menu

ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনি : শেষ

সিমলা-মানালির পথে

কামরুল হাসান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০
image

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৩৯

বাস যেস্থানে যাত্রাবিরতি নিয়েছিল তার নাম সুন্দর নগর। পাহাড়ঘেরা, নীলাকাশ শোভিত, উন্মুক্ত এক উপত্যকায় বসানো সুন্দর নগর সুন্দর বটে, তবে যাত্রাবিরতির স্থানে নগরের চিহ্নমাত্র দেখলাম না। তা দেখলাম কিছুটা এগুতে। সেখানে যে জলধারা সড়কের পাশে খাদের তলদেশে বয়ে চলেছে তার নাম সুকেটি খাদ নদী। সাদা পাথরের উপর অগভীর জলধারা শ্লথ পায়ে বয়ে চলেছে। সে নদীর উপর সেতু চলে গেছে সুন্দর নগরের দিকে, কাছেই খাড়া পাহাড়, তার পাদদেশে ছোট জনপদটি, তাকে নগর বলতে রাজি নই আমি। তবে সে নগরের কতটুকুইবা আমি দেখেছি? শুনেছি কাছেই রয়েছে এক সুন্দর লেক, নয়নাভিরাম সে হ্রদের পাশেও রয়েছে ঘরবাড়ি। গুগল ম্যাপ বলছে সুন্দর নগর হ্রদের পাশ দিয়ে গেছে এ সড়ক, বাসে আমি যে পাশে বসেছি সে পাশেই দৃশ্যমান হবার কথা জলাশয়টির, কিন্তু কেন দেখতে পেলাম না কে জানে। প্রভু, এ পোড়া চোখে কম সৌন্দর্য তুমি ঢালো নি, আরেকটু ঢাললে কী এমন ক্ষতি হতো? সুন্দর নগর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে মান্ডি, সেখানে সুকেটি খাদ নদীর পাশ ঘেঁষে যেতে যেতে হ্রদটিকে খুঁজে চলে আমার প্রকৃতির জারকে ডোবানো চোখ। পায় না। হ্রদের বিপরীতে সড়কের পাশটায় বিনা নামের বন আছে; পাহাড় তাকে আড়াল করে রাখলো। হ্রদ ও বনের দৃশ্যবঞ্চিত চোখকে তৃপ্ত থাকতে হয় পাহাড় ও নদী দেখে। প্রকৃত নগরের দেখা পেলাম মান্ডিতে।

বিয়াস নদীর দেখা পাই সড়ক যেখানে বাঁক নিয়ে পূর্বদিকে গেছে সেখানে, তার আগে নয়। সেখানে সুকেটি খাদের ক্ষীণ জলধারা বিয়াসে সমর্পিত। সেস্থানে মান্ডি শহরে প্রবেশের প্রধান দরজা। সুকেটি খাদের উপর নির্মিত সেতুটিই প্রবেশপথ। তার আগেও আরেকটি সেতু ছিল, তবে তা এত প্রশস্ত নয়। ধনুকের বাঁকানো পিঠের উপর একটি তীর সোজা করে রাখলে যেমনটা দেখায়, তেমনি সেতুটির নকশা। সেখান থেকে মান্ডি শহরের জৌলুষ কিছুটা বোঝা গেল। হেরিটেজ কমপ্লেক্স, মোবারক মান্ডি প্রাসাদ, ইন্দ্র বাজার, আই আই টি, নেতাজী সুভাস বোস হাসপাতাল, অনেকগুলো মন্দির নিয়ে মান্ডি জৌলুসপূর্ণ বটে, কিন্তু দূরপাল্লার এ বাহন ট্যুরিষ্ট বাস নয়, যে একচক্কর শহরটি ঘুরিয়ে দেখিয়ে আনবে। সে তার লক্ষ্যে অবিচল। তার একমাত্র বিচ্যুতি সে লোকাল প্যাসেঞ্জার নেয়।

