menu

সাময়িকী কবিতা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২০
image

আমার বুকের ভিতরে

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

আমার বুকের ভিতরে সমুদ্র

আমার বুকের ভিতরে আকাশ,

গোলাগুলির আওয়াজে যেন কান পাতা দায়

তোমাকে নিয়ে যাই

আমার বুকের ভিতরে যে সমুদ্র আছে

আমার বুকের ভিতরে যে আকাশ আছে, দেখাতে

আমরা বলি যারা নিরস্ত্র তাদের মারা যায় না

আমরা একসঙ্গে আকাশ দেখতে দেখতে সমুদ্র দেখতে দেখতে

দিন রাত পার হই,

গোলাগুলির আওয়াজ পিছনে ফেলে

নিটোল অশ্রুর মতো তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি

ফোলা ফোলা চোখের দিকে,

আমরা বলি আমরা নিরস্ত্র আমাদের মারতে পারো,

না আমরা কখনো মরি না,

স্বপ্ন দেখার চোখ কখনো মরে না,

আমি তোমার হাতে জীবন্ত

আমি পিছন ফিরে তোমাকে নিয়ে সকল বৃষ্টির দিন পার হই

নিরস্ত্র মানুষের স্বপ্ন দেখার চোখ কখনো মরে না,

নিটোল অশ্রুর মতো তোমার চোখে

জেগে থাকে সমুদ্র এবং আকাশ এবং স্বপ্ন

আমার প্রেম।

নিঃশব্দ প্রণাম

মহাদেব সাহা

নিরিবিলি ফুটে আছে ফুল, ফুল কী তোমার নাম,

বলে সে, জানি না নাম, বাংলাদেশ তোমাকে প্রণাম;

বাংলাদেশ, তুমি ধন্য, এই দেশে শেখ মুজিবর

তারই নামে পদ্মা-মেঘনা বয়ে যায় হাজার বছর,

তারই নামে ফোটে ফুল, ফুটে ওঠে বর্ষার আকাশ

জানি না অন্য নাম, জানি শুধু তার ইতিহাস।

লাল একটি গোলাপ, বলি তাকে কী তোমার নাম,

বলে, মুজিব তোমার পায়ে নিঃশব্দ প্রণাম;

প্রশান্ত ভোরের পাখি, সেও বলে শেখ মুজিবর

আমার কেবল আছে এই ছ’টি বাংলা অক্ষর।

ফলাফল মুজিবুর

হাবীবুল্লাহ সিরাজী

ঝুলন্ত সীমা দুরন্ত ¯স্রোতে

খাড়ি পাড়ি দেয় মূলে

বুকটান মেঘ নাচে একা ঘোর

বিজলির মায়া ভুলে।

তোমাতেই তুমি পূর্ণ হরণ

অবিনাশী অন্তর

জলের ক্ষমায় মাখামাখি ছায়া

অনাগত সমস্বর।

যা জানো সূত্র আগুন-বাতাসে

মৃত্তিকা দিলে টান

আকাশের পিঠে বংশ-গোত্রে

প্রলয়ের অভিযান।

মানুষ মানে তো প্রকৃতি-চিহ্ন

জগতের সুরাসুর

জাতি ও ভাষার মানস-স্বপ্নে

ফলাফল মুজিবুর।

আদর্শ-প্রহরী

অসীম সাহা

ভরা বরষায় নদীর পাড় যখন ভাঙতে থাকে

তখন বাতাসও স্তব্ধ হয়ে আকাশের

কানে কানে চুপি চুপি কথা বলে যায়।

নৌকা চলে খুব ধীরে- মাল্লাই-মাঝির কণ্ঠে বেজে ওঠে

বিষাদের ভাটিয়ালি গান- ঘুরঘুট্টি শূন্যতার চরাচরে

একটি নক্ষত্র শুধু জেগে থাকে ভুতুড়ে জ্যোৎস্নায়।

একটি বালক তখন একা একা সংগোপনে

মধুমতী-নদীজলে সাঁতরায়- তরঙ্গের ফেনিল

উচ্ছ্বাস নিয়ে খেলা করে ছুটে যায় সর্বগ্রাসী

সমুদ্রের উন্মাতাল স্বপ্নের দিকে।

এমন বালক তবে এতো বেশি দীর্ঘ হতে পারে!

