যে এই কণ্ঠস্বর, এ তার নিজের নয়। সে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে সজাগ হলো এবং বুঝল নিকটে কোথাও শব্দ শোনা যাচ্ছে- এটা কোনো উল্লসিত পাখির শব্দ নয়, কিংবা জলপতনেরও কোনো শব্দ নয় এটা। শব্দটি আবার শোনা গেল। বেদনার ভয়ার্ত আর্তনাদ- সংক্ষিপ্ত, মৃত্যুর আগেই সাধারণত এধরনের কাতর কণ্ঠের আর্তনাদ শোনা যায়। সে সংবিৎ ফিরে পেল, চারদিকে তাকাল এবং কুকুরগুলোকে ডাক দিল। ওরা আসল না, কারণ ওরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। সে এখন একা। তার মধ্যে ফুটে উঠছে শান্ত-সমাহিত ভাব, উবে গেছে পাগলামি, তার হার্টবিট বেড়ে গেছে ভয়ে, সে অতি সাবধানে শিলাখণ্ডের ওপর থেকে গাছগাছালির আড়ালে ছুটে গেল।

বন্দুকটি প্রস্তুত রেখে সে গাছগাছালির কিনারে এসে দাঁড়াল এবং চারদিকে উঁকি মেরে দেখতে থাকল, অতঃপর সে সামনের দিকে অগ্রসর হলো। তার চোখ-দুটো ছোট হয়ে আসলো। হঠাৎ করে সে থামল, কিছুটা ইতস্তত করল এবং মুখমণ্ডলে নেমে এলো বিহ্বলতা। সে অস্থিরভাবে মাথা নাড়াল যেন সে তার দৃষ্টিকে সন্দেহ করছে।

কালো শিলাখণ্ডের কাছাকাছি দুটি গাছের ফাঁকে সে লক্ষ করল একটি অদ্ভুত প্রাণি, এ যেন স্বপ্ন থেকে পাওয়া, শিং ও মাতাল পদবিশিষ্ট, এটা এমন এক প্রাণি যে, সে এটা কখনো কল্পনাও করেনি। প্রাণিটিকে মনে হলো জীর্ণ-শীর্ণ। প্রাণিটি দেখতে ছোট হরিণের মতো, শরীরে ফোঁটা ফোঁটা কালো দাগ। সমস্ত সময়েই প্রাণিটি আর্তনাদ করছিল, মাতালের মতো চারদিকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল, মনে হচ্ছিল প্রাণিটি অন্ধ। অবশেষে বালকটি বুঝতে সক্ষম হলো এটা সত্যি সত্যি একটি হরিণ। সে প্রাণিটির খুব কাছাকাছি এসে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকল এবং তার ভেতর নতুন ভয়ের অবতারণা হলো। তার চারদিকের ঘাসগুলো ফিসফিস করে কী যেন বলছে এবং এগুলো বেশ সজীব দেখাচ্ছিল। অতঃপর বালক কিছুটা উত্তেজিতভাবে চারদিকে তাকাল এবং চোখ নিচে নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল কালো পিঁপড়ের সারি, এরা তাকে আমল না দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নিজেদের গন্তব্যে। পিঁপড়ের সারিগুলোকে মনে হচ্ছিল উজ্জ্বল কালো জল ঘাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

যখন সে নিশ্বাস টানল, দয়া ও ভীতির এক মিশ্র ভাব তাকে চেপে ধরল, সে স্পষ্টত দেখল জন্তুটি পড়ে গেল, বন্ধ হলো আর্তনাদ। অতঃপর সে পাখির গান, পাতার মর্মরধ্বনি কিংবা পিঁপড়াদের ফিসফিসানি ছাড়া আর কিছু শুনতে পেল না।

এবার তার মনে হলো যে, সে জন্তুটিকে গুলি করে হত্যা করে তার যন্ত্রণার অবসান ঘটাবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করা হলো না। হরিণটি এসবের কিছুই বুঝলো না। সে ভাবল, সে যদি এখানে নাও আসত, জন্তুটি মারা যেত- সুতরাং সে কেন এতে হস্তক্ষেপ করবে? এই বিশাল অরণ্যভূমিতে প্রতিনিয়তই এরকম ঘটছে। এখানের জীবন এরকমই। সে বন্দুকটি দুই হাঁটুর মধ্যে চেপে ধরে তার সমস্ত শরীরে জন্তুটির অজস্র বেদনা অনুভব করল যা হয়ত জন্তুটিই অনুভব করেনি। দাঁত চেপে সে বার বার বলতে লাগল, আমি এটা বন্ধ করতে পারি না। আমি এটা বন্ধ করতে পারি না। আমি বস্তুত কিছুই করতে পারি না।