এমনি এক লোকাল প্যাসেঞ্জারের কাছে শুনলাম মান্ডি থেকে পাহাড়ের উপরে প্রাশর নামে টলটলে জলের এক হ্রদ আছে। পাশে একটি প্যাগোডা যা ঋষি পরাশরের নামে তৈরি। তিব্বতীয় ধাঁচের প্যাগোডাটি মন্দির বা গুরুদুয়ারার মতো নয়। গুগল ম্যাপে প্রাশরের নৈসর্গিক রূপ দেখে আমার ইচ্ছা হলো বাস থেকে নেমে যাই। এ যে একটুকরো স্বর্গ! প্রকৃতি কোন নির্জনে কী সাজিয়ে রেখেছে মানুষ খুঁজে খুঁজে বের করেছে, ঈশ্বরের অবদানের পাশে নিজ সৃজনের স্বাক্ষর রাখতে উপসনালয় বানিয়েছে ঈশ্বরেরই নামে। এই পাহাড়ি অঞ্চলে কত যে মন্দির তার কোন ইয়ত্তা নেই। সহযাত্রীটি আমাকে জানাল মান্ডি থেকে প্রথমে যেতে হয় বাগী নামক এক গ্রামে। সেটা প্রাশরে ওঠার বেজ ক্যাম্প। বেজ ক্যাম্প কথাটি আমি শুনেছি এভারেস্ট অভিযান সম্পর্কে কিছু জানতে গিয়ে। প্রাশর কি তবে অতটা উঁচু? যারা পাহাড়ে পর্বতে ট্রেকিং করে তাদের জন্য মনোলোভা এক রুট মান্ডি-বাগী-প্রাশর। জায়গাটি বিশ্বাসীদের কাছে পবিত্র, প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে নৈসর্গিক।

সিমলা-মানালির সড়ক থেকে মান্ডি শহরকে খুব ঘনবসতিপূর্ণ মনে হলো। তবে উপত্যকায় বসানো বলে তার বিস্তৃতি কম নয়। বাস যখন সে ঐতিহাসিক নগরীর (এর গোড়াপত্তন ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে) দিক থেকে পুবে চলা বিয়াসের অনুসারী হলো তখন জানলাম আমি দেড়শ বছর ধরে নির্মিত ডোগরা রাজবংশের অনিন্দ্য আবাস মোবারক মান্ডি প্রাসাদ, ইন্দ্র মার্কেট, ত্রিলোকনাথ মন্দির, পঞ্চভক্ত মন্দির, শিখ গুরুদুয়ারা দর্শন থেকে বঞ্চিত হলাম। ত্রিলোকনাথ মন্দিরটিব বেশ প্রাচীন। ১৫২০ সালে এটি স্থাপন করেন মান্ডির প্রতিষ্ঠাতা এজবার সেনের স্ত্রী সুলতান দেবী। পঞ্চভক্ত মন্দিরটিও প্রাচীন। সুকেটি খাদ যেখানে বিয়াসের সাথে মিলিত হয়েছে সেই নৈসর্গিক ত্রিমোহনায় মন্দিরটি স্থাপিত। এই পঞ্চভক্ত হলো শিবের পঞ্চরূপ। পাহাড়ে শিবের জয়জয়কার, কেননা এসব নদী যে পর্বত থেকে উৎপন্ন সেই কৈলাশ হলো শিবের ধ্যানস্থান। হিন্দুরা তাই বিশ্বাস করে। পাহাড়ে আরেক নন্দিত দেবী হলেন শক্তিরূপিনী মা কালী। তাঁর এক রূপ হলো মা দুর্গা। মান্ডিতে তাঁর অনেকগুলো উপসনালয়। এ সকল মন্দিরের একটিকেও না দেখে ফিরে চলেছি ঐতিহ্যিক নগরী মান্ডি থেকে, দুঃখ সেটাই। কেবল ঐতিহ্যিক নয়, মান্ডি হলো হিমাচলের এক নম্বর সাংস্কৃতিক নগর। এখানে প্রতিবছর বিখ্যাত শিবরাত্রি উৎসব উদযাপিত হয়।

বাস চলেছে বিয়াসকে সাথে নিয়ে। তার রঙ ঘন সবুজ, চোখের শুশ্রুষা, মনে হয় পান্না দিয়ে তৈরি নদী, এত সে সুন্দর। বিয়াসের প্রস্থবেড় শতদ্রু থেকে চওড়া, সুকেটি খাদ থেকে বেশি চওড়া তো বটেই। অনেকটা যাবার পর উত্তর থেকে নেমে আসা একটি সরু নদীর দেখা পাই। এর নাম উহল (Uhl)। এ নদীর পাশেই আই আই টি মান্ডি। পাহাড়ের পাদদেশে তার ঢালে নদীর বক্রতাকে অনুসরণ করে ৫২০ একর জায়গার উপর নির্মিত আই আই টি সমূহের নবীনতম ক্যাম্পাসটি এক কথায় বিস্ময়কর সুন্দর। শিক্ষাঙ্গণ যে কত মনোরম, কত প্রকৃতিবিহারী হতে পারে তার এক অতুলনীয় উদাহরণ। দেখা হলো না সুনন্দ সে ক্যাম্পাসও। কিন্তু একজন আই আই টি-য়ান হিসেবে বুকে গৌরব জাগলো কি? মনে হলো এ তো আমারই প্রতিষ্ঠান!