তারপর সফেদ পাঞ্জাবি পরে আকাশকে নত করে

যুদ্ধের দ্বৈরথে এ-যুগের অর্জুন

আকাশকে কুরুক্ষেত্রের মাটিতে নামালে

জয়ী হয় পা-বেরা- পেছনে তাকিয়ে থাকে

পাপিষ্ঠ কৌরব। তারপর ছুটে আসে

দুর্বিনীত বালকের রঙিন-স্বপ্ন ভরা

আদর্শলিপির এক সম্পূর্ণ পাতা!

শৈশবের পাঠশেষে আদর্শলিপির পাতা

রঙিন ফুলের মতো সবুজের মানচিত্রে

লিখে দেয় দুঃসাহসী কুমারের অক্ষয় নাম।

আর অপেক্ষার ব্রত নিয়ে মার্চের কালিতে লেখে

দুঃসাহসী আবেগের সম্পন্ন কবিতা।

একটি পোস্টার

বিমল গুহ

সেই কৈশোরে আমার পড়ার ঘরে শোভা পেতো একটি পোস্টার

গোলাকার সূর্যের মাঝে শেখ মুজিবুর

চারপাশে বিচ্ছুরিত আলোর মতোন প্রজ্বলিত ৬-দফা দাবি

বাঙালির মুক্তির স্লোগান।

আমরা সেই পোস্টারের ৬-দফা দেখে দেখে রাজনীতি বুঝেছি।

তখন আমার কাছে রাজনীতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো

তখন আমার কাছে রাজনীতি শোষণের দীপ্ত প্রতিবাদ

তখন আমার কাছে রাজনীতি শেখ মুজিবের আলোকোজ্জ্বল ছবি

তখন আমার কাছে রাজনীতি ৬-দফার পক্ষে দাঁড়ানো।

বড় হতে হতে দেখি আমার দেয়ালে টাঙানো পোস্টারের আলো

বিচ্ছুরিত হতে হতে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলায়

তখন বাংলার মানুষ ধীরে ধীরে ৬-দফার মাহাত্ম্য বুঝেতে শিখেছ

তখন বাংলার মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে সারিবদ্ধ মুজিবের পাশে।

এই সেই শেখ মুজিব শোষিত-নির্যাতিত মানুষের নেতা

অসহায় মানুষের বন্ধু-সহায়, প্রতিবাদে অকুতোভয় মুক্তকণ্ঠস্বর

কোনো প্রলোভন যার গতিপথ রুখতে পারেনি কোনোদিন।

ঊনসত্তরের মুক্তমুজিব এক মৃত্যুঞ্জয়ী নাম

বাংলার মানুষের কাছে;

তখন মুজিব আর সাধারণ মানুষ নয় কোনো

তখন মুজিব মানে ‘বঙ্গবন্ধু’- ঘরে ঘরে উচ্চারিত বন্দিত মুজিব,

তখন মুজিব মানে শোষকের ভীতি

তখন মুজিব এই বাঙালির ভাগ্য-বিধাতা!

আর একদিন সেই পোস্টারের ভাষা স্পর্শ করেছে এই বাংলার আকাশ,

পোস্টারে মুদ্রিত সেই ছবির মানুষ

আকাশকে টোকা দিয়ে বলার সাহস পেয়ে যায়-

বলিষ্ঠ তর্জনী তার আকাশ স্পর্শ করে শোষকের প্রতি

তীর্যক বাক্যবান ছুঁড়েছে সেদিন।

এভাবে মানুষ মানুষের মাঝে হয় দেবতার রূপে আবির্ভূত

এভাবে মানুষ- যুগে যুগে সময়কে করেছে শাসন!