সে খুশি হলো এই ভেবে যে, জন্তুটি এখন অচেতন এবং সে তার কষ্ট-সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে। এখর আর এটিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। সমস্ত শরীর দিয়ে সে অনুভব করল- যা ঘটার তাই-ই ঘটছে- এটাই ঠিক- এর কোনো পরিবর্তন নেই। এই প্রথমবারের মতো ভাগ্যবিষয়ক চিন্তা তাকে আঁকড়ে ধরল এবং কেবল ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। এটাই জীবন’ বলা ছাড়া আর কোনোকিছুই তার মস্তিষ্কে খেলছে না। এই চিন্তা তার মাংসপেশী, হাড় বেয়ে মস্তিষ্কের সুদূর প্রান্তে পৌঁছে গেল। এবং সেই মুহূর্তে সে সামান্য দয়ার কাজটিও করতে পারল না। বরং এটা অপরিবর্তনীয় যে, এখানে বাস করলে, এই নিষ্ঠুর ভেল্ট-এ, যে কোনো মুহূর্তে যে কেউ হয়ত কোনো ক্ষুদ্র প্রাণীর মাথার খুলিতে হোঁচট খেতে পারে কিংবা কোনো কঙ্কাল গুঁড়িয়ে চলে যেতে পারে। কষ্ট, অসুস্থতা, ক্রোধ- মনে হলো নব্য স্টয়িসিজম তাকে পেয়ে বসেছে। সে তার রাইফেলে হেলান দিয়ে দাঁড়াল এবং দেখতে থাকল দূরের টিলাটির ক্রমশ ছোট হয়ে আসা। পিঁপড়েরা খাবার মুখে ঘরে ফিরছে, সে তার নাসারন্ধ্রে সতেজ এসিডের গন্ধ পেল। শূন্য সঙ্কুচিত পাকস্থলির পেশিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে এনে সে মনে মনে ভাবল- পিঁপড়েরাও এখন খাবে! এসময়ে সে লক্ষ করল তার মুখমণ্ডল অশ্রুসিক্ত, তার সমস্ত কাপড় ভিজে গেছে ঐ জন্তুটির বেদনার ঘামে।

সে সামনের দিকে এগোতে থাকল, তার প্রত্যেক পদক্ষেপে পিঁপড়েরা দলিত হলো এবং সে পোশাক থেকে ঝেড়ে ফেরল অনেক পিঁপড়ে, অতঃপর সে ছোট ঝাড়ের মধ্যে পড়ে থাকা ছোট কঙ্কালটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হতে পারে এটা অনেক অনেক বছর ধরে এখানে পড়ে আছে, পিঁপড়েরা সাদা হাড় থেকে মাংস মুখে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। বালকটি এইসব পিঁপড়ের দিকে তাকাল, এদেরকে কুৎসিত মনে হলো তার। সে খুব ঠাণ্ডা গলায় পিঁপড়েদের বলল, ‘দূর হ! আমি তোদের জন্য এখানে আসিনি।’ অতঃপর হাড়গুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ল এবং একটি খুলির সকেট স্পর্শ করল, যেখানে জন্তুটির চোখ ছিল; তার মনে পড়ল হরিণটির সরল কালো চোখ। তারপর সে সামনের পায়ের হাড়টি হাতের তালুতে আনুভূমিকভাবে রেখে দোলাতে থাকল।

সকালে, একঘণ্টা আগেও এই জন্তুটি অহংকার চোখে এই বনে ঘুরেছে মুক্তভাবে। রাজার মতো কিংবা বিজয়ীর বেশে সে হেঁটেছে সারা বন- এখানের প্রত্যেকটি ঘাস বেড়ে উঠেছে তার জন্য, এখানের নদী বয়ে গেছে তার তৃষ্ণার জল নিয়ে। তাহলে এরকম হয় কেন? নিশ্চয় ঐ পিঁপড়াদের সাধ্য নেই এরকম করার? অতঃপর আগ্রহভরে বালকটি কঙ্কালটির কাছে গেল। হরিণটির এ অবস্থা দেখে তার মনে নানারকম প্রশ্নের অবতারণা হলো। অনেক সম্ভাবনার কথাও সে ভাবল। শেষমেশ তার মনে হলো, কিছু নেটিভ আফ্রিকান হয়ত পাথর ছুঁড়ে হরিণটিকে মারতে চেয়েছে মাংসের জন্য এবং এভাবে তার পা ভেঙেছে। সে নিশ্চিত হলো, ঘটনাটি এরকমই হবে। তার মনের মধ্যে সেই দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল- একদল নেটিভের দৌড় ও চিৎকার, পাথর ছোড়া কিংবা হরিণের লাফিয়ে লাফিয়ে দৌড়ে পালানো...।