৪০

মান্ডি থেকে মানালি সোজা উত্তরে, মানচিত্র সেটাই দেখায়। তবে এই ঘন পাহাড়ি অঞ্চলে সোজা পথ বলে কিছু নেই, পাহাড়ের পাদদেশের বক্রতা মেনে পথ চলেছে নদী, ন্যাশনাল হাইওয়েও পাহাড়ের বক্রতা মেনে তৈরি। মান্ডি ছেড়ে পথ প্রথমে গেল পুবে, পরে দক্ষিণে, বিয়াসকে বাহুলগ্না করে ডুয়েট নাচের পুরুষের মতো সে ছন্দে ছন্দে পা ফেলছে। দক্ষিণ অভিমুখে কিছুদূর নেমে তার সম্বিত হলো উত্তরে যেতে হবে। নদীর রূপে বেহুঁশ কেবল সড়ক নয়, সড়কের যাত্রীরাও। সেখানে বিয়াসের গা থেকে একটি জলধারা নেমে গেছে দক্ষিণে। এর নাম জয়ুলি চ্যানেল। সামান্য যেতেই হঠাৎ বিয়াসের প্রস্থবেড় অনেকখানি বেড়ে গেল, পাহাড়ি নদীর ঐ সমতলীয় রূপ দেখে আমি হতবাক। টের পেলাম একটি জলবিদ্যুৎ বাঁধ পার হচ্ছে বাস, স্বচক্ষে দেখলামও Pandoh বাঁধ। এতক্ষণ বিয়াস ছিল আমার জানালার পাশে, পানডহ বাঁধ পেরুতেই তা চলে গেল অপর পাশে।

নদীতে বাঁধ দিলে যে কৃত্রিম জলাশয় তৈরি হয়, এখানে তার ব্যাপ্তি বেশিদূর ছড়াতে পারে নি পাহাড়ের বাধার কারণে, তবে তৈরি হয়েছে গভীরতা, নীল নদীটি আরো নীল হয়েছে। দেখলাম বাঁধের স্লুইস গেট দিয়ে তীব্র গতি ও ধারায় জল বেরিয়ে আসছে। সচরাচর চোখে পড়ে না- এমন একটি দৃশ্য, মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। প্রকৃতির শক্তিকে কৌশলে বেঁধেছে মানুষের প্রকৌশল। মুগ্ধতার রেশ থাকতে থাকতেই অভাবনীয়রূপে দৃশ্যপটে আসা পনডহ বাঁধ আড়ালে চলে গেল। বাস তখন পাহাড়ের কোমরে চড়েছে, পানডহ লেক অনেকখানি নিচে সম্মোহন জাগিয়ে শুয়ে রইল। দুর্ঘটনা এড়াবার জন্য সেখানে লোহার মোটা তারের বেড়া বসানো, যে কারণে বিরল বাঁধ ও অপূর্ব নীল হ্রদটির একটি ছবিও তুলতে পারলাম না। আফসোস হলো খুব। অন্য কারণ ছিল বিয়াসের অন্য পাশে সরে যাওয়া।

সিমলা থেকে যখন বাসের টিকেট কেটেছিলাম তখন কাউন্টারের ক্লার্ককে বলেছিলাম যেপাশে নদী পড়বে, আমার সীট যেন সেপাশে পড়ে। সুন্দর নগর থেকে মান্ডি পর্যন্ত পেয়েছিলাম সুকেটি খাদ নদী, মান্ডি থেকে কুলু অভিমুখী যাত্রায় বিয়াসও সুন্দর ধরা দিয়েছিল এ পাশের জানালায়, মনে হয়েছিল আমার বুঝি নদীভাগ্য। পানডহ বাঁধে এসে বিয়াস সেই যে অন্যপাশে দেহ সরাল, এপাশে আসার কোন লক্ষণ নেই। প্রথমে পারি নি, কেননা অন্যপাশটা যাত্রীঠাঁসা ছিল, পরে কিছু যাত্রী নেমে গেলে সীটবদল করি। পর্বত যদি না আসে, তখন আর কী করা? ভাবি এইসব পর্বতসঙ্কুল পথে কোথায় নামে মানুষ আর যায়ই বা কোথায়?