এইভাবে একটি পোস্টারের ভাষা পেয়ে যায় স্বাধীনতা-রূপ

এইভাবে একটি পোস্টার আজ আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে

এইভাবে একটি পোস্টার মুজিবের জন্মশতবর্ষে এসে

মহাকালের সীমানা দেখায়।

ধান

আবদুর রাজ্জাক

প্রতারিত ধান ও জল আমার, তুমি আমার বেদনার ফল,

প্রকাশ্য কুসুম। তুমি ফ্যাকাশে হলে আমার কোনো

প্রার্থনা থাকে না, প্রকাশ্যে ধূসর হতে থাকে বিকেলগুলো।

আমি তোমার অনার্য গোয়ালের গরু,

সন্ধ্যার আর্দ্রতামাখা ধান্যপ্রভা।

ক্রমশ আমি তোমার জন্য প্রার্থনায় থাকি,

তোমার মাঠের ধান হয়ে উঠি, পাকা, উষ্ণ স্বর্ণালি ধান,

আমি ভুলতে পারি না, তুমি প্রধানত ধান, প্রকাশ্য ধান।

টুপটাপ ছড়িয়ে থাকা উঠোন প্রাঙ্গণে আমার।

প্রাণের ধান যেনো কেউ নিজহাতে ছড়িয়ে দিয়েছে চাঁদকুসুমে,

তুমি ঘুমকুসুমে ফুটে আছো অমা ঘন রাতে। আমি কি

ভাঙতে পেরেছি এই ধানের ধাঁধা, মাটি ও ধানের প্রতিচ্ছবি!

আত্মপরিচয়

মিহির মুসাকী

যে আপনাকে জানলো না

সে আসলে ভাষা আন্দোলন কি

তা জনলো না।

সে জানলো না কতটা রক্ত প্রয়োজন হয়

নিজের মায়ের ভাষাকে নিজের করে পেতে!

যে আপনার আত্মত্যাগকে জানলো না

সে আসলে মানুষের অধিকার কাকে বলে

তা জনলো না।

সে জানলো না কীভাবে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য

শোষকের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়াতে হয়!

করে যেতে হয় সংগ্রাম আজীবন।

যে আপনাকে জানলো না

সে আসলে কোনোদিন বুঝবে না

প্রিয়জন থেকে দূরে জেলের প্রকোষ্ঠে কাটানো দিনগুলো

কতটা বেদনাবিধুর হয়?

সে বুঝবে না মানুষ কতটা ভালোবাসলে দেশ ও মানুষকে

এভাবে এতটা বছর থাকতে পারে অন্তরীণ নির্জন কারাগারে।

যে আপনাকে জানলো না

সে আসলে সাহস কাকে বলে তা উপলব্ধি করলো না।

সে বুঝলো না মানুষের ভালোবাসা কীভাবে

একজন মানুষকে মহামানবে

রূপান্তরিত করে, করে বঙ্গবন্ধু।

যে আপনাকে বুঝলো না

সে তো কোনোদিনও বুঝবে না

কাকে বলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র,

ধর্মনিরপেক্ষতা আর সমাজতন্ত্র

সে বুঝবে না কতটা ভালোবাসা মানুষের জন্য থাকলে

ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে যেতে পারে মানুষ

আপনাকে না জানলে জানা হবে না বাঙালি,

বাংলাদেশ আর স্বাধীনতা

জানা হবে না আত্মপরিচয়।

বঙ্গবন্ধু

খালেদ হামিদী

সমুদ্রে বৃক্ষের ডাক;

যার রাতে দিবসের কোলাহল ছুঁয়ে

গর্ভে পেতেছিলো কান সেই কোন্ আদিম পুরুষ?

‘আমি চলে গেলে চুমু নয়, ঠোঁটে ঠোঁটে

বিদ্ধ ক’রো এক বুক শূন্যের দিগন্ত।

দৃষ্টি নয়, চোখে চোখে চুম্কিময় ক’রে তোলো

অন্ধকার নাকাব আমার।

শোনা নয়, কানে কানে বুঝে নিও

সমুদ্র এবং রাত্রি।’

- এই ব’লে পৃথিবীর আগামী জনতা ছুঁয়ে

কার কাছে পেতেছিলো কান,

যে পুরুষ আশিকড় জীবন ও মৃত্যুর সমান?

