menu

আজ সিকদার আমিনুল হকের ৭৭তম জন্মদিন : শ্রদ্ধাঞ্জলি

সিকদার আমিনুল হকের গদ্য রচনা

ফারুক মাহমুদ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮
image

সিকদার আমিনুল হক মূলত কবি। ‘বিপুলপ্রজ’ কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতিও রয়েছে। বেঁচে ছিলেন একষট্টি বছর। লেখালেখির জীবন নিশ্চয় আরও ১০-১৫ বছর কম। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘দূরের কার্নিশ’ বেরিয়েছে ১৯৭৫ সালে। ওই কাব্যের কবিতাগুলোর রচনাকাল এক দশক বলে উল্লেখ রয়েছে। নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য এসব কবিতা রচিত হয়েছে মধ্য ষাটের দশকে। তাঁর শেষ কাব্য ‘আমরা যারা পাহাড়ে উঠেছি’ বেরিয়েছে ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সিকদার আমিনুল হকের প্রয়াণ ২০০৩ সালের মে মাসে। প্রথম এবং শেষ কাব্যের মাঝে বেরিয়েছে আরও ষোলটি কাব্য। এছাড়াও আছে ‘ছড়ার দুপুর’ নামে ছড়াগ্রন্থ। কবির জীবদ্দশায় বেরিয়েছে শ্রেষ্ঠ কবিতা এবং মৃত্যুর পর আমার সম্পাদনায় বেরিয়ে সিকদার আমিনুল হকের অপ্রকাশিত অগ্রন্থিত কবিতা। জীবনের শেষ কটি বছর কবিতা লেখাই ছিল তার প্রধান কাজ। অনুমান করা যায়, বিপুল লেখার সুবাদে তাঁর এক/দুটি কবিতার পান্ডুলিপি অপ্রকাশিত থেকে যেতে পারে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে আছে তাঁর অনেক কবিতা। এর মধ্যেই কিছু কবিতা আমাদের গোচরে এসেছে। সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় বিপুলতার কথা উল্লেখ করার কারণটি হচ্ছে, তিনি যে কবিতার পাশাপাশি গদ্য রচনায়ও মনোযোগী ছিলেন সেটি উপস্থাপন করা। তাঁর গদ্য রচনার সংখ্যাও কম নয়। বিচিত্র বিষয় নিয়ে গদ্য লিখেছেন, সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা বিষয়ে বেশ কিছু গদ্য রচনা আমরা তাঁর কলম থেকে পেয়েছি। নিজের গদ্য রচনার পটভূমি উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেনÑ কবিতার মতো নিয়মিত ও প্রথাগত পরিশ্রম কিংবা বহু দিনের শ্রম যুক্ত করে প্রবন্ধ আমি সচারচর লিখিনি। অনেক লেখাই, বিশেষ কোনো কাগজের সম্পাদকের অনুরোধে, বন্ধুদের ইচ্ছায় বা কেন গদ্য লিখিছ নাÑ এমন কোনো কোনো শুভানুধ্যায়ী ও অনুরাগী পাঠকের চাপেও কিছু প্রবন্ধ ও গদ্য লিখেছি।