যাত্রাপথের এ অংশে ৩ নম্বর জাতীয় সড়ক পাহাড়ের অনেকটা উপরে থাকায় বাসযাত্রীদের মাঝে ভয়ের সঞ্চার হয়, রোমাঞ্চও জাগে। দুপাশে খাড়া ন্যাড়া পাহাড়, তাদের পাদদেশে বয়ে চলেছে ঐ রোমাঞ্চকর নদী। অপূর্ব দৃশ্য! এই পাহাড়ি পথের নির্জনতায় মন্দিরের সংখ্যা অবাক করার মতো। মানুষ যেখানে গেছে সেখানে তার ধর্মশালাকে সাথে করে নিয়ে গেছে। জনপদে হোক কিংবা নির্জন পাহাড়ে, মানুষের ঈশ্বর লাগে।

বাগলামুখী মন্দির পেরিয়ে আনন্দপুর সাহিব গুরুদুয়ারায় পৌছে গেছে বাস। সেখানে সড়ক অনেকগুলো চুলের কাঁটার মতো বাঁক। ভারি রোমাঞ্চকর পথখানি। আমি জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে নদীটিকে দেখি, দুপাশের পাহাড়ের মাঝে নীল ফিতা হয়ে আছে বিয়াস। সমতলের নদীর রূপ বেশিরভাগই তার নিজের ভিতর, পাহাড়ি নদী পরিপাশ নিয়ে ফোটে। পাহাড়ের কাছ থেকে ধার চেয়ে আনা একচিলতে জায়গা নিয়ে বানানো এ সড়কের বয়স ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের সময়কালের চেয়ে কম, কেননা তা নির্মিত হয়েছে ১৯৪৭ সালের পর। এখানে পাহাড়ের গা নিরেট পাথরে তৈরি, সবুজ পল্লবহীন। সেই রুক্ষ গাত্রের পাথুরে পথ কখনো নেমে আসে পাহাড়ের পাদদেশে, বিয়াসের প্রায় সমান্তরাল, কখনো উঠে যায় অনেকটা উপরে, নদী ও প্রকৃতিকে বিভিন্ন কৌণিক দূরত্ব থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়।

বাস থেকে একটি ঝুলন্ত সেতু দেখি, বিয়াসের উপর ঝোলানো। এ পাহাড়কে জুড়ে দিয়েছে ও পাহাড়ের সাথে। গুগল থেকে জানলাম এর নাম হানুগী (Hanoogi) ফুটব্রিজ। গুগল আরও জানাচ্ছে এ স্থান থেকে এ পাশের খাড়া পাহাড় ধরে সোজা উঠে গেলে ঋষি পরাশরের মন্দির ও হ্রদ পাওয়া যাবে। কেবল মন্দির ও হ্রদ নয়, রয়েছে ঋষি পরাশরের নামে বন। বিপরীত পাহাড়ের এ বনের কাছাকাছি রয়েছে নাল ও ঘুরাটি নামের আরও দুটি বন। এ সকল বনে প্রধানত দুধরণের উঁচু বৃক্ষ দেখা যায়- পাইন ও দেবদারু। হানুগী সেতু পেরিয়ে ঐ নামেরই মন্দির ও ধর্মশালা পার হবার পর নিরেট পাথুরে পাহাড়ে বৃক্ষাবলী ফিরে এলো। পাহাড়ের নিচের অংশে পাইনের সমাবেশ বেশি। পাইনের উঁচু মাথা ছাড়িয়ে পাহাড়ের শীর্ষে দীর্ঘকায় দেবদারুর সমাবেশ। রূপবতী সেসব বৃক্ষের শোভা দেখে চলি। এই উঁচু ও খাড়া পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড়ই বেশি দর্শনীয়। তবে সবচেয়ে রূপবতী, সবচেয়ে দর্শনীয় হলো বিয়াস।