শ্রাবণের রক্ত¯স্রোতে

জিললুর রহমান

শ্রাবণের জলধারা বঙ্গীয় বদ্বীপ বুকে সহস্র বছর বয়ে যাবে

পিতা শেখ মুজিবের রক্ত¯স্রোতে একাকার বুড়িগঙ্গা তুরাগের জলে

যখন অঝোরে ঝরে কাল¯স্রোতে কামালের জামালের রাসেলের

এমনকি আবাল বৃদ্ধ বনিতার বুলেটবিদ্ধ বুক থেকে

এ-আকাশ কতো মেঘ ধরে রাখে কতো বজ্র বিজুলি চমক

বাংলার মাটি ঘাস বাড়ির উঠোন আর শাড়ির আঁচল

তারচেয়ে কালো মেঘে ঢেকে থাকে পাথরের বুকচাপা কান্নার দমকে

এখানে ট্যাঙ্কের মুখ আর রাইফেলের নল থেকে কতো বজ্রপাত

নিরুদ্দিষ্ট পিতার প্রতীক্ষা আমাদেরও টেলেমেকাসের মতো

আমাদেরও পেনিলোপি বঙ্গজননীর কাঁথা নকশী করার ছল করে

ঘরে ফেরে কতো পাখি কতো বীর সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ ঠেলে

শ্রাবণ আমাকে শুধু কানে কানে প্রতি বর্ষে জলক্ষোভে বলে যায়

পিতা আর ফিরিবে না অর্বাচীন টেলেমেকাসের ঘরে বিষণ্ন জংলায়

বাংলার পথঘাট পিতার রক্তের ¯স্রোতে ভেসে যায় অনন্ত শ্রাবণ জলে

আঙুলের ভাষা

চয়ন শায়েরী

আঙুলেও ভাষা আছে বুঝে নিতে হয়

আঙুলের নির্দেশনা ক্রিয়াপদ যেন

কখনো বিশ্বাসে দৃঢ়

কখনো-সখনো যেন তর্জনগর্জন

কখনো নির্দেশ দেয় সংগ্রামে দ্রোহে

কখনো-বা কোনো-এক মুক্তির স্লোগান

ইতিহাস দেয় সাক্ষ্য- তাই ইতিহাসে

পুনরাবৃত্তির পাঠ- ছুঁয়ে দেখি প্রাণ

তুমি ছিলে তুমি আছ

শেখ মুজিবুর রহমান

তোমার হাতের ডান তর্জনীর ভাষা

রেসকোর্সে বাঙালির জাগায় বিশ্বাস

ওইসব মূক মুখে মুখর স্লোগান-

‘জয় বাংলা’ বলে গায় বাঙালির গান

তর্জনীটা অবশেষে তর্জনগর্জন

করে ওঠে দৃপ্তকণ্ঠে:

‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে

রাখতে পারবা না’

কী দারুণ ক্রিয়াপদে তর্জনীর ভাষা

দুখি বাঙালির বুকে জুগিয়েছে আশা!

ইনডেক্স ফিঙ্গারটা নির্দেশক যেন-

ওটাই তো ওর ভাষা:

‘যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর

মোকাবিলা করতে হবে’...

জাতিকে নির্দেশ দেয় অঙ্গুলিহেলনে

জাতীয় স্লোগান আজ ‘জয় বাংলা’টা

আঙুলের ক্রিয়াপদে যা যা করণীয়

সংগ্রামে আর দ্রোহে তুমি শিখায়েছ

কীভাবে বাঁচতে হয় মাথা উঁচু করে

তোমার আঙুল আজ নিজে ইতিহাস-

যে-জাতি মরতে শেখে বুলেটের ঘায়ে

পেরেছে কেউ কি তাকে রাখতে দাবায়ে?

