menu

সাহিত্যে মিথলজি ও যাদুবাস্তবতা

তুষার তালুকদার

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০
image

প্রবন্ধের বিষয়টি গুরুগম্ভীর তবে আলেচনাতীত নয়। প্রথমেই মিথলজি প্রসঙ্গে বলি। তারপর যাদুবাস্তবতা। বিশ্বসাহিত্যে মিথলজির ব্যবহার কবে থেকে শুরু তা হলফ করে বলা কঠিন। তবে ধারণা করা হয়ে থাকে গ্রীক মিথলজির নানা আখ্যান পড়েই সাহিত্যিকরা বিভিন্ন রূপকের মাধম্যে এসব কাহিনী সাহিত্যে প্রতিস্থাপন করেছেন। তবে যা বলা জরুরি- মিথলজি সাহিত্যের এক অনিবার্য অংশ হওযার বহু আগেই চিত্রশিল্পীরা মিথলজি ভিত্তিক চিত্রকর্মের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। একটু বিস্তারিত না বললে ব্যাপারটি অত্যুতকৃষ্ট হবে না। ঘটা করে চিত্রশিল্পে মিথলজির ব্যবহার শুরু হয় রেনেসাঁর একদম গোড়া থেকেই। গতানুগতিক খ্রিস্টীয় বিষয়াবলির পাশাপাশি গ্রীক মিথলজি হয়ে উঠল শিল্পীদের চিত্রকর্মের অন্যতম বিষয়। পনেরো শতকে সান্দ্রে বতিচেল্লির বার্থ অব ভেনাস, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির লেডা, রাফায়েলের গ্যালাটি ও প্লেটো, মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ভালোবাসার দেবতা ইরস নিয়ে আঁকা এমোর ভিনসিট ওমনিয়া (লাভ কনকোয়ার অল) ইত্যকার সৃষ্টি আমাদের জানান দেয় চিত্রশিল্পীদের উপর মিথলজির প্রভাব সম্পর্কে। অপরদিকে ইতালিতে পের্ত্রাক, বোকাসিও ও দান্তের মতো কবিরাও গ্রীক মিথ বা পুরাণের প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারেননি। তাই তাঁদের সাহিত্যকর্মেও উঠে এসেছে মিথভিত্তিক নানা কাহিনী।

আবার উত্তর ইউরোপে চিত্রশিল্পের চেয়ে সাহিত্য বেশি প্রভাবিত গ্রীক মিথলজি দ্বারা। লাতিন ও গ্রীক নানা উপাখ্যান যখন ইংরেজিতে অনুবাদ হতে থাকল সহজেই তখন মিথলজি নিয়ে নির্মিত গল্পগুলো মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেল। ইংল্যান্ডে চসার থেকে শুরু করে শেক্সপিয়ার, মিল্টন, রবার্ট ব্রিজ পর্যন্ত সবাই মিথলজিকে গ্রহণ করল অনুপ্রেরণার এক বৃহৎ উৎস হিসেবে। তবে আঠারো শতকে এসে এনলাইটমেন্টের দাদামায় মিথলজি বৈরিতার মুখোমুখি হল। রোম ও গ্রীস ভিত্তিক বিজ্ঞান ও দর্শনের সব অজর্নের বিপক্ষে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। তবুও থেমে থাকেনি মিথলজি নির্ভর সাহিত্য সৃষ্টি। আঠারো শতকের শেষে রোমান্টিকতাবাদের উত্থানের মাধম্যে আবার নতুনভাবে শুরু হল মিথলজির ব্যবহার। ইংরেজ কবি শেলী, কীটস, বাইরনসহ উনিশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ কবি লর্ড টেনিসন পর্যন্ত সাহিত্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন গ্রীক মিথলজি। শেলী লিখেছেন মিথ নির্ভর বিখ্যাত কবিতা এডোনিস। কীটস তাঁর অনেক কবিতায় গ্রীক মিথলজির নানা কাহিনীকে ব্যবহার করেছেন, নিজস্বতার পাশাপাশি। টেনিসন হোমারের ওডিসি, কিং আর্থারের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের কবিতায় প্রতিস্থাপন করেছেন জীবনের নানা রহস্যকে প্রস্ফুটিত করতে। এমনকি উনিশ শতকের আমেরিকান কবিরাও মিথলজি দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত। নাথানিয়াল হথর্ন, থমাস বোলফিঞ্চের মতো লেখকরা বিশ্বাস করতেন মিথ বা পুরাণ পাঠকদের এক অনির্বচনীয় আনন্দ দিতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, তাঁরা এও জানিয়েছেন যে, ইংরেজি ও আমেরিকান সাহিত্যকে বুঝতে গেলে অবশ্যই ক্ল্যাসিকাল মিথলজি পড়তে হবে। তাছাড়া বিশ শতকের আধুনিক সাহিত্য ধারায় এসেও ফ্রান্সে জ্যাঁ ককতো, জ্যাঁ জিরাডক্স, আমেরিকায় ইউজিনো ও নীল, এবং অন্যতম আধুনিক কবি টি. এস. এলিয়ট তাঁদের সাহিত্যকর্মে ব্যাপকভাবে ক্ল্যাসিকাল মিথলজির ব্যবহার করেছেন। এলিয়ট লিখেছেন দি ওয়েস্ট ল্যান্ডের মতো মিথিক কবিতা। শুধু কি তাই, ক্ল্যাসিকাল মিথলজির নানাবিধ চিন্তা ও ভাবনা সমসাময়িক সঙ্গীতেও দেখা যায়।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা যেমন: কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক প্রভৃতিতে মিথলজির প্রভাবকে এড়িয়ে যেতে পেরেছেন কিংবা গিয়েছেন এমন লেখকের সংখ্যা খুবই কম। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে মিথলজিতে মানুষের প্রাত্যহিক বাস্তব জীবনের নানা অনুষঙ্গ বর্ণিত হয়েছে। তাই লেখকরাও যুগে যুগে মিথলজিকে রূপক (allegory) অর্থে ব্যবহার করেছেন পাঠকদেরকে তাঁদের লেখার অন্তর্নিহিত বার্তা প্রেরণ করতে। যেমন গ্রীক মহাকবি হোমারের ওডিসি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে জেমস্ জয়েস সৃষ্টি করেছেন ইউলিসিসের মতো অমর সাহিত্যকর্ম। আর দেখিয়েছেন শাশ্বত থিম যে পূর্বের কোন পাপ বা ভুল বর্তমানে কোন মানুষকে নৈতিকভাবে দৃঢ় করতে সাহায্য করে। আবার সফোক্লিস তাঁর অনবদ্য নাটক ইডিপাসের (এ কাহিনীটি একটি গ্রীক মিথ বা পুরাণ) একদম শেষে উচ্চারণ করেন এক দার্শনিক উক্তি:

‘Then learn that mortal man must always look to his ending, /And none can be called happy until that day when he carries/ His happiness down to the grave in peace.’ অর্থাৎ সারকথা দাঁড়ায়, কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ নিজেকে পুরোপুরি সুখী বলতে পারে না। মিথলজির এমন অনেক শাশ্বত কথা আমাদের ধারণা বা বোধকে শাণিত করে। এখন বলি যাদুবাস্তবতার কথা।

যাদুবাস্তবতা সাহিত্য ও শিল্পকলার একটি নান্দনিক শাখা। এ শাখায় অনেক যাদুকরী উপাদান বা ঘটনা বাস্তব জগতের বিভিন্ন ঘটনার সাথে মিশ্রণ করা হয়ে থাকে। অনেকক্ষেত্রে এমনভাবে যাদুকরী উপাদানসমূহ উপস্থাপন করা হয় যা পুরোপুরি বাস্তব বলে মনে হয়। তবে যাদুবাস্তবতার অন্যতম পুরোধা লাতিন আমেরিকার লেখক গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ বলেন, আমার লাতিন আমেরিকায় এমন অনেক ঘটনা আছে যেগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাদু বলে মনে হলেও এ মহাদেশে সেসব ঘটনা সত্য, যাদু নয় কারণ আশ্চর্য এসব ঘটনার সাথে হয়ত অন্যান্য দেশের মানুষ পরিচিত না। তাই মার্কেজের দৃঢ় উক্তি আমার সাহিত্যের কাহিনীসমূহতে যে বাস্তবতা আছে তাই যাদু, যাদুকে বাস্তবভাবে উপস্থাপন করতে হয় না।