৪১

পানডহ জলবিদ্যুৎ বাঁধ থেকে ৩ নম্বর মহাসড়ক উত্তরে না গিয়ে পূর্বদিকে গেছে। এ কথা বলার কারণ হলো মান্ডি, কুল্লু ও মানালি একই সরলরেখায় দাঁড়িয়ে, যে সরলরেখাটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে টানা। পাহাড়ি পথ যে কতটা সর্পিল, তার ভালো উদাহরণ হলো আকাশপথে মান্ডি ও কুল্লুর দূরত্ব মাত্র ৩১ কিলোমিটার, অথচ সড়কপথে তা ৮৬ কিলোমিটার। হানুগী ঝুলন্ত সেতু ও হানুগী মন্দির ছাড়িয়ে বিয়াসের পাড় ধরে ধরে সড়ক গেছে।

এখানে ভিউপয়েন্ট নামক জায়গা আছে।ভিউপয়েন্ট যেহেতু নাম, নিশ্চয়ই দেখার কিছু আছে। এই দর্শনীয় বিষয়টি হচ্ছে ম্যাক নামের এক জলপ্রপাত। বর্ষায় সে নিশ্চয়ই রূপবতী হয়, কিন্তু মার্চের এই শীতের পালক ফেলে এগুনো গ্রীষ্মে তার রূপ নেই, বিশীর্ণ নারীর চেহারা।ভূগোলের বইয়ে আঁকা ছবির মতো পাহাড়ের চূড়া থেকে পাথুরে গাত্র বেয়ে নেমে আসা ক্ষীণ জলধারা পাদদেশে কীরূপে সরু ধারা হয়ে নেমে আরো অনুরূপ অসংখ্য ধারার সাথে মিলিত হয়ে নদীর রূপ নেয়, তা হুবহু দেখলাম এই- নদী আর পাহাড়ের নিসর্গে। উৎসের, উজানের ক্ষীণধারা ভাটিতে গিয়ে কী করে অমন সুপ্রশস্ত নদীর রূপ নেয় তা বিস্ময়কর। আরো এগুলে সুইচইয়ারড নামের জায়গা দেখে ভাবি অমন নামের উৎস কী?

এই জনবিরল, বসতিবিরল পাহাড়ি পথে স্থানের নাম জানা কঠিন, কেননা পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড নেই, থাকলেও সেখানে স্থানের নাম নেই, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম আছে, চায়ের দোকানের নাম আছে। দাবাদা ছাড়িয়ে কায়ু নামক স্থানে (দুটি নামই গুগল থেকে নেয়া) মহাসড়ক পুবের টান উপেক্ষা করে উত্তরমুখী হলো, কেননা বিয়াসও উত্তরমুখী হয়েছে, সড়ক নদীর সমান্তরাল চলেছে। এখানেও পানিপথ বলে একটি জায়গা আছে। কায়ু থেকে কুল্লু (প্রথমে সিধা লিখেছিলাম, পরে কেটে দিয়েছি, কেননা পাহাড়ি পথে সিধা বলে কিছু নেই, সব পথই আঁকাবাঁকা) উত্তরে দুটি প্রধান গন্তব্যের নাম ‘ব’ অদ্যাক্ষর দিয়ে শুরু। এগুলো হলো- বানালা ও বাজুরা। তবে এই প্রাকৃতিক ভূগোলে মানুষের জনপদ তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।বানালার কাছে বিয়াসের সাথে মিলিত হয়েছে তীর্থ নদী। একেবারে যুৎসই নাম। যুগে যুগে সাধু সন্ন্যাসীরা বৈরাগ্য অর্জনের জন্য পাহাড়-পর্বত বেছে নিয়েছে। ভারতে দুটি প্রধান তীর্থস্থান হলো হিমালয় পর্বত ও গঙ্গা নদী। এখানে নদী নিজেই তীর্থে এসেছে, নাম নিয়েছে তীর্থ।

বাস আয়ুত নামের এক ছোট শহরে এসে পড়ে যেখানে নদীর পাড়ে চা-দোকান রয়েছে, নদীর পাড় ধরে ফুলের বাগান। দেখে প্রবল চা তৃষ্ণা জেগে উঠলো আমার। পাহাড়-নদীর অমন নৈসর্গিক পরিবেশে চা-পান লোভনীয়। আমাদের বাসচালকের বোধকরি চায়ের প্রতি বিরাগ রয়েছে, সে আমার কথা আমলে নিল না। (সমাপ্ত)