চারদিক শঙ্খসুর

জাফর সাদেক

বিশালতার সংজ্ঞা মানুষ বোঝে- প্রথম সমুদ্রে গিয়ে

এ যেন হিসেব না মেলা অংক- ভীষণ পাগলাটে

তারপর আকাশে তাকিয়ে- বিস্ময় মাপতে শেখায়

কে বড় আকাশ না সমুদ্রের শ্বাস নেয়া ঢেউ

ঢেউয়ের পর ঢেউ গুনতে খেই হারায় ক্ষ্যাপা-বড়ত্বে

মন আর চোখে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব- মন দিগন্তের ওপাশে

চোখ আটকে গেছে দূরের ছায়ারেখায়

তারপর রাতের চাঁদে ঢেউয়ের মাখামাখি দেখে

স্নানের স্বাদ নেয় জোয়ারভাটার জীবন ছুঁয়ে মন

সাগরছুঁয়ে ফেরে মানুষ অন্তরে দিগন্ত হওয়ার সুখ

পথে মাঝেমাঝে শঙ্খে কান পেতে শোনে সমুদ্রের গান

মানুষ তুমি কান দাও-

শিশিরঝরা ভোরের বাঁশবাগান- হেমন্তের ধানখেত

গোধূলির পথে হাটুরেদল- নমিতা রানির চায়ের দোকান

নীলগিরি ছুঁয়ে সাঙ্গু নদ- চা-নারীর ঝুড়িতে সূর্যের বিকেল

চারদিক কেন আবেশিত সুর

বঙ্গবন্ধু সাতসমুদ্র- পায়ে পায়ে রেখে গেছেন সুরের শঙ্খ

কবি

মাহফুজ আল-হোসেন

গভীরতম চাওয়ার বীজমূলে পৌঁছুতে চেয়েছিলেন কবি,

দিতে চেয়েছিলেন ধ্যানমগ্ন এক প্রাচীন প্রবীণ বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়া;

পশ্চাতে রেখে এসেছিলেন দুই সহস্রাব্দের পরদেশি পরাক্রম আর দাসত্বের ক্ষতচিহ্নসমূহ।

সেই অভাবিত অপরাহ্ণে কবির সম্মুখে অপেক্ষমাণ নিশ্চুপ নিযুত স্রোতৃম-লী!

কবি কি শুধুই কালানুক্রমিক কান্নার আখ্যান শুনিয়েছিলেন সবাইকে?

কবি কি সবার মানস সরোবরে হৃদকুসুম হয়ে ফুটেছিলেন সে মুহূর্তে?

আসলে তিনি রক্তসাগর পেরিয়ে এক চিরসবুজ গন্তব্যের ঠিকানা চিনিয়েছিলেন সেদিন।

বঙ্গবন্ধু, বড় হচ্ছে আপনাকে না-দেখার মিছিল

ওবায়েদ আকাশ

বঙ্গবন্ধু, আপনাকে না-দেখার কোনো স্বস্তিই নেই আমার-

কিন্তু তো জন্মেছিলাম বাংলাদেশের প্রথম প্রহরে, আপনার দুর্বিনীত সাহসের প্রতিবিম্ব ঘিরে-

হতে কি পারত না, আপনাকে একঝলক দেখার ঐশ্বর্যে কাটিয়ে দিলাম একটি জীবন?

রেসকোর্স থেকে সারা বাংলা যেমন দাপিয়ে বেড়াত আপনার কণ্ঠ

তেমনি আমারও ক্ষুদে কণ্ঠ মায়ের কোল থেকে সমগ্র বাড়ি

উত্তাল করে দিত সেই দিনগুলি-

এইভাবে ভাষাহীন চিৎকার করে হয়তো আমিও কত কী বলেছি-

আপনার সময়ে জন্মেও আপনাকে না-দেখতে পারার দায় যেমন নিয়েছিল

আমার শিশু বয়স, তেমনি

আপনাকে হত্যার দায় কি নিয়েছিল সেই শিশু বাংলাদেশ?