সত্যি বলতে যাদুবাস্তবতা কথাটি ১৯২০ সালের দিকে একদল চিত্রশিল্পীদের আঁকা ছবি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এ শব্দটি প্রথম ঘটা করে ব্যবহার করেন জার্মান চিত্রসমালোচক ফ্রান্জ রো। তিনি বিশ্বাস করতেন যাদুবাস্তবতা, মিথলজি ও পরাবাস্তববাদের মিলিত চিন্তা থেকে উৎসারিত। আর এর কিছুকাল পরেই বোহের্স, মার্কেজ ও গুন্টার গ্রাসসহ আরো অনেকের লেখা গদ্যকে নির্দেশ করতে যাদুবাস্তবতা কথাটি ব্যবহার করা হয়। যাহোক একটু সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যাদুবাস্তবতা নানান সাহিত্যে নানাভাবে বিভিন্ন কালে কিংবা সময়ে বিদ্যমান ছিল, তবে তা যাদুবাস্তবতা নাম ধারণ করে নয়। যেমন আমার শিক্ষক কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আমাকে একবার বলছিলেন, যাদুবাস্তবতা লালন শাহের মধ্যেও ছিল তবে ঐ সময়ে যাদুবাস্তবতা নামটি আমাদের চিন্তায় আসেনি। মূলত যাদুবাস্তবতার আকার কিংবা প্রকৃতি সর্বত্র এক নয়। এই বিচিত্রতা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণেই এ ধারাটি শিল্প। গঠন বা কাঠামো বিমুখিতা, ফিকশানে পাঠকের ভূমিকা, গ্রাম ও নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার মিশ্রণ, রহস্যময়তা, অভিজাত শ্রেণীকে বিদ্রুপ ও সমাজের গভীরতম স্তরের সমস্যা প্রভৃতি বিষয়াবলী যেগুলো উত্তর-আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য সেসবই আবার যাদুবাস্তবতায় আলোচিত হয়ে থাকে। এদিক থেকে যাদুবাস্তবতা আবার উত্তর-আধুনিক শিল্পেরও একটি অংশ। যাহোক এবার বলি বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে যাদুবাস্তবতার ব্যবহার নিয়ে। বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি লেখক যে এ সাহিত্যধারা নিয়ে কাজ করেছেন তা বলা যাবে না। হাতেগোনা কয়েকজনের মধ্যে প্রধান তিনজন: শহীদুল জহির, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও হুমায়ুন আহমেদ। এর মধ্যে প্রথম দু’জন পুরোপুরি ব্যবহার করেছেন আর হুমায়ূন আহমেদ আংশিক। শহীদুল জহিরের ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সুখদুঃখের গল্প নামক ছোটগল্প সংকলনে যাদুবাস্তবতা সংবলিত গল্প আছে। হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন গল্প ও উপন্যাসে আংশিক ছোঁয়া পাওয়া যায় এ শাখাটির। যেহেতু লাতিন আমেরিকায় যাদুবাস্তবতা শাখাটি বেড়ে উঠেছে তাই প্রাচ্যে এর ব্যবহার যথেষ্ট কম। ব্যাপকভাবে যাদুবাস্তব নানা আখ্যানের বর্ণনা এসেছে গার্সিয়া মার্কেজের গল্পে, আছে বোর্হেস, গুন্টার গ্রাস, লুই ফেরন, পিটার হেনকি, অ্যাঞ্জেলা কার্টার, উইলেম ব্রেকম্যান প্রমুখের গদ্যে। তবে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা যাদুবাস্তবতার সত্যিকার দাদামা পৃথিবীতে যে উপন্যাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তার নাম দি অন হানড্রেড ইয়ারস্ অব সলিটিউড। লেখক গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ। যে কথা না বললেই নয়, কিউবার ঔপন্যাসিক এলজো কার্পেন্টিয়ার যাদুবাস্তবতা শাখাটির উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তাঁর ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস দি কিংডম অব দিজ ওয়ার্ল্ড যাদুবাস্তবতার অন্যতম উদাহরণ। এ শাখা নিয়ে বিস্তর কথা বললে কিংবা নাম উল্লেখ করেছি এমন সব বইয়ের আলোচনা করলে এ প্রবন্ধের ইতিটানা মুশকিল। তাছাড়া কোন জার্নালের পরিসরই অনন্ত নয়। হলে না হয় গবেষণায় অবতীর্ণ হতাম উক্ত বিষয় নিয়ে। তাই যাদুবাস্তবতাকে আপাত এখানেই বিদায়।

যাদুবাস্তবতায় মিথলজি ও পরাবাস্তববাদের প্রভাব অনেকাংশে বিদ্যমান এ সত্যতা উপরে উল্লেখিত বইগুলো পড়লে পাঠকরা নিশ্চয় পাবেন। আর মিথলজি এতো কালোত্তীর্ণ। তাই একদম আধুনিক বা উত্তর-আধুনিক কোন সাহিত্যকর্মেও পেয়ে যেতে পারেন মিথলজির নানা আখ্যান। তবে উদ্দেশ্য ঐ একই অর্থাৎ কল্পনা হোক আর যাদুই হোক বৃহৎ অর্থে মানুষকে জগত সংসারের শাশ্বত দিকটি ধরিয়ে দেয়া ও বাস্তবতাকে চিনিয়ে দেয়া।