তার ক্ষুধার উদ্রেক হলো। এভাবে বন্দুক নিয়ে জন্তু-জানোয়ারের পিছে মাইলের পর মাইল ছোটা আর ঠিক হবে না। কিছু সময়ের জন্য সে আর এসব দৃশ্য দেখবে না। সে আবার ছোট বালক হয়ে গেল এবং কিছুটা অভিমান করে কঙ্কালটিকে লাথি মেরে এড়িয়ে যেতে চাইল এসবের দায়িত্ব।

অতঃপর সে খুব সাদাসিধেভাবে একধরনের অদ্ভুত হতাশার অভিব্যক্তি নিয়ে হাড়গুলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল, তার ভেতর থেকে সমস্ত রাগ উবে গেল। তার মন একেবারে শূন্য হয়ে গেল, সে দেখতে পেল তার চারদিকের পিঁপড়েগুলো ধীরে ধীরে ঘাসের মধ্যে অদৃশ্য হযে যাচ্ছে। এভাবে অরণ্যের ফিসফিস শব্দও ক্রমশ শুষ্ক, ক্ষীণ হয়ে আসল।

অবশেষে সে তার বন্দুকটি ঘাড়ে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। সে কিছুটা উন্মত্তের মতো বলে চলল- সে নাস্তা চায়। তখন এতটাই রোদ পড়েছে যে জঙ্গলে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই আর। সে প্রকৃতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে এত জোরে হাঁটতে শুরু করল যে কোথায় তার পা পড়ছে সে টেরই পেল না। যখন সে বাড়ির কাছাকাছি এল হঠাৎ থামল। তার মনে হলো তার কিছু ভাবার আছে। ঐ ছোট্ট প্রাণীটির মৃত্যুর ব্যাপারটি তার মাথা থেকে গেল না। একধরনের অস্বস্তির মধ্যে ঘুরপাক খেকে খেতে সে ভাবল, আগামীকাল সকালেই সবাইকে এড়িয়ে সে আবার অরণ্যে যাবে এবং বিষয়টি নিয়ে ভাববে।

[১৯১৯ সালের ২২ অক্টোবর বর্তমান ইরানের খেরমানশাহতে বৃটিশ লেখিকা ডোরিস লেসিং-এর জন্ম। তাঁর বাল্যকাল কাটে দক্ষিণ রোডেশিয়ায় এবং ১৯৪৯-এর আগে তিনি ইংল্যান্ডে আসেননি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি স্কুল ত্যাগ করেন। নার্সমেইড এবং উকিলের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছেন জীবিকানির্বাহের জন্য। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গ্র্যাস ইজ সিংগিং’ (১৯৫০) প্রকাশিত হলে তা সফল হয় এবং তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল একজন ইহুদি মার্ক্সিস্ট গডফ্রিড লেসিং-এর সাথে। এই স্বামীর সাথে তার সংসার না টিকলেও লেসিং নামটি তিনি বাদ দেননি। তার লেখার দুটি মূল বিষয় : আফ্রিকান জাতিসমূহের দ্বন্দ্ব এবং একটি পুরুষ অধিকৃত জগতে নারীর আইডেন্টিটির সমস্যা। তিনি অবশ্য নিজেকে একজন নারীবাদী লেখক মনে করেন নি। ফিকশন ছাড়াও তিনি নাটক, ছোটগল্প, কবিতা এবং প্রবন্ধও লিখেছেন প্রচুর। ২০০৭ সালে ৮৮ বছর বয়সে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এ বছর (২০১৩) ১৭ নভেম্বর ৯৪ বছর বয়সে তিনি লন্ডনে মারা যান। অনূদিত গল্পটি জেমস বি হল এবং এলিজাবেথ সি হল কর্তৃক সম্পাদিত বিশ্ব ছোটগল্পের সংকলন ‘দ্য রিয়েলম অব ফিকশন’-এর অন্তর্ভুক্ত।]