বঙ্গবন্ধু, আমি আপনাকে কখনো দেখিনি

অথচ দেখেছি আপনার ¯স্নেহের সন্তান স্বাধীন বাংলাদেশের রোগজর্জর দেহ-

তাতে সামরিক কামান, ক্ষমতার লালসা আর স্বাধীনতার বিরোধিতা ছাড়া

কিছুই দৃশ্যমান ছিল না তখন-

বঙ্গবন্ধু, আমি জন্মেছি আপনার সময়ে আর বড় হয়েছি

বিভ্রান্ত গুজব, দেশদ্রোহের উচ্ছ্বাস, আর আপনাকে হত্যাকারীদের সুবর্ণ সময়ে-

আমাদের গেলানো হয়েছে দুর্গন্ধ ইতিহাস, রাজাকারের স্তুতি আর

ব্যক্তিগত পেট ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আকাশ স্পর্শের কথা-

বঙ্গবন্ধু, কাদায় রোপিত সেইসব পদচ্ছাপ শুকাতে শুকাতে

এতটাই শক্ত হয়ে উঠেছে যে, প্রবল জলোচ্ছ্বাসেও তাকে মেলানো যায় না আজ

বঙ্গবন্ধু, আমি আপনাকে কখনো দেখিনি

কিন্তু আপনার অনুপস্থিতি জুড়ে রয়ে গেছে আমার শত সহস্রপ্রগাঢ় বায়না

মুক্তির তর্জনী

ভাগ্যধন বড়ুয়া

ঐ তর্জনীতে গর্জন করে মুক্তির সমুদ্র;

সাত কোটি স্নায়ু সাতই মার্চে কেঁপেছিল

দিশা পেয়ে মানচিত্র আঁকে আশায়, ভালোবাসায়

আমার সোনার বাংলা...

দাবানল চাপা বুকে, ঐ তর্জনী স্বাধীনতা শিখা

ছক এঁকে বলে দেয় পথের হদিস

শব্দই বাঘের স্বর, শব্দই ব্রহ্মাস্ত্র

তর্জনী নির্দেশ করে সহস্র শব্দের ভাব

মুক্তি আর স্বাধীনতা।

কখনো তর্জনী হয় চেতনার কাঠি

স্ফুলিঙ্গের মতো ধাবমান টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া

কী বীজমন্ত্রে জাগালে বজ্রকণ্ঠ টোনে?

পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জলে তরঙ্গিত ঢেউ

ঐ তর্জনীর গিঁট জানে বাধা আছে প্রতি পদে

শ্বাপদের কালো থাবা আশেপাশে চারিধার

অনুভবে স্বাধীনতা, পরাজয় মনে নেই

স্বকীয় পতাকা ওড়ে বুকের বদ্বীপে...