সিকদার আমিনুল হক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় কলাম লিখেছেন। কোনো কোনো কলাম তো সেই সময় বেশ আলোচিত হয়েছে। একসময় তিনি ‘সাপ্তাহিক বিপ্লব’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন তিনি প্রায় নিয়মিত উড়ন্ত যোগাযোগ নামে একটা কলাম লিখতেন। নিজের নামে বা ছদ্মনামে কিছু লেখা বিভিন্ন কাগজে বেরিয়েছে। তবে এসব লেখা নিয়ে তাঁর অনাগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন- ‘নিজের নামে বা ছদ্মনামে লেখা কলামের সংখ্যা কম বলা যাবে না। এখন ভাবছি এসব লেখা বর্জিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এসবের কথা আমি ভুলে গিয়েছি এবং আমি চাই আমার অবর্তমানেও সেসব লেখা আমার নামের সঙ্গে আর কখনও যেন যুক্ত না হয়। নিজের এমন বিবেচনার কারণেই হয়ত কলাম জাতীয় লেখাগুলো পরবর্তীতে তাঁর গ্রন্থে স্থান পায়নি। সিকদার আমিনুল হক বেঁচে থাকাকালেই তাঁর দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ বেরিয়েছে ‘শব্দ থেকে ভাবনায়’ এবং ‘মৃত্যুচিন্তা: এবার হলো না গান’। উল্লিখিত প্রথম গ্রন্থে স্থান পাওয়া প্রবন্ধগুলো হচ্ছে ‘কবিতর নতুন জন্ম : আশা নিরাশা’, ‘নগর থেকে দূরে : সাহিত্যের সংকট’, ‘অমেধাবী সময়’, ‘জনপ্রিয় উপেক্ষিত লেখক’ : ‘ঈশ্বর ছাড়া আধ্যাত্মিকতা’, ‘সাগরের ওপারের এক মক্ষীরানী’, ‘কমলা দাশ ও কিছু প্রশ্ন’, ‘কবিতার সাম্প্রতিক অনুবাদ’, ‘সাম্প্রতিক গদ্যসাহিত্য’, ‘লেখকের পুরস্কার’, ‘মুহূর্ত থেকে শাশ্বত’, ‘শেষ লেখা’, ‘আহসান হাবীব : অক্ষয় তার গৌরব’ , ‘প্রতিভা ও কারাগার’, ‘আবুল হাসানের জন্যে গদ্য এলিজি’, ‘বই আমাদের ছেলেবেলা’, ‘কবিতার কবি’ প্রভৃতি। দ্বিতীয় প্রবন্ধগ্রন্থের রচনাক্রম হচ্ছেÑ ‘প্রসঙ্গক্রম: কালের পুতুল’, ‘বুদ্ধদেব বসু: কবি’, ‘পীড়িত কবি: এক বসন্তের পাখি’, ‘কবিতার খরা: কিছু সংশয় ও জিজ্ঞাসার উত্তর’, ‘বুদ্ধদেব বসুর গদ্য ও তাঁর পরিবার’, ‘দুই ভুবনের দুই কবি’, ‘আবিদ আজাদের কবিতা’, ‘মৃত্যু চিন্তা: এবার হলো না গান’, ‘দুই দশকের অভিজ্ঞতা: অন্তর্কৃত চঞ্চলতার স্বভাব’, ‘কবিতার দুঃসময় ও অনন্ত সময়’, ‘সাম্প্রতিক নাটকের দৃষ্টি’, ‘প্রথা থেকে বিদায়: স্থিতধী গল্পের প্রস্তাব’, ‘বাসা বাদল’, ‘আমাদের স্বাক্ষর’, ‘কবির জন্ম: কিন্তু কবি কে’, ‘পয়লা বৈশাখ: উত্তর চল্লিশে’, ‘বিষ্ণু দের কিছু স্মৃতি প্রভৃতি।

মিনার মাহমুদের সম্পাদনায় সিকদার আমিনুল হকের দু’খ- রচনাবলী বেরিয়েছে। দ্বিতীয় খন্ডে দু’টি অগ্রন্থিত প্রবন্ধ রয়েছে ‘নব্বই দশক: মাতাল তরণির কতিপয় যাত্রী’, ‘প্রসঙ্গ: বই ও বইয়ের প্রকাশনা’। এছাড়াও সম্প্রতি ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা শীর্ষক’ একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ, এবং ‘একজন কবির ক’টি কবিতা দরকার’ শীর্ষক গদ্য রচনা আমাদের হাতে এসেছে। প্রথমটি বেরিয়েছিল লতা হোসেন সম্পাদিত ‘পূর্ণতা’র শক্তি চট্টোপাধ্যায় সংখ্যায় (জুলাই, ১৯৯৬)। এ সংখ্যাটির অতিথি সম্পাদক ছিলেন রফিক আজাদ, দ্বিতীয়টি বেরিয়েছি অনওয়ার আহমদ সম্পাদিত ‘কিছুধ্বনি’ কবিতা পত্রিকায় (নভেম্বর ১৯৯৩)। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আধুনিক কালের প্রায় সব প্রধান কবিই গদ্য লিখেছেন। আমরা যদি মাইকেল মধুসূদনের কথাই ধরি, তাঁর লেখা দুটি বাংলা গদ্যের সন্ধান আমরা জানি, ‘(১)’ হেকটর-বধ অথবা হোমারের ঈলিয়াড নামক কাব্যের উপাখ্যানভাগ’ এবং ‘একটি বক্তৃতা’ শীষক ছোট রচনা। ইংরেজি ভাষায় মধুসূদনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা রয়েছে। কবিতার বাইরে ‘নাটক-প্রহসন’ তো আছেই। যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্য রচনার বিশাল ভা-ার দেখে আমি বিস্মিত। উপন্যাস ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণসাহিত্য, কী না লিখেছেন! রবীন্দ্রপরবর্তী ত্রিশের প্রধান কবি বুদ্ধদের বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তীÑ এঁরা সবাই বিপুলসংখ্যক গদ্য লিখেছেন। বন্ধুদেব বসুর কবিতার পল্লার মতো গদ্যের পাল্লাচিত্ত যে ওজস্বীÑ একথা সহজেই বলা যায়। বিশিষ্ট এবং বৈশিষ্ট্যম-িত এঁদের গদ্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। জীবদ্দশায় জীবনানন্দ দাশের তেমন কোনো গদ্য রচনার সন্ধান পাওয়া যায়নি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সন্ধান মিলেছে এই কবির বিপুলসংখ্যক গদ্য রচনার, কবিতার জন্য তো বটেই, জীবনানন্দ দাশ তাঁর গদ্য রচনায়ও বিশিষ্টতার স্বক্ষর রেখেছেন।