রেসকোর্সের ভাষণ পলির মায়ায় প্রদীপ্ত কবিতা

বাতাসে তর্জনী দাগে মুক্তির সনদ

স্লোগানে উত্থিত হাত, আগুয়ান জনস্রোত

পৃথক পরিচয় নেই, এক নেতা এক দেশ

জয় বাংলা, বাংলাদেশ।

স্বপ্ন দেখার জন্য শেখ মুজিব লাগে

পিয়াস মজিদ

কিছু কিছু স্বপ্নের

কোনো বাটোয়ারা হয় না,

একা এক দীঘল পুরুষ

হয়ে ওঠেন

স্বাধীন ও সার্বভৌম স্বপ্নমানুষ।

তারপর নিজের ব্যক্তিগত দিগন্তের মতো

স্বদেশের সুরহারা আকাশকে

এক লহমায় ভরে তিনি তোলেন

অনন্তের আমার সোনার বাংলায়,

মায়ের মলিন মর্ম মুছায়ে

পতাকার রঙ আঁকেন

হাজার বছরের মায়া-লাল সবুজে,

আর নিচে নদী তো বয়ে চলে

তাঁরই অনুকূলে, উজানের দিকে।

অপফসলের দেশে

স্বপ্নের প্রসূনের জন্য

যথাযোগ্য জীবন লাগে,

যে জীবন নিঃসঙ্গ কিন্তু নিঃশঙ্কও

স্বপ্ন দেখার জন্য

কোনো জাতির যদি একজন

শেখ মুজিব থাকে,

সে দেশের নাম তবে

হয় হয় হয়

বাংলাদেশ হতেই হয়।

অমর নাম

হাইকেল হাশমী

কতই সভ্যতা বিলীন হয়েছে, আমাদের কি মনে আছে? কোনো সভ্যতাই খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। গ্রিক সভ্যতার কথা আজো আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে জানি। কোথায় সেই আলেক্সান্ডার দি গ্রেট, কোথায় ফিলিপ আর ক্যাসেন্ডার। মিশরীয় সভ্যতা আজ শুধু পিরামিডে বন্দি আর কিছু ফেরাউনের নাম জানা যায় ইতিহাসের পাতা থেকে, রইলো না রামসেস, খুফু, ক্লিউপেট্রা, তুতানখামেনের মতো শক্তিশালী রাজা-মহারাজার অস্তিত্ব। চীনা সভ্যতারও রইলো না কোন নাম। ইরানের সাইরেস দি গ্রেট, দাইরাস দি গ্রেট সবই তো আজ কেবলি এক একটি নাম। পম্পাই আর মহেঞ্জোদারো আজ মাটির গর্ভে বিলীন।

এই উপমহাদেশে কতো রাজা-মহারাজার ছিল রাজত্ব। মোরিয়া, গুপ্ত, আশোক, মোঘল, গৌরী, খিলজি আর কতো রাজপরিবার কিন্তু সবাই তো আজ ইতিহাসের পাতায় একটি ঝাপসা নাম। মানুষের মনে জায়গা না করতে পারলে টিকে থাকে না কোন নাম। দুঃখী মানুষের কল্যাণে, নিপীড়িত জনগণকে মুক্ত করতে যে মহামানবেরা দিয়েছেন তাঁদের শ্রম ও জীবনের বলিদান তারাই থাকবেন অমর, তাদেরই মৃত্যু নেই।

আমরা ভাগ্যবান আমাদের মাঝে জন্মেছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ মানব। তিনি আমাদের জন্য ছিনিয়ে এনেছেন মুক্তির লাল সূর্য আর পরিস্ফুটিত করেছেন স্বাধীনতার গোলাপ। তিনি তার দুঃখী জনতার জন্য সয়েছেন কারাগারের জুলুম বছরের পর বছর, যেটা মনে হয় অনন্তকাল। তিনি তো তার দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন সব চেয়ে মূল্যবান বস্তু, তিনি বিসর্জন করেছেন তার প্রাণ। ইতিহাস তো মনে রাখবে এমন মহৎ ব্যক্তির নাম, সে তো এঁকে দিয়েছেন মানুষের মনে তার অমর নাম।

বঙ্গবন্ধু

সুহিতা সুলতানা

আমার জন্মই হয়েছে এমন একটি দেশে চোখ খুলে

দেখেছি মধুসূদন, লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ

ও শেখ মুজিবকে! আমি চিৎকার করে বলতে পারি আমি

বাঙালি আমি মাতৃভাষায় কথা বলি, আমার মহান নেতা

বঙ্গবন্ধু! ঈর্ষার গহ্বর থেকে আমরা মুক্ত হতে চাই

কৃতঘ্ন মানুষের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হতে চাই

এ ভূখ- আমার আমাদের সকলের । লাল সবুজ

পতাকার নিচে আমরা আমাদের অধিকার খুঁজে পাই

ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে আজো প্রতিধ্বনিত হয় :

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের

সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তোমাকে অভিবাদন

বঙ্গবন্ধু

তোমার কণ্ঠস্বর একটি লাল গোলাপ, অবারিত মাঠ

একটি মানচিত্র আর আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা!

আত্মপরিচয়

মুজিব ইরম

কোথা থেকে এলে তুমি

কোন দেশের গাও গান

যে দেশেতে জাতির পিতা

শেখ মুজিবুর রহমান।

যে দেশেতে সাত কোটি লোক

বজ্র কণ্ঠে জাগে

যে দেশেতে মুজিব মুজিব

স্বাধীনতার আগে।

কোন ভাষাতে বলো কথা

কোন ভাষায় গাও গীত

যে ভাষাতে বঙ্গবন্ধু

তৈরি করেন মিথ।

আমি সে-দেশেরই লোক

যে দেশেতে পিতার আঙ্গুল

গর্বে ভরায় বুক।