সমকালীন কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান গদ্য রচনায়ও তাঁর কলমের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অন্তত চারটি উপন্যাসের সন্ধান আমাদের কাছে আছে। ছয়টি গল্প নিয়ে তাঁর একটি ছোটগল্পের বই রয়েছে। আত্মস্মৃতি- ‘স্মৃতির শহর’ এবং ‘কালের ধুলোয় লেখা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘আছে আমৃত্যু তাঁর জীবনানন্দ’, ‘শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ’, ‘কবিতা এক ধরণের আশ্রয়’ প্রভৃতি। একান্ত ভাবনা, কলাম, নিবন্ধের বিষয়টিও তাঁর গদ্যরচনার উজ্জ্বল উদাহরণ। সৈয়দ শামসুল হক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এঁদের গদ্য রচনার সংখ্যা বিপুল। সবসময় কবিতায় যিনি মগ্ন ছিলেন- শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তাঁর গদ্য রচনাও উল্লেখযোগ্য। আবদুল মান্নান সৈয়দ লেখালেখি শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে; কিন্তু তাঁর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ রয়েছে বিপুলসংখ্যক।

কবিরা ভালো গদ্য লেখেন- এমন কথা প্রচলিত আছে। আসলেও কবিদের গদ্য কাব্যাশ্রয়ী এবং পাঠমধুর হবেÑ এটাও স্বাভাবিক। সিকদার আমিনুল হকের গদ্য নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। তবে মনযোগী পাঠক নিশ্চয় শনাক্ত করতে পারবেন, এই কবির গদ্য, তাঁর কবিতার মতোই বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। সংকেত, দর্শন, রূপময়তা, মুগ্ধতার আলো এবং অন্ধকার যেমন তাঁর কবিতাকে বর্ণময় করে তোলে, গদ্য রচনায়ও তিনি বাক্য বুননে, শব্দ ব্যবহারে অভূতপূর্বতার নিশানা রাখতে পেরেছেন। অনেকে বলতে চান, গদ্য রচনার জন্য বিশেষ করে প্রবন্ধ লিখতে তেমন আবেগ-আবিষ্ট হওয়ার প্রয়োজন বা ভূমিকা নেই। কিন্তু সিকদার আমিনুল হকের গদ্য লেখায় অবস্থান ছিল এমন বক্তব্যের বিপরীতে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, ‘গদ্য লেখার জন্যও আমি এক ধরনের প্রেরণা বা অনুকূল আবহাওয়ার মুখাপেক্ষী। কীভাবে লিখবো, সেটা জানতে আমার অনেক সময় লেগে যায়; তবে একবার যদি শুরু করতে পারিÑ হাতের আগে চিন্তা ও চিন্তার আগে আমার ভাষা তরতর করে এগোয়। অবচেতনের সঞ্চিত ভান্ডার দেখে আমি নিজেই অবাক হই।’ একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই, সিকদার আমিনুল হকের ‘গদ্য কবিতা, ধরনের কবিতাগুলো পাঠকের মুগ্ধ মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। এমন দক্ষতা তাঁর গদ্য রচনায়ও রয়েছে। শুধু তথ্যনির্ভর রচনা নয়, তিনি তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধে বিশ্লেষণের যৌক্তিক পথেই হেঁটেছেন, দাঁড়িয়েছেন নিজের চিন্তাজাত ঋজু বিশ্লেষণে। মৌলিক এবং নতুন ভাবনাই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর প্রবন্ধে, গদ্য রচনায়।

  • সিকদার আমিনুল হক সম্পর্কে

    বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা

    সাক্ষাৎকার

    newsimage

    [কবি সিকদার আমিনুল হকের ডাকনাম দীপক। দীপকের বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা। বর্তমানে তিনি

  • আমার বাবা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবেন

    সালমান তারিক মিশা

    newsimage

    ছোটবেলা থেকে আমি খুব একা থাকতাম। স্কুলে ভর্তি হই ১৯৭৫ সালে গভর্নমেন্ট

  • মহাদেব সাহার কবিতা

    newsimage

    [মহাদেব সাহা ষাটের দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি

  • নিরাপত্তা রক্ষী

    এম নাঈম

    newsimage

    লাশটি মাটির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আর গ্রামের মানুষরা চারিদিকে জটলা

  • অজানার ডাকে

    কণিকা রশীদ

    newsimage

    গত সতের দিন ধরে অন্ধ রজব আলী বসে আছে বকুল গাছের তলায়।

  • মহাস্থানের হাজার বছর

    সৌম্য সালেক

    newsimage

    নাটককে প্রাচীন কলাশাস্ত্রবিদগণ ‘দৃশ্যকাব্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। নাটকের মধ্যে বিশেষ কালপ্রবাহ আসতে

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    চতুর্দশপদী চিঠি মার্গারিটার কাছে ফাউস্ট মাহফুজ আল-হোসেন আমায় তুমি ক্ষমা কোরো না গ্রেচেন, আর করবেই